ঢাকা, বুধবার 15 August 2018, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আজ আবদুল মালেকের ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকী

স্টাফ রিপোর্টার : আজ ১৫ আগস্ট। ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রসেনানী আবদুল মালেকের ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকী। ইসলামী শিক্ষার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী ও সমাজতন্ত্রীদের হাতে গুরুতর আহত হয়ে ১৯৬৯ সালের এই দিনে তিনি শহীদী মৃত্যুর অমিয়সুধা পান করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের সেরা ছাত্রের মর্মান্তিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ইসলাম প্রিয় তরুণরা একদিনের জন্যও ভুলেন নি। শহীদ আবদুল মালেক লাখো তরুণের ‘প্রেরণার বাতিঘর,’ ‘তিমির রাতের অভিযাত্রী,’ ‘আলোরদিশারী’ হিসেবে বেঁচে আছেন। ইসলামী ছাত্রশিবির এই দিনটিকে ইসলামী শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন (নিপা) ভবনে (বর্তমান ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ) এ ‘শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা সভায় বামপন্থীদের বিরোধীতামূলক বক্তব্যের মধ্যে শহীদ আব্দুল মালেক মাত্র ৫ মিনিট বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। অসাধারণ মেধাবী বাগ্মী শহীদ আব্দুল মালেকের সেই ৫ মিনিটের যৌক্তিক বক্তব্যে উপস্থিত সবার চিন্তার রাজ্যে এক বিপ্লবী ঝড় সৃষ্টি করে। ফলে সভার মোটিভ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যায়। জাতির শিক্ষা ব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তির বিষয়ে তিনি সে দিন স্পষ্ট করে বলেছিলেন- "Pakistan must aim at ideological unity, not at ideological vacuum- it must impart a unique and integrated system of education which can impart a common set of cultural values based on the precepts of Islam. We need Common set of cultural values, not one set of cultural values-
তার বক্তব্যের এ ধারণাটিকে তিনি যুক্তি সহকারে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। উপস্থিত শ্রোতা, সুধীম-লী এবং নীতি নির্ধারকরা শহীদ আব্দুল মালেকের বক্তব্যের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে একটি সার্বজনিন ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। আব্দুল মালেকের ত্বত্ত্ব ও যুক্তিপূর্ণ অথচ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ক্ষিপ্ত করে দেয় ইতোপূর্বে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখা বাম, ধর্মনিরপেক্ষ ও ইসলাম বিরোধী বক্তাদের। সকল বক্তার বক্তব্যের মাঝ থেকে নীতি নির্ধারক এবং উপস্থিত শ্রোতা-সুধীম-লী যখন আবদুল মালেকের বক্তব্যকে পূর্ণ সাপোর্ট দেয় তখন আদর্শের লড়াইয়ে পরাজিত বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সকল ক্ষোভ গিয়ে পড়ে শহীদ আব্দুল মালেকের ওপর। নিপার আলোচনা সভায় ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ডাকসু-র নামে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পক্ষে প্রস্তাব পাশ করানোর উদ্দেশ্যে দশ দিনের ব্যবধানে অর্থাৎ ১২ আগষ্ট ঢাবির ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তনে (টিএসসি) এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। ছাত্রদের পক্ষ থেকে শহীদ আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন ইসলামী শিক্ষার ওপর কথা বলতে চাইলে তাদের সুযোগ দেয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। সভার এক পর্যায়ে জনৈক ছাত্র নেতা ইসলামী শিক্ষার প্রতি কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখে। তখন উপস্থিত শ্রোতারা এর তীব্র বিরোধীতা করে ইসলামী শিক্ষার পক্ষে শ্লোগান দেয়। সাথে সাথে ক্যাডাররা ঝাপিয়ে পড়ে সাধারণ ছাত্রদের ওপর। সন্ত্রাসীদের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শহীদ আব্দুল মালেক তার সঙ্গীদের স্থান ত্যাগের নির্দেশ দেন। এ সময় সকল সঙ্গিকে নিরাপদে বিদায় দিয়ে শহীদ আব্দুল মালেক কয়েকজনকে সাথীকে সাথে নিয়ে টিএসসির পাশ দিয়ে তার হলে ফিরছিলেন। হলে ফেরার পথে লোহার রড-হকিষ্টিক নিয়ে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তাকে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নিয়ে মাথার নিচে ইট দিয়ে, ইটের উপর মাথা রেখে ইট ও লোহার রড- হকিষ্টিক দিয়ে উপর্যপুরি আঘাত করে রক্তাক্ত ও অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। শহীদ আব্দুল মালেককে আহত এবং সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার তিনদিন পর ১৫ আগস্ট শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তিপুর্ণ বক্তব্য দেয়া ইসলামের এই সুমহান বক্তা। ১৯৬৯ সালের ১৫ আগস্ট বিশ্বের যে প্রান্তেই শহীদ আবদুল মালেকের শাহাদাতের সংবাদ পৌঁছেছে ইসলাম প্রেমিক প্রতিটি মানুষের চোখের পানি সেখানে ঝরেছে।
তারা চেয়েছিল শহীদ আবদুল মালেককে হত্যা করে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার আন্দোলনকে চিরতরে মুছে ফেলতে। কিন্তু তাদের এই ষড়যন্ত্র চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তার প্রমাণ আজকের এই বাংলাদেশ। আবদুল মালেকের রক্ত ইসলামী শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার আন্দোলনকে আরো বেগবান করেছে। শহীদ আবদুল মালেকের মধ্যে বিস্ময়করভাবে অনুকরণীয় সবগুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তার গোটা জীবনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী, অনুসন্ধিৎসু, নিরহংকার, বিনয়ী, মিষ্টভাষী, দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠাবান কর্মী, সঠিক নেতৃত্ব দানের দুর্লভ যোগ্যতার অধিকারী, ভালোবাসা, ত্যাগ ও কুরবানির উজ্জ্বল ও অনুপম দৃষ্টান্ত।
আবদুল মালেকের জন্ম ১৯৪৭ সালের মে মাসে। জন্ম স্থান বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার খোকসাবাড়ী গ্রামে। অসাধারণ মেধাবী আবদুল মালেক জুনিয়র স্কলারশীপ পান। তিনি এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে মেধা তালিকায় একাদশ স্থান অর্জন করেন। রাজশাহী কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। শাহাদাতবরণ কালে তিনি ৩য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে ১২২ নং রুমে থাকতেন।
কর্মসূচি: ইসলামী ছাত্রশিবির ইসলামী শিক্ষা দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কুরআনখানী, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল এবং শিক্ষা বিষয়ক স্মারক প্রকাশ। এ ছাড়া বগুড়ায় শহীদ আবদুল মালেকের কবর জিয়ারত ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ