ঢাকা, সোমবার 13 August 2018, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সড়ক-মহাসড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি ও প্রতিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে জানা যায়, ক্ষতি সংঘটনের কারণে যে ঘটিয়েছে ফকীহদের ঐক্যমতে তার উপরই ক্ষতিপূরণের দায় বর্তাবে। এ বিষয়ে ইবনে মাসউদ রা. এর সূত্রে একটি আছার বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি কাদিসিয়া থেকে একটি বালিকাকে নিয়ে আসছিল। পথে সে আরোহী এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। লোকটি জন্তুকে খোঁচা দিল। ফলে জন্তু পা তুলে বালিকাটির চোকে আঘাত করল। এ মোকাদ্দমা সালমান বিন রাবী‘আ আল বাহিলীর আদালতে গেলে তিনি বললেন, আরোহী ক্ষতিপূরণ দেবে। ইবনে মাসউদ রা. এর কাছে এ ফয়সালার সংবাদ গেলে তিনি বললেন এ দায়ভার খোঁচা দানকারী ব্যক্তিটির ওপর বর্তাবে। সেই ক্ষতির দায় বহন করবে “ইবনু আবী শায়বা, আল-মুসান্নাফ, খ.৫,পৃ,৪৬৫, (২৭৯৪৯); ইবনু আবদির রাযযাক, আল-মুসান্নাফ, খ.৯,পৃ,৪২২(১৭৮৭১১)।”
ফকীহগণ এটাও বলেছেন যে, জন্তু মারা যাওয়ার কারণে যদি আরোহী পড়ে যায় এবং অন্যের কোন ক্ষতি হয়, তাহলে আরোহী সে দায় বহন করবে না। একই ভাবে মৃত্যু বা অন্য কোন রোগবশত আরোহী যদি জন্তুর পিঠ থেকে পড়ে যেয়ে কোন কিছু নষ্ট করে, তাহলে আরোহী তার দায় বহন করবে না। যেহেতু অন্যের ক্ষতি বা সম্পদ নষ্টের বিষয়টি তার পক্ষ থেকে সংঘটিত হয়েছে- একথা বলার সুযোগ আমাদের নেই।
শাফিয়ী মাযহাবের ইমাম আবুল কাসিম আররাফিয়ী [৫৫৭-৬২৩হি.] রহ. বলেন, “কেউ যদি জন্তুতে আহোরণ করে এরপর জন্তু মরে পড়ে যায় ও কোন ক্ষতি ঘটায় “ অনুরুপ বিধান প্রচন্ড বাতাস বা অসুস্থতা বা এজাতীয় এমন যে কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগের জন্য প্রযোজ্য হবে, যার করণে আরোহী বা জন্তু নিজ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।” অথবা আরোহী মারা যায় এবং পড়ে গিয়ে কোন ক্ষতি ঘটায় তাহলে সে ক্ষতির দায় বহন করবে না। “রাফিয়ী, আল আযীয শরহুল ওয়াজীব, খ.১১,পৃ.৩৩৬।”
ইমাম শাফিয়ী রহ. বলেন, যদি দুই আরোহীর মাঝে সংঘর্ষ এভাবে হয় যে, কেউ আরেকজনের আগে আঘাত করতে পারেনি, অর্থ্যা প্রত্যেকেই অপরের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের শিকার হয়েছে, এরপর উভয়েই ঘোড়াসহ মারা গিয়েছে, তাহলে প্রত্যেকের আকিলা “আকিলা শব্দটি উহ্য মাওসূফ (বিশেষণযুক্ত) এর গুন, এর পূণাঙ্গ রুপ: (দিয়্যাত দানকারী দল) পরিভাষায় আকিলা বলা হয় যৌথ দায়ভার বহনকারী কোন সংঘ বা প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষকে,যা তার অধীনস্ত সদস্যগণের মাধ্যমে হওয়া অনিচ্ছাকৃত হত্যার রক্তপণ প্রদান করে।” অপরের আকিলাকে অর্ধেক দিয়্যাত দেবে। এর কারণ,প্রত্যেতেকের মৃৃত্যু ঘটেছে নিজের ও অন্যের অন্যায় আচরণের কারণে। নিজের অন্যায়ের কারণে দিয়্যাত অর্ধেক রহিত হয়ে যাবে এবং অন্যের অন্যায়ের কারণটি ধর্তব্য হবে এবং অর্ধেক দিয়্যাত দেয়া হবে।
অনুরুপভাবে আরোহী ও অপরের অন্যায় আচরণের কারণে যদি প্রত্যেকের ঘোড়া মারা গিয়ে থাকে। অন্যের অপরাধকে বিবেচনা করে ঘোড়ার অর্ধেক মূল্য দিতে হবে। তবে এ মূল্য দেয়া হবে অপর আরোহীর নিজস্ব সম্পদ থেকে; আকিলার তরফ থেকে নেয়।“ ইমাম শাফিয়ী, আল উম্ম (বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৪০০হি.),খ.২,পৃ.১৮৫; আরও দ্রষ্টব্য: ইয়াহইয়া বিন শারফ আন-নবভী, রওযাতুত তালিবীন ওয়া উমদাতুল মুফতিয়্যিন (বৈরুত ও দামিশক: আল মাকতাব আল ইসলামী, ২য় সংষ্করণ, ১৪০৫ হি.), খ.৯,পৃ.৩৩১।” দুই আরোহী বা জাহাজের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে তার বিধান ও একই হবে। অনুরুপ দুই গাড়ির মাঝে সংঘর্ষ হলে ও একই বিধান হবে।
ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, দুই ঘোড়া আরোহীর মাঝে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে প্রত্যেকে মারা গেলে প্রত্যেকের সম্পদ থেকে অপরকে দিয়্যাত দেয়া হবে। “ ইমাম মুহাম্মদ, আল আসল (আল মাবসূত), খ.৫. পৃ.৫০০; তূরী, তাকমিলাতুল বাহরির রাইক,খ.৯,পৃ.১৩৩।” মালিকী  ও হাম্বলী ফকীহদের মত অনুরুপই। “ কারাফী, আয যাখীরা, খ.১২,পৃ.২৬০; ইবনু কুদামা, আল মুগনী, খ.১২,পৃ.৪৫৪।” ক্ষতির সরাসরি সংঘটক ও ক্ষতি সংঘটনের কার্যকারণের মাঝে পার্থক্য করার এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু সড়ক দূর্ঘটনার ক্ষেত্রে ও অন্যান্য প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত মাসআলায় এর বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
“কার্যকারণের সংঘটক অন্যায় আচরণ ছাড়া দায় বহন করবে না” ঃ এ মূলনীতিটি মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যার ৯৩ নং ধারায় বর্ণিত হয়েছে: “ইচ্ছাকৃত অন্যায় আচরণ ছাড়া ক্ষতির কারণ সংঘটক দায় বহন করবে না। এ থেকে বোঝা গেল, ক্ষতির কারণ সংঘটক দায় বহন করবে দুই শর্তে: ১. ইচ্ছাকৃতভাবে করা; ২. অন্যায় আচরণ করা।
এমূলনীতির আলোকে যদি কাউকে দেখে অপরের জন্তু ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়, তাহলে যাকে দেখে ভয় পেয়েছে সে পালিয়ে যাওয়ার দায় বহন করবে না, যতক্ষণ তার থেকে কোন অন্যায় আচরণ প্রকাশ পেয়ে থাকে। “হায়দার, দূরারুল হুক্কাম শরহুল মাজাল্লা, খ,১.পৃ.৯৪।”
তবে শায়ক মুস্তাফা যারকা রহ. এ ব্যাপারে মাজাল্লাহর সাথে দ্বিমত পোষণ করে যুক্তি দেখান যে, শরীআহ অন্যের সম্পদ ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় সর্বাবস্থায় দায়বদ্ধ। বরং তীব্র প্রয়োজনের কারণে হারাম বিষয়াদি বৈধ হওয়ার অবস্থাতেও অন্যের সম্পদ দায়বদ্ধ। “যারকা, আল মাদখালুল ফিকহিয়্যুল আম, খ.২,পৃ.১০৪৬।” এক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করার শর্ত যোগ করা ভূল। যেমন কেউ তীব্র ক্ষুধার কারণে খাবার খেয়ে ফেলল অথবা শত্রু বা কারো থেকে বাঁচার জন্যে অন্যের গাড়িতে আরোহণ করল, এ অবস্থাতে ও সে খাবার ও গাড়ি দায়বদ্ধ থাকবে। সম্ভবত এই মূলনীতির মূল ভিত্তি হল ইতঃপূর্বে বর্ণিত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা.- এর অভিমত। বিশেষত তাঁর রায়: “ক্ষতির দেবে খোঁচা দেয়া ব্যক্তি। কাযী শুরাইহ (মৃ.৭৮হি.) আমির আশশা‘বী (১৯-১০৩ হি.) রহ. ও অন্যদের থেকেও অনুরুপ মত বর্ণিত রয়েছে।
আভিধানিক অর্থে সাবাব অর্থ রশি। রুপকার্থে এমন প্রত্যেক বিষয়কেই সাবাব বলা হয়, যা দ্বারা কোন কাজ সংঘটন পর্যন্ত পৌছা যায়। “আল-ফাইয়্যূমী, আল মিসবাহুল মুনীর, মাদ্দাহ (সাবাব); আবুল বাকা আল কাফাওয়ী, আল কুল্লিয়্যাত (বৈরুত: মুআসসাসাতুর বিরাসালাহ, ২য় সংরষ্করণ, ১৪১৩হি.), পৃ.৪৯৫,৫০৩।” আর মুতাসাব্বিব বলা হয়,যে এমন কাজ করে, যার মাধ্যমে কোন কাজ ঘটে। তবে সে সরাসরি ঐ কাজ ঘটায় না। “যারকা, আল মাদখালুল ফিকহিয়্যূল আম, খ. ২,পৃ.১০৪৫;হামাওয়ী,শরহ আলা কাওয়াঈদি ইবনু নুজাইম, খ,২,পৃ.৪৬৬।”
যদি কোন দূর্ঘটনায় কোন ব্যক্তি কারণ হয়, তাহলে কার্যকারণ সংঘটনের উপর ক্ষতির দায় এই শর্তে বর্তাবে যে, সে অন্যের মারিকানায় অন্যায় হস্তক্ষেপ করেছে। যেমন কেউ প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে কাজ নিজ ঘরের সামনে রাস্তায় কুয়া খনন করল, অথবা প্রশাসনের অনুমতিসাপেক্ষে করল কিন্তু কুয়ার  চারপাশে কোন বেড়া বা দেয়াল দিল না যা কুয়ায় পড়ার ক্ষেত্রে বাধা হবে, এরপর কোন অন্ধ, পশু বা গাড়ি পড়ে গেল, তাহলে ক্ষতি সংঘটনের কারণ ও সংঘটক হিসেবে এই ব্যক্তি প্রাণহানি বা সম্পদ নষ্টের দায় বহন করবে। আর যদি নিজ মালিকানায় কুয়া খনন করে আর কেউ পড়ে যায়, তাহলে সে দায় বহন করবে না, যেহেতু নিজ মালিকানায় কারো হস্তক্ষেপকে অন্যায় হস্তক্ষেপ বলার সুযোগ নেই। সুতরাং অন্যায় আচরণে উপর ভিত্তি করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান ও আরোপিত হবে না।
অনুরুপভাবে যদি কেউ চাকার নিচে পিন জাতীয় কিছু রেখে দেয়, আর এ কারণে চাকা নষ্ট হয়, তাহলে চাকা নষ্ট হওয়া এবং এ কারণে যে ক্ষতি হবে তার দায় ঐ ব্যক্তি বহন করবে। এভাবেই এককভাবে ক্ষতি সংঘটনের কারণে যে ক্ষতি ঘটিয়েছে সেই এর দায় বহন করবে, কেননা সেই অন্যায় আচরণ করেছে। কিন্তু যদি কোন ক্ষতি সংঘটনের ক্ষেত্রে সরাসরি সংঘটক ও কার্যকারণের সংঘটক একত্রিত হয়,  তাহলে কার দায়ে ক্ষতিপূরণ বর্তাবে? এ বিষয়ে সামনের মুলনীতিতে আলোচনা করা হবে। “যদি কোন ক্ষেত্রে সরাসরি সংঘটক ও কার্যকারণের সংঘটক মিলিত হয়, তাহলে ক্ষতির সর্ম্পক হবে সরাসরি সংঘটকের সাথে।”
এ মূলনীতিটি হুবহু হানাফী ফকীহ ইবনু নুজাইম [মৃ.৯৭০হি.] রহ. প্রণীত আল আশবাহ থেকে গৃহীত। “ইবনু নুজাইম, আল আশবাহ ওয়ান নাযাইর, পৃ.১৮৭, কায়িদা নং-১৯; সুয়ূতী, আল আশবাহ ওয়ান  নাযাইর, পৃ.১৬২, কায়িদা-৪০।” এটি মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যার ধারা (৯০)- এর মূল বক্তব্য ও। ইতঃপূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, মুবাশির হল যে সরাসরি ক্ষতি ঘটায় আর মুতাসাব্বির হল যে ক্ষতি সংঘটনের কারণ ঘটায়।
এর উদাহরণ হল, কেউ রাস্তায় কুয়া খনন করল, এরপর দ্বিতীয় কেউ তৃতীয় আরেকজনের মালিকানাধীন জন্তু কুয়ায় ফেলে দিল, এ অবস্থায় জন্তুর প্রাণহানির ক্ষেত্রে দু জন একত্রিত হল। যদি কুয়া খনন করা না হতো, তাহলে প্রাণহানি হতো না। একই ভাবে দ্বিতীয় জন যদি নিক্ষেপ না করতে তাহলে ও প্রাণহানি হতো না। এ অবস্থায় সরাসরি সংঘটক অর্থ্যাযে নিক্ষেপ করেছে তার সাথে প্রাণহানির সম্পর্ক হবে। কেননা প্রাণহানির ক্ষেত্রে তার ভূমিকা জোরালো। অনুরুপভাবে যদি কেউ চোরকে আরেকজনের ঘর দেখিয়ে দেয় আর চোর চুরি করে, তাহলে হাত কাটা যাবে চোরের; যে দেখিয়ে দিয়েছে তার নয়। কেননা চুরির অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে চোরের ভূমিকা বেশি। তবে এ সবকিছুর সাথে সাথে যে কারণ ঘটিয়েছে তাকেও অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবে। যদি একজন আরেকজনকে জাপটে ধরে রাখে আর তৃতীয় আরেকজন একে হত্যা করে তাহলে কিসাস আরোপিত হবে তৃতীয় ব্যক্তির উপর; যে ধরে রেখেছিলো তার উপর নয়। আর যে ধরে রেখেছিল যদিও তার উপর কিসাস আরোপিত হবে না; তবু তাকে ধরে রাখার কারণে শাস্তি দেয়া হবে। “এ জাতীয় বিভিন্ন দৃষ্টান্তের জন্য দ্রষ্টব্য: দুরারুল হুক্কাম, খ.১,পৃ.৯১; যারকা,শরহুল কাওয়াঈদিল ফিকহিয়্যাহ, পৃ.৩৭৯।”
উপরিউক্ত ফিকহী মুলনীতিসমূহের আলোকে সমসাময়িক আলিমগণ ড্রাইভিং সংশ্লিষ্ট দূর্ঘটনাসমূহের বিভিন্ন ধরনের শরয়ী বিধান নিরুপনের প্রয়াস নিয়েছেন। নিম্নে সংক্ষেপে প্রকৃতি ও তার বিধান আলোচনা করা হলো। “বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: আল খাতীব, মাসউলিয়্যাতু সাইকিস সাইয়্যারাহ. পৃ. ১৭১-১৭৮।”
এক্ষেত্রে মূলনীতি হল, যানবাহনের মাধ্যমে যা ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হবে সে বিষয়ে চালক দায়ী থাকবে। কেননা তিনিই যানবাহনের সঞ্চালক এবং বাহন হলো তার কর্তৃত্বে থাকা একটি যন্ত্রমাত্র। তার ইচ্ছায় গাড়ি চলে এবং থামে। সুতরাং এ গাড়ির মাধ্যমে যা কিছু ঘটবে সে ক্ষেত্রে চালক শরীয়ত ও আইনের দৃষ্টিতে দায়ী হবে।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এ প্রসংগে পূর্ববর্তী যুগের মাসআলা ও মূলনীতির আলোচ্য বিষয় তথা জন্তুর সাথে বর্তমান যুগের যান্ত্রিক বাহনের তুলনা করে বিধান নিরুপনের প্রয়াস নেয়া হচ্ছে; কিন্তু জন্তুর ক্ষয়ক্ষতির ও বর্তমানে গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির মাঝে পার্থক্য বিদ্যমান।তা হলো জন্তু কখনো কখনো নিজ ইচ্ছা ও গতিতে চলাফেরা করতে পারে  বরং ক্ষেত্রবিশেষ কোচোয়ান জন্তুর কর্তৃক হারিয়ে ফেলে, তখন তো ফকীহগণ জন্তুর আরোহীর কর্তৃত্ব থাকা অবস্থায় জন্তু পা দিয়ে যা ক্ষতি করে তার দায় আরোহীর উপর চাপান না, যেহেতু এ জাতীয় ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব। পক্ষান্তরে গাড়ি হল চালকের কর্তৃত্বে থাকা একটি যন্ত্রমান। সে যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা গাড়ি চালাতে পারে। অনুরুপভাবে থামাতে পারে। এ পার্থক্য থাকার কারণে আমরা বললো, গাড়ি সামনে পেছনে যে কোন দৃশ্য যা ক্ষয়ক্ষতি ঘটাবে তা দায় বহন করবে চালক। কেননা যে কোন বিচারে ক্ষয়ক্ষতি চালকের উপর বর্তাবে।“উসমানী, বুহূসূন ফী কাযায়া ফিকহিয়্যাতিন মু‘আসিরা,পৃ.৩১১।”
সুতরাং ক্ষতি যদি অন্যায় ব্যবহারের কারণে হয়, যেমন লাল দাড় ক্রস করে চলে গেল অথবা একমুখী রাস্তায় বিপরীত দিকে চলল, অথবা এমন ভীড়ের মাঝে দ্রুতগতিতে চালাল যেখানে ধীরে চালানোটাই কাম্য, অথবা অননুমোদিত জায়গায় গাড়ি থামিয়ে রাখল, এরপর গাড়ি সামনে বা পেছনে নিয়ে গেল, অথবা ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ল। এ সকল অবস্থায় গাড়ির কারণে যা ক্ষতি হবে, কোন সন্দেহের অবকাশ ছাড়া চালক ক্ষতির দায় বহন করবে। যেহেতু সে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেছে। আর সরাসরি সংঘটক সর্বাবস্থায় ক্ষতিপূরণ বহন করে। সুতরাং অন্যায় ব্যবহার করলে ক্ষতিপূরণ বহনের বিষয়টি আরো স্বাভাবিক, যেমনটা উল্লিখিত মূলনীতির আলোকে তা স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং অন্য কারো কষ্ট বা ক্ষতি না করার বিষয়টি লক্ষ্য রাখা সত্ত্বে ও যদি ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে কী বিধান হবে?
এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য মত হলো- চালকই ক্ষতিপূরণ বহন করবে এই যুক্তিতে যে, ক্ষতির সরাসরি সংঘটককে ক্ষতিপূরণ বহন করতে হবে। রাস্তার সুবিধা ভোগ করা যদিও চালকের অধিকার; তবুও এ জন্য শর্ত হলো- ক্ষতির আশংঙ্খা থাকা এবং অন্যের কষ্ট ও ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা। যখন অন্যের ক্ষতি করা থেকে সে নিজেকে বাচাঁতে পারল না অর্থ্যা বিষয়টি তার আওতার বাইরে গিয়ে, ক্ষতি সংঘটনের অন্য কোন কারণ ঘটাল, তাহলে পরবর্তী কারণটিই ক্ষতি সংঘটনের কারণ হিসেবে ধর্তব্য হবে।
এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিম্নরুপ: চালক যদি খুব সর্তকতার সাথে ট্রাফিক আইন পুরোপুরি মেনে চলে, এরপর গাড়ির নিকট দূরত্বে (যেমন এক মিটার) কেউ অপরকে ধাক্কাা দিল অথবা কোন আসবাবপত্র ফেলে রাখল, আর চালক সেটাকে ধ্বসিয়ে দিল, তাহলে মালিকী ও শাফিয়ী মাযহাবের ফকীহদের মতে, চালক ক্ষতিপূরণ দেবে। কেননা তাঁদের মতে, জন্তু কর্তৃত্ব ছাড়া হয়ে গেলে সে কারণে ক্ষতিপূরণ দেবে। কেননা তাঁদের মতে জন্তু কর্তৃত্ব ছাড়া হয়ে গেলে সে কারণে ক্ষতিপূরণরহিত হয় না।  তবে ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করার গোনাহ হয় না।“ কারাফী, আয যাখীরা, খ.১২,পৃ.২৬৬; রাফিয়ী, আল আযীয, খ.১১,পৃ.৩৩১; রমালী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ.৮,পৃ.৩৯।”  আর সরাসরি সংঘটক ক্ষতিপূরণ বহন করবে। অপরদিকে হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের ফকীহদের মতে, চালক ক্ষতিপূরণ বহন করবে না।
এ মাসআলায় হানাফী ও হাম্বলী মাযহাবের মতই প্রণিধানযোগ্য। এর কারণ হচ্ছে: ক্ষতি সংঘটনের শক্তি। এ অবস্থায় চালক সম্পূর্ণভাবে নিরুপায় এবং গাড়ি ও ইখতিয়ারহীন। আর ক্ষতির কারণ সংঘটক অন্যায় হস্তক্ষেপ করলে। সে ক্ষতিপূরণ বহন করবে। আলোচ্য অবস্থায় যা ঘটানো হয়েছে এর চেয়ে বড় অন্যায় হস্তক্ষেপ আর কী হতে পারে, যার কারণে চালকের পক্ষে দূঘর্টনা রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে?!
যুক্তি ও বুদ্ধির বিচারে চালককে আলোচ্য অবস্থায় ক্ষতির সংঘটক বলার সুযোগ নেই। কেননা দূর্ঘটনা ঘটানোর ক্ষেত্রে ধাক্কা দেয়া ব্যক্তির ভূমিকা আরোহীর চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং এখানে ধাক্কা দেয়া ব্যক্তিই ক্ষতির সংঘটক। সুতরাং তার উপরই ক্ষতিপূরণের দায় বর্তাবে। ধাক্কা দেয়া ব্যক্তি এ অবস্থায় অন্যায় আচরণ করেছে। চালক অন্যায় আচরণ করেনি। আর সে অন্যায় আচরণ করে সে ক্ষতিপূরণ বহন করবে।
যদি চালক সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে সবুজ সিগন্যালের অপেক্ষা করতে থাকে, এসময় পেছন থেকে যদি কোন বাহন এসে এ গাড়িকে ধাক্কা দেয়, যার ফলে এ গাড়ি সামনের গাড়িকে ধাক্কা দেয়, তাহলে এ কারণে যা ক্ষতি হবে তা বহন করবে প্রথম ধাক্কা দেয়া গাড়ি। কেননা এ অবস্থায় থামিয়ে রাখা গাড়ির চালক ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছে বলা সম্ভব নয়।
এ মাসআলাটি পূর্ণনমুনা হল সেই আরোহী, যার জন্তুকে আরেকজন খোঁচা দেয়ার কারণে সেই জন্তু অপরের কোন ক্ষতি করেছ। এ অবস্থায় ফকীহদের সকলের মতে, যে খোঁচা দিয়েছে সে ক্ষতিপূরণ দেবে; আরোহী নয়। “আল ফারগানী, আল ফাতাওয়ালা হিন্দিয়্যা, খ. ৬, পৃ. ৫১: আল-কারাফী, আয যাখীরা, খ. ১২, পৃ, ২৬৫ রামলী, নিহায়াতুল মুহতাজ, খ,৮,পৃ. ৪: ইবনু কুদামা, আল মুগনী, খ.১২. পৃ. ৫৪৪।” আল লাজনাতুদ দায়িমা রিল বুহুসিল ইলমিয়্যা ওয়াল ইফতা, সৌদি আরব ও মতটিকেই গ্রহণ করেছে। “মাজাল্লাহ ইসলামিয়্যা, সংখ্যা. ২৬,১৪০৯-১৪১০হি.।” এ অবস্থায় প্রথম ধাক্কা দেয়া গাড়ির যা ক্ষতি হয়েছে তা বিনিময়মূল্য বলে ধর্তব্য হবে। ধরে নেওয়া হবে, সে নিজ সম্পদ নষ্ট করেছে। পূর্বে উল্লেখিত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউস রা. এর আছার এ মতকে আর শক্তিশালী করে।
যদি গাড়ি ক্ষতি আশংকা থাকে, গাড়ির দেখভাল করার বিষয়ে চালকের কোন অবহেলা না থাকে, চাকা ও ব্রেক সবই ঝুঁকি মুক্ত থাকে, আর স্থান অনুপাতে গাড়ির গতি থাকে স্বাভাবিক এবং চালক যদি কোন অন্যায় ব্যবহার বা নিয়মলঙ্ঘন না করে গাড়ি চালায়, এরপরও গাড়ির কোন চাকা খুলে গিয়ে গাড়ি রাস্তা থেকে সরে যায় অথবা উল্টে যায় আর এর ফলে কোন জানমালের ক্ষতি হয়, তাহলে চালককে ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে না।
এর পূর্বমুনা হল সেই জন্তু, যা নিয়ন্ত্রন বহির্ভুত হয় এবং আরোহীর কর্তৃত্বের বাইরে চলে যায় সে ক্ষেত্রে আরোহী ক্ষতিপূরণ বহন করবে না। যেহেতু এতে আরোহীর কোন ক্রুটি নেই, তাই সে ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছে বলার সুযোগ নেই। তবে কারো কারো মত হলো, আরোহী ক্ষতি সংঘটনের কারণ ঘটিয়েছে। তাই সে ক্ষতিপূরণ দেবে।
গাড়ি যদি ভালভাবে সচল না হয়, সে কারণে চালক অন্যকে গাড়িটি সচল করার জন্যে সামনে পেছনে ধাক্কা দিতে বলে, এ অবস্থায় সে গাড়ির কারণে কারো জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয় তবে উভয়ে মিলে ক্ষতিপূরণ দেবে। এর পূর্নমুনা হল সকল ফকীহদের মতে, জন্তু কোন ক্ষয়ক্ষতি করলে কোচোয়ান ও আরোহী উভয়ে সম্মিলিতভাবে ক্ষতিপূরণদেবে। “আশ-শায়বানী, আল মাবসূত, খ.২৭,পৃ.৪; আল-কারাফী, আয যাখীরা, খ. ২, পৃ, ২৬৪; ইবনু কুদামাহ, আল মুগনী, খ. ১২. পৃ. ৫৪৫।” জন্তুর কোচোয়ান হল এ অবস্থায় ধাক্কা দেয়া ব্যক্তির ন্যায়। আর জন্তুতে আরোহী ব্যক্তি হল আলোচ্য অবস্থায় গাড়ির চালকের ন্যায়। সুতরাং তারা উভয়ে ক্ষতিপূরণ দেবে।
কারো কারো মতে, ক্ষতিপূরণ শুধু আরোহী অর্থ্যাৎ গাড়ির চালক প্রদান করবে। এটি শাফিয়ী মাযহাবের মত অনুসারে কিয়াসের দাবি। “সুলায়মান আল বুজাইরিমী, তাজরীদ লিনাফইল আবীদ [হাশিয়াতুল বুজায়রীমী আলা শরহিল মানহাজ], (কায়রো: মাতবাআতু মুস্তাফা আল বাবী আল হালবী, ১৩৪৫ হি.), খ.৪.পৃ.২৪৪।” কেননা চালক ও আরোহীর কর্তৃত্ব গাড়ি ও জন্তুর ক্ষেত্রে বেশি। এটিই অগ্রগণ্য মত্ কেননা চালকের পক্ষে ব্রেকের মাধ্যমে গাড়িকে থামিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল। তাছাড়া যে ধাক্কা দিচ্ছে সে তো গাড়ির সামনে কী আছে তা দেখতে পাচ্ছে না। তবে যদি ঐ ব্যক্তি সামনে থেকে ধাক্কা দেয় তাহলে উভয়ে মিলে ক্ষতিপূরণ দেবে, যেমনটা অন্য সকল ফকীহদের মত।
যদি কেউ কোন গাড়ি চুরি করে, জবরদখল করে, ধার নেয়, ভাড়া নেয় অথবা বন্ধক নেয়, এরপর গাড়ির মাধ্যমে কোন প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষতি করে, তাহলে সে ক্ষতিপূরণ দেবে। মালিক ক্ষতিপূরণ দেবে না। তবে এ ক্ষেত্রে পূর্বের সকল মূলনীতির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। এর কারণ গাড়ি এখন তার অধীন; মালিকের অধীন নয়। সে-ই এখন গাড়ি চালাচ্ছে, গাড়ির দেখাশোনা ও সংরক্ষণ তার দায়িত্ব। “আল-বুজায়রিমী, হাশিয়াতুল বুজায়রিমী আলা শরহিল মানহাজ, খ.৪.পৃ.২৪৪।”
যদি কেউ লাল সিগন্যাল অতিক্রম করে কোন ব্যক্তি বা গাড়িকে ধাক্কা দেয়, তাহলে শাসকের অনুমোদিত আইন লঙ্ঘনের কারণে সে অপরাধী সাব্যস্ত হবে। পাশাপাশি অন্যের ক্ষতি করার কারণেও সে গোনাহগার হবে। যে মানুষ বা সম্পদের ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ সে বহন করবে। কেননা সে সরাসরি ক্ষতির সংঘটক। যে সরাসরি ক্ষতি ঘটায় সে অন্যায় ব্যবহার না করলেও ক্ষতিপূরণ দেয়। আলোচ্য অবস্থায় চালক অন্যায় করেছে, সুতরাং তার ক্ষতিপূরণবহন করতে হবে। যদি উভয় অন্যায় হস্তক্ষেপ করে, উভয়ে লাল সিগন্যাল ক্রস করে একে অপরের সাথে সংঘর্ষ বাঁধিয়েছে, তাহলে প্রত্যেক অপরের সম্পদের ক্ষতির দায় বহন করবে। আর প্রত্যেকের  আকিলা একে অপরের অপরের শারীরিক যে ক্ষতি হয়েছে তার দায় বহন করবে।
কেউ নিজ পথে গাড়ি চালাচ্ছে, এরপর পেছন থেকে কেউ তাকে ধাক্কা দিল, তাহলে পেছনে থাকা ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ দেবে। কেননা পেছনের ব্যক্তি ধাক্কা দিয়েছে আর সামনে থাকা ব্যক্তি ধাক্কার শিকার হয়েছে। পেছনে থাকা ব্যক্তি যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বা তার গাড়ি ক্ষতিগস্ত হয় তাহলে তা হবে বিনিময়শূন্য। কেনা সে নিজেই নিজের ও নিজ গাড়ির ক্ষতি করেছে। “ইবন কুদামাহ, আল মুগনী, পৃ.১২.পৃ.৫৪৬।”
গাড়ির চালক অপ্রাপ্তবয়ষ্ক হলেও ক্ষয়ক্ষতির দায় অর্থ্যাৎ দিয়্যাত ও ক্ষতিপূরণ বহন করার ক্ষেত্রে সে প্রাপ্তবয়স্কদের বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে। সে গাড়ি চালনায় অন্যায় করুক বা না করুক- বিধান অভিন্ন। কেননা অপ্রাপ্ত বয়স্কের ইচ্ছাকৃত অন্যায়ের বিধান ভুল বলে ধর্তব্য হবে; বিনিময়শূন্য বলে ধর্তব্য হবে না। যদি ও অন্যায় কররে ও তার কাজকে গোনাহ বলা যায় না। চার ইমাম ই এ বিষয়ে একমত। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক যে ক্ষয়ক্ষতি ঘটায় তার কারণে সে ক্ষতির দায় বহন করবে এ সম্পর্কে ফকীহদের নিম্নোক্ত বক্তব্যসমূহ উল্লেখযোগ্য। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ