ঢাকা, শনিবার 11 August 2018, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছেই

গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় ২ শিক্ষার্থী হত্যা ও ১০/১২ জনের মারাত্মক আহতের ঘটনায় স্কুলকলেজের সকল শিক্ষার্থী ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয় এবং রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সছাড়া ড্রাইভারদের খুঁজে বের করে পুলিশে দেয়। এতে শৃঙ্খলারক্ষায় সহযোগিতা হয়। এমতাবস্থায় যখন প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নিয়ে তাদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানান, তখন শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে মহল বিশেষ অপতৎপরতায় লিপ্ত হয় বলে উদ্বেগজনক খবর পাওয়া যায়। এরই মধ্যে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী রাইয়ান নামক এক ছাত্রকে গত ৩ জুলাই সকাল ৭ টায় পুলিশের পোশাক পরা কয়েকজন এসে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। এসময় রাইয়ানকে উদ্দেশ করে বলা হয়, ‘বিচার চাইছো তো, চলো বিচার করছি।’ ছেলেটি খিলগাঁও সরকারি কলোনি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক ২য় বর্ষের ছাত্র। বাসা যাত্রাবাড়ির কাজলা। আমরা জানি না ওর ভাগ্যে কী ঘটেছে।
উদ্বেগের আরেকটি খবর হচ্ছে, একটি মহলের উদ্যোগে বস্তিবাসী হাজার দেড়েক কিশোরতরুণকে বিভিন্ন স্কুলের ইউনিফর্ম পরিয়ে রাস্তায় নামিয়ে যানবাহন ভাংচুর করে দায় চাপানো হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রছাত্রীদের ওপর। অতঃপর ধানমন্ডির জিগাতলায় যা ঘটলো তা নজিরবিহীন। অতঃপর কিশোর শিক্ষার্থীরা চাপের মুখে রাজপথ থেকে সরলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু তাদের ওপর যেভাবে হামলা হলো তা কি ভাবা যায়? ধানমন্ডির জিগাতলা কিংবা নর্থসাউথ ও ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে সশস্ত্র হামলার যেসব ছবি পত্রিকায় ছাপা ও টিভিতে দেখানো হয়েছে সেগুলো গুজব বলে চাপা দেয়া যায়নি। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন জায়গায় হামলা হয়েছে। অনেকে নিখোঁজ। হামলার ছবি অনলাইনেও ব্লক করা হচ্ছে। বিক্ষোভের খবর টিভি চ্যানেলে সম্প্রচারে করতে উচ্চমহল থেকে বাধা দেয়া হয়েছে। হামলা হয়েছে সাংবাদিকদের ওপর। ধানমন্ডির আওয়ামীলীগ অফিসেও হামলা হয়েছে। কারা এই হামলাকারী? কারা এই সন্ত্রাসী হামলাবাজ? এদের কাউকে আটকানো হলো না কেন?
উল্লেখ্য, অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট করে দেশব্যাপী মারাত্মক জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়। অথচ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যানবাহন চালাতে বাধা দেয়নি। ভাঙচুরও করেনি। ওরা কেবল ফিটনেস সার্টিফিকেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি দেখেছিল। যাদের কাছে পেয়েছে তাদের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। যাদের কাছে পায়নি তাদের পুলিশে দিয়েছে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবার জন্য। পুলিশও তাদের প্রশংসা করছে। তাহলে কারা শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষুব্ধ? কেন তারা হামলার শিকার হলো? এর রহস্য উদঘাটিত হওয়া দরকার। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের হাতে সোপর্দ করা জরুরি।
সড়ক আন্দোলনের সব দাবি মেনে নেবার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাসচাপায় নিহতদের পরিবারকে ৪০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্রও দিয়েছেন তিনি। নিহত দুই শিক্ষার্থী যে কলেজে পড়তেন সেটিকে ৫ টি বাস দেয়া হয়েছে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের আনানেয়ার জন্য। এসব উদ্যোগ নিশ্চয়ই প্রশংসার। জাবালে নূরের হন্তারক ড্রাইভারের উপযুক্ত বিচারের আশ্বাসও দেয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনেরও পরিবর্তন আনা হয়েছে মন্ত্রীপরিষদে।
শিশুকিশোর আন্দোলনকারীদের ক্লাসে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছে। এটা তাদের দরকারও। কারণ পড়ালেখাই তাদের আসল কাজ। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ তাদের কাজ নয়। তবে পরিবহন সেক্টরে যে অনিয়মের জগদ্দল অচলায়তন চেপে বসেছে তা সরাতেই শিশুকিশোর শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল। তারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে অসঙ্গতিগুলো। ফলে গাড়ির ফিটনেস ও লাইসেন্স নবায়নের জন্য বিআরটিএ-তে দীর্ঘ লাইন পড়েছে। পুলিশের গাড়িও দেখা গেছে এ লাইনে। সড়কে নিরাপত্তা প্রত্যাশী সাধারণ জনগণ, অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ সবাই নিরাপদ সড়কের ন্যায্য দাবি সমর্থন করেছেন। তবে আগামিতে ওদের যেন কেউ ভুল পথে পরিচালিত না করতে পারে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, নিরাপদ সড়কের দাবিতে সকল আন্দোলনকারীর প্রতি সবাই সুনজর দেবেন। ওদের জীবনের প্রতি কোনও পক্ষ যেন হুমকি না হতে পারে। আমরা তাদের নিয়ে কোনও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকতে চাই না। আমরা শান্তি ও শৃঙ্খলার পক্ষে নিরন্তর। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের আন্দোলনকারী ২২ শিক্ষার্থীকে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে কী হয় অনেকেরই জানা। কেউ দোষী হলে আইনানুগ বিচার হতেই পারে। কিন্তু যারা মার খেলো। আহত হলো। তাদেরই পুলিশ গ্রেফতার করলো। হলো রিমান্ড। দেয়া হলো হাজতে। যারা হামলা চালালো তাদের কিছু হলো না। অথচ হামলায় পুলিশও আহত হয়েছে। কিন্তু পুলিশের চোখে পড়লো না হামলাকারীদের কেউ। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ার কারণ এটাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ