ঢাকা, মঙ্গলবার 14 August 2018, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৪৬ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন তদারকিতে মাত্র ৬৫৬ কর্মকর্তা!

রাজধানীতে গাড়ি স্বল্পতার কারণে ঝুঁকি নিয়ে গাড়িতে চড়া, অথবা যাতায়াতে যেকোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। গতকাল সোমবার রাজধানীর শনির আখড়া এলাকা থেকে তোলা ছবি -আজিজ ফারুকী

# পরিবহণ খাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ২৪ লাখ ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক
কামাল উদ্দিন সুমন : ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিআরটিএর রেজিস্টার্ড গাড়ির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার। ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৩টি। বিগত ৩১ বছরে যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ লাখ বাড়লেও এসব যানবাহনের তদারকিতে বাড়েনি বিআরটিএ’র জনবল। মাত্র ৬৫৬ জন কর্মকর্তা তদারকি করছেন নিবন্ধিত ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার যানবাহন। ফলে অনেকটাই নিধিরাম সর্দারের ভূমিকায় বিআরটিএ।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ। সংস্থাটি যানবাহনের শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্বে নিয়োজিত। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের পাশাপাশি যানজট, গণপরিবহনের অরাজকতা, দুর্ঘটনারোধসহ অন্তত ১৯ ধরনের কাজ করতে হয় তাদের। কিন্তু কাজের কাজ কোনোটাই হয় না। এর পেছনে অন্যতম কারণ জনবল ও অবকাঠামো সংকট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআরটিএ’র সাংগঠনিক কাঠামোতে অনুমোদিত জনবল ৮২৩। এর মধ্যে সদর কার্যালয়সহ বিভিন্ন সার্কেল অফিসে কর্মরত মাত্র ৬৫৬ জন। সংস্থার ৫৭টি সার্কেল অফিস থাকলেও জনবল নেই। এক অফিসের কর্মকর্তা আরেক অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জে কর্মরত সহকারী পরিচালক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন সাভার সার্কেল অফিসেও। জেলা পর্যায়েও একই চিত্র। ফলে খোলা থাকলেও সপ্তাহে তিন ও দুদিন করে দুই অফিসের কার্যক্রম চলে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকরা। দ্রুত কাজ সারার আশায় অনেকেই দ্বারস্থ হন দালালের। অনিয়মের পাশাপাশি তখন প্রতারণার শিকার হয় সাধারণ মানুষ।
সূূত্র জানায়, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, যানবাহনের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ, মালিক-শ্রমিকদের দাবির ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়াও বিআরটিএর দায়িত্ব। সেই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, গণপরিবহণে ভাড়া নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ, যাত্রীদের অভিযোগ যাচাইসহ নানাবিধ কাজ রয়েছে সংস্থাটির। তবে কোনোটাই পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করতে না পারায় পরিবহণ নেতাদের কাছে অনেকটাই অসহায় কর্মকর্তারা। ঠিকমতো নজরদারি করতে না পারায় গাড়ি বাড়ছে হু হু করে। রং করে চলছে ফিটনেসহীন পুরনো গাড়ি।
সূত্র জানায়, প্রতিবছরই গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। ২০১১ সালে নুতন নিবন্ধিত হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার গাড়ি, ২০১৬ সালে হয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪১০টি, ২০১৭ সালে করা হয় ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৫টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন। শুধু যে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বাড়ছে, তা কিন্তু নয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৮৭ সালে মোট লাইসেন্স ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার, ২০১৭ সালে এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬।
সূত্র বলছে, সারাদেশে প্রায় ২৪ লাখ অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক পরিবহণখাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ অদক্ষ চালক বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানসহ ভারী যানবাহন চালাচ্ছে বলে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া মোটরসাইকেলে অধিকাংশ চালকের লাইসেন্স নেই। এসব চালকের বেপরোয়া গতির কারণেই প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। তাই মোটরযান নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে চালকের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দেশে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে চালকের বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতির কারণে। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে তা মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৬ শতাংশের সমান।
বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সারাবিশে^ সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতিবছর ১২ লাখ লোক মারা যায়। আহত হয় আরও ৫ কোটি লোক। যারা মারা যায় তাদের অর্ধেকের বয়স ১৫ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে। তবে এই দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এর মধ্যে অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে অতিরিক্ত গতির কারণে। এছাড়া বাজে রাস্তা, যানবাহন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করা, নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি চালনা এবং সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে চালক, যাত্রী এবং পথচারীদের জ্ঞান না থাকার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে ৩০ শতাংশ চালক ভুয়া লাইসেন্সধারী।
এ বিষয়ে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জাতীয় সংসদে এক বক্তব্যে বলেন, দেশে ৪৫ লাখের বেশি নিবন্ধিত যানবাহন থাকলেও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা এর অর্ধেক। দেশের প্রায় অর্ধেক যানবাহন এমন চালক দিয়ে চলছে, যাদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স নেই। দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬২০টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২২ লাখ ৬ হাজার ১৫৫টি। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে এমন চালকের সংখ্যা দেশে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬ জন। দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ গাড়ি চালক তৈরি না হওয়ার কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত সংখ্যক ড্রাইভিং স্কুল ও ইনস্ট্রাক্টর না থাকার কথা সংসদে তুলে ধরেন মন্ত্রী। দেশে মোট ১২৩টি নিবন্ধিত ড্রাইভিং স্কুল রয়েছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ড্রাইভিং ইনস্ট্রাক্টর আছেন ১৭৯ জন। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে দক্ষ ও মানবিক গুণসম্পন্ন পেশাদার গাড়িচালক সৃষ্টির লক্ষ্যে পেশাজীবী গাড়ি চালকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। পেশাজীবী গাড়িচালকদের লাইসেন্স নবায়ন করার সময় দুদিন মেয়াদে এ প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিআরটিএ’র সূত্র জানায়, সারাদেশে মোট নিবন্ধনকৃত মোটরযানের মধ্যে ভারী মোটরযানের সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ৭৬৫টি। এর মধ্যে ৪৩ হাজার ৫৭৩টি বাস, ৯ হাজার ২৮৬টি কার্গোভ্যান, ২৯ হাজার ১৬৭টি কাভার্ডভ্যান, ৫ হাজার ৩৩টি ট্যাংকলরী, ১ লাখ ২৪ হাজার ৭২৮টি ট্রাক এবং ৮ হাজার ৯৭৮টি বিশেষ ধরনের মোটরযান রয়েছে। এছাড়া ঢাকা মহানগরীতে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৩টি যানবাহনের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ২০৫টি মোটরসাইকেল, ২ লাখ ৫০ হাজার ৬৯টি প্রাইভেট কার, ৭০ হাজার ১৭০টি মাইক্রোবাস, ৬৬ হাজার ৮০৮টি পিকআপ ভ্যান, ৫৬ হাজার ৭৮৪টি ট্রাক, ৩৪ হাজার ৯১৮ জিপ, ২৯ হাজার ৭৬টি বাস, ২৫ হাজার ৮৯৮টি ট্রাকটর (বড়ট্রাক), ১৯ হাজার ৪৬৪টি ডেলিভারিভ্যান, ১৮ হাজার ৪১৪টি কাভার্ডভ্যান, ১১ হাজার ৪৬১টি অটোরিকশা, ১০ হাজার ২৯৯টি মিনিবাস ও ৭ হাজার ৫৩০টি কার্গোভ্যান নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। ঢাকার বাইরে সারাদেশে ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০টি যানবাহনের নিবন্ধণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৯২টি, প্রাইভেটকার (ব্যক্তিগত গাড়ি) ৩ লাখ ৪০ হাজার ২৮৯টি, অটোরিকশা ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০টি, ট্রাক ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪১০টি, পিকআপ ১ লাখ ৮ হাজার ৬৯০টি, মাইক্রোবাস ৯৯ হাজার ১৮৭টি, জিপ ৫৫ হাজার ৮৬৩টি, বাস ৪৫ হাজার ৩৪৭টি, ট্রাকটর (বড়ট্রাক) ৪১ হাজার ৬০৬টি, কাভার্ডভ্যান ২৮ হাজার ৪৭০টি, ডেলিভারি ভ্যান ২৮ হাজার ৪২৯টি, অটো টেম্পু ২০ হাজার ৪৭৩টি, হিউম্যান হলার ১৮ হাজার ২৫টি ও অন্যান্য পরিবহন ১৭ হাজার ৮০৩টি নিবন্ধন করা হয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বমোট নিবন্ধিত প্রায় ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৩টি যানবাহন পরিচালনার জন্য মাত্র ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬ জন চালকের লাইসেন্স আছে বলে সংস্থারটির সূত্র জানায়। বাকি ২৮ লাখ ৯ হাজার ৭৯৭টি মোটরযান পরিচালিত হচ্ছে লাইসেন্সবিহীন চালক দ্বারা। এর ফলে সারাদেশের প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এই বিরাট সংখ্যক অদক্ষ চালকের বিষয়ে কোন তদারকি নেই সরকারের। বিভিন্ন সময় সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এই চালকরা দায়ী। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণেই ঘটছে এই দুর্ঘটনা।
এ বিষয়ে বিআরটিএ সচিব মো. শওকত আলী গনমাধ্যমকে বলেন, মোটরযানের অর্ধেকের বেশি চালকের লাইসেন্স নেই এটা ঠিক। তবে এর মধ্যে বেশিরভাগ চালক মোটরসাইকেলের। প্রায় ৩৫ লাখ যানবাহনের মধ্যে ২২ লাখ মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেলের অধিকাংশ চালকের লাইসেন্স নেই। তবে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের মতো ভারী যানবাহনের সমান সমান চালক লাইসেন্স আছে। বর্তমানে বিআরটিএ পক্ষ থেকে চালক তৈরি একাধিক পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। সে আলোকে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিআরটিএ বলছে, এ পরিস্থিতিতে সাত বিভাগীয় অফিসে পরিচালকের (ইঞ্জিনিয়ারিং) সাতটি এবং ১৯টি জেলা সার্কেল ও পাঁচটি মেট্রো সার্কেল অফিসে উপপরিচালকের (ইঞ্জিনিয়ারিং) ২৪টি নতুন পদ তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, একজন সহকারী পরিচালক, দুজন মোটরযান পরিদর্শক, দুজন মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন করে উচ্চমান সহকারী ও হিসাবরক্ষক, চারজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও একজন এমএলএসএস পদ সৃষ্টির অনুরোধ জানানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ