ঢাকা, রোববার 12 August 2018, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সোনারগাঁয়ে চলছে নদী বিক্রি!

রুহুল আমীন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা: নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় অবাধে চলছে নদী বিক্রি। রাতা-রাতি কোটিপতি হচ্ছে দালাল চক্র। উপজেলার পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীর জমি জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করছে সংঘবদ্ধ জালিয়াতচক্র। স্থানীয় সাব রেজিস্ট্রি অফিসে নদীর জমি বেচাকেনার দলিলও রেজিস্ট্রি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে। এরপর দখল-ভরাটের মাধ্যমে নদীর জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা, মিল-কারখানা। রাতদিন চলছে এই কর্মকাণ্ড, বাধা দেওয়ার কেউ নেই। প্রশাসনের ভূমিকাও রহস্যজনক, এমনকি দখলদারদের কোনো তালিকা সোনারগাঁ এসি ল্যান্ড অফিস থেকে পাওয়া যায়নি। মেঘনাঘাট থেকে আনন্দবাজার বারদী ঘুরে শতাধিক দখলদারের অস্তিত্ব দেখা গেছে। নদীর জমির ওপর স্থাপনা থেকে শুরু করে জেটি, রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্নভাবে সরকারি খাসজমি দখল করা হয়েছে। এসব মিল-কারখানা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে একদিকে নদী ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি ও হারিয়ে যাচ্ছে নদী-নালার মৎস্য সম্পদ। একাধিক নদী বিশেষজ্ঞ জানান, অতিরিক্ত দখল-দূষণে মেঘনা নদীর গতিপথ দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে বেশ কয়েকটি গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে নদীর দুই তীরে বসবাসরত বাসিন্দাদের জীবনে নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার টেঙ্গারচরে ও পিরোজপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর, প্রতাবেরচর, আষারিয়াচর, ছয়হিস্যা, গিয়ে দেখা যায়, মেঘনা নদী দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। দেশের বড় বড় শিল্প-কারখানার মালিকরা এর সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের হাত করে নির্বিঘেœ নদীর জমি দখল করছে তারা। এতে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে মেঘনা। প্রতিটি এলাকায় সবার চোখের সামনে নদীর প্রায় ২০০/৩০০ বিঘা জমি ভরাট করে চারদিকে সীমানা প্রাচীর দেওয়া হয়েছে। কেউ একটু বাধাও দেয়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমান গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ,বসুন্ধরা গ্রুপসহ বিভিন্ন কোম্পানি প্রথম দিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি কিনে সেখানে সাইনবোর্ড লাগায়। এরপর নির্বিচারে নদীর জমি দখল করে সেখানে মাটি ফেলে। একই সঙ্গে অনেকের ধানিজমি দখল করে নেয় তারা। ভুক্তভোগীরা প্রশাসন ও স্থানীয় চেয়ারম্যান- মেম্বারদের কাছে ঘুরেও প্রতিকার পাচ্ছে না ফলে এলাকার লোকজনের জমি বিরোধ নিষপত্তি সক্রান্ত মামলা জট বারছে থানা ও আদালতে। স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ হলেও প্রভাবশালীদের কাছে সবাই অসহায়। তবে আমান গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ জানান, নদীর তীরবর্তী স্থানে তাঁরা স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি কিনে আমরা শিল্প স্থাপনা নির্মাণ করেছি। সেখানে মেঘনা নদীর কোনো জমি নেই। উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ঝাউচর-ছয়হিস্যা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর জমির উপরে মেঘনা গ্রুপের একটি পেপার মিলস নির্মাণ করেছে। নদী ছাড়াও অনেকের কৃষিজমি জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দখলদাররা এতটাই প্রভাবশালী যে সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম মান্নানের বেশ কয়েক বিঘা জমি পর্যন্ত তাদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পায়নি। সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম এ কথা  স্বীকার করে বলেন, ওদের (দখলদার) কাছে নদীর জমি, সরকারি খাসজমি, সাধারণ মানুষের কৃষিজমি, কোনোটাই নিরাপদ নয়। ঝাউচর-গুলিরপাড় নদীর তীর ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে একটি কেমিক্যাল কারখানা। সেখানে নদীর প্রায় ২০ বিঘা জমি দখল করা হয়েছে। প্রতিদিন সেই কারখানা থেকে বিষাক্ত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে পানিতে। কারখানার আশপাশে নদীর পানিতে মরা মাছ ভেসে থাকতে দেখা গেছে। মেঘনা নদীর তীরবর্তী গঙ্গানগর এলাকায় গিয়ে দেখা গেল একই চিত্র। নদীর প্রায় ৫০ বিঘা জমি দখল করে সেখানে একটি প্যাকেজিং কোম্পানি নির্মাণ করা হয়েছে। জামাই মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি আষাড়ীয়ারচর এলাকায় নদীর প্রায় পাঁচ বিঘা জমি দখল করে সেখানে ওই কারখানা নির্মাণ করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, দখলদাররা সোনারগাঁর মেঘনা ঘাট থেকে বারদী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় নদীর তীরবর্তী এলাকা দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপ এসব এলাকায় কারখানা করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কারণ নৌপথে যোগাযোগের সহজলভ্যতা এবং কম টাকায় জমি কেনার সুযোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন দুই বিঘা জমি কিনে, সঙ্গে আরো ১০ বিঘা খাসজমি দখল করে নেয়। এ জন্য স্থানীয় একটি দালাল শ্রেণি গড়ে উঠেছে। যারা জমি কেনা, খাসজমি দখল এবং নদীর জমি কেনার বানোয়াট দলিল-পর্চা তৈরি করে দলিল রেজিস্ট্রির জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করে। একটি প্রভাবশালী চক্র সৃষ্টি হয়েছে। তারা নদী ও সাধারণ মানুষের জমি দখলে সহযোগিতা করছেন। চক্রটি বর্তমানে নদীর জমি শিল্পপতিদের হাতে তুলে দিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক। কেবল নদী নয়, তাদের কাছে এলাকার সাধারণ ভূমি মালিকরাও অসহায়। ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষে সরকারি খাসজমি রক্ষার দায়িত্ব সোনারগাঁ এসি ল্যান্ড অফিসের। তালিকা করে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তাদের। কেউ সরকারি জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করলে তা উচ্ছেদের দায়িত্বও তাদের। তবে মেঘনার জমি দখলের বিষয়ে জানতে সোনারগাঁ এসি ল্যান্ড অফিসে গিয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত নদীর কী পরিমাণ জমি দখল হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য এসিল্যান্ড অফিসের কেউ জানাতে পারেননি।
এসিল্যান্ড বি এম রুহুল আমিন বলেন, শিগগিরই মেঘনা নদী দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাব। তবে আমি শুনেছি, মেঘনা নদীর মেঘনা ঘাট  বৈদ্যেরবাজার আনন্দবাজার এলাকায় সবচেয়ে বেশি নদী দখল হয়েছে। পরিবেশ কর্মী এবং সোনারগাঁ সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি এ টি এম কামাল বলেন, মেঘনা দখলের যে মহোৎসব চলছে তা বন্ধ করতে পারে একমাত্র প্রশাসন। কিন্তু প্রশাসনের অনেকেই এই দখলের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দখলদারদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দখলদারদের যোগসাজশ থাকায় সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে পারছে না। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, সরকারি নদী কিংবা খাসজমি রক্ষার দায়িত্ব তহসিল কিংবা এসিল্যান্ড অফিসের। কিন্তু তাদের সে ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় না। তারা জমির নামজারি ও মিস কেস নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১১ সালের শেষের দিকে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডাবলিউটিএ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেঘনা রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এমনকি বিশেষ অভিযান চালিয়ে পরিবেশ অধিপ্তরের এনফোর্সমেন্ট টিম একটি বড় শিল্প গ্রুপকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করে নদী ভরাটের মাটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সে নির্দেশ চার বছরেও কার্যকর হয়নি। উল্টো ওই শিল্প গ্রুপ নতুন করে অনেক এলাকায় নদী দখল-ভরাট অব্যাহত রেখেছে। বিআইডাব্লিউটিএ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, নদী দখলদারদের স্থাপনা উচ্ছেদ করার জন্য সোনারগাঁ থানা-পুলিশের অসযোগিতার কারণে তাদের পক্ষে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নদীবন্দরের ভবিষ্যৎ ব্যাহত হতে পারে। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাব্বি মিঞা  বলেন, অপ্রিয় হলেও সত্য কিছু প্রভাবশালী মহল মেঘনা নদীর তীরভূমি দখল করছে।
তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। নোটিশও দেওয়া হয়েছে। দখল না ছাড়লে এবং স্থাপনা সরিয়ে না নিলে অচিরেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। সোনারগাঁ এলাকার সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা  বলেন, নদী দখলমুক্ত করার জন্য যে উদ্যোগই নেওয়া হোক, আমি তার সঙ্গে আছি। অতীতে আমরা ঢাকার আশপাশের অনেক নদ-নদী হারিয়ে ফেলেছি। এখন সোনারগাঁর মেঘনাকে হারাতে চাই না। নদী দখলমুক্ত করতে সব রকম ব্যবস্থা নেব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ