ঢাকা, শনিবার 11 August 2018, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভালো থাকুক মিনার ভালো থাকুক ও স্বপ্নেরা

আয়েশা আলম প্রান্তি : সবার মতোই সাধারণ এক যুবক মো. মিনার উদ্দিন। কিন্তু সাধারণ হয়েও তিনি অসাধারণ। জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছেন নিজ লক্ষে। চট্টগ্রাম জেলার বারখাইন গ্রামের আনোয়ারা থানায় ছোটবেলা কাটানো মিনার তৈলার দ্বীপ বারখাইন এর্শাদআলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি এবং সরকারি কর্মাস কলেজ থেকে ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। দুটি পরীক্ষাতেই তিনি জিপিএ ৫ পেয়ে কৃতিত্ব দেখান। এর পর এই মেধাবী চান্স পেয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগে। সেখানেও তার ভালো ফলাফল অব্যাহত ছিল। সিজিপিএ বিবিএ-৩.৪০, এমবিএ- ৩.৬০। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে স্পোর্টসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, কোচিং সেন্টারে পড়াতেন ও টিউশনি করতেন, নিজের গ্রামে ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে/ নামমাত্রমূল্যে পড়াতেন, একটা টেলিকম কোম্পানির ব্র্যান্ড প্রমোশনের কাজও করেছেন। খেলাধুলায় পটু মিনার ২০১২ সালে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের সঙ্গে জিতেন আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল রানার্সআপ ট্রফি ও ২০১৩ সালে একইভাবে আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন ট্রফি। ভালই চলছিল জীবন কিন্তু একটি দুর্ঘটনা দুমড়েমুচড়ে দেয় মিনারের জীবনটাকে। ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, কোরবানি ঈদের রাতে ঘটে এই দুর্ঘটনা। ৩৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষ করে ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নিজ বাড়িতে গিয়েছিলেন মিনার। ১২ সেপ্টেম্বর রাতে একটি ভবনের সঙ্গে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারে আকস্মিকভাবে স্পৃষ্ট হন। রাতেই তাকে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। জ্ঞান নেই মিনারের। চট্টগ্রামে বার্ন ইউনিট নেই বলে জরুরিভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায়। ১১০০০ ভোল্টের ইলেক্ট্রিক শকে মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি করা হয় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ভর্তি থাকেন ৩ মাস, আইসিইউতে ৩৯ দিন, ১১টি অপারেশন হয় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে, ব্লাড দেওয়া লাগে ২৫-২৬ ব্যাগ। অর্থাভাবে চিকিত্সা চালানো খুব কষ্টসাধ্য হয়ে গিয়েছিল, তখন মিনারের পাশে দাঁড়িয়েছিল সারা দেশবাসী। তাকে নিয়ে পেপারে লেখালেখি হয়। সাহায্য করেন সর্বস্তরের মানুষজন। সবার সাহায্যে মিনারের চিকিত্সা চলল। বার্ন ইউনিটে টানা তিন মাস থেকে বাসায় আসেন মিনার। কয়েকদিন পরপর অপারেশন। যে পা দিয়ে অসাধারণ ফুটবল খেলে মার্কেটিং বিভাগকে চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন সেই দুই পায়ের কোনোটিতেই দাঁড়াতে পারেন না। একটা পা কাটা পড়ল। একটা হাতও। কিন্তু এত কিছুর পরও জীবনের কাছে হার মানেননি মিনার। এই পুরোটা সময় জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, জীবন-মৃত্যুর মাঝে ৫ মাস মিনার বাসায় ছিলেন, বিসিএস ভাইভা দিলেন, মাস খানেক পর ভারতে চিকিৎ্সার জন্য গেলেন। ভারতের তামিলনাড়ুতে ক্রিস্টিয়ান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা চলে তার। ৫ জুলাই ২০১৭ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৮ মাস ছিলেন ভারতে, অপারেশন চলে আরও সাতটি। এত চিকিত্সা এত অপারেশনের ফলাফল ও মানুষের সহযোগিতা ও দোয়ায় মিনার জীবনের পথে ফিরে এলেন কিন্তু হারালেন নিজের ডান হাত ও ডান পা। কৃত্রিম পায়ের সাহায্যে হাঁটতে পারেন এখন মিনার। তিনি বলেন, ‘বাবা চলে গেলেন, সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন জীবনের সব সুখ-আনন্দ। ছোট এই কাঁধে দিয়ে গেলেন বড় ভার। নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছি। জীবনে যেদিন মনে হলো এই অভাব-অনটন, দুঃসহ জীবন যাত্রার বুঝি শেষ হতে চলেছে তখন আল্লাহ আমার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা নিলেন।  পুরো ছাই করে দিলেন আমার শরীরটাকে। হয়ে গেলাম অপূর্ণ এক মানুষ। হাসপাতালের নারকীয় দিনগুলোতে বারবার মনে হতো মরে যাই, তবে মরা এত সহজ না। সাহস দিত বন্ধুরা, কিছু বড় ভাই ও দেশের মানুষ। এখন কাটা হাতে বিলানো শুরু করব মুঠো মুঠো স্বপ্ন। শরীরের পঙ্গুত্ব আমার ইচ্ছাকে পঙ্গু করতে পারবে না। যেমন ওই আগুন আমার স্বপ্নকে পোড়াতে পারেনি। কোনোদিন পারবে না।’ ফিরে এলেন মিনার দেশে। তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো হার মানতো। কিন্তু হার মানেননি মিনার। চালিয়ে গেছেন নিজের চেষ্টা। অসুস্থ অবস্থায় দিয়েছেন বিসিএসের ভাইভা। আজ তিনি ৩৬ বিসিএস প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত। পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, তথ্য ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হবে আরও হাজারো তরুণ। আমরা যারা হয়তো প্রতিদিনকার জীবনে সামান্য কিছুতে হতাশ হই, হাল ছেড়ে দিই; তাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত এই মিনারের জীবন থেকে। যারা জীবনে সফল হতে চান তাদের জন্য এই মেধাবীর পরামর্শ, ‘কখনো ভাববেন না আপনার কোনো সহায় নেই। আপনি নিজে আপনার সবচেয়ে বড় সহায়। বাবা, মা, ভাই, বোন আর প্রিয়জনের জন্য কিছু হলেও করুন, জীবন অনেক সুন্দর।’ এই মিনার সাধারণ হয়েও কত অসাধারণ উদাহরণ হতে   পারেন আজকের হতাশাগ্রস্ত তরুণ প্রজন্মের জন্য।  ভালো থাকুন মিনার, ভালো থাকুক তার স্বপ্নরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ