ঢাকা, রোববার 12 August 2018, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করায় পাচারের শঙ্কায় খুলনার ব্যবসায়ীরা

খুলনা অফিস : কুরবানি পশুর চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণের কারণে ভারতে পাচারের আশঙ্কায় রয়েছে খুলনার ব্যবসায়ীরা। ফড়িয়া ও মওসুমী ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাবে চামড়ার বিকিকিনি। স্বাধীনতার পর থেকে কুরবানি পশু এবং চামড়া জাত দ্রব্যের দাম যেভাবে বেড়েছে, সেই অনুপাতে কাঁচা চামড়ার মূল্য বাড়েনি বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীসহ অনেকেই। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চামড়ার মূল্য কম হওয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সচেতন জনগণ।     

খুলনার পশুর কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের চেয়ে এবার কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য কমানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এতে চামড়ার বাজার চলে যাবে ফড়িয়া এবং মওসুমী ব্যবসায়ীদের হাতে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা। পূর্বের পাওনা না পেয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এখন চামড়ার মূল্য কম হওয়ায় পাচার হয়ে যাবে। পার্শ্ববর্তী দেশের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা এসব চামড়া ক্রয় করে বিভিন্ন রুট দিয়ে পাচার করে নিয়ে যায়। আর পাচার হলে সর্বশান্ত হবে স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা।     

শেখপাড়া চামড়া পট্টির ব্যবসায়ী বাবর আলী জানান, বংশগতভাবে ৩৫/৪০ বছর চামড়ার ব্যবসায়ের সাথে জড়িত রয়েছি। পূর্বে বড় সাইজের ৬/৭ মণ ওজনের গরুর চামড়ার মূল্য ছিল ২৬০০-২৮০০। অথচ চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণ করায় তা এখন ৭০০-৮০০ টাকা হবে। আর মধ্যম সাইজের ৩/৪ মণ ওজনের গরুর চামড়ার মূল্য ছিল ১৮০০-২০০০ টাকা। কিন্তু এখন সেই চামড়ার মূল্য হবে ৩০০/৪০০ টাকা। এর সাথে প্রসেসিং করতে আরো ২০০-২৫০ টাকা ব্যয় হয়। সেই অনুযায়ী বিক্রি করা যায় না। আর ছোট সাইজের গরুর চামড়া এবার ব্যবসায়ীরা কিনলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কুরবানির পশু এবং চামড়া জাতীয় দ্রব্যের মূল্য বেশি থাকলেও কাঁচা চামড়ার মূল্য অনেক কম। ফলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।    

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা রেজা হোসেন তার ফেসবুক টাইমলাইনে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, স্বাধীনতার পর পর একটি মধ্যম সাইজের গরু কিনেছে দশ থেকে বার হাজার টাকার মধ্যে। তার চামড়া বিক্রয় হয়েছে আটশ’ থেকে এক হাজার টাকায়। ৭৬ ও ৭৭ সালে ওইরুপ একটি গরুর দাম ছিল সতের থেকে বিশ হাজার টাকা, যার চামড়া বিক্রয় হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা হতে ২ হাজার টাকা। এখন একটি গরু ৭৫ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার টাকায় ক্রয় করলেও তার চামড়া বিক্রয় হয় ৬শ’ বা ৭শ’ টাকায়। যখন চামড়া ২৬০০ হতে ২৮০০ টাকায় বিক্রয় হয়েছে, তখন এক জোড়া খুব ভাল মানের জুতা সাত/আটশ’ টাকায় কেনা গিয়েছে। আর এখন সাধারণ মানের জুুতা কিনতে খরচ হয় কমপক্ষে ২৫০০ টাকা। এ ছাড়াও চামড়াজাত দ্রব্যের বর্তমান মূল্য আকাশচুম্বি। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার মূল্য কম দেখিয়ে দেশের চামড়ার মূল্য কম নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি তাই হবে তবে পার্শ্ববর্তী দেশ হতে যারা অবৈধভাবে চামড়া কিনতে আসে তারা কীভাবে বেশি দামে মাল ক্রয় করে।  

খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম ঢালী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে চামড়ার যে মূল্য ছিল এখন তার তুলনায় অনেক কম। কুরবানি পশুর দাম বাড়লেও বাড়েনি চামড়ার দাম। একই সাথে চামড়া জাতীয় দ্রব্যের দাম অনেক বেশি। অথচ সেই তুলনায় কাঁচা চামড়ার দাম অনেক কম। এভাবে চামড়ার মূল্য কমতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। 

ট্যানারি ও আড়ৎ মালিকরা ব্যবসায়ীদের ঠিকমতো টাকা দেয় না। অথচ ফড়িয়াদের টাকা তাদের নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। ধার-দেনা করে ব্যবসা চালাতে গিয়ে অনেকেই এখন নিঃস্ব হয়ে গেছেন। লোকসানের বোঝা সহ্য করতে না পেরে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। পূর্বে খুলনায় চামড়া ব্যবসায়ের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল ৬০/৭০ জন। অথচ এখন তার সংখ্যা ৪/৫ জন। তবে ১৫/২০ জন ব্যবসা করছেন, কিন্তু সব সময় নয়। আর ঈদের মওসুমে এই সংখ্যা বেড়ে যায়। ঈদে কাঁচা চামড়া কিনে অন্তত ১০/১৫ দিন, কখনো এক মাস পর্যন্ত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। এবার সেই জায়গাও নেই। এখন মাত্র দু’টি দোকান আছে। এজন্য পৃথক মার্কেট না হলে খুলনায় চামড়া ব্যবসা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ