ঢাকা, বুধবার 15 August 2018, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫, ৩ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কয়লা চুরি : দায় কি শুধু বাতাসের?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : একটার পর একটা খারাপ সংবাদ আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি,সামাজিক সুবিচার ও আইনের সুশাসনের সব সূচককে ভুলন্ঠিত করলেও একশ্রেণির দলকানারা বলছে সবকিছু ঠিকঠাক কোন সমস্যা নেই, দেশ উন্নয়নের মহাসাগরে ভাসছে। তারা না দেখছে মেগা প্রকল্পের দুর্নীতি, না দেখছে গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষিতা নারীর চোখের পানি। দুর্নীতির মহাউৎসব চললেও শাসক শ্রেণি উন্নয়নের আফিমে জাতিকে বুঁদ করে রেখেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন নামে একটি কমিশন থাকা সত্ত্বেও কেন দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুই আফসোস করে বলেছিলেন,‘আমি সারা দুনিয়া থেকে বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য ভিক্ষা করে আনি আর তা সাবাড় করে দেয় চাটার দল। নিকট অতীতে ব্যাংকিং খাতের লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছে এই খাতে পুকুর নয়,সাগর চুরি হচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনৈতিকতার মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সমালোচনা করলে ক্ষমতাসীনেরা অতীতের প্রসঙ্গ টেনে বলে আগের আমলে আরও বেশি দুর্নীতি হয়েছে। অথচ এখনো বাংলাদেশ দুর্নীতির সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। আমাদের নিচে আছে আফগানিস্তান। শুধুমাত্র উন্নয়ন দিয়ে দুর্নীতির সূচকের পরিবর্তন করা যায় না এটা ক্ষমতাসীনদের অনুধাবন করা প্রয়োজন।
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরী। তবে অন্যায়, জুলুম, অবিচার, অনিয়ম, দুর্নীতি বা চুরির অভিযোগ যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিরুদ্ধে উঠে তখন কারও বুঝতে বাকি থাকে না যে সরষের ভেতরে ভূতের বসবাস। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতির ঘটনা বাংলাদেশে নতুন তা কিন্তু নয়! বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার আগেও দেশে অনেক দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে যার সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয়নি। খালেদার জিয়ার দুর্নীতির মামলায় দুদককে উৎসাহী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেলেও ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কিংবা আবদুর রহমান বদির মতো ক্ষমতাসীন দলের ডজনখানেক নেতার মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের নিস্ক্রিয়তা সত্যিই দুঃখজনক। বেগম খালেদা জিয়া ১০ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে। এই সময়ে দেশে আইনের সুশান ও সুনীতির বন্যা বয়ে গেছে তা কিন্তু নয়! খালেদার জিয়ার আমল ধুয়া তুলসি পাতা কিংবা দুর্নীতিমুক্ত ছিল তা যেমন মোটা দাগে বলা যাবে না তেমনি এই সরকারের শাসনামলকেও দুর্নীতিমুক্ত সনদ দেয়া যায় না।  নিকট অতীতে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) জানিয়েছে,বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯১১ কোটি ডলার পাচার হয়েছে ২০১৪ সালে যা টাকার অংকে প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী সে দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এসব তথ্য কি প্রমাণ করে না দেশে দুর্নীতি হচ্ছে? অথচ দুর্নীতির কুশীলবেরা ধরা পড়ছে না। আর ধরা পড়লেও তাদের বিচার হয় না। যদি সত্যিকার অর্থে বিচার হতো তাহলে ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেংকারির মূল হোতারা কিভাবে বাইরে থাকে? ডেসটিনি, হলমার্ক কেলেংকারী,বিসমিল্লাহ গ্রুপ, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রেস্ট জালিয়াতি, সোনালী ব্যাংক,জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এবং সর্বশেষ  ব্যাংকের ভল্ট থেকে সোনা জালিয়াতির নায়কেরা কীভাবে দাপট দেখায়? এসব বড় বড় দুর্নীতির জন্য যারা দায়ী তাদেরকে আইনের আওতায় না আনতে পারলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি বাড়তেই থাকবে। এসব ঘটনার সাথে সরকার ঘরানার লোকরাই জড়িত। বাছাই করা বিচার দিয়ে নির্দোষ মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলানো যায়। কিন্তু রাষ্ট্রে সুবিচার কায়েম করা যায় না।
একটি দেশের রাজনীতিকরা হচ্ছে রাষ্ট্রের অভিভাবক। রাজনীতির চাকা এগুলে অর্থনীতিও সমান তালে অগ্রসর হয়। কিন্তু রাজনীতি পিছিয়ে গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করতে পারে না। কারণ সেটা তখন অন্যরা খেয়ে ফেলে। বাংলাদেশের বিরাজমান অর্থনীতি তারই প্রমাণ দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন ৩২.৫ বিলিয়ন ডলার তখন বছরে ৭৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন দুর্নীতি,স্বজনপ্রীতি ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়ে যায় তখন উন্নয়নের নামে লোটপাটের রাজত্ব সর্বত্র বিরাজ করে। ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলকে শায়েস্তা করার জন্য যে পন্থা অবলম্বন করে তার ছিটেফোটাও যদি দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি প্রতিরোধে করতো তাহলে বড়পুকুরিয়ার কয়লার খনি থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উধাও হয়ে যেত না। কোল্ড মাইনিং কোম্পানীটি ১৯৭৮ সালে বড়পুকুরিয়া বাজারে একটি সেচ পাম্প বসাতে গিয়ে কয়লার সন্ধান পায়। ১৯৯২ সালে চীনা কোম্পানী সিএমসির সাথে চুক্তি হওয়ার পর ১৯৯৪ সালে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। ২০০৬ সালে খনিটি থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হওয়ার পর ২০০৮ সালের দিকে খনিটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলীয় বিবেচনায় খনি কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও স্বজনপ্রীতির ফলে খনিটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। দুদকের পক্ষ থেকে করা প্রাথমিক তদন্তে কয়লা চুরির হওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। কাগজপত্রে কয়লা থাকার কথা এক লাখ ৪৬ হাজার টন, সেখানে মজুদ আছে দুই হাজার টনের মতো। আর বাকি এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব। পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে যে,২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে কোন ডিও ছাড়াই খনি থেকে তিনশ মেট্রিক টন কয়লা বের হয়ে যায়। আবার অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে খোয়া যাওয়া কয়লার টাকা  সরকারি কোষাগারে জমা করে দেয়া হয়েছে। কি অদ্ভুদ ব্যাপার! এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকার পরও গেট দিয়ে ট্রাকভর্তি কয়লা কিভাবে বের হয়ে গেল সে প্রশ্নের উত্তর আজো উদঘাটিত হয়নি। এর আগে ২০০৮ সালে ২ কোটি ৯ লাখ টাকার তামা চুরি হলে মামলা  হয় বটে, কিন্তু চুরি হওয়া তামা উদ্ধার করা হয়নি। তবে এতদিন জানতাম পেট্রোল বাতাসে উড়ে এবার নতুন করে জানতে পারলাম কয়লাও নাকি বাতাসে উড়ে। কবে যে শুনবো স্বর্ণও বাতাসে উড়ে যায় সেই অপেক্ষায় রইলাম। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কয়লা পেট্রোলের মতো বাতাসে উড়ে গেছে। তাই বলে কি  ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উধাও হয়ে যেতে পারে?
বাংলাদেশ খনিজ সম্পদের দেশ। এটা কোন সরকার কিংবা দলের কৃতিত্ব নয়! মহান আরশের মালিক ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশের মাটির নীচে প্রচুর খনিজ সম্পদ দান করেছেন। অথচ আমরা ক্ষমতার মোহে দাম্ভিকতার সাথে স্রষ্টার বিধানকে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে চলেছি। বাংলাদেশ জ্বালানি চাহিদার দুই ভাগ কয়লাশক্তি হইতে মিটাইয়া থাকে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে,দুই বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে আমাদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। কিন্তু ভারত ও চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলি ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার প্রয়োজন মিটাইতে কয়লাশক্তির উপর নির্ভর করিলেও আমার কয়লার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি। ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত কর্মকতা কোল মাইনিং কোম্পানির দায়িত্বশীল পদে নিযুক্ত ছিল তাদের সিংহভাগই নিজেদের আখের গুছিয়েছে। জালিয়াতি,অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যহারের মাধ্যমে ১ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন কয়লা খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ শীর্ষ চার কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিতে শুধু কি আমলারাই জড়িত নাকি অন্য কেউ জড়িত তা উদঘাটন জরুরী। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কয়লা যে শুধু বাতাসেই উড়ে না লুন্ঠনও হয় তা জাতির সামনে উন্মোচিত করা হোক এমনটিই দেশের ১৬ কোটির প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ