ঢাকা, রোববার 12 August 2018, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ড. কামালের বিরুদ্ধে আইনমন্ত্রীর জুডিশিয়াল ক্যু’র মারাত্মক অভিযোগ

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। একজন চৌকস আইনজীবী। আরেক জন চৌকস আইনজীবী মরহুম সিরাজুল হকের ছেলে। আইনজীবী হিসাবে আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি মক্কেলের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথাই বলতে পারেন। অনুরূপভাবে মন্ত্রী হিসাবেও তিনি অনেক কথাই বলতে পারেন, যেগুলো রাজনীতিতে অনেক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। রাজনীতিতে বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের সেটাই বিউটি। তা না হলে আর বহুদলীয় গণতন্ত্র কেন হলো। যদি শুধু একটিমাত্র মতাদর্শই থাকবে তাহলে তো একদলীয় শাসন হয়ে যায়। আনিসুল হক সাহেব দুদকের উকিল থেকে মন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন। হাসিনা সরকারের মন্ত্রী হিসাবে তিনি প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কথা বলবেন বা সাফাই গাইবেন তাতে কারো কিছু বলার থাকতে পারে না। কিন্তু রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে যদি সত্যের অপলাপ করা হয়, অথবা যদি মিথ্যার বেসাতি করা হয় তাহলে আর সেটা রাজনৈতিক বিতর্ক থাকে না। সেটা হয়ে যায় প্রবঞ্চনা, মিথ্যাচার এবং ধোঁকাবাজি। দুঃখের বিষয়, রাজনীতিতে নতুন আসা আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সেই কাজটিই করেছেন।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, অনেকেই বলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিলো একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী রাজাকার, আল বদরেরা। কিন্তু সেটা কি ঠিক? ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিলো এই আওয়ামী লীগেরই কিছু কুচক্রি নেতা। তার মানে মীর জাফর আমাদের মধ্যে ছিলো। এখানে তিনি যা বলেছেন সে ব্যাপারে অন্যদের কিছু বলার নাই এ কারণেই যে, এটি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু এর পর তিনি যেসব কথা বলেছেন সেগুলো তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
যেমন তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনাকে সরাতে ড. কামাল হোসেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে জুডিশিয়াল ক্যু’তে জড়িত ছিলেন। আপনারা দেখেছেন, প্রথমে শ্রীলঙ্কায় রাজা পাকশে যখন তার প্রধান বিচারপতিকে নামিয়ে দিয়েছিলেন তখন রাজা পাকশেকেও নেমে যেতে হয়েছে। তারপর পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফকে নামিয়ে দিয়েছেন তার প্রধান বিচারপতি। তারপরে নেপালে এবং তারপরে আমাদের সাবেক বিচারপতি এসকে সিনহাকে নিয়ে যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের সবার নাম কিন্তু আমরা জানি।
শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর গদি থেকে সরানোর জন্য ড. কামাল হোসেন নাকি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সাথে জুডিশিয়াল ক্যু’তে, অর্থাৎ বিচারবিভাগীয় অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত ছিলেন। এটি একটি ভয়ানক এবং চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। এই প্রথম এমন একটি অভিযোগ শোনা গেল এবং সেটিও এমন এক ব্যক্তির মুখে যিনি এখনো মন্ত্রীত্বের চেয়ারে সমাসীন রয়েছেন। আনিসুল হক সাহেবের এই মারাত্মক অভিযোগটি সত্যি কি মিথ্যা সেটি আমরা বলবো না। কারণ, এমন মারাত্মক বিষয় আমাদের পর্যায়ে কোনো দিন আসে না। এগুলো যদি কোনো দিন ঘটে একমাত্র তখনই সেগুলো দিনের আলোতে আসে এবং তখন মানুষ জানতে পারে।
বিচারপতি এসকে সিনহা এখন সপরিবারে বিদেশে আছেন। বিদেশে যাওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে কোনো কথা তিনি বলেননি। এমনকি যে ভয়ঙ্কর পটভূমিতে তিনি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন  সে সম্পর্কেও তিনি আজ পর্যন্ত মুখ খোলেননি। দেশ ত্যাগে বাধ্য হওয়ার আগে বিচারপতি সিনহাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে, যার অনেকগুলো ছিল সত্য এবং অনেকগুলো বাজারে শোনা গেলেও দায়িত্ব নিয়ে কেউ সেগুলোর সপক্ষে কিছু বলেননি। সুতরাং এ সম্পর্কে আমাদের পক্ষে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এখন বাকি থাকলেন স¦য়ং ড. কামাল হোসেন। তিনি এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এই তো কয়েক দিন আগেও একটি গোল টেবিল বৈঠকে  তিনি অত্যন্ত গরম কথা বললেন। উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ নামের একটি সংগঠন এই গোল টেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিল। এই বৈঠকে  কঠোর ভাষায় ড. কামাল হোসেন যে বক্তব্য রেখেছেন, তেমন কঠোর ভাষায় বক্তব্য ইতোপূর্বে ২০ দলীয় জোটের নেতাদের মুখ থেকেও শোনা যায় নাই। ঐ বৈঠকে বক্তৃতাকালে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দেশে এখন আওয়ামী লীগের গুন্ডাতন্ত্র চলছে। তিনি আরো বলেন, দেশে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজমান। বঙ্গবন্ধুর দেশে চলছে পুলিশ প্রহরায় আওয়ামী লীগের গুন্ডাতন্ত্র। কোথাও গণতন্ত্র বা আইনের শাসন নাই। তিনি প্রশ্ন করেন, কিসের গণতন্ত্র? দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই। আমি এই গুন্ডাতন্ত্রের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই না। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া  হোক। আমাদের গুলি করে মারা  হোক। তিনি আরো বলেন, পুলিশ প্রহরায় গুন্ডাদের নামিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পেটানো হচ্ছে। এটা কোন দেশ? বঙ্গবন্ধু কী এই দেশ চেয়েছিলেন?
॥দুই॥
ড. কামাল হোসেন বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আমাকে গুলি করে হত্যা করলে অন্তত বলতে পারবো গুন্ডাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে মারা গেছি। দেশে তরুণ সমাজ আজ জাগ্রত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য বড় শক্তি। কিন্তু আমরা গুন্ডা মুক্ত বাংলাদেশ চাই। তিনি প্রশ্ন করেন, পুলিশের পাশে লাঠি নিয়ে কারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে? কারা এদের লেলিয়ে দিয়েছে? আমরা পুলিশের পাশে গুন্ডা দেখতে চাই না।
ড. কামাল হোসেনের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলার উদ্দেশ্য নিয়ে আজকে আমি কিছু লিখছি না। কিন্তু মানুষ যেটা দেখছে সেটি হলো এই যে, এতদিন পর্যন্ত সরকার বা আওয়ামী লীগ ড. কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। কিন্তু যেই তিনি সাম্প্রতিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেছেন তার পরেই দেখা যাচ্ছে ড. কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের তীব্র বিষোদগার। আজ থেকে ১০ মাস পূর্বে গত বছরের অগাস্ট সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিষোদগার শুরু হয়। আওয়ামী লীগের গালি গালাজ, আন্দোলন এবং হুমকির মুখে গত বছরের নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে  এসকে সিনহা  পদত্যাগে বাধ্য হন। তারপর ৯ মাস পার হয়ে গেছে। এতদিন পর্যন্ত মানুষ এমন কথা শোনেনি যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি জুডিশিয়াল ক্যু করতে চেয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতির মতো বিচার বিভাগের মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রীকে হটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মানুষ  একথাও শোনেনি যে, সেই কথিত জুডিশিয়াল ক্যু প্রচেষ্টায় প্রধান বিচারপতির সাথে ড. কামাল হোসেন জড়িত ছিলেন।
এখন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে নিয়ে যারা ষড়যন্ত্র করেছে তাদের সবার নাম নাকি তারা অর্থাৎ সরকার জানে।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে,  ড. কামাল হোসেন যে অভিযোগ করেছেন সেটি একটি ভয়ঙ্কর অভিযোগ। সেই অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য যদি সরকারের হাতে থাকে এবং কারা সেই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল তাদের নাম যদি সরকারের জানা থাকে তাহলে এতদিন পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন? এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিযোগের সবিস্তার তথ্য সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও তারা ১০ মাস ধরে এই ব্যাপারে হাত গুটিয়ে বসে আছেন, সেটি কারো নিকটই গ্রহণযোগ্য নয়।
জনগণের দাবি এটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সম্পর্কে এমন গুরুতর অভিযোগের আশু তদন্ত হোক এবং সেই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দেশবাসীকে জানানো হোক। একই সাথে শুধুমাত্র ড. কামাল হোসেন নয়, সেই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত বলে আইনমন্ত্রী আর যাদের নাম জানেন বলে বলেছেন তাদেরকেও অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক।
॥তিন॥
এখন দেখছি আইনমন্ত্রীও যেখানে সেখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনেও তিনি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অভিযোগ করেছেন। ঐ একই মিটিংয়ের বক্তৃতায় তিনি বলেন, কোটা আন্দোলন যাতে চলমান থাকে, এই আন্দোলনের ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করা যায়, সেইজন্য এই কামাল হোসেন, ইউনুছ (ড. মুহাম্মদ ইউনুছ), খালেদা জিয়ার যারা সহযোগী তারা কিন্তু এটার মধ্যে নাক গলানো শুরু করে। আইনমন্ত্রীর জবানিতে এই নাক গলানোর উদ্দেশ্য হলো, এর পেছনেও একটি ষড়যন্ত্র রয়েছে। আর সেই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য হলো এই সরকারকে ফেলে দিতে হবে। এগুলোর পেছনে সরকার একটি আলামত খুঁজে পেয়েছে। সেই আলামত হলো, পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসা। আর একটি উদ্দেশ্য হলো, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের নীচে নামিয়ে আনা।
কোটা আন্দোলনের পেছনেও যে কোনো ষড়যন্ত্র ছিলো সেটি এতদিন আমাদের জানা ছিলো না। শুধু আমরা নই , সমগ্র দেশবাসী এতদিন জেনে এসেছেন যে, বর্তমান কোটা ব্যবস্থা স্বাধীনতার পরপরই অর্থাৎ ৪৭ বছর আগের। তাই এই ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতাও সরকার স্বীকার করেছে। তাই প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে একেবারে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, এখন থেকে গোটা কোটা ব্যবস্থাই বাতিল করা হলো। কোটা সংস্কার আন্দোলনের পেছনেও যে ড. কামাল হোসেন এবং বাংলাদেশের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুছ জড়িত ছিলেন সেটিও আইনমন্ত্রীর মুখ থেকে এই প্রথম জানা গেল। ড. ইউনুছ এবং ড. কামাল হোসেন যে কোটা আন্দোলনকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে পেছনের দরজা দিয়ে সরকার উৎখাত করতে চেয়েছিলেন সেটিও এবারই প্রথম জানা গেল।
আন্দোলনের মাধ্যমে অথবা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন সরকারের পতন ঘটে তখন সেটিকে ষড়যন্ত্র বলা হয় না। ’৬৯-এর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেদিনের এক নায়ক জেনারেল আইয়ূব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই অভ্যুত্থানকে কি ষড়যন্ত্র বলা যায়? অবশ্য সেই গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ূব খান পদত্যাগ করলেও জনগণের কাছে ক্ষমতা আসেনি। সুযোগটি গ্রহণ করেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং তিনি ক্ষমতা দখল করেন। তাহলে কি আনিসুল হক সাহেবরা বলবেন যে, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের সাথে ইয়াহিয়া খানের একটি গোপন সম্পর্ক ছিলো?
জেনারেল এরশাদও প্রায় ১০ বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। ’৯০ এর প্রবল গণআন্দোলনের মাধ্যমে তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরশাদ চেয়েছিলেন জেনারেল নুরুদ্দিনের হাতে ক্ষমতা দিতে। কিন্তু জেনারেল নুরুদ্দিন ক্ষমতা গ্রহণ করেননি। সুতরাং এরশাদকে সরে যেতে হয়। তাহলে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানকে কি কোনো চক্রান্ত বলা যায়?
অবশ্যই নয়। গণআন্দোলন গণতান্ত্রিক রাজনীতিরই একটি অনুষঙ্গ। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। তেমনি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেও সরকার পরিবর্তন ঘটে। নির্বাচন এবং আন্দোলন গণতন্ত্রের অঙ্গ। সাম্প্রতিক যে কোটা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হলো সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলেরই কোনো ষড়যন্ত্রমূলক ভূমিকা দেখা যায়নি। আমাদের জানা মতে, কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা সেখানে নাক গলায়নি। তার পরেও যদি সরকারের হাতে প্রমাণ থাকে তাহলে সেই সব রাঘব বোয়ালদেরকে  সরকার আইনের আওতায় আনতে পারে। সেটা না করে ইলেকশন বক্তৃতায় এসব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বক্তৃতা করা জনগণের সেন্টিমেন্টকে উস্কিয়ে দিয়ে ভোট আদায় করার সস্তা কৌশল হিসাবে বিবেচিত হয়।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ