ঢাকা, শনিবার 11 August 2018, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গণপরিবহনের বেহাল অবস্থা দুর্ভোগে যাত্রীসাধারণ

গণপরিবহন ইংরেজি Public Transport. যা দিয়ে সাধারণ জনগণ একস্থান থেকে অন্যস্থানে তথা গন্তব্যস্থানে পৌঁছেন। ‘গণ’ শব্দটি দিয়ে আমাদের দেশের নামটি লিখা হয় অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ যার ইংরেজি People’s Republic of Bangladesh. গণতন্ত্র বা Democracy– এখানেও ‘গণ’ শব্দটি রয়েছে যা নিয়ে এত বিড়ম্বনা। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ৩৬নং অনুচ্ছেদে “চলাফেরার স্বাধীনতা” সম্পর্কে বলা হয়েছে “জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোনো স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।” নবম ও দশম শ্রেণীতে পাঠ্য ‘ভূগোল ও পরিবেশ’ বইটির দ্বাদশ অধ্যায়ে বাংলাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বাণিজ্য (Transport System and Trade of Bangladesh) গণপরিবহন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের যাতায়াতের ব্যবস্থা প্রধানত ৩ পথে হয়ে থাকে-যথা স্থলপথ, জলপথ ও আকাশপথ। স্থলপথ ২টি- যথা সড়কপথ ও রেলপথ। জলপথ ২টি-যথা নৌপথ ও সমুদ্রপথ। সড়কপথ ৩ ধরণের হয়ে থাকে, যথা- জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও কাঁচাসড়ক। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধিনে বিভিন্ন শ্রেণীর সড়ক পথ রয়েছে। রেলপথ সাধারণত ৩ ধরণের যথা- মিটারগেজ, ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ। বাংলাদেশ রেলপথের পরিমাণ অল্প হলেও এটি আরামদায়ক গণপরিবহনের পাশাপাশি ভারী দ্রব্য পরিবহন, শিল্প ও বাণিজ্য দ্রব্য, শ্রমিক পরিবহন প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এটা দেশের প্রধান বন্দর, শহর, বাণিজ্য ও শিল্প কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ সাধন করে। ঢাকা কমলাপুর বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলস্টেশন। পাবনা ঈশ্বরদী থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ভারতের জিপিটি এবং বাংলাদেশের এসইএল ও সিসিসিএল অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ২৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় ঈশ্বরদী বাইপাস টেক অফ পয়েন্ট থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করবে। নৌপথ (River Transport) এবং সমুদ্রপথ (Ocean Shipping) নিয়েই জলপথ। নৌপথ বাংলাদেশের সুলভ পরিবহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা। বাণিজ্য, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করে বাংলাদেশ নৌপথ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে রয়েছে ৩টি সমুদ্র বন্দর যথা- চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩০টি নদী বন্দর রয়েছে। ৩০তম নদী বন্দর হল সুনামগঞ্জ নদী বন্দর। বর্তমানে বাংলাদেশে স্থল বন্দর রয়েছে ২৩টি। দেশের ২৩তম স্থল বন্দর হল বাল্লা (চুনারুঘাট) হবিগঞ্জ। বাংলাদেশে ৩টি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর রয়েছে যথা- হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ঢাকা, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সিলেট ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর চট্টগ্রাম। বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ Civil Aviation Authority Bangladesh (CAAB) ১৯৮৫ সালে এই নামে চালু হয় যার সদর দপ্তর কুর্মিটোলা ঢাকা। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Shipping) একটি সংস্থা বা সংগঠন হলো বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা (Bangladesh Inland Water Transport Authority) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় (Ministry of Road Transport & Bridges) বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এর একটি সংস্থা। (Bangladesh Road Transport Authority) সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বেসরকারি বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ, এই ৩ গণপরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে দেশের জনগণ জিম্মি। বিমান বন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামে রাজধানী সহ সারাদেশে স্কুল কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীরা। সরকার অবস্থা বেগতিক দেখে ০২/০৮/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ বৃহস্পতিবার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন। প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ে গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে সভা করে ঢাকায় গণপরিবহনের অপ্রাপ্ত বয়স্ক অবৈধ চালকদের ধরতে নির্দেশ জারী করেন। নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন একটি অবৈধ সংগঠন বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইনসুর আলী। তিনি বলেন, ওই সংগঠন অবৈধ এবং ওই সংগঠনের নেতারাও অবৈধ। দীর্ঘদিন থেকেই দেশের পরিবহন সেক্টরে অরাজকতা চলছে। সরকারি দলের এক মন্ত্রীর প্রত্যক্ষ ইন্ধনেই এমনটি হচ্ছে। অথচ গণপরিবহন সংকট দূরীকরণে সরকারেরই দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। এ সেক্টর বরাবরই একটি উশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত সংস্থা। কোটি কোটি শ্রমজীবি মানুষ এবং ছাত্র শিক্ষক ও কর্মজীবি  প্রতিদিন এ সেক্টরের মুখাপেক্ষী। নি¤œ মধ্য আয়ের মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম গণপরিবহন। অথচ এই গণপরিবহনই অনিয়ম ও দূর্নীতি আখড়ায় পরিণত হয়ে রয়েছে। নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা সহপাঠীর প্রাণহানীতে বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ গড়ে তোললে শিক্ষার্থীর ওপর আ’লীগ ও পুলিশের একযোগে হামলা হয়েছে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠাসহ ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত ৯ দফা দাবিতে সারা দেশে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লে রাষ্ট্র ও সরকারের কর্ণধাররা একে ষড়যন্ত্র বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ছাত্রদেরকে লাঠি পেটা করে ও রিমান্ডে নেয়। এদিকে মন্ত্রী সভায় সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর খসড়ায় যাত্রী নয় বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট মহল মনে করেন। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা পাশ কাটিয়ে পরিবহন আইন গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মতামত দিয়েছে টিআইবি। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট চলচিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, যে দেশে গাড়ি চলে ২৭ লক্ষ আর লাইসেন্সধারী ড্রাইভারের সংখ্যা ১৭ লাখ, ১০ লক্ষ গাড়ি ড্রাইভিং লাইসেন্স বিহীন চালক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এটা দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার তা করছেন না বলেই আজ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। গাড়ির ফিটনেস ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করার জন্য। এই কমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের মনে দাগ কেটেছে তাদের সহপাঠী হারানোর বেদনা।
ছাত্র-ছাত্রীদের আক্ষেপের স্থানটি হলো বছরে ২০ হাজারেরও অধিক লোকের যাত্রা পথের দুর্ঘটনায় করুণ মৃত্যু আর কতকাল দেখব? আমি আপনি কে কখন সড়ক, নৌপথ, রেলপথ ও বিমান পথের দুর্ঘটনার শিকার হব? আফগান যুদ্ধে যে পরিমাণ লোক নিহত হয়েছে তার চেয়েও অধিক লোক নিহত হয়েছে আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায়। মোটরযান অধ্যাদেশের ১৪৩,১৪৬ ও ১৪৯ ধারায় যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং যে শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে তা বাড়ানো দরকার। কিন্তু বর্তমান আইনেও দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর জেল রাখা হয়েছে যা কোনো অবস্থাতেই মেনে যায় না। পরিশেষে যানবাহনে আরোহণের সময় যে দু’আটি রাসূল (সাঃ) শিক্ষা দিয়েছেন, তা হল এই, ‘ সাবাহানা আল্লাজি ছাক্কারালানা হাজা ওমা কুন্না লাহু মুকরিনিন ওয়া ইন্না ইলা রাব্বিনা লা মুনকালিবুন’ অর্থ পবিত্রতা ঘোষণা করছি মহান প্রভুর যিনি আমাদের জন্য বাহনকে বশীভূত করে দিয়েছেন, অন্যথায় আমরা একে আয়ত্বে আনতে পারতাম না। নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।
(মুসলিম-ইসলামিক সেন্টার হাঃ ৩১৩৯, সহীহ আবী দাউদ হাঃ ২৫৯৯)।
-আবু মুনীর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ