ঢাকা, শনিবার 11 August 2018, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পুলিশ আমাদের ভাই অথবা সন্তান

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। এটা আমাদের সবার জানা। পুলিশ ঘুষ খায় এটাও সবাই বলেন। পুলিশ পুলিশই। মানুষ না। এমন ধারণা প্রায় মানুষেরই। এরপরও পুলিশের কাছে মানুষকে যেতে হয়। অর্থাৎ পুলিশ আছে বলেই সমাজটা আছে। সমাজের মানুষ এখনও রাতে ঘুমোতে পারে। বলুন, পুলিশ না থাকলে রাতে কেউ ঘুমোতে পারতেন নির্বিঘ্নে?
পোস্টের নিচের অংশটুকু জনৈক মোল্লা মাসুমের টাইমলাইন থেকে নেয়া। তিনি এটা নিজে লেখে পোস্ট করেছেন, না অন্যের পোস্ট শেয়ার করেছেন তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে তিনি একজন সচেতন মানুষ। পুলিশের লোকও হতে পারেন। নিজের পরিচয় গোপন করে কথাগুলো লিখতে বা বলতে পারেন। এতে দোষের কিছু নেই বলে আমি মনে করি। তবে শিরোনামটা ছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে দেয়া বিক্ষুব্ধ কিশোরতরুণ ছাত্রদের শ্লোগানের অংশ। আমি উদ্ধৃত করতে চাইনি শুনতে খারাপ লাগবে বলে। শুধু পাঠকদের বুঝতে সুবিধে হবে বলেই উল্লেখ করলাম। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। সেটা হচ্ছে, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত লাল, পুলিশ কোন চ্যাটের বাল’।
‘ছাত্রআন্দোলনে জোর সমর্থন দেয়া এক বাবার সন্তান বাসায় ফিরছে না। উদ্বিগ্ন বাবা পরিচিত এক পুলিশ অফিসারকে বারবার ফোন দিচ্ছেন। ছেলের খোঁজ চেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন।
অবশ্য তিনি ফোন দিয়ে ‘ওই চ্যাটের বাল, আমার পোলাকে আইনা দে’ বলছিলেন, না কি ‘ভাই আপনার পায়ে পড়ি আমার ছেলেটাকে উদ্ধার করবার ব্যবস্থা করুন প্লিজ’ এমন করে বলেছিলেন, সেটা পোস্টের লেখক বলেননি। উল্লেখ্য, পুলিশ যদি পক্ষে থাকে তাহলে সে সাধু। বিপক্ষে গেলেই সে ‘চ্যাটের বাল’ এমন আর কী!
আজকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা নেতারা জোরেসোরে পুলিশকে গোলাম, তাবেদার, পাচাটাসহ অনেক অভিধা দিচ্ছেন। তারা কি বুকে হাত রেখে বলতে পারেন, কোন সরকারের আমলে পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে? পুলিশ ব্যবহৃত হয়নি?
পাওয়ারে থাকা সরকারের প্রতি পুলিশের আনুগত্য না থাকলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা অনেকে কল্পনাও করতে পারবেন না। পুলিশ নিয়ে আমাদের এলার্জি আজকের নয়। এটি বহু পুরনো একটি জাতীয় ব্যাধি বলা যেতে পারে। পুলিশের প্রতি মানুষের এমন বিরূপ ধারণার পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। তাহলো:
এক : লর্ড ক্যানিং ১৮৬১ সালে যখন পুলিশ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন তখন পুলিশ বলতে ছিল মূলত সাদা চামড়ার ইংরেজ। সাধারণ সেপাই পদে কিছু উপমহাদেশীয় লোক সুযোগ পেতো। কিন্তু তখন পুলিশের কাজই ছিল নিপীড়ন চালানো। হয়তো সেই আমল থেকেই বংশপরম্পরায় আমাদের রক্তে পুলিশ শব্দটার প্রতি একটা এলার্জি মিশে আছে।
দুই : পুলিশের কাজের প্রকৃতি এবং আমাদের স্বভাব এর পেছনে দায়ী থাকতে পারে। পুলিশ ধরলেও দোষ, ছাড়লেও দোষ। এই সমাজে ডাক্তার আর পুলিশ। এই দুটো পেশা আসলে কিছুটা অতিমানবীয় মনে হয়। মানুষ যখন সুস্থ থাকে তখন সে জীবনেও ডাক্তারের নাম মুখে আনে না। আর সুখে থাকলেও জীবনে পুলিশের নাম নেয় না। মনে রাখবেন ‘সুস্থ’ এবং ‘সুখ’। দুটো শব্দই ‘সু’ দিয়ে নির্মিত। এই দুই ‘সু’ মানুষের থাকলে আর কারুর ধার ধারে না সহজে। নিশ্চিন্তে নাকে তেল দিয়ে ঘুমোয় বলা চলে।
একজন ডাক্তার মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যতো মানুষের সঙ্গে মিলিত হন তারা সবাই অসুস্থ। রোগাক্রান্ত। একজন পুলিশ চাকুরি জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি অপরাধী ও অপরাধ সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই জীবন ও ক্যারিয়ার শেষ করেন। আমাদের সমাজে কিছু নির্মম বাস্তবতা রয়েছে যা সবার চোখে পড়ে না। যেমন: উৎসব বা পার্বণে পুলিশকে দাওয়াত দেয়া হয় না। কিন্তু বাড়িতে ডাকাত পড়বার আশঙ্কা থাকলে ঠিকই থানাপুলিশের ডাক পড়ে। আনন্দের সময়, সুখের দিনে পুলিশকে ডেকে এনে একবেলা খাওয়ালে সম্পর্ক ভালো থাকে। বিপদের দিনে সহজে পাওয়া যায়। পুলিশের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকা, সুসম্পর্ক থাকা নিশ্চয় দোষের নয়। কেন, পুলিশের সম্পর্ক কি কেবল চোরডাকাতের সঙ্গেই থাকতে হবে? ভালো লোকের সঙ্গে থাকতে পারে না? নিশ্চয় পারে।
পুলিশের সংস্কার যতটা জরুরি তারচেয়ে আমাদের মানসিক সংস্কার আরও বেশি দরকার। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হলেই দেখবেন পুলিশ অটোমেটিক পরিবর্তন হয়ে যাবে। তবে ব্যতিক্রম কিছু থাকবেই। ১০০% ভালো মানুষ পুলিশ কেন, কোনও বিভাগেই পাওয়া যাবে না।
তাই বলছি, শুধু দুঃখের সময় পুলিশকে স্মরণ না করে সুখের দিনেও নিঃস্বার্থভাবে তাদের কথা স্মরণ করলে অসুবিধে আছে কোনও? নিশ্চয় না। সত্য বলতে কী, অসামাজিক পুলিশকে আমরাই উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক বানাতে পারি। পারি না?
নিজের থানায় নতুন কোনও পুলিশ অফিসার বদলি হয়ে এলে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসতে পারেন। তারা মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য দিনরাত যে পরিশ্রম করছে সেজন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসুন। আপনি যদি এটুকু করতে পারেন তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায়, পুলিশও আপনার প্রতি এমন আচরণ করবে। আকাম-কুকাম করে পুলিশের কাছে যাবেন, হাতে পায়ে ধরে, বাপ বলে ডেকে ঘুষ দিয়ে কাজ উদ্ধার করে বাইরে এসে নিজের শার্টের কলার নেড়ে নেড়ে বলবেন, ‘শালা কোন চ্যাটের বাল !’ এমনটা কেবল অনাকাক্সিক্ষতই নয়, বরং এটাও অসামাজিকতা।
১০/১২ বছর আগের ঘটনা। রাতে অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। বাসার কাছাকাছি আমার কয়েক গজ দূরে পিস্তলের গুলির আওয়াজ পেলাম। রাত ৯টা সাড়ে ৯টা হবে। সে সময় লোডশেডিং চলছে। এগিয়ে দেখি এক অটোরিকশার চালককে কে বা কারা গুলি করে চলে গেল। ওরা যাত্রীবেশে ছিল। অটোর চাবি চাচ্ছিল। চালক বুদ্ধি করে চাবিটা অন্ধকারের মধ্যে দূরে ছুঁড়ে মারে। ফলে অটোটা নিতে না পেরে চালককে গুলি করে পালিয়ে যায়। আমি সাহস করে কাছে গিয়ে বুঝতে পেরে মিরপুর থানায় ফোন করলাম। থানার টহল পুলিশ কাছাকাছি ছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে এসে আহত অটোচালককে পুলিশ ভ্যানেই মহাখালি বক্ষব্যাধি হাসপাতালে নেয়া হলো। কারণ ওরা ওর বুকে গুলি করেছিল। আমাকেও সঙ্গে নেয়া হলো। হাসপাতাল ও থানার কাজ সারতে সারতে রাত প্রায় দেড়টা বেজে গেল। গভীর রাতে থানায় চা-নাস্তা খাইয়ে আমাকে পুলিশের গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দেয়া হলো। আমি পুলিশের আচরণে অভিভূত হলাম। আমরা সাধারণ পাবলিক রাতে নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে থাকি। অথচ পুলিশ রাত জেগে ডিউটি করে। মানুষকে সেবা দেয়। এরপরও পুলিশকে মানুষের গাল খেতে হয়। হতে হয় বিরাগভাজন।
‘পুলিশ ঘুয খায়’ কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়।পুলিশ অনেক কিছুই খায়। ধাওয়া খায়। মার খায়। গুলিও খায়। গুলি খেয়ে মারাও যায়। এসব অনেককেই খেতে হয় না। ঘুষ অফিসার খায়। ইঞ্জিনিয়ার খায়। ডাক্তার কমিশন খায়। বিনাপ্রয়োজনে অতিরিক্ত প্যাথলজিকাল পরীক্ষা করিয়ে ডায়াগনস্টিক ল্যাব থেকে কমিশন পাওয়াটা কি ঘুষের চেয়ে ভালো খাদ্য? অনেক প্রফেসার ঘুষ খেয়ে বেশি নম্বর দিয়ে ফেল করা ছাত্রকেও পাস করিয়ে দেন। এটা কি পুলিশের ঘুষ খাওয়া থেকে উত্তম কোনও ‘খাবার’?
ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে যায়। কয়লাখনি থেকে কয়লা উধাও হয়। পাথরখনি থেকেও পাথর উড়ে যায় কোটি কোটি টাকার। সে তুলনায় পুলিশের ঘুষ খাওয়া অবশ্য সামান্যই। তবে ঘুষ ছোট হোক বড় হোক ঘুষই। তেমনই চুরি ছোট হোক বড় হোক চুরিই। সব ঘুষ যেমন অপরাধ, তেমনই সবরকম চুরিও অপরাধ। অন্যায়। এসবের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়াও অপরাধ।
অন্যায় ও দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত একই অবস্থা। মন্ত্রী থেকে সেক্রেটারি, অফিসার থেকে পিয়ন সবাই একই ধান্ধায় বসে থাকেন। সবাই সবাইকে চেনেন। অচেনা অজানা কেউ নন। মন্ত্রী খেলে সেক্রেটারি বা সচিব ফেলে দেবেন কেন? পানি যেমন ওপর থেকে নিচের দিকে গড়ায়, ঘুষও তেমনই ওপর থেকে নিচে নামে। তবে হ্যাঁ, সবাই বলতে সবাই নন। এখানে সবাই বলতে ‘বেশির ভাগ’ ধরে নিতে হবে। বেশির ভাগই ঘুষখোর। সবাই খান না। মানে কেউতো ভালো আছেন অবশ্যই। অন্তত ভালো থাকতে চেষ্টা করেন। অর্থাৎ কেউ ভালো আছেন। ভালো থাকতে চেষ্টা করেন কষ্ট করে হলেও। এদের মধ্যে পুলিশও আছে। পুলিশের সবাই পচে গেছে এমন ভাবা ঠিক নয়। অনেক সময় পুলিশকে ঊর্ধ্বতনের কথা শুনতে হয়। এটা না মেনে উপায় আছে?
বৃটিশ বিদায় নেবার পর ধীরে ধীরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পুলিশেরও পরিবর্তন হয়েছে। তবে আশানুরূপ হয়নি। হওয়া দরকার। অতীতে পুলিশে নিয়োগ দেবার আগে পারিবারিক বা বংশপরিচয় খোঁজা হতো। যাকে নিয়োগ দেয়া হবে তারতো বটেই, ওর পরিবারে বা বংশে কেউ খারাপ চরিত্রের ছিল কি না, চোরডাকাত ছিল কি না সেসবের খবর নেয়া হতো। নিয়ম এখনও আছে। কিন্তু তা কার্যকর নেই। বলতেই হচ্ছে, আজকাল লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পুলিশের সেপাই পদে চাকরি পেতে হয়। যোগ্যতার বিচারও হয়। তবে তা নগণ্য। এই যখন অবস্থা তখন পুলিশ ঘুষ খায় বলে কোনও লাভ আছে?
পরিবর্তন খুব জরুরি। শুধু পুলিশ নয়, চাকরিজীবী নয়, প্রফেসার, ডাক্তার নয়, সর্বস্তরে পরিবর্তন প্রয়োজন। ঘুণেধরা সমাজের সবকিছু ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। পুরনো বিল্ডিং মেরামত করলে যেমন ভালো হয় না; তেমন সমাজও এক আধটু ভেঙে ভালো করা যায় না। টেকসই করতে হলে পুরোপুরি ভাঙতে হবে। নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে সবকিছু।
তাই বলছিলাম, পুলিশ কারা? শুধু শুধু  ওদের দোষ খুঁজে কী হবে? ওরাতো এই সমাজেরই মানুষ। দূষিত ও কলুষিত সমাজেই ওরা জন্মেছে। এখনকার জলহাওয়ায় ওদের রক্তমাংস পরিপুষ্ট। তবু কেউ কেউ ভালো আছে বলে সমাজ এবং এ জাতি এখনও টিকে আছে। তাই আবারও বলছি, বলতে বাধ্য হচ্ছি, পুলিশ আর কেউ নয়। ওরা আমাদেরই ভাই, বন্ধু অথবা প্রিয় সন্তান। ওরা দেশ ও জাতির জন্য যা করছে তা ফেলে দেবার মতো নয়। পুলিশকে ভালো দেখতে চাইলে সমাজকেও ভালো হতে হবে। শুধু দেশে নয়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতেও আমাদের পুলিশ চমৎকার পারফর্মেন্স করছে। দেশ ও জাতির জন্য অভাবনীয় সুনাম বয়ে আনছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ