ঢাকা, বুধবার 15 August 2018, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যানবাহন নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৬৫৬ জন!

শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে, কিন্তু সত্য হলো, রাজধানী মহানগরীতে নিয়ন্ত্রণসহ যানবাহনের ব্যবস্থাপনা কাজে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ৬৫৬ জন কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তাই যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ ও নবায়ন করা থেকে যানজট ও গণপরিবহনের অরাজকতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধসহ ১৯ ধরনের বিষয়ে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এমন অবস্থার ফলাফলও যেমন হওয়ার তেমনই হচ্ছে। বাস্তবে কোনো বিষয়েই কাজের কাজ বলতে যা বোঝায় তার কিছুই হচ্ছে না। ওদিকে অকল্পনীয় হারে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা।
গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষÑ বিআরটিএ’র তথ্য-পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৩টিতে। অন্যদিকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭৫ হাজার। কিন্তু বিগত ৩১ বছরে যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ লাখ বাড়লেও সে তুলনায় বিআরটিএ’র জনবল বাড়েনি প্রয়োজন অনুযায়ী। ফলে নামে কর্তৃপক্ষ হলেও বিআরটিএকে ‘নিধিরাম সরদারের’ ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিআরটিএ’র সাংগঠনিক কাঠামোতে জনবল ৮২৩ দেখানো হলেও বাস্তবে প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন সার্কেল অফিসে কর্মরত রয়েছেন ৬৫৬ জন কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তাকেই ঘুরে ঘুরে ৫৭টি সার্কেল অফিসের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
উদাহরণ দিতে গিয়ে দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ঢাকার কেরানীগঞ্জের সহকারী পরিচালক একই সঙ্গে সাভারের সার্কেল অফিসেও দায়িত্ব পালন করেন। এক অফিসে তিনদিন করলে দ্বিতীয় অফিসে তিনি দু’দিন কাজ করেন। ফলে অফিস খোলা থাকলেও ওই কর্মকর্তাকে নির্দিষ্ট অফিসে সব সময় পাওয়া যায় না। প্রতিটি অফিসে কাজ হয় দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত। এমন অবস্থায় একদিকে যানবাহনের মালিক ও ড্রাইভারসহ বিআরটিএতে কাজ নিয়ে আগত মানুষকে প্রচন্ড ভোগান্তির শিকার হতে হয়, অন্যদিকে এ অবস্থারই সুযোগ নেয় দালালরা। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দালালদের সঙ্গে যোগসাজশ করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, জনবলের স্বল্পতার অজুহাতে কর্মকর্তারা এমনভাবেই নিজেদের এলাকা ও কর্মসূচি  নির্ধারণ করেন, যাতে দালালরা বিআরটিএতে আগত মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করতে এবং তাদের কাছ থেকে যথেচ্ছ পরিমাণে ঘুষ আদায় করতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের ভাগ নাকি কর্মকর্তারাও পেয়ে থাকেন!
বলার অপেক্ষা রাখে না, যানবাহন নিয়ন্ত্রণের প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ’র  জনবল সংকট অনেক আগেই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ৩১ বছর আগের তথা ১৯৮৭ সালের পরিসংখ্যানকেও যদি বিবেচনায় নেয়া হয় তাহলেও দেখা যাবে, মাত্র ৬৫৬ জন কর্মকর্তার পদ প্রয়োজনের তুলনায় মোটেই যথেষ্ট ছিল না। তারপর থেকে বাড়তে বাড়তে যানবাহনের সংখ্যা এক লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে প্রায় ৪৭ লাখে পৌঁছেছে। এটা অবশ্য কাগজপত্রের হিসাব। বাস্তবে যানবাহনের সংখ্যা আরো অনেক বেশি। বড় কথা, এই বিপুল সংখ্যক যানবাহনের মধ্যে বাস, লরি ও ট্রাক থেকে শুরু করে প্রাইধেভট কার, অটো রিকশা ও মাইক্রোবাস তো রয়েছেই, রয়েছে লাখ লাখ মোটর সাইকেলও। এত বিভিন্ন ধরনের বিপুল সংখ্যক যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ড্রাইভারদের লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের পাশাপাশি সড়কে যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য যে মাত্র ৬৫৬ জন কর্মকর্তা মোটেও যথেষ্ট হতে পারেন না সে কথা নিশ্চয়ই অনুমান করতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
বিআরটিএ’র সূত্রে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতিতে উন্নতি ঘটানোর জন্য সংস্থাটি নাকি সব মিলিয়ে জনা পঞ্চাশেক নতুন পদ সৃষ্টি করার প্রস্তাব পেশ করেছে। আমরা একেও যথেষ্ট মনে করতে পারি না। দুর্ঘটনা ও যানজটসহ দ্রুত অবনতিশীল সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বরং বিভিন্ন স্তরে কয়েক হাজার পদ সৃষ্টি করার এবং অনতিবিলম্বে সে সব পদে যোগ্য জনবল নিয়োগের দাবি জানাই। আমরা আশা করতে চাই, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে অনুমান করতে সক্ষম হবেন এবং বিআরটিএকে সকল দিকে থেকে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ