ঢাকা, সোমবার 13 August 2018, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ১ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মহাদেবপুরে বিলুপ্তির পথে মৃৎশিল্প

মহাদেবপুরে মৃৎশিল্পের কাজ করছে একজন কারিগর -সংগ্রাম

ইউসুফ আলী সুমন, মহাদেবপুর (নওগাঁ) থেকে : কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। এক সময় এ এলাকার অনেক মানুষের প্রধান পেশা ছিল এই মৃৃৎশিল্প। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক বস্তু হিসেবে মৃৎশিল্পের তৈরি থালা, বাসন, হাড়ি, পাতিল, ঘটি-বাটি, বদনা ইত্যাদি ব্যবহার করতেন। বর্তমানে এই স্থান দখল করেছে বিভিন্ন প্লাষ্টীক ও সিলভার সামগ্রী। এ কারনে মহাদেবপুরের মৃৎশিল্প বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। স্থানীয়ভাবে মৃৎ শিল্পিদের কুমার বলা হয়। কুমারদের বড় দুর্দিন আজ। অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত কুমাররা। জীবন জীবিকার তাগিদে কঠোর পরিশ্রম করে উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের কয়েকটি পরিবার এখনও মৃৎশিল্পের উপর নির্ভশীল হয়ে শুধুই বাপ-দাদার কুমার পেশা আঁকরে ধরে আছেন।
মৃৎশিল্প কর্মের জন্য স্থানীয়ভাবে খ্যাত ব্যক্তি শ্রী রামায়ন পালের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার স্বর্গীয় পিতা শিউ প্রসাদ পালের মৃত্যুর পর পৈত্রিক ভিটাতে এখনও গায়ের ঘাম পায়ে ফেলে নিরলস ভাবে বাপ-দাদার কুমার পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন। অতীতে এই পেশায় ভালই লাভ হত। কিন্তু বর্তমানে এর উপর নির্ভর করে তিনবেলা ভালভাবে খাবার জোটেনা। এখন অনাহারে-অর্ধাহারে অতি কষ্টে দিন কাটাতে হয়। আধুনিকতার প্রভাবে ছেলে-মেয়েরা এ পেশা ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় যোগ দিয়েছে। তিনি বলেন “বংশগত ভাবে এ পেশা ধরে আছে আমার মত হাতে গোনা কয়েকজন। যাদের অবর্তমানে এই শিল্প মহাদেবপুরের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।” তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, অতীতে তারা তাদের শিল্প সম্ভার নিয়ে প্রতিটি উৎসব ও গ্রাম্য মেলায় ষ্টল সাজিয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। কিন্তু বর্তমানে তা আর হচ্ছে না।
কেবলমাত্র বাংলা নববর্ষ এলেই সৌখিন পান্তা খেকোদের কাছ থেকে মাটির থালার অডার আসে, এছারা সারা বছর মাটির তৈরি থালা বাসনের কোন চাহিদা থাকে না। একই গ্রামের ধিরেন পাল বলেন, এলাকার আশে-পাশে বেশ কয়েকটি ইট ভাটা রয়েছে। ইট বানাতে তারাই বেশি দামে প্রতি বছর প্রচুর মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। জমির মালিকরাও ইট ভাটায় অধিক দামে মাটি বিক্রি করায় মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলো পাল্লা দিয়ে মাটি কিনতে পারছে না। তিনি বলেন “বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, ফাল্গুন ও চৈত্র এই চার মাস গ্রামাঞ্চলে মৃৎশিল্পের তৈরী পণ্যের চাহিদা একটু বেশী থাকে। এ সময় কুমার পরিবারের লোকেরা কোন মত দু’বেলা পেটভরে খেতে পারে বাকি ৮ মাস চরম কষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়।” তিনি আরো বলেন, একটা সময় মাটির তৈরি কলস হাড়ি পাতিল খেলনার খুব কদর থাকলেও আধুনিকতার ছোয়ায় বিপন্ন হতে বসেছে এ মৃৎশিল্প। তাছাড়াও বর্তমান আধুনিক যুগের প্লাষ্টিক সামগ্রী সহ অন্যান্য জিনিস পত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় এই শিল্পে ধ্বস নেমেছে। মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত কুমার পরিবারগুলো আর্থিক সংকটসহ নানা অভাব অনাটনে, মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মৃতশিল্প থেকে। মৃৎশিল্পের কারিগর কানচন পাল বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থভাবে এখানকার কুমার পরিবারগুলোর নেই কোন আধুনিক মেশিন ও সরঞ্জাম।
অনেকেই এ পেশা ছেড়ে এখন কৃষি কাজের দিকে চলে যাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈচিত্র্যময় পেশার এই দেশে কোন পেশাই হারিয়ে যাবে এটা কাম্য নয়। মৃৎশিল্পের সাথে জড়িতদের সরকারি ও বেসরকারি দাতা সংস্থার আর্থিক অনুদান এবং সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এ পেশাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। হাজার বছরের এ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছে এ শিল্পের কারিগররা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ