ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 August 2018, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আর্থিক বিপর্যয়ে আয়হীন কর্মসংস্থানের দিকে দেশ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি থেকে শুরু করে একের পর এক আর্থিক কেলেংকারির খবরে দেশের অর্থনৈতিক খাতে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল হয়ে পড়ার উপক্রম। বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থানে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বেকারত্ব মহামারি আকার ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি নতুন সংকটের মধ্যে পড়েছে দেশ। বর্তমানে দেশ আয়হীন কর্মসংস্থানের দিকে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান আছে, আয় নেই অর্থনীতিতে নতুন তত্ত্ব যোগ হয়েছে এ সরকারের আমলে। এতে বিভিন্ন মহলের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি অন্যথায় যুবসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।  
জানা যায়, বর্তমানে দেশে হু হু করে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। সে তুলনায় নেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে কিছু কিছু কোম্পানি শিক্ষিত যুবকদের দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। হাত খরচের জন্য কিছু টাকা দিলেও তাদের মাসিক কোনো বেতন নেই। সারাদিন ঘুরে না বেড়িয়ে কাজ করা দরকার তাই করছেন। অথচ সেইসব কোম্পানি সরকারকে তথ্য দিচ্ছে তার অধিনে এতো জন যুবক কাজ করছে। আর সেটাকেই কর্মসংস্থান হিসাবে চালিয়ে দিচ্ছে সরকার। ফলে কর্মসংস্থানের যে তথ্য দিচ্ছে সরকার তার বেশিরভাগই আয়হীন কর্মসংস্থান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি থেকে শুরু করে দেশের অর্থনৈতিক খাতে একের পর এক মহা বিপর্যয় নেমে এসেছে। হলমার্ক কেলেংকারি, বেসিক ব্যাংক কেলেংকারি থেকে শুরু করে ভল্টের সোনা চুরি, কয়লা চুরি, পাথর চুরিসহ বিভিন্ন অপকর্মে রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল হয়ে পড়ার উপক্রম। শিক্ষিত যুবকরা এখন স্বেচ্ছাশ্রমে নিয়োজিত। যে সময়ে তাদের পরিবারের হাল ধরার কথা ছিল সে সময়ে তারা বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। বেকারত্ব ঘুচাতে কোনো একটা কাজে ব্যস্ত থাকতে চাচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের সুযোগ দিলেও তা বেতন ছাড়া কাজের সুযোগ। অর্থাৎ কাজ করলেও তারা এক প্রকার বেকারই থেকে যাচ্ছে। যাকে বলে আয়হীন কর্মসংস্থান। জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশের জন্য সন্দেহাতীতভাবেই কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের প্রাসঙ্গিকতাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক সময়ে বলা হতো পড়াশোনা করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে। আর এখন পড়াশোনা করে যে, বেকার বেশি হয় সে। কারণ এ দেশে এখন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি থেকে বাংলাদেশ আয়হীন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে মানুষের প্রকৃত আয়ও কমে গেছে। বিকলাঙ্গ ও এতিমে পরিণত হয়েছে ব্যাংকিং খাত। তারা বলছেন প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয় এই চারটির মধ্য সামঞ্জস্য না থাকলে বুঝতে হবে এমন ধরনের আয় হচ্ছে, যেটা নিয়ে চিন্তার বিষয়। আমরা দেখছি দেশে কর্মসংস্থান বাড়লেও আয় কমছে। দেশ আয়হীন কর্মসংস্থানে পরিণত হয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) উচ্চতর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মসংস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন দেশে আয়হীন কর্মসংস্থান হচ্ছে।
এ ব্যাপারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এতদিন কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর এখন হচ্ছে আয়হীন কর্মসংস্থান। আমরা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি থেকে বের হয়ে আয়হীন কর্মসংস্থানে চলে গেছি। প্রবৃদ্ধি ৬, ৭, ৮ শতাংশ যাই হোক ফলাফলটা আমরা কি পাচ্ছি। ফল তো প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে হবে না। ফলাফল নির্ধারিত হবে জনমানুষের জীবনে কর্মসংস্থান হলো কি না, আয় হলো কি না তার ওপর। সরকারি প্রতিবেদন থেকে আমরা দেখছি, কর্মসংস্থান বেড়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রকৃত আয় কমে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে আড়াই শতাংশ।
আয় কমার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, যাদের আয় কমেছে তাদের মধ্যে নারীদের আয় বেশি কমেছে। শহরের মানুষের থেকে গ্রামের মানুষের আয় বেশি কমেছে। এর সাথে আমরা নতুন বিষয় দেখছি, যারা পড়াশোনা করে তারা বেকার বেশি। আর শেষ যেটা দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়ছে। দেশে শোভন কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, তা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। যেখানে আয় কম, সেখানে কোনো ধরনের শ্রমের অধিকার বা পরিবেশ নেই।
সূত্র জানায়, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ তিন বছর ধরে প্রায় একই স্থানে স্থবির হয়ে আছে। মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ, অথচ বিতরণ হয়েছে ১৮ শতাংশের বেশি। কিন্তু সে টাকা বিনিয়োগ হয়নি। পুঁজি পণ্য আমদানি হচ্ছে, সরকারি ব্যাংকের টাকা যাচ্ছে, বেসরকরি ব্যাংকের টাকাও যাচ্ছে, কিন্তু বিনিয়োগ হচ্ছে না। উৎপাদনের সাথে মুদ্রানীতির পরিসংখ্যান, আমদানির পরিসংখ্যানের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না বাড়ায় আয়হীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে নির্বাচন এলে এক দিকে যেমন বিদেশ থেকে অনেকে রেমিট্যান্সের টাকা পাঠায় নির্বাচনে অর্থায়নের জন্য, অপর দিকে তার থেকে বিপুল টাকা বিদেশে চলে যায়। অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থাকলে এটি আরও বেশি যায়। টাকার এই ধরনের তছরুপ, অপব্যবহার ও বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে তিনটি জায়গা রয়েছে। এর প্রথমটি ব্যাংকিং খাত, দুই নম্বর পুঁজিবাজার এবং তৃতীয়টি আমদানি। ২০১৭ সাল ছিল ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির বছর। আর চলতি বছর ব্যাংকিং ব্যবস্থা এতিমে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারাই এখন এতিমের ওপর অত্যাচার করছেন। দেশে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সব থেকে বেশি। যেখানে অশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ১.৫ শতাংশ, সেখানে উচ্চমাধ্যমিক পাস করাদের বেকারত্বের হার ১৪.৯ শতাংশ।
সিপিডি বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দুর্বল জায়গায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মানুষের করের টাকা ব্যাংকগুলোকে না দেয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট থেকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, বকেয়া রাজস্ব আদায়ে সরকার ও এনবিআরের আরও মনোযোগী হওয়া, করপোরেট করহার কমানোর ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করা এবং নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার ছিল।
উন্নয়ন-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদন বিশ্লেষণে ৫টি বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। সরকার বলছে, গত অর্থবছরে কর্মসংস্থান বেড়েছে। এই তথ্য যদিও ঠিক, তবে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এক বছরে গড়ে মানুষের আয় কমেছে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, পুরুষের চেয়ে নারীদের আয় বেশি কমেছে। তৃতীয়ত, শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষের আয় আরও কমেছে। চতুর্থত, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। সবশেষে আয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে। খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটের মানুষের আয় বেশি কমেছে। এর মানে হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসংক্রান্ত সরকারের তথ্য সঠিক হলে ওই কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হয়েছে। সেখানে আয় কম, শ্রমের অধিকার বা পরিবেশ নেই। অর্থাৎ দেশে আয়বিহীন কর্মসংস্থান হচ্ছে।
সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের ০.২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের পাঁচ ভাগ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল ০.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশের অবদান ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এরচেয়ে বেশি আয় করছেন, অন্য দিকে আয় কমেছে গরিবদের। সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ শতাংশের খানা প্রতি আয় (হাউজহোল্ড ইনকাম) ২০০৫ সালে ছিল ১১০৯ টাকা, যা কমে ২০১৬ সালে ৭৩৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ধনী পাঁচ শতাংশের খানা প্রতি আয় ৩৮ হাজার ৭৯৫ থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকা। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী পাঁচ শতাংশের কাছে, অন্যদিকে ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ ভাগের কাছে। সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রার মধ্যে এই বৈষম্য বাড়ার জন্য ‘প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের অভাবকে’ দায়ী করেছে সিপিডি।
প্রবৃদ্ধির হারের নিচে যে অন্ধকারটি রয়েছে সেটি হল দেশের ভেতরে সে তুলনায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না, দারিদ্র্য বিমোচনের হার শ্লথ হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৈষম্য শুধু আয়ে আর ভোগে বৃদ্ধি পায়নি, সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে সম্পদের বৈষম্য। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকে ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়া, বড় বড় প্রকল্পের ভেতর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ভিন্ন দিকে পরিচালনা করাকে চিহ্নিত করা হয়। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে নেমে হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে ১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যে কর্মসংস্থান হচ্ছে তা হয়ে পড়েছে আয়হীন। অর্থাৎ কর্মসংস্থান হচ্ছে কিন্তু আয় হচ্ছে না। অর্থনীতিতে এটি নতুন তত্ত্ব হিসাবে উল্লেখ করেছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ