ঢাকা, মঙ্গলবার 14 August 2018, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অবিলম্বে শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের

স্টাফ রিপোর্টার : সাংবাদিক শহিদুল আলমকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তাকে নির্যাতনের সব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে মিডিয়া কর্মীদের জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার পর গ্রেফতার করে ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ আছে। তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক যেসব বিশেষজ্ঞ তাদের মধ্যে রয়েছেন মাইকেল ফোর্সট, ডেভিড কাই এবং সিওঙ্গ-ফিল হোং।
এর মধ্যে মাইকেল ফোর্সট হলেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর অন দ্য সিচুয়েশন অব হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস। ডেভিড কাই হলেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর অন দ্য প্রোমোশন অ্যান্ড প্রটেকশন অফ দ্য রাইট টু ফ্রিডম অব অপিনিয়ন এন্ড এক্সপ্রেশন। সিওঙ্গ-ফিল হোং হলেন চেয়ার-র‌্যাপোর্টিউর অব দ্য ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে শহিদুল আলমের সাক্ষাতকার প্রকাশ হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাকে তার ঢাকার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় ৫ই আগস্ট। পরের দিন তাকে আদালতে তোলা হয়। এ সময় তার ওপর নির্যাতনের চিহ্ন তিনি দেখিয়েছেন বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ওই বিশেষজ্ঞরা আরো বলেছেন, শহিদুল আলমকে গ্রেফতার ও তার ওপর অত্যাচার চরম উদ্বেগের বিষয় (এক্সট্রিমলি ওরিং)। টিনেজার শিক্ষার্থী ও অন্যরা, যারা বাংলাদেশে অধিকতর সুশাসন, সংস্কার ও ন্যায়বিচার দাবি করছিল তাদেরকে  দমনের একটি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটা ঘটানো হয়েছে। এই একই দাবি করছে মিডিয়ার কর্মীরা ও নাগরিক সমাজের অন্যরাও। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি শহিদুল আলমকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে। একই সঙ্গে তাকে নির্যাতনের যেসব অভিযোগ আছে তার সবগুলোর বিষয়ে কার্যকর ও পক্ষপাতিত্বহীন তদন্ত করতে হবে। আমরা মিডিয়া কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যও আহ্বান জানাচ্ছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি।
নোবেলজয়ী স্টিগলিজসহ ১৩ বরেণ্য ব্যক্তির খোলাচিঠি: কারাগারে আটক খ্যাতনামা আলোকচিত্রী ও অ্যাকটিভিস্ট শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে এবার খোলাচিঠি লিখেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিসসহ ১৩ জন বরেণ্য ব্যক্তি। প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে লেখা ওই চিঠিতে শহিদুলের গ্রেফতারকে ‘বিধিবহির্ভূত’ আখ্যা দিয়ে তারা বলেছেন, এ ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। শহিদুলের গ্রেফতারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধি ও মানবাধিকারের বৈশ্বিক ঘোষণা, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক বিধি, এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের লঙ্ঘন আখ্যা দিয়েছেন তারা।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট ‘উসকানি’র অভিযোগে শহিদুল আলমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই দিন পর তাকে আদালতে নেওয়া হয় এবং জাতির সুনাম ক্ষুণেœর অভিযোগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, শহিদুল তার জীবন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। আদালতে নেওয়ার সময় তিনি খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছিলেন। সে সময় তিনি বলেছেন, আমি একজন আইনজীবী চেয়েও পাইনি। লাঞ্ছিত করা হয়েছে আমাকে। আমার রক্তমাখা পোশাক ধুয়ে তা আবার পড়ানো হয়েছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে, তাদের কথামতো না চললে আবার আমাকে ... (অস্পষ্ট)।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকারের দমনপীড়ন নিয়ে আল-জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং ফেসবুকে এ সংক্রান্ত কঠোর বিবৃতি দেওয়ার কারণে শহিদুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের ঘটনাকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার ও এর সমর্থক বাহিনীর চলমান বেআইনি ও সহিংস কর্মকা-ের নজির আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে রাবার বুলেট ব্যবহারের সমালোচনাও করা হয়েছে এতে। এ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে চিঠিতে।
মুক্ত সংবাদমাধ্যমকে যে কোনও ধারার গণতন্ত্রের ‘অপরিহার্য উপাদান’ আখ্যা দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, কোনভাবেই সংবাদমাধ্যমের অবমাননা মেনে নেওয়া যায় না। শহিদুলের ঘটনাকে ‘তার ওপর নিষ্ঠুর আচরণ’ আখ্যা দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, এই ধারার কর্মকা- মুক্ত সংবাদমাধ্যমের অধিকারকে নস্যাৎ করে। তারা বলেছেন, ‘আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে এর নিন্দা জানাই’। খোলাচিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিস ছাড়াও ভারতের পিপল’স সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের সহ-সভাপতি বিনায়ক সেন, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্ত্তী স্পিভাক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুডিথ বাটলার ও অ্যাঙ্গেলা ডেভিস রয়েছেন।
এর আগে মার্কিন ভাষাবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক নোম চমস্কি, ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়সহ বিশ্বের খ্যাতনামা লেখক-সাংবাদিক-শিল্পীরা তাকে মুক্তি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সাংবাদিকতার সুরক্ষা, মানবাধিকার ও আলোকচিত্র সংশ্লিষ্ট বেশকিছু সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাকে মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ