ঢাকা, সোমবার 13 August 2018, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সোনার বাংলায় নাব্যতা- প্রাপ্যতার হিসাব-নিকাশ

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে হার্ডিজ ব্রীজের নীচে খরায় চৌ-চির

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান : আমার সোনার বাংলা গানটি রচিত হয়েছিল শিলাইদহের ডাক-পিয়ন গগন হরকরা রচিত আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে গানটি সুরের অনুষঙ্গে। সত্যেন রায়ের রচনা থেকে জানা যায়, ১৯০৫ সালের ৭ আগষ্ট কলকাতার টাউন হলে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ সভায় এই গানটি প্রথম গীত হয়েছিল। এই বছরেই ৭ সেপ্টেম্বর সঞ্জীবনী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে গানটি মুদ্রিত হয়।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ। পরে ৩ মার্চ তারিখে ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে ঘোষিত ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সংগীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সংগীত হিসাবে গাওয়া হয়। এটিই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত যা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই রচয়িতা ও সুরকার। ১২ জানুয়ারী, ১৯৭২ খিষ্টাব্দে মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে এই গানটির প্রথম দশ লাইন সদ্যগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয়সঙ্গীত হিসেবে বিবেচিত হয়। যে পূর্ণাঙ্গ সংগিতে দেশপ্রেম, প্রাকৃতিক সুন্দর্য, ফসল ভরা ক্ষেতের ঘ্রাণ, বটের মূল, নদীর কূল, মাঠ-ঘাট, স্নেহ, মায়া-মমতা, খেলাঘর, সন্ধা প্রদীপ, পাখি ডাকা, ধুলা মাটি এবং সব শেষে মলিনতা, নয়নের জল এবং পরাধীনতার চেয়ে গলার ফাঁসি শ্রেয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মুলত সংগীতটিতে হাসি আর কান্নার সচিত্র প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। এছাড়া সংগীতটিতে দেশ প্রেমের শিকড় ও শিরকের সংমিশ্রণ ঘটেছে। সেই ক্ষেত্রে জাতীয় সংগীতের ভাবধারায় দেশের পরিবেশ-পরিচিতি সহজভাবে বিকশিত হয়েছে। অপরদিকে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লিখেছেন-“ধনধান্যে পুষ্পেভরা আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে এক দেশ সকল দেশের সেরা; ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা; এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার  জন্মভূমি।” এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার? ওথায় এমন ধুম্র পাহাড়? কোথায় এমন হড়িৎ ক্ষেত্র আকাশ তলে মেশে? এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে। একবার যেতে দেনা আমার ছোট্ব সোনারগাঁয়। “সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম মাগো, তোমায় ভালবেসে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                         
বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এ দেশ ২০০৩র্৪ উত্তর অক্ষরেখা থেকে ২৬০৩র্৮ উত্তর অক্ষরেখার মধ্যে এবং ৮৮০০র্১ পূর্ব দ্রাঘিমারেখা থেকে ৯২০৪র্১ পূর্ব দ্রাঘিমারেখার মধ্যে অবস্থিত। বাংলাদেশের মাঝামাঝি স্থান দিয়ে কর্কটকান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ছাড়া সারা দেশটি নদী মাতৃক। বাংলাদেশ একটি ছোট্ট আয়তনের সবুজ শ্যামলে ঘেরা একটি দেশ। যার সর্বোত্র ছোট-বড় অসংখ্য জলাশয় জালের মত ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১৯৯৬-৯৭ সালের তথ্য অনুসারে দেখা যায়, বাংলাদেশের নদী অঞ্চলের আয়তন ৯,৪০৫ বর্গ কিলোবাইট। বাংলাদেশের নদীর সংখ্যা প্রায় ৭০০। আর নদীবহুল দেশ বলে স্বাভাবিকভাবেই এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নদীর প্রভাব রয়েছে।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, উপনদী ও শাখানদী রয়েছে। উপনদী ও শাখানদী সহ বাংলাদেশে নদীর মোট দৈর্ঘ্য হল প্রায় ২২,১৫৫ কিলোমিটার। এ সকল নদনদী এর সমভূমি অঞ্চলকে করেছে শস্য শ্যামলা ও অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী। প্রকৃতি যে কি আশ্চর্য সুন্দর তা বাংলাদেশের প্রতিটি ঋতুকে দৃষ্টিতে লক্ষ না করলে বুঝা যায় না। তাই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এদেশে যুগে যুগে এসেছেন বহু পর্যটক, কবিরা লিখেছেন কবিতা। কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ভাষায়-“পদ্মা যমুনা মধুমতি আর মেঘনার মালা কন্ঠে পরি, দাঁড়ায়ে রয়েছে সুজলা যে দেশ সেই দেশে বাস আমরা করি।”
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ছয়টি ঋতুতে প্রকৃতির ছয় রকম অবস্থা দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের প্রকৃতি হয়ে ওঠে এক উদাসীন সন্ন্যাসীর মতো । তার রুক্ষ রৌদ্রের দাবদাহে মানবজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময়ে কালবৈশাখী তার উদ্দামতা নিয়ে আসে। গ্রীষ্মের পর আসে বর্ষা। বর্ষায় এ দেশের প্রকৃতিতে যেন নতুন করে প্রানের সঞ্চার হয়। তখন প্রকৃতি হয়ে ওঠে সজীব ও সতেজ। ফসল ভরা ক্ষেতগুলো দেখলে মনে হয় আবহমান। ধানসিঁড়ির সমুদ্র। তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তার সমস্ত গ্লানি মুছে ফেলেছে। চাঁদনী রাতের শোভা তখন বড়ই মনোলোভা মনে হয়। কবি তাই বলেন-“চাঁদনীর সাথে প্রতি রাতে রাতে গোলা মনোচোর শরতের ভোর আলোছায়া ঋতু বড়সে।” শরতের শেষে, শীতের আগে আসে হেমন্ত ঋতু। এ সময় সোনালী ফসলে ভরা থাকে মাঠ-ঘাট। আর সোনালি ধানের শীষে যখন বাতাসের খেলা চলে তখন বাংলার নিসর্গে ছোঁয়া লাগে। হেমন্তের পর শুষ্ক শীতল চেহারা নিয়ে অসে শীত। এ সময়ে প্রকৃতি বিবর্ণ ও বিষন্ন হয়ে পড়ে। শীতের শেষে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। গাছপালা তখন সজীব হয়ে ওঠে। গাছে গাছে নতুন পাতা গজায় নতুন নতুন ফুল ফোটে।
বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান দেশ। তার প্রত্যেকটি গ্রাম যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব রঙ্গশালা। যেদিকে চোখ যায়-অবারিত সবুজ মাঠ, ফুলেফলে ভরা গাছপালা, তৃন গুল্মশোভিত বন-বনানী ও শ্যামল শস্যেক্ষত-এই অনুপম রূপসুধা পান করে সকলের হৃদয়ে এক অভিনব আনন্দের শিহরণ জাগে। কোথাও প্রকৃতির সবুজ ঘোমটা ভেদ করে পাকা শস্যের সোনালি সুন্দর মুখখানা বের হয়ে আসছে, আবার কোথাও বিশালদেহ বটবৃক্ষ প্রান্তরের এক স্থানে উধ্বর্বাহু হয়ে মৌন তাপসের মত দাঁড়িয়ে সুশীতল ছায়া দিয়ে পথিকের ক্লান্তি দুর করছে। কোথাও তালগাছ এক পায়ে দাড়িঁয়ে আকাশ থেকে নীলিমা ছিনিয়ে আনার অন্যে ওপর দিকে হাত বাড়িয়েই চলছে, আবার কোথাও দীঘির কাকচক্ষু কালো পানিতে লাল সাদা শাপলা ও কুমুদ ফুঁটে অপরূপ সৌন্দর্য বিস্তার করছে। বাংলাদেশের এই সৌন্দর্য বৈচিত্র্য সবার মন আনন্দে ভরে দেয়।
অন্য দিকে সিকি দামের পোষ্টকার্ডের একটি চিঠির ভাষা এবং ডাকপিয়নের চিঠি বিলির অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিখ্যাত কন্ঠ শিল্পি ভূপেন হাজারিকা একটি গান গেয়েছিলেন। ‘সরৎবাবু একটা খোলা চিঠি দিলাম তোমাকে, তুমি পাবে কিনা জানিনা-গেলোবছর বন্যা হলো এবার এলো খরা, তোমার মহেশ...।
বিখ্যাত লোকো সংগীত শিল্পি আব্দুল আলীম গাইলেন -’মনমাঝি তোর বইঠা নিরে আমি আর বাইতে পারলাম না’। ‘নদীর একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে এইতো নদীর খেলা রে ভাই এইতো নদীর খেলা’। পল্লি কবি জসিম উদ্দিন লেখেন-আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও রহিমুদ্দীর ছোট্ট বাড়ি রসুল পুরে যাও, বাড়িতে নেই পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি- একটু খানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পরে পানি..। কিচি মিচি করে সেথা শালিকের ঝাক-রাতে উঠে থেকে থেকে শিয়ালের হাক’। ‘পাড় হয়ে যায় গরু পাড় হয় গাড়ী-দুই ধার উঁচু তার ঢালুতার পারি’। উপরে উল্লেখিত সফলতা ও ব্যর্থতার উপর ভিত্তি করেই সোনার বাংলায় নদী সিকস্তি উপকূলীয় জনপদের সেকাল-একালের হাল-হকিকত সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উপকুলীয় জেলাগুলো দেশের নিম্নাঞ্চল তথা বঙ্গোপসাগরের সন্নিকটে হওয়ায় প্রতিবছর এখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় ২শ’ বছর ধরে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে এসব দুর্যোগের কারণে গত ৫০ বছরে সংঘটিত ৯টি বড়ো ঘুর্ণিঝড়ে সংঘটিত ৯টি বড়ো ঘূর্ণিঝড়ে ৪ লক্ষ ৭৩ হাজার ৬৬১ জনের প্রাণহানি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ৮ হাজার ৯শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকার জনগণ অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে বলে এক গবেষণায় জানা গেছে।
যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা এবং দেশের অভ্যন্তরে আরো ৫০টির বেশি নদী উপকূলীয় এলাকার মধ্যদিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিলক্ষিত হলেই উপকূলীয় জনপদে এর প্রভাব পড়ে যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। আবার মৌসুমী জলবায়ুর প্রভাবে উজানে থেকে নেমে আসা পানি, সাইক্লোন, ব্যাপক বৃষ্টিপাত, নদীর উপচে পড়া পানিপ্রবাহ বন্যার সৃষ্টি করে এবং উপকূলীয় জনপদ  ভীষণভাবে প্লাবিত করে। নদী ভাংঙ্গনে হাজার হাজার বসত বাড়ী স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দীর,হাসপাতাল, গাছ-পালা সহ মূল্যবান সম্পদ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিগত ২০০ বছরেরও বেশি সময়ে উপকূলীয় জনপদে কমপক্ষে ৭০টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যায় মধ্যে গত শতকে অর্থাৎ ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ৪০টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত করে। এমনকি ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে এসব এলাকায় ১১টির বেশি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার প্রকোপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, সম্পদ আশ্রয়স্থল, গবাদিপশু এবং উপকূলীয় অবকাঠামোর উপর এর প্রভাব পড়ছে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে সংঘটিত সাইক্লোন ‘সিডর’ উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। এ এলাকার জনগণের সুরক্ষার প্রয়োজনে সুরক্ষার প্রয়োজনে অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটেছে দুর্যোগে। এর আগে ১৯৬৫ সালে ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ে ১৯ হাজার ২৭৯ জনের প্রাণহানি হয়। একই বছর ডিসেম্বরে ২১৭ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ৮৭৩ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৬৬ সালের অক্টোবরের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৮৫০ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৮৫ সালের মে মাসের ঘুর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটার। আর এর আঘাতে ১১ হাজার ৬৯ সালের এপ্রিলে ২২৫ কিলোমিটার গতিতে আসা ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছাসের উচ্চতা ছিল ৬ থেকে ৭.৬ মিটার।
এই দুর্যোগে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৮৮২ জনের প্রাণহানি হয়। ১৯৯৭ সালের মে মাসে ২৩২ কি.মি. বেগে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৫৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। ৯০ সালের পরে দুর্যোগ মোকাবিলায় পদেক্ষপ নেয়া হলেও ২০০৭ সালের নভেম্বরের সিডরে ২ হাজার ৩৬৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এই সময় ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২৩ কিলোমিটার। আর সর্বশেষ ২০০৯ সালের মে মাসের আইলায় ১৯০ জনের প্রাণহানি হয়।
বন্যায় জুলাই ২০১৬ খ্রিঃ ১ সপ্তাহে ১০টি জেলায় ৩৮ টি বন্যাদুর্গত উপজেলায় মানবিক বিপর্যয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ৪০ জন। বিভিন্ন রোগের আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার ২২ জন। এর মধ্যে পানিতে পড়েই মৃত্যুবরণ হয়েছে ৩৬ জনের । গত ২৫ জুলাই ২০১৬ খ্রিঃ বন্যা কবলিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে জামালপুর জেলার ৫৩ টি ইউনিয়ন। ৩১ জুলাই ২৪ ঘন্টায় জেলায় রোগাক্রান্ত হয়েছেন ২০৩ জন। এবং এর আগে ৭ দিনেই মৃত্যুবরণ করেছেন ১৬ জন।
বন্যা কবলিত অঞ্চলগুলোতে ডায়রিয়া, শাস-প্রশ্বাসজনিত রোগ, বজ্রপাত, সাপের কামড়, পানিতে ডুবে মৃত্যু, চর্ম রোগ, চোখের প্রদাহ, আঘাত এবং অন্যান্য কিছু প্রসঙ্গিক অসুস্থতাজনিত কারণে বহু লোকের প্রাণ দিতে হয়েছে। এটি ২ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত প্রতিবেদন যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল হেলথ্ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া।
জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সৃষ্ট প্রভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিগত ৮০ বছরে সোনার বাংলায় নদী সিকস্তি চরবাসীদের জীবন সংগ্রামের নানা রকমারিতা রয়েছে। উপর্যপরি ভয়াবহ বন্যার কারণে নাব্যতা কমে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার বালকারাশিতে ধুধু বালুচর পড়ায় খরা সৃষ্টি হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত উত্তাপে লাখ লাখ একর ফসলি জমি আবাদ যোগ্যতা হারিয়েছে। অভাব, দারিদ্র্যতা, বেকারত্ব, ব্যাপকভাবে বেড়ে জনদূর্ভোগ চরম ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যায় বহুল চাষাবাদে চাষিরা চাষকার্য ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। বার বার বন্যায় নদী ভাঙ্গনে শিকার হয়ে বসত বাড়ী, সহায় সম্বল হারিয়ে চরাঞ্চলের মেহনতি মানুষ বাঁচার তাগিদে আশ্রয় নিয়েছে। উচু এলাকায় কিংবা বেড়ী বাঁধের ওপর। এক শ্রেণীর কর্মক্ষম যুবকেরা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করা বাদ দিয়ে জীবিকার তাগিতে শহরাঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছে।
বেড়েছে বাল্য বিবাহ, যৌতুক প্রথা, মাদক সেবন, হাইজাক, ডাকাতি, গুম, খুন। রাক্ষুসে যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ চইরা নামে খ্যাত, দুরন্ত দুর্বার খর¯্রােতা গতিশীল নদীগুলোর মধ্যে যমুনা একটি করাল গ্রাসী নদী।
যমুনা চরাঞ্চলে আদি অধিবাসী কারা? কবে কোথা থেকে এদের আগমন ঘটেছে? তার সাঠিক তথ্য পরিবেশন করা দুস্কর। তবে অনুমান করা যায় যে এরা বহিরাগত এবং বিচ্ছিন ভাবে সপ্তদশ কিংবা ষোড়শ শতকের মাঝা মাঝিতে এদের আগম ঘটে।
 সৈয়দ, পাঠাণ, ভূঁইয়া, শিকদার, তালুকদার, সরকার, তরফদার, খন্দকার, আকন্দ, প্রামানিক, শেখ, মির্জা, মিয়া, ফকির, হরকিসিমের বংশের মানুষ সম্প্রাদায়ের লোক যুগে যুগে প্রাকৃতিক বিবর্তন ও বিপর্যয়ের কারণে এরা বিচ্ছিন্ন ভাবে অথবা সম্প্রদায় ভিত্তিক চরাঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। এসব বংশের মধ্যে যার একটু সচেতন তাদের পরিবারের মুষ্টিমেয় সদস্যরা শিক্ষা-দীক্ষা অর্জন করে দেশের বিভিন্ন স্থলে চাকুরী বাকুরীর সুবাদে গ্রাম ছেড়ে শহর উপশহর এমনকি দেশের বড় বড় নগর বন্দরে বসতি স্থাপন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।
এসব চরাঞ্চলে প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে যারা জীবন যাপন করতেন তারা অনেকেই আজ বেঁচে নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা যোগাযোগ, যাতায়াতের ক্ষেত্রে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়ে অনেকেই চর ছেড়েছেন। চর মালিকানা, ভূমি মাকিলানা, আন্ত জেলা সিমানা নির্ধারণী জঞ্জাট দখলস্বত্ব নদীতে তলিয়ে যাওয়া জমির পূর্নদখল, জমির খাজনা খারিজ, দলিল দস্তাবেজ যোগাড় সম্ভব না হওয়ার কারণে অধিকাংশ চইরা জমি ১ নং খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত হয় বিপাকে পড়েছে জমি সত্বাদখলিয় ভূমি মালিকরা। ফলে এসব জমিজমা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল হস্তান্তর অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
জোর যার মুল্লুক তার , জাল যার জলা তার এই নিয়মে চলছে চরাঞ্চলের পানিও জমির দখল স্বত্ব। ফলে এক শ্রেণীর টাউট বাটপারদের দাপটে লাখ লাখ নিরীহ চইরাবাসীরা নানা রকম কৃত্রিম দূর্ভোগ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়ছেন।
৯০ এর দশকে বগুড়া সরিয়াকান্দী ও জামালপুরের মাদারগঞ্জ-ইসলামপুুর উপজেলার নদী উপকূলীয় আন্ত জেলা সিমানা দখল নিয়ে এক ঘটনায় সারিয়াকান্দী উপজেলার চালুয়াবাড়ী ও মাদারগঞ্জ উপজেলার নব্যরচর বাসীদের মাঝে একটি সংঘর্ষ হয়, এতে ৪৩ টির পরিবারের বসতবাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করে সবকিছু পুরে ছাঁই করে দেওয়া হয়। লুটপাট করে নিয়ে যায় গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী, অলংকার ও টাকা পয়সা। দুস্কৃতিকারীরা মানিক দাইড় ও টেংরা কুড়ার অধিবাসীদের ধান ভাংঙ্গানোর ঢেঁকি পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যেতে ভোলেনি।
রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলা ও ঢাকা বিভাগের জামালপুর জেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর উপকূলীয় সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে ১৯১১-১২, এবং ১৯২১-২৪, ১৯৮৭ খ্রিঃ ২১শে মে মন্ত্রী পরিষদের সচিবের সভাপত্বিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা সরকারের ১৯১১ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর অনুসারের সংশোধিত আন্তঃজেলা সীমানা নির্ধারণ প্রজ্ঞাপন সংশোধন করে সি এস জরিপের বিষয়টি নির্ধারণের চুড়ান্ত ঘোষনা করা হয়। এতে জামালপুর পশ্চিম ও বগুড়া পুর্ব আন্তঃজেলা বরাবর সীমা রেখা চিহ্নিতকরন এবং রেখা বরাবর সিমান্ত পিলার স্থাপনের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন যাবৎ সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে যে সকল দাংগা হাংগামা, অগ্নিসংযোগ, খুন খারাবী, লুট পাট, অপহরণ ও মামলা মোকদ্দমা চলে আসছিল তা মোটামোটি ভাবে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু সে অঞ্চলে নতুন করে আবার সিমান্ত বিরোধ দেখা দিয়েছে। যে কারণে বিভাগীয় মানচিত্রের আলোকে জেলা সিমান্ত চিহ্নিত করনে নতুন করে মাপ-ঝোক শুরু করেছে সরকার।  
দেশের যমুনা ব্রক্ষপত্র বিধৌত আন্তঃজেলা সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে সন্ত্রাসীদের অভয়ারন্যে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এসব এলাকা ঘুরে জানা যায় বর্ষাকালীন কয়েক বছরে শতাধিক সম্পদশালী ঐতিহ্যবাহী বড় বড় বাড়ীতে ডাকাতি ধন-সম্পদ লুট-পাট, হত্যা,গুম, গরু চোরদের উপদ্রবে শতশত পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। বেড়ে গেছে মাদকদ্রব্য চোরাচালান এবং হামলা, মামলা।
শুষ্ক মৌসুমে এই সব জেলার বিভিন্ন উপজেলার নদী পথ ও দুর্গম চরাঞ্চলে চলে অস্ত্র, মাদক, ডিজেল ও বিভিন্ন অবৈধ দ্রব্য ও পণ্যসামগ্রীর রমরমা ব্যবসা। আইন শৃংখলা বাহিনীর নাগালের বাইরে অতি সহজেই এসব বেআইনী কর্মকান্ড ইদানিং বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা সদরের দাগী আসামীরা নিরাপদে চরাঞ্চলে গা ঢাকা দিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ