ঢাকা, সোমবার 13 August 2018, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জায়নবাদী আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ইসরাইলী ইহুদীদের একাংশ

তেলআবিবের ইহুদি জাতি-রাষ্ট্র আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশে আরবদের পাশাপাশি তাদের সমর্থকরাও অংশ নেয়   -রয়টার্স

১২ আগস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স : ইসরাইলকে ইহুদী রাষ্ট্র ঘোষণায় প্রণীত আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে সেখানে বসবাসরত হাজার হাজার আরব জনগণ। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলের ইহুদী জনগণের একাংশও ফিলিস্তিনী দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেয়। শনিবার মধ্য-তেলআবিবে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

চলতি বছরের জুলাই মাসে ইসরাইলী পার্লামেন্ট নেসেটে পাস হওয়া ‘জাতিরাষ্ট্র বিষয়ক আইন’ অনুযায়ী দখলীকৃত ফিলিস্তিনী ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল রাষ্ট্রকে ঐতিহাসিকভাবেই ইহুদীদের জন্মভূমি আখ্যা দেয়া হয়। বলা হয়, সঙ্গত কারণেই এখানকার মাটিকে নিজেদের দাবি করার অধিকার রয়েছে তাদের। আইনে অবিভক্ত জেরুজালেমকে নিজেদের রাজধানীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিতর্কিত এই আইনে ইসরাইলকে প্রথম ও একমাত্র ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বলা হয় ইসরাইল শুধু ইহুদী নাগরিকদের রাষ্ট্র। এই আইন তৈরির কারণ হিসেবে বিবিসি বলেছে, কোনো কোনো ইসরাইলী রাজনীতিবিদ মনে করেন নিজেদের প্রাচীন মাতৃভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন নীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।

দেশটিতে প্রায় ৮৮ লাখ আরব সংস্কৃতির মানুষের বসবাস, যারা আরবি ভাষায় কথা বলেন। তাদের দ্রুজ বলা হয়। ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র বানানোরআইনটির বিরুদ্ধে সোচ্চার এই জনগোষ্ঠী। দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার রাজধানী তেল-আবিবে হাজার হাজার আরব-বিক্ষোভকারী পথে নেমে আইনটির বিরোধিতা করে। তাদের হাতে ছিল ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের পতাকা। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তারা অভিযোগ করে, এই আইনটি তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে রূপান্তরিত করবে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ওই কর্মসূচিতে ইসরাইলের ইহুদীরাও অংশ নিয়ে আরব নাগরিকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। শনিবারের বিক্ষোভ মিছিলে ইসরাইলকে অতীতের ধারাবাহিকতায় বর্ণবাদী রাষ্ট্র আখ্যা দেয়া হয়। হিব্রু আর আরবি ভাষায় লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড আর ব্যানারে দাবি তোলা হয়: ‘বর্ণবাদকে গ্রহণ করা যায় না’ কিংবা ‘সমতাই শেষ কথা’ জাতীয় বক্তব্য হাজির করা হয় সেইসব ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে। উল্লেখ্য, ইহুদী ধর্মের নামে, ‘জায়নবাদ’ নামের মতবাদের মধ্য দিয়েই ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসরাইল রাষ্ট্র। জায়নবাদ ইহুদী ধর্মের দর্শন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মতবাদ; অলীক রূপকথায় যে মতবাদের শরীর গড়ে উঠেছে। জায়নবাদের ভাষ্য, জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনী ভূখ- নিয়ে গঠিত পবিত্র নগরীতে ¯্রষ্টা তাদের অধিকার ফিরিয়ে নিতে বলেছিল ইতিহাসে নজর ফেরালে দেখা যায়, ১৮ শতক থেকে জায়নবাদ নামের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা তাদের বর্ণবাদী ধারণার বিস্তার ঘটিয়ে দখল হওয়া ফিলিস্তিনী ভূমিতে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম দেন। জায়নবাদের মাধ্যমে তখন থেকে আজ পর্যন্ত ইহুদী জনগণের মনে ফিলিস্তিনবিরোধী বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। সেই বিদ্বেষী প্রচারণা সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরাইলিকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বৈরি করে তুললেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও রয়েছে সেখানে। এরইমধ্যে পাস হওয়ার পর ওই আইনের নিন্দা জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মিসরও এই আইনপাসের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। ফিলিস্তিনী কর্তৃপক্ষসহ আরব নাগরিকেরা এই আইনকে বর্ণবাদী আইন আখ্যা দেয়। বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবীরাও এই আইনের সমালোচনা করেছেন। এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে ইসরাইলী পার্লামেন্ট নেসেটেও। বিরোধী দলীয় নেতা জিপি লিভিনি বলেছেন, তিনি এমন একটি আইন চান যেখানে ইসরাইল ইহুদী রাষ্ট্র হলেও সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, ‘ নেতানিয়াহু আমাদের ইহুদী ও সংখ্যালঘুদের মাঝের সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর নতুন আইন করে এটা দূর করা হচ্ছে।’ লিভিনি দাবি করেন, আমরা আমাদরে জীবনের স্বাধীনতার সেই চেতনা ফিরিয়ে আনতে চায়। আপনাদের সময় শেষ। আমরা জয়ের আগমুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবো।

উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরার নৌকা ভাসিয়ে ইসরাইলি নৌবাহিনীর দখলদারিত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে ফিলিস্তিনের জেলেরা। গত শনিবার প্রায় ২০টি মাছ ধরার নৌকা নিয়ে ইসরাইল সংলগ্ন সমুদ্রসীমায় বিক্ষোভ করেছে তারা। এর প্রতিক্রিয়ায় হুঁশিয়ারিমূলক গুলী ছুড়েছে ইসরাইলী নৌবাহিনী। বিক্ষোভকারীদের উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা খবরটি জানিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

২০০৭ সালে গাজার ক্ষমতায় আসে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। মূলত এরপর থেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে গাজার ওপর অবরোধ আরোপ করে ইসরাইল ও মিসর। তখন থেকে রাফাসীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন গাজার ২০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা। বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তারা। ইসরাইলের দাবি, হামাসসহ জঙ্গি সংগঠনগুলোর হাতে যেন অস্ত্র না পৌঁছাতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই গাজার সঙ্গে তাদের নৌ সীমান্তে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে জঙ্গি সংগঠন আখ্যা দিয়ে থাকে ইসরাইল।

গাজার ওপর ইসরাইলের অবরোধের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে শনিবার গাজা সিটি বন্দর থেকে ইসরাইলের সমুদ্রসীমার দিকে প্রায় ২০টি ফিলিস্তিনী মাছ ধরার নৌকা যাত্রা করে। আদম আবু সেলমেয়া নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে অস্ত্রবিরতির জন্য প্রচেষ্টারত সব পক্ষকে বার্তা দিতে এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা গাজার মানুষের অবরুদ্ধ অবস্থা আর ভোগান্তিকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে চাই। অবরোধ পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে নেওয়া ছাড়া আমরা কোনভাবেই থামব না।’

ফিলিস্তিনি প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরাইলি সমুদ্রসীমার দিকে যাত্রা করা নৌকাগুলো চারটি ইসরাইলি নৌ জাহাজের মুখোমুখি হয়। বিক্ষোভকারী জেলেদের দাবি, তাদের নৌকা লক্ষ্য করে ইসরাইলি বাহিনী হুঁশিয়ারিসƒচক গুলি ছুড়েছে। তবে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, নৌ বাহিনীর সদস্যরা প্রথমে মৌখিকভাবে ফিলিস্তিনি নৌকাগুলোকে সতর্ক করেছিল। পরে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে তারা। 

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের পর এ বছর গাজায় ফিলিস্তিনি-ইসরাইলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। গত ৩০ মার্চ থেকে গাজা সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের ছয় সপ্তাহের মাচ অব রিটার্ন আন্দোলন চলার সময় ইসরাইলী বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১২০ ফিলিস্তিনী নিহত হয়। ইসরাইলী বাহিনীর দাবি, নিহতদের বেশিরভাগই সন্ত্রাসী ও হামাস সদস্য। বিক্ষোভের আড়ালে তারা ইসরাইলে হামলা চালানোর চেষ্টা করছে। দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল উত্তেজনার পর গত ৩০ মে ইসরাইল ও গাজার ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি হলেও পরে তা ভেস্তে যায়। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকে। ৯ আগস্ট রাত থেকে আবারও মিসরের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতিতে পৌঁছায় ইসরাইল ও হামাস। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ