ঢাকা, রোববার 12 August 2018, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করায় ঘর তৈরীর আগেই ভেঙ্গে যাচ্ছে খুঁটি

মো: জাকির হোসেন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) : আশ্রয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরন ব্যবহার এবং এসব তৈরিতে প্রকল্পের নীতিমালা, শিডিউল মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘর বরাদ্দের তালিকায় অর্থের বিনিময়ে স্থান দেয়া হয়েছে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের। সুবিধাভোগী প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে ৬ থেকে ৮ বিঘা জমির মালিককেও এ ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যে কারণে প্রকৃত ব্যক্তিরা বঞ্চিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সুবিধা থেকে। সে সাথে প্রকল্পের ঘর তৈরীর খুটি নির্মাণে নিম্নমানের উপরকরণ ব্যবহার করায় তা ঘরে লাগানোর আগেই ভেঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ভাঙ্গা খুটিগুলোও বাঁশের ঠেকনা দিয়ে মাটিতে পুতে ঘরে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব নানামুখি অনিয়মের ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নে। সরেজমিনে খাতামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের পিলার, দরজা-জানালা তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু কাজ দেখার জন্য কারিগরি কোনো লোক নেই। রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিরা যেনতেনভাবে কাজ করছেন। পিলার তৈরির পর মাটিতে শুইয়ে রেখে যথাযথভাবে কিউরিং না করায় পিলার গাড়িতে তুলতে গিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। খাতামধুপুরে একজন মেম্বারের বাড়িতেসহ বিভিন্ন জায়গায় এমন কিছু ভাঙা পিলার পড়ে থাকতে দেখা গেছে। তাছাড়া অনেক স্থানে পিলারের খোয়া ও সিমেন্ট খসে পড়ার কারণে বাঁশ দিয়ে বেধে ঠেকনা দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি অভিযোগ উঠেছে যে, এই নি¤œমানের উপকরণ দিয়ে বাড়ি তৈরী করে দেয়ার জন্য বাড়ি প্রতি প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে প্রায় প্রতিটি সুবিধাভোগীর কাছ থেকে। খাতামধুপুর ইউনিয়নের কবিরাজপাড়ার হরিনাথ চন্দ্র রায়ের ছেলে কানচালু (৩২) বলেন তার কাছ থেকে ঘর বাবদ ৮ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তালিকা তৈরীতেও করা হয়েছে চরম অনিয়ম। বিত্তশালী স্বচ্ছল ব্যক্তিদেরও টাকার বিনিময়ে ঘর দেয়ার তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। খাতামধুপুর ইউনিয়নের অমূল্য পানিয়ালের ছেলে রঞ্জিত (২৮) প্রায় ৬ বিঘা জমির মালিক এবং নিজস্ব বাড়ি বা ঘর আছে। একই ইউনিয়নের ছইলাপাড়ার আব্দুল এর ছেলে ঝন্টু (২৭) প্রায় ৮বিঘা জমির মালিক। তাকেও ঘর দেয়া হয়েছে।  জানা গেছে, ৬০টি ঘরের নির্মাণকাজ চুক্তিতে করছে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ঠিকাদার আব্দুর রাজ্জাক। তিনি আবার কাজ ইউনিয়নওয়ারি রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিদের সাব চুক্তিতে দিয়েছেন। খাতামধুপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে অবস্থানরত ঠিকাদারের লোক রেজাউল করিম জানান, ‘প্রতিটি ঘর তৈরিতে মজুরি বাবদ ১৭ হাজার টাকা ইউএনও স্যারের সঙ্গে মৌখিক চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিক লাগিয়ে কাজ করছি আমরা। ঘর তৈরিতে সব মাল ইউএনও স্যার সরবরাহ করছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের যে ভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে আমরা সেভাবে কাজ করছি। এখানে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা ইউএনও ও সরকারী লোকজনই করেছে। এদিকে ঘর তৈরীর জন্য খুটি নিয়ে যাওয়ার পর তা ভেঙ্গে যাওয়ায় ঘরে লাগানোর জন্য সিমেন্টের খুটির সাথে বাঁশের ঠেকনা ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে টাকা দিয়ে ঘর বরাদ্দ নেয়া লোকজনের সাথে ওয়ার্ড মেম্বারদের বাক বিতন্ডার সৃষ্টি হচ্ছে। মেম্বাররা এ ব্যাপারে চুপ থাকতে বলেছে। তা না হলে ঘর দেয়া হবেনা বলে হুমকি দিয়ে অর্থ প্রদান করার কথা কাউকে না জানানোর জন্যও ভয় দেখিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের অংশ হিসেবে আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় হতদরিদ্র মানুষের মাঝে ঘর দিচ্ছেন। অথচ সরকারের এ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে ইউপি চেয়ারম্যান জুয়েল চৌধুরী অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন। সে কারণে নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে ঘরের খুঁটি তৈরী, তালিকা প্রনয়ণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূর্নীতি করেছেন। ফলে সুবিধাভোগীরা প্রকৃত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আর এটা করা হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। যা সরকার তথা আওয়ামীলীগের জন্য অত্যন্ত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এ ব্যাপারে খাতামধুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: জুয়েল চৌধুরী জানান, আমরা পুরো পরিষদ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরো কাজটাই মনিটরিং করেছি। কোথাও কোন অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়নি অর্থাৎ কোন নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি। আমাদের ঘরের খুঁটিগুলো ১২ ফুট আর তা বহন করা হচ্ছে ৪ ফুট দৈর্ঘ্যের রিক্সাভ্যানে। তাছাড়া গত বন্যায় আমার ইউনিয়নের রাস্তাগুলো প্রায় ভঙ্গুর অবস্থায় পতিত হয়েছে। সে কারণে খুঁটিগুলো ভ্যানে নিয়ে যাওয়ার সময় ২/১টা খুঁটি ভেঙ্গে বা ফেটে যেতে পারে। কিন্তু সেগুলো কোনভাবেই ঘরের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছেনা।
তারপরও এ বিষয়ে যে অভিযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা ওভারকাম করার চেষ্টা করছি। সৈয়দপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মোখছেদুল মোমিন বলেন, স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন মাটি, বালু দিয়ে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হচ্ছে। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে পিলার তৈরি করায় তা ভেঙ্গে যাচ্ছে। টাকা নেয়ার কোন নিয়ম আছে কিনা তা আমি জানিনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ