ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 August 2018, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাণিজ্য ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে

সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে এগিয়ে চলার গালগল্প শোনানো হলেও দেশকে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির কবলে পড়তে হয়েছে। অন্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক  রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত জুনে সমাপ্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী ওই অর্থবছরশেষে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮২৫ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ এক লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
রিপোর্টে আরো জানা গেছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ পরিমাণের ঘাটতি। স্বাধীনতার পর দেশ কখনো, কোনো অর্থবছরেই এত বিপুল পরিমাণ ঘাটতির কবলে পড়েনি। এর আগে পর্যন্ত ২০১০-১১ অর্থবছরের ঘাটতিকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বলে মনে করা হতো। সেবার ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৯৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। উল্লেখ্য, ২০১৬-১৭ অর্থবছরশেষে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই ঘাটতির পরিমাণ হয়েছে ৯২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। দেশের পণ্য এবং সেবা বাণিজ্য উভয় বাণিজ্যেই ঘাটতি বেড়ে গেছে।
তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে সে তুলনায় রফতানি আয় বাড়েনি বলেই দেশকে এত বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে। একই কারণে প্রচন্ড চাপে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা। কারণ, আমদানি বাড়লেই বাজারে মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যায়। বর্তমানেও বেশ কয়েক মাস ধরে ডলারের তুলনায় টাকা অনেক দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি এমন হলে তার প্রভাব পড়ে আমদানি ও শিল্প পণ্যের দামে। অমদানির এই প্রভাব যদি উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগে পড়ে তাহলে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ভালো হতে পারে। অন্যদিকে আমদানির আড়ালে অর্থ যদি পাচার হয়ে থাকে তাহলে তার ফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। একই কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও প্রচন্ড চাপের মুখে পড়বে। সব মিলিয়েই বলা হচ্ছে, অবিলম্বে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে চলতি অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ আরো অনেক বেড়ে যেতে পারে।
ঘাটতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, আমদানি ব্যয়ের তুলনায় একদিকে রফতানি আয় বাড়েনি, পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেবাখাতের ঋণাত্মক অবস্থা। একযোগে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ এবং মেট্রোরেলসহ আরো কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। এসব কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানির বিষয়টি চলবে আরো কয়েক বছর। সে তুলনায় রফতানি বাড়ার যেহেতু সম্ভাবনা নেই সেহেতু দেশের ঘাটতির পরিমাণও কেবল বাড়তেই থাকবে। এভাবে ঘাটতি বাড়তে থাকলে আমদানি-রফতানির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে না, প্রচন্ড চাপের মুখে পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তখন স্বাভাবিক নিয়মেই বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বেড়ে যাবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতিও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে। বাড়বে চাল-ডালসহ প্রতিটি পণ্যের দাম। এভাবে স্বল্পসময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে। নাভিশ্বাস উঠবে সাধারণ মানুষের।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাণিজ্য ঘাটতি সংক্রান্ত তথ্য-পরিসংখ্যানগুলো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানা গেছে, বিপুল এই ঘাটতির পেছনে যথারীতি প্রধান ভূমিকা রয়েছে ভারতের। প্রতিবেশি দেশটি থেকে আমদানি লাফিয়ে বাড়লেও নানা ধরনের শুল্ক-অশুল্ক ও আধাশুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশের রফতানি বাড়তে পারছে না। উল্লেখ্য, মাস কয়েক আগে জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতির পরিমাণ আট গুণ।
এমন অবস্থার কারণ জানাতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীসহ তথ্যাভিজ্ঞরা ভারতের নীতি ও কার্যক্রমকে প্রতারণাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কারণ, প্রকাশ্যে আমদানি বাড়ানোর এবং ঘাটতি কমিয়ে আনার ঘোষণা দিলেও ভারত সুকৌশলে এমন কিছু শুল্ক-অশুল্ক ও আধাশুল্ক বাধার সৃষ্টি করে রেখেছে এবং এখনো করে চলেছে যার ফলে রফতানির সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে ভারত থেকে নানা ধরনের অসংখ্য পণ্য আসছে বাংলাদেশে। বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি চোরাচালানের পথেও বিপুল পরিমাণ পণ্য ঢুকে পড়ায় ঘাটতি শুধু বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতের সঙ্গে শুধু বৈধ বাণিজ্যেই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যেও বাংলাদেশ পিছিয়েই রয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, এভাবে বেড়ে চলা ঘাটতির মধ্যে থাকতে হলে উন্নয়নশীল দেশ হওয়া শুধু কল্পনার বিষয় হয়ে থাকবে। এজন্যই বেশি দরকার ঘাটতি কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। আর সে লক্ষ্যে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রফতানি আয় বাড়ানোর ব্যাপারে- বিশেষ করে ভারতে রফতানি বাড়াতে হবে। এ উদ্দেশ্যে ক’টনৈতিক পর্যায়ে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের উচিত চোরাচালান প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া। কারণ বৈধ বাণিজ্যের চাইতে কয়েকশ’ ভাগ বেশি বাণিজ্য ভারত চোরাচালানের পথে করে থাকে। আমদানির ক্ষেত্রেও জাতীয় শিল্পের স্বার্থে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এমন সব পণ্য আমদানি করতে দেয়া চলবে না যেগুলো বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়।
বলা দরকার, ভারতসহ বিশ্বের সব দেশই এভাবে নিজেদের শিল্প ও পণ্যকে নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এর ফলে একদিকে জাতীয় শিল্পের বিকাশ ঘটবে অন্যদিকে দেশের আমদানি ব্যয়ও অনেক কমে আসবে। এসবের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোর জন্য সরকারকে রেমিট্যান্স আয় এবং বিদেশি ঋণ ও সাহায্যের প্রবাহ বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর এবং আমদানি ও রফতানির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখবে না। অন্য সব দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ী এবং অর্থনীতিবিদসহ দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ