ঢাকা, সোমবার 13 August 2018, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আসামের ‘অবৈধ’ বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশের বিপদ

আশিকুল হামিদ : ভারতের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাজ্য আসামের নাগরিক সংক্রান্ত সংকটে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই বিপদে পড়তে যাচ্ছে। কারণ, গত শুক্রবার ক্ষমতাসীন দল বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী কলকাতার এক সমাবেশে ঘোষণা করেছেন, আসামে বসবাসরত যে ৪০ লাখ মানুষের নাম নাগরিকপঞ্জি তথা নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তাদের সবাই অবৈধ ‘বাংলাদেশি’। এ সব বাংলাদেশিকে বের করে দেয়া হবে। শুধু আসাম প্রসঙ্গে বলেই থেমে যাননি বিজেপির প্রেসিডেন্ট। অমিত শাহ আরো বলেছেন, পশ্চিম বঙ্গেও লাখ লাখ বাংলাদেশি রয়েছে এবং তাদের সকলকেও বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানো হবে। নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজেপির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি অবৈধ বাংলাদেশিদের ভোটেই নির্বাচিত হয়েছেন। মমতার এই ভোটের রাজনীতির অবসান ঘটানোর জন্যও লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশিকে বের করে দেয়া হবে। অমিত শাহ অবশ্য অবৈধ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের আশ্বস্ত করেছেন। বলেছেন, তারা অবৈধ হলেও ভারতে থাকতে পারবেন এবং তাদের নাগরিকত্বও দেয়া হবে।
গত রোববারের দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত রিপোর্টের এই অংশটুকু পড়ার পর মনে হতে পারে যেন বিজেপির প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘এক হাত’ দেখিয়ে দেয়াই তার উদ্দেশ্য। অন্যদিকে সত্য হলো, বিষয়টি নিয়ে প্রথমে মুখ খুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বছর দেড়-দুই আগে, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে আসাম রাজ্যের নির্বাচনে প্রচারণা চালানোর সময় তিনি বলেছিলেন, ওই রাজ্যে নাকি বিপুলসংখ্যক ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশ করেছে। বসবাস তো করছেই, তারা নাকি অবৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাকরি-বাকরিও করছে। শুধু তাই নয়, অবৈধ এই বিপুল বাংলাদেশির কারণে আসামের ভারতীয় নাগরিকরা নাকি সবক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। সমস্যার সমাধান সম্পর্কেও আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন মিস্টার মোদি। কথিত বাংলাদেশিদের ‘গাট্টিবোচকা’ বেঁধে তৈরি থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারলে অবৈধ সকল বাংলাদেশিকেই বহিষ্কার করা এবং বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানো হবে।
২০১৬ সালের মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সে ঘোষণা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছিল রাজ্যের বিজেপি সরকার। একই সঙ্গে আসাম রাজ্যও ভয়ংকর এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক এ সংকটের সঙ্গে অর্থনীতির পাশাপাশি ধর্মকেও জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যার পেছনে সুচিন্তিত পরিকল্পনা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে আসামে শুধু ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক সংঘাতই ছড়িয়ে পড়বে না, রাজ্যটি এমনকি ভৌগোলিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই কারণে বাংলাদেশেরও বিপদ বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
আসাম সংকটের ঘটনাপ্রবাহে প্রাধান্যে এসেছে আসামের রাজ্য বিজেপি সরকারের উদ্যোগে তৈরি করা নতুন জাতীয় নাগরিকপঞ্জি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, চলতি বছর ২০১৮ সালের পহেলা জানুয়ারি আসামের রাজ্য সরকার ‘বৈধ নাগরিক’ হিসেবে যে এক কোটি ৯০ লাখ বাসিন্দার নাম প্রকাশ করেছে সে তালিকায় অন্তত এক কোটি ৩৯ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। অর্থাৎ এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে রাজ্যের তথা ভারতের বৈধ নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বাদ পড়াদের মধ্যে আসাম বিধান সভার চারজন সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকসহ অনেক বিশিষ্টজনও রয়েছেন। জানা গেছে, কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির পাশাপাশি বড়পেটা ও ধুবড়ির মতো এমন সব এলাকার অধিবাসীরাই বেশি সংখ্যায় বাদ পড়েছেন, যেসব এলাকায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অভিযোগ উঠেছে, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের আড়ালে লাখ লাখ মুসলিমকে রাষ্ট্রহীন করার এবং বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিষয়টিকে মুসলিম বিরোধী সুচিন্তিত ষড়যন্ত্র হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্মরণ করা দরকার, এ ব্যাপারে প্রথমে সোচ্চার হয়েছিল ‘অ্যাকশন কমিটি ফর আসাম’ নামের এক অসাম্প্রদায়িক সংগঠন। এই অ্যাকশন কমিটির উদ্যোগে গত বছর ২০১৭ সালের নভেম্বরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের এক সম্মেলনে অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হয়েছিল, বিজেপি সরকার আসাম রাজ্যের ৫০ লক্ষ মুসলমানকে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। আর নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়লে ৫০ লক্ষ মুসলমান ভারতীয় নাগরিক থাকার সুযোগ পাবেন না। সেই সুযোগে তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে আসাম তথা ভারত থেকেই তাড়িয়ে দেয়া হবে।  জোর করে ঠেলে পাঠানো হবে বাংলাদেশে।
অথচ তারা কোনো বিচারেই বাংলাদেশি নন। তাদের সবারই জন্ম হয়েছে আসামের মাটিতে। সে কারণে আইনত তারা জন্মসূত্রেই আসাম তথা ভারতের নাগরিক। কিন্তু বিজেপি সরকার এমন এক আইনকে অজুহাত বানিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল পর্যন্ত যারা আসামে এসেছে কেবল তাদেরকেই ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। আপত্তি উঠেছিল একটি বিশেষ কারণে। দেখা গেছে, আইনটির আশ্রয় নিয়ে বিজেপি সরকার শুধু ২০১৪ সাল পর্যন্ত আগত মুসলিমদের ব্যাপারেই কঠোরভাবে বিরোধিতা করেছে। একই আইনের আড়াল নিয়ে সরকার এমন মুসলিমদেরও নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করেছে, যারা ২০১৪ সালের অনেক আগে আসামে জন্ম নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৫০-এর বেশি বয়সী হাজার হাজার মুসলিমও রয়েছেন। তাদের সকলকেই বিজেপি সরকার ২০১৪ সালের পর আসামে আগত বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছে।
এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু সম্মেলনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছিল, আসামের ৫০ লক্ষ মুসলিমকে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের বাপ-দাদার ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করার পদক্ষেপ নেয়া হলে তারাও নিশ্চয়ই নীরবে বসে থাকবে না। তারা বরং প্রতিরোধের চেষ্টা চালাবেÑ যার পরিণামে হিংসা, মারামারি, খুনোখুনি ছড়িয়ে পড়বে। রক্ত ঝরবে আসামে। ভারতীয় মুসলিমরা তো বটেই, আসামের মুসলিমদের সমর্থনে এগিয়ে আসবে অন্য সব রাজ্যের সাধারণ মানুষও। তেমন অবস্থায় আজকের শান্ত আসাম মিয়ানমারে পরিণত হবে, যার পরিণতি রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জন্যও অশুভ হয়ে উঠবে। সেই অশুভ পরিণতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে হলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত আসাম রাজ্যের বিজেপি সরকারকে মুসলিম বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া থেকে নিবৃত্ত করা।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু সম্মেলনের বক্তারা প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, যারা ভারতীয় নয় আমরা তাদের ভারতীয় বানাতে চাই না। কিন্তু যারা চারশ বছরের বেশি সময় ধরে বংশ পরম্পরায় আসামে বসবাস করে এসেছেন তাদের কেবলই মুসলিম হওয়ার কারণে আসাম তথা ভারত থেকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না। কারণ, এই মুসলিমরা কেবল আসামেই জন্ম নেননি, তাদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও অংশ নিয়েছেন। অনেকে এমনকি স্বাধীনতার জন্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন। অন্যদিকে এত বছর পর এসে বিজেপি সরকার সেই সব মুসলিমকেই ভারতীয় নয় বলে প্রচার করতে শুরু করেছে। তাদের জমা দেয়া পঞ্চায়েত নথি পর্যন্ত মানা হচ্ছে না।
অ্যাকশন কমিটি ফর আসাম আয়োজিত দিল্লি সম্মেলনে আসামের মুসলিমদের পক্ষে আরো অনেক তথ্য-পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক দলিলসহ যুক্তি হাজির করা হয়েছিল- যেগুলো প্রমাণ করে, চিহ্নিত ৫০ লক্ষ মুসলিম সকল বিচারেই জন্মগতভাবে ভারতীয় এবং আসামের নাগরিক। দিল্লি সম্মেলনে জাতীয় পর্যায়ের নেতারা বলেছিলেন, এত বিপুলসংখ্যক মুসলিমকে আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পরিকল্পনার পেছনে আসল উদ্দেশ্য মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন। কথাটা বলার কারণ, ২০১৬ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের সময় থেকেই বিজেপি এই বলে অভিযোগ তুলেছে এসেছে যে, আসামে নাকি লাখ লাখ বাংলাদেশি অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে। তারা শুধু বসবাসই করছে না, চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যও দখল করে নিয়েছে। মূলত এসব অবৈধ বাংলাদেশির কারণেই আসামের প্রকৃত নাগরিকরা নাকি চাকরি পাচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যেও পিছিয়ে পড়েছে তারা। উল্লেখ্য, একথাগুলো বলার সময়ই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কথিত বাংলাদেশিদের ‘গাট্টিবোচকা’ বেঁধে তৈরি থাকতে বলেছিলেন।
মূলত প্রধানমন্ত্রী মোদির ওই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই বিজেপি সরকার আসামে আদম শুমারির নামে প্রকৃতপক্ষে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে নাগরিক নিবন্ধনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। সে সময় ভিত্তি বছর ও তারিখ হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে নির্ধারণ করে সরকার বলেছিল, রাজ্যের বৈধ নাগরিকের স্বীকৃতি পেতে হলে প্রত্যেককে নথি ও কাগজপত্র দেখিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সে ও তার পরিবার সদস্যরা ওই তারিখের আগে থেকে আসামে বসবাস করে আসছে। অন্যদিকে বিশেষ করে মুসলিমরা জানিয়েছিলেন, অশিক্ষিত হওয়ায় তাদের পূর্বপুরুষরা এ ধরনের নথি বা কাগজপত্রের গুরুত্ব বুঝতে পারেননি বলে সেগুলো সংরক্ষণও করেননি। এজন্যই মুসলিমদের কাছে সরকারকে দেখানোর মতো যথেষ্ট নথি বা কাগজপত্র নেই এবং সে কারণে জাতীয় নিবন্ধন তালিকায়ও তাদের নাম ওঠেনি। অমন একটি তালিকাকেই চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে গত ৩০ জুলাই। উল্লেখ্য, একই আসাম সরকার একবার ১৯৭১ সালকে ভিত্তি বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছে আবার ২০১৪ সালের কথাও বলেছে। এর মধ্য দিয়েও পরিষ্কার হয়েছে, বিজেপি সরকারের আসল টার্গেট বাংলাভাষী মুসলিমরা। কারণ, ২০১৪ সালকে সময়কাল হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও বিজেপি সরকার শুধু মুসলিমদের ব্যাপারেই কড়াকড়ি করেছে। সরকার একই সঙ্গে এমন এক উদ্ভট দাবিও হাজির করেছে যেন এই ৫০ লক্ষ মুসলিমের সবাই আসামে গেছে বাংলাদেশ থেকে এবং গেছেও ২০১৪ সালের পর! এমন যুক্তি, বক্তব্য এবং দাবি ও আহবানের পরিপ্রেক্ষিতেই অ্যাকশন কমিটি ফর আসামের উদ্যোগে আয়োজিত দিল্লি সম্মেলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন বিজেপি ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি মুসলিম বিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিলেন। মমতার পাশাপাশি অন্য সকলেও একই সাথে ৫০ লক্ষ মুসলিমকে তাদের বাপ-দাদার ভিটে-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ না করার জন্য আসামের বিজেপি সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা বলেছিলেন, আসামকে আরো একটি মিয়ানমার বানানোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। অমন আশংকাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ না নেয়া হলে রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকেই অশুভ পরিণতির শিকার হতে হবে।
বর্তমান পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হলো, বিভিন্ন মহলের যুক্তি, তথ্য ও আবেদন উপেক্ষা করে একদিকে আসামের রাজ্য বিজেপি সরকার নাগরিক নিবন্ধনের নামে ৫০ লাখ মুসলিমকে ভারতের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করেছে, অন্যদিকে এমন তিনটি জেলাসহ বরাক উপত্যকাকে পৃথক রাজ্য বানানোর দাবি উঠেছে, যে অঞ্চলের প্রায় একশ ভাগ নাগরিকই বাঙালি এবং মুসলিম। নাগরিক নিবন্ধনের অন্তরালে বিজেপি সরকারের মুসলিম বিরোধী উদ্দেশ্য নিয়ে শুধু নয়, তালিকা থেকে বাদ পড়া সবাইকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর গোপন পরিকল্পনা থাকায় একদিকে ভারতকে আরো একটি মিয়ানমারের অশুভ পরিণতি বরণ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ভারতেরই রাজনীতিকসহ বিশিষ্টজনেরা, অন্যদিকে বাংলাদেশকেও রোহিঙ্গাদের মতো বিতাড়িত অসমীয় বাঙালিদের আশ্রয় দেয়ার জন্য ‘প্রস্তুত’ থাকতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের ঠিক প্রাক্কালে ২৯ জুলাই বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, আসাম রাজ্যের দক্ষিণাংশের বরাক উপত্যকার বাঙালি-অধ্যুষিত তিন জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দিকে নিয়ে পৃথক একটি রাজ্য গঠনের দাবি তুলেছেন বাঙালি নেতারা। এ বিষয়ে প্রথমে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়েছে ‘আকশা’- অল কাছাড় করিমগঞ্জ হাইলাকান্দি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। আকশার সভাপতি প্রদীপ দত্ত রায় এক বিবৃতিতে বলেছেন, অসমীয়দের বাঙালি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে পৃথক রাজ্যই আসামে বসবাসকারী বাঙালিদের মুক্তির একমাত্র উপায়। পৃথক রাজ্য গঠনের দাবিটিকে কেন্দ্র করে আসামের রাজনীতিতে প্রবল বিতর্কের সূচনা হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি কঠোর বিরোধিতা করলেও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বলেছে, পৃথক রাজ্য গঠনের দাবিটির কারণ অনুসন্ধান করে সমস্যার সমাধান করা দরকার, যাতে আসাম রাজ্যকে দ্বিখন্ডিত না করতে হয়।
ঘটনাপ্রবাহের পর্যালোচনায় দেখা যাবে, নাগরিক পঞ্জির নামে প্রকৃতপক্ষে বাংলাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধেই বহিষ্কারের পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একই উদ্দেশ্যের টার্গেট হয়েছে পশ্চিম বঙ্গের মুসলিমরাও। কিন্তু উদ্বেগ ও আপত্তির কারণ হলো, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সোচ্চার হলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রহস্যময় নীরবতা অবলম্বন করা হচ্ছে। অথচ রোহিঙ্গা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের দায়িত্ব ছিল প্রথম থেকেই বলিষ্ঠ অবস্থান নেয়া এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়া যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ কূটিল রাজনীতি করতে চাইলেও আসামের প্রায় ৪০ লাখ বাংলাভাষী বাংলাদেশের নাগরিক নয়। তারা অবৈধভাবেও আসামে বসবাস করছে না। একই কথা সত্য পশ্চিম বঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিমদের ব্যাপারেও। সুতরাং ভারত কোনো যুক্তিতেই তার নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতে পারে না। বলা দরকার, এখনই বলিষ্ঠ অবস্থান না নেয়া হলে বিজেপি সরকার আসাম ও পশ্চিম বঙ্গের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদি কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দেবে- যার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বিজেপি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে।
অমন পরিণতি এড়ানোর জন্যই তৎপর হওয়া দরকার। সরকারের উচিত আসামের রাজ্য সরকারের পাশাপাশি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেও জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ