ঢাকা, মঙ্গলবার 14 August 2018, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পারস্পরিক সম্পর্কের সীমারেখা ও পবিত্রতা সংরক্ষণে করণীয়

মাইমুনা সুলতানা : “হে মানুষ! আমরা নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রীলোক থেকে এবং তোমাদের সজ্জিত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্ররূপে, যেন তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার।” (সূরা হুজরাত:১৩)
মানব সমাজে পারস্পারিক সম্পর্কের যে সুপ্রাচীন ধারা, তার মূল ভিত্তি বা রহস্য এখানেই নিহিত। সব মানুষের মূল যে এক ও অভিন্ন, সবাই তো একই সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা। তাই তো, আবহমান কাল থেকে যুগের পালাবদল, সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে পৃথিবী অনেক বদলে গেলেও মানুষের মধ্যকার আত্মিক ও রক্তের বাঁধনগুলো আজও আপন মহিমায় সমুজ্জল। সব সৃষ্টির থেকে মানুষের বিশেষত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের যৌক্তিকতাও এখানেই। সকল জীবই পৃথিবীতে বংশ রক্ষা ও বিকাশ সাধনের জন্য অস্থায়ী ও আপাত সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। যেখানে থাকে না কোন ধরণের আবেগ, অনুভূতি বা মহৎ উদ্দেশ্যের উপস্থিতি। কিন্তু মানুষে মানুষে সম্পর্কগুলো হলো আত্মিক, সামাজিক ও স্থিতিশীল একটি বিষয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি, রীতি-নীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এমনকি অস্তিত্বের প্রশ্নও। তাই মানব জাতির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
মানব জীবন যেহেতু বহুবিধ নিয়মের ছকে বাঁধা, পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ব্যাপারে সর্বজনীন ও সর্বাধিক কল্যাণকর মাপকাঠি ও সীমারেখা কী হতে পারে- এটা অতি বড় একটা প্রশ্ন। এ নিয়ে যুগে যুগে বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। কারণ, মানুষ শুধু দেহ সর্বস্ব নয়, বরং মানুষের মাঝে মন, মনন ও আতœার অস্তিত্ব বিদ্যমান। তাই মানব প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ও বাস্তবমুখী জীবন বিধানই মানুষের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। এ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করেই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
“তোমাদের জন্যে তোমাদের স্বজাতীয়দের মধ্য থেকে জুড়ি সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা তাদের কাছে পরম শান্তি-স্বস্তি লাভ করতে পারে এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ও দয়া, অনুকম্পাও জাগিয়ে দিয়েছেন।” (সূরা রূম : ২০)
এভাবে মানব জাতির সূচনালগ্ন থেকেই আল্লাহ পরস্পরকে জুড়ে দেয়ার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি বীজ বপন করে দিয়েছেন, যা আজ অবধি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে চলেছে। এ সম্পর্কের ভিত্তি কী হবে, পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্যের মানদন্ড কেমন হওয়া উচিত- এ সকল বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়ে দিয়েছেন। এর সঠিক অনুসরণ ও অনুশীলনের মাধ্যমেই মানুষের মাঝে শান্তি, শৃংখলা, কল্যাণ ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। অন্যদিকে পারস্পরিক হক আদায়ে উদাসীনতা ও অবহেলা সমাজের অশান্তি ও অরাজকতার অনেক বড় একটা কারণ।
মানুষ পরস্পরের সাথে যে সকল বন্ধনে আবদ্ধ তার মধ্যে পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু ইত্যাদি সম্পর্কের বিভিন্ন রূপ আমরা দেখতে পাই। এর প্রত্যেকটিরই ভিন্ন ভিন্ন মর্যাদা ও আবেদন রয়েছে। একেকজনের উপর একেকরকম অধিকার ও কর্তব্য বর্তায়। এই সীমারেখাটি মেনে চলার উপরেই সমাজের ভারসাম্য নির্ভরশীল। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা ও আন্তরিকতার অভাব আজকের মানব সমাজকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আমরা চারপাশে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাই- পারিবারিক সম্পর্ক দিন দিন ভঙ্গুর হতে চলেছে। আত্মীয়- প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের দৈন্যতা পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরশীলতার বিষয়টিকে বিনাশ করে দিচ্ছে। অপরদিকে নানা ধরণের অযৌক্তিক ও অনাকাংক্ষিত সম্পর্কের জালে জড়িয়ে মানুষ সমাজকে চরম অরাজকতা ও অনৈতিকতার দিকে ধাবিত করছে।
পরিবারের একের প্রতি অন্যের ভালবাসা, মমত্ববোধ, নির্ভরশীলতাই সবার হৃদয়গুলোকে জুড়ে রাখে, ঠিক যেন একই বৃন্তের কয়েকটি পাপড়ি। তেমনিভাবে আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সাথে সুন্দর সহাবস্থানও একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরী করে দেয়। এ সম্পর্কগুলোই মানব সমাজকে পরিপূর্ণতা দান করে। 
আজকের সমাজে পরিবারের নিকটতম সদস্য বাবা, মা, ভাই, বোনের মধ্যকার সম্পর্কগুলোও কেমন ফিকে হয়ে আসছে আর বাড়ছে ক্রমাগত দুরত্ব। এর পেছনে যে কারণগুলো আমরা সাধারণত দেখতে পাই সে বিষয়গুলো আলোচনা করার চেষ্টা করব।
প্রথমত, মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, এ থেকে জন্ম নিচ্ছে এক ধরণের স্বার্থপরতা। মানুষ জীবন ধারণের প্রয়োজনে একে অন্যের উপর যত বেশী নির্ভরশীল হয়, তাদের মধ্যকার বন্ধনটা তত বেশী দৃঢ় হয়, এটাই স্বাভাবিক প্রকৃতি। এমনিভাবে একে অপরের সাথে যত বেশী সময় ধরে জুড়ে থাকে, তাদের ভালবাসা ততই বৃদ্ধি পায়। বর্তমান বিশ্বে মানুষের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই নিকট সম্পর্কের মানুষগুলোর সাথে একধরণের মানসিক দুরত্ব তৈরী হয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকের স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা তার ঘনিষ্ঠজনদের সাথে বিচ্ছিন্নতা তৈরী করে দিচ্ছে। এই বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন- আমাদের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী, মর্যাদার দিক থেকে বাবা-মা দু’জনে সমান হলেও পরিবারের প্রধান হলেন বাবা। মা হলেন বাবার একান্ত সঙ্গী ও সহযোগী। সে হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বই হলো মূল ভিত্তি। পরিবারের সবার জন্য অর্থসংস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য উপার্জনের কাজটা হলো বাবার। আর বাবার উপার্জিত সম্পদে সবার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কাজটা মায়ের। সন্তান  প্রতিপালনের দায়িত্ব পালনে বাবা-মায়ের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা পরিবারের সদস্যদের মাঝে ভালবাসার এক চমৎকার আবহ তৈরী করে দেয়। এভাবে যে পারিবারিক মিলবন্ধন তৈরী হয় তা সমাজে অত্যন্ত ইতিবাচক ও কল্যাণকর প্রবাহ নিয়ে আসে। এ আলোচনার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, পরিবারের নারী ও অন্যান্য সদস্যদের উপার্জন ও স্বনির্ভর হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে। বরং এর উদ্দেশ্য হলো- পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে নিজ অভিপ্রায় বাস্তবায়নের পাশাপাশি সবার সাথে পারস্পরিক শেয়ারিং, প্রয়োজনে পাশে থাকা, শুধু কর্তব্যের খাতিরে নয় বরং হৃদ্যতা বৃদ্ধির জন্যও সঙ্গ দেয়া, নিত্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো একসাথে করতে অভ্যস্ত হওয়া, পারিবারিক হালাল বিনোদন- ইত্যাদি কাজগুলোর মাধ্যমে পরিবারে একটি স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরী করা। পরিবারের প্রবীণ ও অন্যান্য সদস্যরাও এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশেষ করে বয়োঃজেষ্ঠ্য ও শিশুরা একটু বেশী যত্ন পাওয়ার হকদার। উপরের এই সামগ্রিক আলোচনাটা প্রয়োজনের সাপেক্ষে আত্মীয়- প্রতিবেশীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনেও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলবো সেটা হলো- পারস্পরিক হক-অধিকার ও মোয়ামালাতের ইসলামী বিধান ও তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে। পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী ও সমাজের সাধারণ মানুষ- প্রত্যেকের সাথে আচরণ ও কর্তব্যের বিষয়ে ইসলাম সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে এবং তার বাস্তবায়নে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে। সন্তানের প্রতি পিতামাতার, পিতামাতার প্রতি সন্তানের, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, আত্মীয়-প্রতিবেশী, সাধারণ মুসলিম ও অমুসলিম ইত্যাদি প্রতিটি সম্পর্কের প্রতি দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত বিস্তারিত, যুক্তিযুক্ত ও কার্যকর নীতিমালা দিয়েছে। এগুলো মানার ব্যাপারে সকল পর্যায় থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারলে  অনাবিল শান্তির একটি পৃথিবী বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়, প্রতিবেশী সহ সর্বস্তরে আল্লাহ প্রদত্ত ফরজ-ওয়াজিব ও হালাল হারামের সীমাগুলো দৃঢ়ভাবে মেনে চলা। বিশেষভাবে- লেনদেন, সামাজিক আইন, পর্দা প্রথা, বিয়ে-তালাকের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অত্যন্ত সচেতনতার সাথে বাস্তবায়ন করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ব্যাপারগুলোতে উদাসীনতা ও অবহেলাই সমাজে চরম বিপর্যয় নিয়ে আসে।
পারস্পরিক সম্পর্কের সীমা ও পবিত্রতা সংরক্ষণে করণীয়:
সঠিক চর্চার মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন সুন্দর ও মধুর হতে পারে, তেমনি সীমালঙ্ঘনের কারণে তা চরম মানবিক বিপর্যয় ও অধঃপতনের কারণও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে বর্তমান সময়ের কিছু বড় সমস্যার কথা আলোচনায় আনা যেতে পারে। যেমন-
১) পারিবারিক ভাঙ্গন- এই কারণে অনেক নারী ও শিশু সন্তানের জীবনে অনিশ্চয়তার অন্ধকার নেমে আসছে।
২) পরিবারের বয়োঃবৃদ্ধদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অনীহা। এতে করে বৃদ্ধ বয়সে অনেকেই সীমাহীন কষ্টে দিনাতিপাত করছে।
৩) আত্মীয়-প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের দৈন্যতা ও ক্রমবিনাশ।
৪) অ্যাফেয়ার বা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের প্রসার। এটা সমাজকে কলুষতার বিষবাষ্পে ভরিয়ে দিচ্ছে।
৫) পরকীয়া- এটি সমাজে মানবিক মূল্যবোধের মেরুদ-টাই ভেঙ্গে দিচ্ছে। বহু পরিবারে অশান্তির দাবানল প্রজ্জলিত করছে।
উপরোক্ত সমস্যাগুলো সামনে রেখে এগুলোর সুষ্ঠু সমাধান খুবই জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব বিষয়ের মত এ ব্যাপারেও ইসলামের বিধানই হলো সর্বোত্তম, বরং একমাত্র সমাধান। এককথায় সেটি হলো ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা ও অনুশীলন। তবে সেই সাথে আরো কয়েকটি দিক বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কের আলোচনা উপরে চলে এসেছে। পরিবারের পর সবচেয়ে বেশী নিকট সম্পর্কের মানুষ হলো- আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা, যারা প্রয়োজনে সবসময় সবার আগে সহযোগীর ভূমিকায় থাকে। তাই, তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যের ব্যাপারে অনেক সচেতন ও আন্তরিক হওয়া উচিত।
এরপর আজকের সমাজের জটিল সমস্যা অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে কিছু কথা বলা দরকার। এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। সাধারণত, অবিবাহিত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যারা অনৈতিক সম্পর্কে জড়ায় তাদের ব্যাপারে একটা বিষয় দেখা যায় যে, হয় পারিবারিকভাবে না হয় সামাজিকভাবে ওরা অবহেলা বা নিগ্রহের স্বীকার। তাই নিজেদের কষ্ট লাঘবে বা প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পেতে অনাকাংক্ষিত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আজকের যুব সমাজ তাদের পৃথিবীতে আগমন ও জীবন যাপনের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ব্যাপারে অনবহিত ও উদাসীন। পার্থিব সফলতা ব্যতিত জীবনের বৃহত্তর কোন উদ্দেশ্য না থাকায় দুনিয়ার সাময়িক ভোগ-বিলাসের মোহই তাদেরকে ভুল পথে ধাবিত করে। তৃতীয়ত, আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ছেলে-মেয়ের কাছে বিবাহ-পূর্ব সম্পর্ক কোন ধরণের সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতাই মনে হয় না।
উপরোক্ত কারণগুলো সামনে রেখে চিন্তা করলে ওগুলোর মাঝেই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। অর্থাৎ পারিবারিক গন্ডিতে বাবা-মা ও বড়দের পক্ষ থেকে ছোটদের ব্যাপারে সচেতনতা, সঠিক যত্ন-পরিচর্যা, সবদিক থেকে পর্যাপ্ত সাপোর্ট ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমেই সমাজকে এ অনুচিত চর্চা থেকে বের করে নিয়ে আসা সম্ভব।
সমাজ-সভ্যতার জন্য আরেকটি বড় বিপর্যয় পরকীয়া- এ বিষয়টি এখন আলোচনা করার চেষ্টা করব। আমরা যদি পরকিয়ার পেছনের কারণগুলো দেখার চেষ্টা করি, তাহলে এখানেও কিছু বিষয় খুঁজে পাব। সাধারণত, আপন সহধর্মী বা সহধর্মিনীর প্রতি অসন্তোষ, তার দ্বারা অবহেলিত হওয়া বা নির্যাতিত হওয়া থেকেই প্রথম দুরত্বটা তৈরি হয়। পরিণতিতে আরও ভাল থাকার প্রত্যাশায় মানুষ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আপন সঙ্গির কোন দুর্বলতা বা অপছন্দনীয় কোন দিকের কারণে পরকীয়ায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, অনেকক্ষেত্রে কোন কারণ ছাড়াই নফসের তাড়নায় মানুষ বিপথে পা বাড়ায়। আরেকটি সমস্যা এখন প্রকট হচ্ছে, সেটা হলো- পরিবারে একসাথে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারা বা দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতা।
এ সমস্যাগুলোর সমাধানেও কিছু বিষয় খেয়াল করা দরকার। নিজ জীবনসাথির মাঝে কষ্টকর কোন বিষয় দেখতে পেলে ধৈর্য ধরে সংশোধনের চেষ্টা করা। এটাই রাসূলের (সা) সুন্নাহ। শেষ পর্যন্ত সম্ভব না হলে, আইনসম্মতভাবে পৃথক হয়ে নতুন সম্পর্ক করার বিধানও শরীয়তে আছে। তবে এটা কাংক্সিক্ষত ও যথাযথ পদক্ষেপ নয়। মনে রাখা দরকার, মানুষ মাত্রই কিছু মানবিক দুর্বলতা থাকবে। তাই যথাসম্ভব উদারতা ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়া। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছাই দু’জনকে একত্রিত করেছে। কেউ তো কাউকে আগে থেকে জানা ও বোঝার সুযোগ পায় নি। একে অপরের জন্য আগে থেকেই নিজেকে প্রস্তুতও করে নি। এজন্য পছন্দ-অপছন্দ বা মতের অমিল থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। সময়ের সাথে সাথে এর সমাধান খুঁজে নিতে হবে। এজন্য নিজেদের ও সন্তানদের কল্যাণের কথা ভেবে কিছুটা ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা রাখা উচিত। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের পথনির্দেশ হলো- “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে উত্তম আচরণ করো। আর যদি তাকে তোমার অপছন্দও হয়, তবু তুমি যা অপছন্দ করছো হয়তো আল্লাহ তাতে সীমাহীন কল্যাণ দিয়ে দেবেন।”- (সূরা নিসা: ১৯) এই বিষয়টি নারীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য। এছাড়া পরকীয়াসহ অন্যান্য মন্দ চর্চা থেকে বেঁচে থাকতে নৈতিক শিক্ষা ও অনুশীলনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শেষে যে বিষয়টা বলব, দু’জন দু’জনকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, পরস্পরের হক আদায়ে আন্তরিক হওয়া, পারিবারিক বিষয়গুলোতে ও ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে একসাথে পরিকল্পনা করা, সব বিষয়ে শেয়ারিং ও পরামর্শ করা, পরস্পর সহযোগিতা ও সহমর্মিতা একান্তই জরুরী।
সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ এক মুহূর্তের জন্যও একাকী বা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতে পারে না, এটা সম্ভবও নয়। সব মানুষই বিভিন্ন সূত্রে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। এই সম্পর্কগুলোকে যতেœর সাথে সংরক্ষণ, পারস্পরিক অধিকার আদায় ও সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল সেতুবন্ধন রচনাই আমাদের সবার একান্ত কাম্য। এ জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র- সর্ব মহল থেকেই উদ্যোগী হতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে নৈতিক শিক্ষা অনুশীলনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা অনেক বেশি জরুরী।  পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে মানুষকে সজাগ রাখতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র জুমার খুতবায় সূরা নাহলের ৯০ নং আয়াতটি তিলাওয়াতের বিধান করেছেন- “আল্লাহ ন্যায়পরায়নতা, সদাচরণ, এবং আত্মীয়- স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।” আল্লাহ আমাদেরকে তার দেয়া জীবনবিধানের কল্যাণকামীতা বোঝার ও সে আলোকে নিজেদের জীবনাচরণ সংশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনকে ঢেলে সাজানোর তাওফীক দিন। আমীন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ