ঢাকা, শনিবার 11 August 2018, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভালো নয় পাট ও পাটশ্রমিকের অবস্থা

খুলনা অফিস : ভালো নেই খুলনার  বেসরকারি পাটকলগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীরা। একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক সময়ের লাভজনক খুলনার বেসরকারি পাটকলগুলো। এ অঞ্চলের বেসরকারি ২৭টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে ৮টি। আর আংশিক চালুর তালিকায় রয়েছে পাঁচটি পাটকল। যা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকারত্বের কবলে পড়ছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বাজারে এসব মিলের শ্রমিকদের পরিবার-পরিজন নিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এসব জুট মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা মজুরী, বেতন ও গ্রাচ্যুইটিসহ বকেয়া পাওনা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। পাটকল বন্ধক রেখে ব্যাংকের ঋণ নেয়া এবং পরে সেই টাকা দিয়ে অন্য ব্যবসা পরিচালনা করা, মিল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও সঠিক তদারকির অভাবে এ দুরাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
পাট অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পাট সূতা, বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশন সূত্রে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরে বেসরকারি পাটকল রয়েছে ২৭টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-এ্যাজাক্স জুট মিল, সোনালী জুট মিল, মহসেন জুট মিল, আফিল জুট মিল, জুট স্পিনার্স, সাগর জুট মিল, স্পেশালাইজড (টুয়াইন) জুট মিল, নওয়াপাড়া জুট মিল, গ্লোরি জুট মিল, সালাম জুট মিল, দৌলতপুর জুট টেক্সটাইল, ওহাব জুট মিল, এফ আর জুট মিল, আইয়ান স্পিনিং, নওয়াপাড়া শিডলু স্পিনিং, ইয়াছিন, আহাদ জুট মিল, আকিজ জুট মিল, সুপার জুট মিল, জয় জুট মিল, কাজী শাহনেওয়াজ প্রাইভেট জুট মিল, জুট টেক্সটাইল মিল (মন্ডল), মিমু জুট মিল, মুন স্টার জুট মিল, এ আর জুট মিল ও ট্রানসেশন জুট মিল। এসব জুট মিলের মধ্যে ২০১৩ সালের ২২ জুন খুলনার মহসিন জুট মিল প্রথম দফায় লে-অফ ঘোষণা করে। দীর্ঘ ১৩ মাস ৫ম দফা লে-অফ থাকার পর ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই মিলটি বন্ধ ও মিলের ৬৬৭ জন শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই করে মিল কর্তৃপক্ষ। মিলটি স্থায়ী বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পর শ্রমিক পরিবারগুলোর মাঝে হতাশা নেমে আসে। শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ে। আর ২০১৬ সালের জুলাই থেকে কৌশলে অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে জুট স্পিনার্স। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজ করতে পারছে না। জেডিএল মিলের ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে। এছাড়া সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে বন্ধ রয়েছে আফিল জুট মিল। মিলটি বন্ধ থাকায় অর্থ কষ্টে মানবেতর জীবন-যাপন করছে শ্রমিক-কর্মচারীরা।
শুধু মহসেন, আফিল আর জুট স্পিনার্স মিলই নয়, একে একে বন্ধ রয়েছে এ্যাজাক্স, ট্রানসেশন, শাহ নেওয়াজ, ইয়াছিন জুট ও স্পেশালাইজড জুট মিল। আর আংশিক চালু অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পাঁচটি পাটকল। এগুলো হচ্ছে সোনালী, আহাদ, নওয়াপাড়া, শিডলু ও সাগর জুট মিল। এসব পাটকলের শ্রমিক-কর্সচারীদের মজুরী, গ্রাচ্যুইটি ও বোনাসসহ কোটি কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এমন অবস্থায় খুলনা অঞ্চলের লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার অত্যন্ত মানবেতর জীবন-যাপন করছে। আর এমনটা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যেও চলছে চরম মন্দা।
 বেসরকারি পাট, সুতা, বস্ত্রকল ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম সবুজ জানান, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ২৭টি বেসরকারি পাটকল রয়েছে। এসব জুট মিলের মধ্যে ৮টি এখন বন্ধ রয়েছে। আর ৫টি আংশিকভাবে চালু রয়েছে। মিলগুলো লাভজনক থাকা সত্ত্বেও মালিকরা মিলগুলো বন্ধের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। শ্রমিকদের বেকারত্বতা দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এ শ্রমিকরা বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হতে পারে। এ কারণে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বেসরকারি পাট সূতা বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারি ফেডারেশনের সভাপতি শেখ আনসার আলী জানান, খুলনায় বেসরকারি পাটকলের শ্রমিকদের দুর্দশা যেন শেষ নেই। অধিকাংশ পাটকল বন্ধ। বকেয়া মজুরি না পেয়ে শ্রমিক পরিবারে নেমে এসেছে হাহাকার। এর মধ্যে এ্যাজাক্স জুট মিল, মহসিন জুট মিল, জুট স্পিনার্স উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সোনালী জুট মিল চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তিনি বলেন, আফিল জুট মিলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে গত ৬ মাস মিলটি বন্ধ রয়েছে। তবে জেনারেটর চালুর চেষ্টা চলছে। মিলটি চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
মহসেন জুট মিল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শেখ আব্দুর রশিদ বলেন, ৫ বছর ধরে মিলটি বন্ধ। মিলের কাছে শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা রয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। ফলে দীর্ঘদিন তারা বেকার ও মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকে চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে। অনেক পরিবারের সন্তানদের লেখা পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। তবে মিল বন্ধের পর দু’দফায় মেইনট্যানেন্স করা হলেও চালু করা সম্ভব হয়নি।
জুট স্পিনার্স মিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ রবিউল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে মিলটি বন্ধ হয়। দীর্ঘদিন মিল বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা মজুরী না পেয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে। তিনি বলেন, মিলের মালিকসহ ৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জেডিএল শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেছে। এই মামলায় ৫ কর্মকর্তাই জামিনে রয়েছেন। আগামী ২৯ আগস্ট মামলার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ