ঢাকা, শনিবার 11 August 2018, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নড়িয়ায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে ব্যবসা কেন্দ্র বাজার ও লঞ্চঘাট বিলীন

কে এম মকবুল হোসাইন ও সালাহ উদ্দিন (শরীয়তপুর ও নড়িয়া) সংবাদদাতা: শরীয়তপুরের নড়িয়ায় বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি লঞ্চঘাট ও ঘাট সংলগ্ন বাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা অন্তত ৩৫ থেকে ৪০জন পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এদের মধ্যে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছে। এ ঘটনায় ৭ জন নিখোজ রয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস সুত্রে জানাগেছে। তবে নিখোজের সংখ্যা আরো বাড়তে বারে বলেও ফায়ার সার্ভিস, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার দুপুর ২ টার দিকে নড়িয়ার সাধুরবাজার লঞ্চঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এলাকার বাড়ী ঘর ও লোকজনকে নিরাপদ স্থানে এবং নদীর তীরবর্তি স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য জরুরী অবস্থা ঘোষনা করা হয়েছে। নড়িয়া সরকারী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, আর্ন্তজাতিক মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত এটর্নী জেনারেল এডভোকেট সুলতান মাহমুদ সীমন, শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের, পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন, নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা ইয়াসমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
শরীয়তপুর ফায়ার সার্ভিস, নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৭০ দশক থেকে নড়িয়া ও জাজিরা এলাকায় পদ্মার ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই গভীর রাত থেকে জেলার নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নে শুরু হয় রাক্ষুসী পদ্মার সর্বগ্রাসী ভাঙ্গন। বিরামহীন এ ভাঙ্গন চলতে থাকে ২০১৭ সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। যা শত বছরের ইতিহাসে পদ্মার ভয়াবহ এ রকম রুপ কেউ দেখেনি। ভয়াবহ ভাঙ্গনে গত ২ বছরে নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর, মোক্তারের চর, কেদারপুর ইউনিয়ন ও নড়িয়া পৌরসভা পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে কবলিত হয়ে বিরাট একটি অংশ বিলিন হয়ে গেছে। একই সাথে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ হাট-বাজার, মসজিদ-মাদ্রাসা নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এ বছরও বর্ষা মৌসুরে শুরু থেকেই নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়  ব্যাপক ভাবে পদ্মা নদীর ভাংগন আবারও শুরু হয়। তবে নড়িয়ার মোক্তারেরচর, কেদারপুর ও নড়িয়া পৌরসভার অন্তত ১০টি গ্রামে ভাঙ্গনের তীব্রতা অনেকগুন বেশি হওয়ায় ইতোমধ্যে এসব এলাকার প্রায় ৫শতাধিক কাচাঁ ও পাকা বাড়ি ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শত শত হেক্টর ফসলী জমি ও কয়েক কিলোমিটার পাকা রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে নড়িয়া উপজেলা সদর, মুলফৎগঞ্জ বাজার, নড়িয়া উপজেলা হাসপাতাল, সরকারী খাদ্য গুদাম, পৌরভবনসহ অনেক স্থাপনা। ফলে ভাঙ্গন আতংকে দিন কাটছে পদ্মাপাড়ের হাজার হাজার মানুষের। এ সব এলাকার লোকজন দিন রাত করে তাদের বসত ঘর, আসবাপত্র, গবাদী পশু ও গাছ পালা কেটে সরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত দুই দিন ধরে পদ্মার ভাঙ্গন আরো তীব্র আকার ধারণ করে। আজ দুপুর ২ টার দিকে হঠাৎ করেই নড়িয়ার কেদারপুর ইউনিয়নের সাধুরবাজার লঞ্চঘাট এলাকার বিশাল অংশ ধসে পড়ে এবং মুহূর্তেই নদীতে বিলীন হয়ে যায়। লঞ্চঘাট এলাকায় থাকা ৬/৭ টি ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এ সময় নদীতে তলিয়ে যায়। এ সময় সেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ী সহ প্রায় ৩৫/৪০ জন লোক ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। এদের মধ্যে এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত ৭জন নিখোজ ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হলেন, নড়িয়ার চাকধ গ্রামের নাসির উদ্দিন হাওলাদার, কেদারপুর গ্রামের নাসির উদ্দিন বয়াতী, মঞ্জুর ছৈয়াল, জাজিরার পাচু খাঁর কান্দি গ্রামের মোশারফ চোকদার, আইটেল মোবাইল কোম্পানীর এরিয়া ম্যানেজার আল আমিন ও স্থানীয় দোকান্দার গুবি দাস। এ  ঘটনার পর এখন পর্যন্ত ১৪ জনকে উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সাধুরবাজার লঞ্চঘাট এলাকার জসিম হাওলাদার বলেন, দুপুরে হঠাৎ করেই দোকান ঘরটি কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই দোকান ঘর সহ পানিতে তলিয়ে যাই। পরে পানির উপরে ভেসে উঠলে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। দুর্ঘটনার সময় সেখানে প্রায় ৪০ জন লোক, ৩/৪টি মোটর সাইকেল, ২টি ট্রলি গাড়ী ছিল।
কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান বলেন, লঞ্চঘাটের জায়গা ধসে লোকজন নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রলার যোগে ১৪ জনকে উদ্ধার হাসপাতালে ভর্তি করেছি। এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। মাটি ধসের সময় একটি মাহিন্দ্র গাড়ি, দুটি মটর সাইকেল, একটি অটো রিকসা তলিয়ে যায়। এ সময় ঐ ঘাটে থাকা পল্টুনটি ডু্েব যায়। কিছুক্ষন পরে পল্টুনটি ভেসে ওঠে।
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ বলেন, লঞ্চঘাট এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭ জন নিখোঁজ রয়েছে। তবে এই সংখ্যা বাড়তেও পারে। ১৪ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিখোজদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ সহ স্থানীয়রা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াছমিন বলেন, ভাঙনে মাটি ধ্বসের ঘটনায় পাঁচ ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানের জন্য ফায়ার সার্ভিসের শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের পাঁচটি দল কাজ করছে।
উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিসের ৫ জন সদস্য নদীতে পড়ে যায়। তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের ধারনা পদ্মার তীরবর্তী এ এলাকটির অনেক জায়গা জুড়ে মাটির নিচে পানি ঢুকে পড়েছে। আমরা জরুরী অবস্থা ঘোষনা করে এলাকার বাড়ী গর ও লোকজনকে নিরাপদ স্থানে নেয়ার চেষ্টা করছি। নদীর তীরবর্তি মানুষের স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যরা কাজ করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ