ঢাকা, মঙ্গলবার 14 August 2018, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ছাত্রবিক্ষোভে স্কুল ছুটি ॥ মানববন্ধন ৮ দিনের রিমান্ডে চালক ও হেলপার

রংপুর অফিস : রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী জিয়ন হত্যাকারী মিনিবাস চালক ইনসান আলী এবং হেলপার বাদশা মিয়ার ৮ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে  রংপুরের চীফ জুডিশিয়াল মেজিষ্ট্রেট আদালত । রোববার রাতে এদরে গ্রেফতার করে পুলিশ গতকাল তাঁদের আদালতে হাজির  করে ১০ দিনের রিমা- আবেদন করা হলে আদালত এদের ৮ দিন করে রিমা- মঞ্জুর করে। চালক, হেলপার ও বাসের মালিক শরীফা বেগমের বাড়ী গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় বলে জানা গেছে।    

এদিকে ‘ তোমাদের আর কত জিয়নের প্রাণ চাই? উই ওয়ান্ট টু নো’, ‘তোমরা ন্যায়ের পক্ষে থাকবে, যেখানেই অন্যায় অবিচার দেখবে- সেখানেই চরম আঘাত হানবে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’, ‘আমরা পড়তে এসেছি মরতে নয়’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই- যানবাহনের চাকার নিচে গণতন্ত্র নাই’- এ ধরনের শত শত লেখা সাদাকাগজ হাতে নিয়ে গতকাল সোমবার রাস্তায় পুলিশ ও স্কুল কর্তৃপক্ষের বাধা উপেক্ষা করে নেমেছিল রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

গত রোববার দুপুরে দর্শনা  শুটকির আড়ত এলাকায় মহাসড়কে মিনিবাসের চাপায় এই স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ জিয়নের নিহতের ঘটনার সাথে জড়িত চালক ও হেলপারের ফাঁসিসহ ৪ দফা দাবিতে সোমবার সকাল থেকে রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা সকাল পৌণে ৯টায় স্কুল থেকে বের হয়ে বিক্ষোভ নিয়ে সেনপাড়া রোড হয়ে জীবনবীমা ভবনের সামনে নগরীর প্রধান সড়কে অবরোধ করতে চাইলে তা বাধা দিয়ে পন্ড করে দেয় পুলিশ।

বিপুল পরিমাণ পুলিশ তাদেরকে নিয়ে স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে তারা স্কুলে প্রবেশ না করে শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটকে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে খারাপ মন্তব্য্য করলে শিক্ষার্থীরা আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে।

এক পর্যায়ে জেলা প্রশাসন পরিচালিত স্কুলটিকে ছুটে আসেন এডিসি (শিক্ষা ও আইসিটি) আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে তাদেরকে ভিতরে প্রবেশ করাতে সক্ষম হন। শিক্ষার্থীরা ভেতরে প্রবেশ করলে প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বন্দী অবস্থাতেই বিক্ষোভ করতে থাকে।

এরই মধ্যে বিক্ষোভ সামলাতে স্কুল ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ত্রিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বাইরে এনে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে মানববন্ধন করার অনুমতি দেয়।

 বেলা সাড়ে ১২টায় প্রধান ফটক খুলে দিলে কড়া পুলিশী নিরাপত্তায় শিক্ষার্থীরা বের হয়ে ক্যাম্পাসের সামনের রাস্তায় দুই পাশে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন। এসময় সাদা কাগজে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের লেখা প্লাকার্ড প্রদর্শন করে। শিক্ষার্থীরা এসময় জিয়ন হত্যাকারীদের ফাঁসি, কলেজের রাস্তায় দুই পাশে স্পীড ব্রেকার, ওভার ব্রীজ নির্মাণ এবং কলেজের রাস্তায় সকাল ৭টা থেকে ৯টা এবং ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত ভারি যানবাহন চলাচল না করার দাবি জানায়।

মানববন্ধনে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা বলে, প্রত্যেকে আমরা ভাই ভাই। আমরা পড়তে এসেছি। কিন্তু কেন আমরা মরছি। আমরা মরতে চাই না। তারা জানায়, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে আমাদেরকে এভাবে বাস চাপা দিয়ে মারা হবে, এটা হতে পারে না। এর প্রতিকার চাই।‘অ্যাম আই দ্যা নেক্সট?’ প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ানো দশম শ্রেণীর ছাত্রী জাফরিন শেখ বলেন, বাস-ট্রাক আর কত জিয়নকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিবে। আমরা এটা মানবো না। এটা হতে দিবো না। তারা বলে, আমরা পড়তে এসেছি মরতে নয়। আমরা আর লাশের পর লাশ চাই না। জিয়নকে যারা বাস চাপা দিয়ে মেরেছে তাদের ফাঁসি দিতে হবে।

‘তোমাদের আর কত জিয়নের প্রাণ চাই? উই ওয়ান্ট টু নো’- এছাড়াও ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘তোমাদের আর কত জিয়নের প্রাণ চাই, আর কত মায়ের কোল খালি হবে?’, ‘জিয়ন হত্যার বিচার চাই’, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নাই’, ‘নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চাই’ এ ধরনের শতশত সাদা কাগজে অদক্ষ হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে শিক্ষার্থীরা অংশ নেয় মানববন্ধনে।

মানববন্ধনের এক পর্যায়ে মাঝে দাঁড়িয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীন জিয়নের জন্য এক মিনিট নিরবতা পালনের ঘোষণা দেন এবং অভিভাবকদের সাথে শিক্ষার্থীদের নিজ বাসায় ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পরে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন থেকে বাড়ি চলে যায়।

 শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আরো বক্তব্য রাখেন এডিসি (শিক্ষা ও আইসিটি) আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্বিক) আবু হাসান মারুফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ (এ সার্কেল)। মানববন্ধন চলাকালে পুরো এলাকা বিপুল পরিমাণ পুলিশ কর্ডন করে রাখে।

এ ব্যাপারে রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ জানান, সহপাঠী জিয়ন নিহতের ঘটনায় ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। আমরা তাদের বুঝিয়ে স্কুলে নিয়ে গেছি। এরপর তারা মানববন্ধন করে বাসায় বাসায় ফিরে গেছে। কোনো বিশৃংখলা তৈরি হয়নি। ইতোমধ্যেই আমরা বাসের চালক ও ড্রাইভারকে গ্রেফতার করেছি। তারা আইনের আওতায় এসেছে।

কলেজের অধ্যক্ষ মঞ্জুয়ারা পারভীন জানান, জিয়নের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা হত্যকারীদের ফাঁসি এবং বিভিন্ন দাবি প্রশাসনকে জানিয়েছি। শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠার কারণে স্কুল ছুটি দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে যথারীতি ক্লাস চলবে।

এদিকে এ ঘটনায় ওই স্কুলের পাশের স্কুল সেনপাড়া সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও স্কুল শুরু হওয়ার পরপরই ছুটি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ