ঢাকা, শুক্রবার 10 August 2018, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এবার কুরবানিতে খুলনা বিভাগের পশু বিক্রি হবে ১৯১ হাটে

খুলনা অফিস : আসন্ন ঈদ উল আযহায় খুলনা বিভাগে এবার উৎপাদন হচ্ছে সর্বমোট ৭ লাখ ৮২ হাজার ৪১৩টি। এরমধ্যে ষাঁড় রয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৯টি, বলদ ৪৯ হাজার ৮২টি, গাভী ৪০ হাজার ৫৪৩টি, মহিষ ১৭শ’টি, ছাগল ৩ লাখ ৮২ হাজার ৪৮টি, ভেড়া ২৩ হাজার ১২২টি এবং অন্যান্য পশু রয়েছে ৮৫৯টি। চাহিদা রয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার পশুর। 

বিভাগের ১০ জেলার ৫৯ উপজেলার ১৯১টি তালিকাভুক্ত হাটে বিক্রি হবে এসব পশু। আশার কথা হচ্ছে, খুলনা বিভাগে চাহিদার তুলনায় ৮৭ হাজার অতিরিক্ত পশু উৎপাদন হয়েছে। ফলে, সংকট তৈরি হবে না বলে মনে করছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

ঈদ উল আযহা উপলক্ষে খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় নিবন্ধিত ৯৩ হাজার ৯৬৭ জন খামারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে এসব গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উৎপাদন করা হয়েছে বলে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে। যশোরে ৬ হাজার ৯৬১ খামারি ১৯ হাজার ৯৭৮টি ষাঁড়, ৪ হাজার ২২৯টি বলদ, ২ হাজার ৬৭৯টি গাভী, ১৯ হাজার ৬২৫টি ছাগল, ১ হাজার ১৯৫টি ভেড়া এবং অন্যান্য পশু ৬৬টি, ঝিনাইদহের ১২ হাজার ৩৬১ জন খামারি ৩০ হাজার ২২১টি ষাঁড়, ৪ হাজার ৬২৫টি বলদ, ৬ হাজার ১৭৩টি গাভী, ১২১টি মহিষ, ২০ হাজার ২২৪টি ছাগল, ১ হাজার ৯১৯টি ভেড়া এবং ৯০টি অন্যান্য পশু, মাগুরার ২ হাজার ২৯২ জন খামারি ৫ হাজার ৯১০টি ষাঁড়, ২ হাজার ৩৬০টি বলদ, ১ হাজার ১৯২টি গাভী, ৬টি মহিষ, ৫ হাজার ৮০৮টি ছাগল, ১৩২টি ভেড়া, নড়াইলের ২ হাজার ৯৮৮ জন খামারি ৫ হাজার ৪৮৭টি ষাঁড়, ১ হাজার ৪৯৬টি বলদ, ১ হাজার ৬১৮টি গাভী, ৫ হাজার ৩৬২টি ছাগল, ২০টি ভেড়া, খুলনার ৩ হাজার ৬৩৭জন খামারি ১১ হাজার ৩৮৯টি ষাঁড়, ১ হাজার ২৪টি বলদ, ১ হাজার ১৬০টি গাভী, ৮ হাজার ২৯৪টি ছাগল, ৭৬৮টি ভেড়া ও ৩৩টি অন্যান্য পশু, বাগেরহাটের ৭ হাজার ৪১২ জন খামারি ১৫ হাজার ৩৫৮টি ষাঁড়, ৪ হাজার ৫৪৪টি বলদ, ৩ হাজার ২১৩টি গাভী, ১৫৩টি মহিষ, ১০ হাজার ৬৩৩টি ছাগল, ২ হাজার ৯৪৩টি ভেড়া ও ৭৪টি অন্যান্য পশু, সাতক্ষীরার ১০ হাজার ৫৫২জন খামারি ১৩ হাজার ষাঁড়, ৪ হাজার ৩৪৩টি বলদ, ৪ হাজার ৮৯৪ গাভী, ৪টি মহিষ, ১২ হাজার ৯০৩টি ছাগল, ৩ হাজার ৪৭৪টি ভেড়া, কুষ্টিয়ায় ২০ হাজার ১১০ জন খামারি ৫৭ হাজার ৬৭১টি ষাঁড়, ৫ হাজার ১০৬টি বলদ, ৬ হাজার ২২৬টি গাভী, ৩৮৫টি মহিষ, ৪৬ হাজার ৮৯১টি ছাগল, ৩ হাজার ৭টি ভেড়া ও অন্যান্য ১২৯টি পশু, চুয়াডাঙ্গায় ৭ হাজার ২৩৫ জন খামারি ২৮ হাজার ৮৩টি ষাঁড়, ২ হাজার ৪৩৩টি বলদ, ৫৭৬টি গাভী, ১৩১টি মহিষ, ৮৬ হাজার ৯১৫টি ছাগল, ১ হাজার ৭৭১টি ভেড়া এবং মেহেরপুরে ২০ হাজার ৪১৯ জন খামারি ২৭ হাজার ৮৮৪টি ষাঁড়, ৫ হাজার ১৭০টি বলদ, ১ হাজার ২৩১টি গাভী, ৬০২টি মহিষ, ৫৬ হাজার ৮৭০টি ছাগল, ১ হাজার ৫৪৮টি ভেড়া ও ৩০০টি অন্যান্য পশু পালন করা হয়েছে। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত পালিত পশুর সংখ্যা এটি। এরপর থেকে এ পর্যন্ত আরো ২ লাখ ১০ হাজার পশু পালনের তালিকায় যোগ হয়েছে।

সূত্র মতে, যশোরের ২৭টি, ঝিনাইদহের ২০টি, মাগুরার ১৮টি, নড়াইলের ১৩টি, খুলনার ২৫টি, বাগেরহাটের ২৯টি, সাতক্ষীরার ৭টি, কুষ্টিয়ার ১৯টি, চুয়াডাঙ্গার ৭টি ও মেহেরপুরের ৫টি হাটে কুরবানীর এসব পশু বিক্রি হবে।

খুলনা বিভাগের উল্লেখযোগ্য হাটের মধ্যে রয়েছে-যশোরের চৌগাছা, সাতমাইল, উপশহর, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর, কেশবপুর, খেদাপাড়া, নাভারণ, বাগআঁচড়া, ছুটিপুর, খাজুরা, চাড়াভিটা, নারকেলবাড়িয়া, রূপদিয়া ও পুড়োপাড়া। খুলনার মহানগরীর জোড়াগেট, ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া, শাহাপুর, আঠারোমাইল, চুকনগর, পাইকগাছার চাঁদখালী, গদাইপুর, কাছিকাটা, পাইকগাছা জিরোপয়েন্ট, দাকোপের বাজুয়া, চালনা, কয়রার দেউলিয়া, গোবিন্দপুর, কালনা, ঘুগরাকাটি, মান্দারবাড়িয়া, হোগলা, ফুলতলার সদর, দিঘলিয়ার এমএম মজিদ কলেজ মাঠ ও জালাল উদ্দিন কলেজ মাঠ, পথের বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তেরখাদার ইখড়ি কাটেঙ্গা, বটিয়াঘাটার বাইনতলা, খুটিরহাট, উপজেলা সদর, বারোআড়িয়া, রূপসার আমতলা, তালিমপুর ও পূর্বরূপসা বাসস্ট্যান্ড। কুষ্টিয়ার আইলচারা, উজানগ্রাম, বালিয়াপাড়া, কুষ্টিয়া, আলমপুর, হরিণারায়নপুর, মিরপুর, কুমারখালি, ভেড়ামারা, আল্লারদরগা, খোকসা ও পোড়াদহ। ঝিনাইদহের ভাটই, গাড়াগঞ্জ, শৈলকুপা, খালিশপুর, এলাঙ্গী, বারোবাজার, হরিণাকুন্ডু, ডাকবাংলা, মধুপুর, গোয়ালপাড়া, মধুহাটি, সাধুহাটি, নগরবাথান, বৈডাঙ্গা, বাজার গোপালপুর, গান্না, হরিণাকুন্ডু হাটখোলা ও হরিণাকুন্ডু চরপাড়া। চুয়াডাঙ্গার বদরগঞ্জ, সরোজগঞ্জ, আলমডাঙ্গা, মুন্সিগঞ্জ ও শিয়ালমারি। মেহেরপুরের পৌরসভা, বারাদী ও বামন্দী-নিশিপুর। সাতক্ষীরার পারুলিয়া, আবাদ, পাটকেলঘাটা, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ। মাগুরার রামনগর, কাটাখালি, আলমখালি, শত্রুজিতপুর, আলোকদিয়া, বেথুলিয়া, নহাটা, আড়পাড়া, সীমাখালি, পুলুম, চতুরবাড়িয়া, লাঙ্গলবাঁধ ও সারঙ্গদিয়া। নড়াইলের মাইজপাড়া, লোহাগড়া, শিয়েরবর, শিঙ্গাশোলপুর ও পুরুলিয়া। এবং বাগেরহাটের বেতাগা, রামপাল, ফকিরহাট, মোরেলগঞ্জ ও রায়েন্দা।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, এসব হাটে এ বছর প্রায় আট লাখ পশু ঈদ উল আযহা উপলক্ষে বিক্রি হবে। বিভাগীয় উপ-পরিচালক কল্যাণ কুমার ফৌজদার জানিয়েছেন, তিনিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিন সরেজমিনে নিবন্ধিত বিভিন্ন খামার পরিদর্শন করছেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন, পশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে। কোনো খামারে পশু মোটাতাজাকরণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে কি না সেটিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

গত বছর ঈদ উল আযহায় ১৩৭টি মেডিকেল টিম পশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন হাটে গিয়েছিল। এ বছর এখনও পর্যন্ত মেডিকেল টিমের তালিকা বিভাগীয় কার্যালয়ে না এলেও গত বছরের মতো থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব টিম প্রতিনিয়ত খামার ও হাট তদারকি করবে। এর পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশে চার সদস্যের উপজেলা কমিটিও দেখভাল করবে বলে সূত্র জানিয়েছে। 

এদিকে, খামারি,ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানাগেছে, গত বছরের তুলনায় এবার কুরবানীর পশুর দাম তুলনামূলক বেশি। তবে, খুলনা বিভাগের হাটগুলোতে দেশীয় পশুর আধিক্য থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

ঝিকরগাছা উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় খামারি হাসানুর রহমান। এবারের কুরবানি ঈদে বিক্রির জন্যে তিনি ৬০টি গরু মোটাতাজা করেছেন। তার খামারে এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা মূল্যের গরু রয়েছে। এরই মধ্যে ১৯টি গরু তিনি বিক্রিও করেছেন। আশা করছেন এবার তিনি ভালো মুনাফা করতে পারবেন।

খামারি ও সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছর ভারতীয় গরু আসা বন্ধ থাকায় প্রতি বছরই যশোরে খামারের সংখ্যা বাড়ছে। আর এসব খামারে দেশি পদ্ধতিতে পালন করা হচ্ছে হাজার হাজার গরু ও ছাগল। যশোর জেলায় খামারির সংখ্যা ৬ হাজার ২০০ এবং ছাগলের খামারি রয়েছেন ৫ হাজার ৩০০। এসব খামারে ৩২ হাজার ৯৭৩ গরু এবং ২৬ হাজার ছাগল মোটাতাজা করা হয়েছে। তবে এটা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। গত ৬ মাসের পরিচর্যায় মোটাতাজা করা গরু-ছাগল এখন বিক্রির জন্য প্রস্তুত।

পশু চিকিৎসক শামছুর রহমান বলেন, ‘আমার তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০টি খামার রয়েছে। আমি এসব খামার তত্ত্বাবধান করি। খামারিরা প্রাকৃতিক খাদ্য, যেমন-নেপা ঘাস, খুদ, কুড়ো, খড়, ভূষি, খৈল ইত্যাদি পশুর খাবার হিসেবে ব্যববহার করে থাকেন। পশু মোটাতাজাকরণে তারা কেউই ক্ষতিকর কোনও রাসায়নিক, হরমোন কিংবা ট্যাবলেট ব্যবহার করে না। সে কারণে কুরবানির জন্যে তৈরি করা এসব পশু স্বাস্থ্যের জন্যে নিরাপদ।

ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ চন্দ্র মন্ডল বলেন, গতবারের তুলনায় এবার পশুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। কিন্তু এতে জেলার কুরবানির চাহিদায় কোনও প্রভাব ফেলবে না। পশু চিকিৎসক এবং প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তদারকিতে দেখা গেছে, খামারিরা পশু মোটাতাজা করতে প্রাকৃতিক খাবারই ব্যবহার করছেন। স্বাস্থ্যের জন্যে হুমকির এমন কোনও ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এসব গোশ সর্বাংশে নিরাপদ।

যশোর জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. ভবতোষ কান্তি সরকার বলেন, জেলায় খামারের সংখ্যা বাড়লেও পশু পালনের সংখ্যা কমেছে। এবারে জেলার কুরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হলেও বাইরে বেশি একটা পাঠানো যাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গতবার কুরবানির পশুতে খামারিরা দাম কম পাওয়ায় এবার মোটাতাজাকরণ কিছুটা কমেছে। সে কারণে উদ্বৃত্তের সংখ্যাও কম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ