ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 August 2018, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অবদমন নয় : প্রয়োজন সঙ্গত ও সৃজনশীল ভূমিকা

‘হামলাকারী সনাক্তে তৎপরতা নেই’ শিরোনামে মুদ্রিত প্রতিবেদনটি ভেবে দেখার মতো। ১১ আগস্ট প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়Ñ নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছিল লাঠিসোঁটা, রামদা হাতে হেলমেট পরিহিত লোকজন। আন্দোলনের তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার সাংবাদিকরা এখনও সুস্থ হননি। কিন্তু সুস্পষ্ট ছবি-ভিডিও থাকার পরও জানা যায়নি এই ‘হেলমেট বাহিনী’ আসলে কারা। এদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন তৎপরতা নেই। অথচ মার খেয়ে উল্টো গ্রেফতার হয়েছেন ২২ শিক্ষার্থী। থানা হেফাজতে তাদের সাথে ভালো আচরণ করা হয়নি। রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আদালত চত্বর থেকে কেঁদেকেটে কারাগারে গেছেন তারা, কারাবাসের কথা যারা স্বপ্নেও কোন দিন ভাবেননি।
এমন চিত্র থেকে জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে- প্রশাসন কি তাহলে অনুরাগ বিরাগের বশবর্তী হয়ে কাজ করছে? যদি তাই হয় তাহলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কেমন করে? মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের যে ঘটনা ঘটলো তারপর তাদের গ্রেফতার করা হলো, তাহলে যারা হামলা করলো তাদের কেন গ্রেফতার করা হবে না? আইনের চোখে যে সবাই সমান সেটা যেন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। তিনি বলেন, ‘এখানে রাষ্ট্র একচোখা আচরণ করছে। এক পক্ষকে গ্রেফতার করছে, আরেক পক্ষকে কিছু বলছে না। আর হেফাজতে নিয়ে গিয়ে যদি কাউকে নির্যাতন করা হয় তাহলে ধরে নিতে হবে রাষ্ট্রই সেই নির্যাতন করছে। আমাদের দাবি, আইনের প্রয়োগ যেন সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়।’
সুলতানা কামালের বক্তব্য বিবেচনার দাবি রাখে। আমরা মনে করি অনুরাগ-বিরাগের বদলে আইনের শাসন তথা সুশাসনের চেতনা এখন জাতির জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়। আর এ ক্ষেত্রে সঙ্গত ভূমিকা পালন করতে পারে সরকার তথা প্রশাসন। সময়ের দাবি বাস্তবায়নে তারা সমর্থ হন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববার-এ (১২ আগস্ট) রাজধানী ঢাকার সড়কে ছিল তীব্র যানজট। যানবাহনের গতি ছিল ধীর। তারপরও সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ ছিল না। পুলিশ মামলা ও জরিমানা করেও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে পারছে না। রোববার রাজধানীর পাঁচটি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লক্ষ্য করা গেছে যানবাহনের চালক ও পথচারীদের আইন অমান্য করার ঘটনা। বর্ধিত ট্রাফিক সপ্তাহের অষ্টম দিন ছিল রোববার। এদিন গুলিস্তানে বাস চাপায় প্রাণ গেছে এক যুবকের। এদিকে রোববার রংপুরের দর্শনা এলাকায় বাস চাপায় প্রাণ হারায় রংপুর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্র জিয়ন মন্ডল।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ হওয়ার পর দেশের সড়কগুলোয় আবার পুরনো বিশৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। এই বিশৃঙ্খলা লক্ষ্য করে স্বয়ং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ১২ আগস্ট রোববার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন পথচারী আন্ডারপাস নির্মাণ কাজ উদ্বোধনকালে ভাষণে সড়কের বিশৃঙ্খল অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। উল্লেখ্য যে, গত ২৯ জুলাই বেপরোয়া বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এরপরই নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। নানা কারণেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে না। এর একটা কারণ প্রশ্রয়প্রাপ্ত বিশেষ ক্ষমতাবান গোষ্ঠী। গত রোববার এই গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা গেছে চট্টগ্রামে। উল্টো পথে আসা মোটর সাইকেল আরোহীকে বাধা ও মামলা দেওয়ায় অন্তত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে কিছু যুবক। শুধু তাই নয়, আইন অমান্যকারী মোটরসাইকেল আরোহী ওই যুবক দলবল নিয়ে হামলা চালিয়েছে নগরীর নিউ মার্কেট মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ বক্সে। ট্রাফিক সপ্তাহ চলাকালে রোববার দুপুরে এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় কয়েকজনকে ধরা হলেও পরে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। এমন ঘটনায় প্রশ্ন জাগে, আইন কি তার নিজস্ব গতিতে চলতে অক্ষম? এমনটি হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে কেমন করে? সুশাসন তো অনেক দূরের কথা। ন্যায়ের বদলে অনুরাগ-বিরাগের শাসনই কি দেশে চলতে থাকবে?
‘কারাগারে সাত নেতা, বাকিরা পালিয়ে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলো পত্রিকায়। ১২ আগস্ট মুদ্রিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্মম হাতুড়ি পেটায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলামের পায়ের হাড় ভেঙ্গে গিয়েছে। আঘাত পেয়েছিলেন মেরুদণ্ড ও মাথায়। মাথার আঘাতটা ভাল হয়েছে কিন্তু মেরুদণ্ডের ব্যথা রয়ে গেছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পায়ের। শুধু তরিকুল ইসলামই নন, কোটা সংস্কারের আন্দোলনের সাথে যুক্ত বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মারধরে আহত হয়েছিলেন। গত ৩০ জুন থেকে পরের এক সপ্তাহ ধরে চলা হামলায় ১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে সরকারি হাসপাতালে তাদের ভাল করে চিকিৎসা করা হয়নি। পরে গোপনে চিকিৎসা নিয়ে তারা এক ধরনের পলাতক জীবন যাপন করছেন। পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন ১১ জন আন্দোলনকারী। একাধিক মামলায় এখনও কারাগারে আছেন ৭ জন শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে চাকরির জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন থেকেই দূরে থাকতে হচ্ছে আন্দোলন কারীদের। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরতদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যারা হলে থাকতাম তাদের কেউ এখন হলে থাকতে পারছি না। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারাই এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম সবাই গুম এবং গ্রেফতার আতঙ্কে আছি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্তদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে, এতে এই আতঙ্ক বাড়ছে। তারপরও কোটা সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আমরা নতুন কর্মসূচিতে আন্দোলন চালিয়ে যাব, গ্রেফতারকৃতদেরও নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।’
এমন চিত্রে উপলব্ধি করা যায়, কোটা আন্দোলনের কাক্সিক্ষত ফল এখনও অর্জিত হয়নি। সরকার প্রকাশ্যে কোটা আন্দোলনের দাবি মেনে নেয়ার কথা ঘোষণা করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরং কোটা আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতা-কর্মীদের ওপর চলছে নির্যাতন-নিপীড়ন। গণতান্ত্রিক সমাজে এমন আচরণ মেনে নেয়া যায় না। বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা কারো জন্যই মঙ্গলজনক বলে বিবেচনা করা যায় না। স্বস্তিতে নেই সরকারি দলও। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হঠাৎ করে নানা অরাজনৈতিক ইস্যু জনপ্রিয় আন্দোলনের বড় বিষয়ে পরিণত হওয়ার প্রবণতায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। দলটি আশঙ্কা করছে নির্বাচন সামনে রেখে এমন আরো আন্দোলন হতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো জনপ্রিয়তা পেয়ে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ দাবিগুলোর যৌক্তিকতা। আর আন্দোলন সংগঠিত হওয়া এবং তা ছড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এতে সরকার বিরোধী শক্তিও সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে। তাই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারকে শক্তি প্রয়োগ, গ্রেফতার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন, যৌক্তিক আন্দোলনগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার দমন-পীড়নের নীতি গ্রহণ করেছে। সরকার হয়তো মনে করছে এই নীতির মাধ্যমে কোটা সংস্কার ও ছাত্র আন্দোলন আপাতত সামাল দেয়া গেছে। কিন্তু সমাজে বিক্ষুব্ধ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যদি আন্দোলনে নেমে পড়ে তখনও যৌক্তিক ভূমিকার বদলে সরকার কি দমন-পীড়নের নীতি গ্রহণ করবে? তখন দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে নামার আশংকা আছে। শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির দাবিটিরও সুরাহা হয়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলনও আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এমন বাস্তবতায় দমন-পীড়নের পুরনো নীতির বদলে সরকারের সঙ্গত ও সৃজনশীল ভূমিকা গ্রহণ প্রয়োজন বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। সরকার পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে সেটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ