ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 August 2018, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শহীদ আবদুল মালেক : বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের মহানায়ক

ড. মোবারক হোসাইন : [দুই]
জনাব নূর মোহাম্মদ মল্লিক এক সময়ে কোন এক কারণে বেশ কিছু দিনের জন্য আব্দুল মালেক ভাইয়ের মেহমান হয়েছিলেন। তাকে মেহমানদারি করতে গিয়ে নীরবে নিভৃতে শহীদ আবদুল মালেক কিভাবে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটিয়েছেন তার চোখ ভেজানো বর্ণনা দিয়েছেন তিনি তার ‘চিরভাস্বর একটি নাম’ শীর্ষক স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধে : “স্কলারশিপের টাকায় তাঁর সবকিছু চলতো। কিছু টাকা মায়ের কাছেও পাঠাতেন। বাকি টাকা খাওয়াপড়া ও আন্দোলনের জন্য খরচ করতেন। বেশ কয়েকদিন থাকার পর আমি লক্ষ্য করলাম, মালেক ভাই ডাইনিং হলে খাচ্ছেন না। মনে করলাম মজলিসে শূরার বৈঠকের জন্য হয়তো তাঁদের সকলে একসঙ্গে খান সময় বাঁচানোর জন্য। শূরার বৈঠক শেষ হলো। এরপরও তাকে দেখি না। এরপর একদিন দেখলাম তিনি রুটি খাচ্ছেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে বললেন, শরীর খারাপ। আমার সন্দেহ হলো, আমার জন্যই বোধ হয় তাকে কষ্ট করতে হচ্ছে। সামান্য ক’টি টাকাতে হয়তো তিনি কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না এবং এজন্য বিশেষ করে আমার ভার বহনের জন্যই তাকে অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হচ্ছে বুঝতে পেরে তাঁর কাছ থেকে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলাম।”
৪. কর্মীদের অনুপ্রেরণার উৎস : আজ মালেক ভাইয়ের মতো দায়িত্বশীল সত্যিই কর্মীদের অনুপ্রেরণার উৎস। নিবিড় তত্ত্বাবধানকারী দায়িত্বশীল হিসেবে আব্দুল মালেক ভাইয়ের দৃষ্টান্ত ছিল অনন্য। নামাজ কাজা বন্ধ করার জন্য ফজলুল হক হল থেকে কর্মীর হোস্টেলে গিয়ে তিনি ডেকে তুলেছিলেন। দায়িত্বশীল যে একজন সেবক তার প্রমাণ মালেক ভাইয়ের চরিত্রে সমুজ্জ্বল। বাড্ডায় টিসিতে টয়লেট মজবুত নয় মর্মে ইহতেসাবের পর তিনি নিজেই রাতে পানিতে নেমে টয়লেট ঠিক করেছেন। পরিচালকের জন্য ইহতেসাব গ্রহণের এ দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। মেহমান এলে নিজে বই মাথায় দিয়ে শুয়ে মেহমানকে ওপরে ঘুমাতে দিতেন। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম লিখেছেন- “শহীদ আব্দুল মালেক তরুণ বয়সেই এমন এক উজ্জ্বল নজির রেখে গেছেন যা এদেশে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে চিরদিন প্রেরণা জোগাবে। এতগুলো গুণ একজন ছাত্রের মধ্যে একসাথে থাকা অত্যন্ত বিরল”। তাঁর জীবনালেখ্য রচয়িতা ইবনে মাসুম লিখেছেন, “কর্মীদের তিনি ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন তাদের দুঃখ-বেদনার সাথী। ভাবতে অবাক লাগে, প্রতিটি কর্মী সম্পর্কে তিনি নোট রাখতেন। প্রতিটি কর্মীর ব্যাপারে নিজের ধারণা লেখা থাকতো তাঁর ডায়েরিতে। ফলে কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় মালেক ভাই, একজন অভিভাবক, একজন নেতা।” তিনি কিশোর ও তরুণদের খুব ভালোবাসতেন। তাদের নিয়ে আগামী দিনের বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। তাইতো তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন, “আমরা চাই দুনিয়ার বুকে একটা ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করতে। আমাদের সেই স্বপ্নের কাফেলায় তোমরাই হবে নিশানবরদার, তোমরাই হবে তার সিপাহসালার।”
৫. ইকামাতে দ্বীনের কাজকে অগ্রাধিকার
“পৃথিবীর হাজারও কাজের ভিড়ে
ইকামাতে দ্বীনের এ কাজ যেন,
সবচেয়ে প্রিয় হয়।
আর কোন বাসনা নেইতো আমার
কবুল করো তুমি
হে দয়াময়।”
-আবু তাহের বেলাল
হ্যাঁ, সত্যিই পৃথিবীর সকল কাজের মধ্যে ইকামাতে দ্বীনের কাজকেই সবচেয়ে বেশি প্রিয় করে নিয়েছিলেন শহীদ আবদুল মালেক। দ্বীনকে তিনি অন্যতম নয় বরং একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। আর এ উদ্দেশ্য পূরণে বাধা হিসেবে যাকিছু সামনে এসেছে তা মাড়িয়ে এগিয়ে গেছেন। স্কুলজীবনে তিনি লজিং থাকতেন মৌলভী মহিউদ্দিন সাহেবের বাসায়। মহিউদ্দিন সাহেব গাইবান্ধায় এক সেমিনারে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুর রহীম আলোচিত “জীবনের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত” বিষয়টি সকলকে বুঝানোর সময় অনুসন্ধিৎসু শহীদ আবদুল মালেক প্রশ্ন করেছিলেন, “চাচা, এ পথের সন্ধান কিভাবে পাওয়া যায়?” হ্যাঁ, এ পথের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন বলেই বগুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হয়েই বাবার কাছে চিঠি লিখেছিলেন, “বাড়ির কথা ভাবি না, আমার শুধু এক উদ্দেশ্য, খোদা যেন আমার উদ্দেশ্য সফল করেন। কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছি এবং কঠোর সংগ্রামে অবতীর্ণ, দোয়া করবেন খোদা যেন সহায় হন। আমি ধন-সম্পদ কিছুই চাই না, শুধুমাত্র যেন প্রকৃত মানুষরূপে জগতের বুকে বেঁচে থাকতে পারি।” কলেজের গ-ি পেরিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করলেন তখন তার এ সঙ্কল্প আরও দৃঢ় হলো। তাইতো ফজলুল হক হলে তার রুমের দরজার ওপর লিখে রেখেছিলেন শহীদ সাইয়েদ কুতুবের সেই বিপ্লবী বাণী “আমরা ততদিন পর্যন্ত নিস্তব্ধ হব না, নীরব হব না, নিথর হব না, যতদিন না কোরআনকে এক অমর শাসনতন্ত্র হিসেবে দেখতে পাই। আমরা এ কাজে হয় সফলতা অর্জন করব নয় মৃত্যুবরণ করব।”
৬. দায়িত্বানুভূতি ও স্বতঃস্ফূর্ততা : দায়িত্বানুভূতি ও স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল শহীদ আবদুল মালেকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম দিক। এ ব্যাপারে শহীদ আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শহীদ আবদুল মালেক ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘আমার প্রিয় সাথী’তে লিখেছেন, “সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে একদিন ঢাকায় প্রবল বৃষ্টি হয়ে গেল। আগামসি লেনস্থ সংঘের পূর্ব পাক দফতর থেকে বেরোবার উপায় ছিল না আমাদের। বস্তির লোকেরা বিশ্ববিদ্যালয় পুরাতন কলাভবন, হোসেনি দালান ও সিটি ল কলেজে আশ্রয় নিয়েছে। আমি কোনোমতে ফজলুল হক হলে গেলাম। ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে আমরা কী করতে পারি সে সম্পর্কে পরামর্শ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। এ প্রসঙ্গে কথা ওঠার আগেই আবদুল মালেকের মুখে খবর পেলাম ঢাকা শহর অফিসে পানি উঠেছে। বৃষ্টি একটু থেমে যেতেই তিনি অফিসে গিয়ে সব দেখে এসেছেন। অধিক পানি ওঠায় কাগজপত্রাদি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবদুল মালেক ওগুলো সব ঠিকঠাক করে এসেছেন। তাঁর দায়িত্ব সচেতনতার এ চাক্ষুষ প্রমাণটুকু আমার পক্ষে কোনোদিনই ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তারপর কর্মীবৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিন নিউমার্কেট ও আরেকদিন জিন্নাহ এভিনিউয়ে রোড কালেকশন করা হলো। অল্প সময়ে কর্মীদেরকে জমায়েত করে এত বড় কাজ আঞ্জাম দেয়ার মতো আর কোনো কর্মীই ছিল না। আমার তো কাজ ছিল শুধু কাগজের টুকরায় কিছু নোট লিখে অথবা আধঘণ্টা পনেরো মিনিটের আলাপে মোটামুটি কিছু বুঝিয়ে দেয়া। আবদুল মালেকের সুদক্ষ পরিচালনায় সংগৃহীত অর্থের নিখুঁত হিসাব পেলাম। সিকি, আধুলি, পাই পয়সা থেকে নিয়ে কত টাকার নোট কতটি, তার হিসেবের ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছিলেন। এরপর তিন দিন তিন রাত একটানা পরিশ্রম করে আবদুল মালেক অল্পসংখ্যক কর্মী নিয়ে চাল বণ্টনের কাজ সমাধান করে ফেললেন। সেদিন আবদুল মালেককে স্বচক্ষে অমানুষিক পরিশ্রম করতে দেখেছি। এই ভাগ্যবান ব্যক্তির পরিশ্রমকে লাঘব করার জন্য সেদিন তার সাথে মিলে নিজ হাতে কিছু করতে পারলে আজ মনকে কিছু সান্ত¦না দিতে পারতাম।”
৭. জবাবদিহির অনুভূতি : ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বশীলদের জন্য সংগঠন পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শহীদ আব্দুল মালেক ভাই ছিলেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অগ্রপথিক। তৎকালীন সময়ে ঢাকা মহানগরীর সভাপতি অধ্যাপক ফজলুর রহমান ভাই আব্দুল মালেক ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “আমি যখন ঢাকা মহানগরীর সভাপতি, মালেক ভাই তখন ছিলেন শাখা সেক্রেটারি। একদিন রাতের বেলায় অফিসে গিয়ে দেখলাম মালেক ভাই মোম জ্বালিয়ে খাতা-কলম নিয়ে হিসাব করছেন। আমি ঢুকে সাংগঠনিক কথা শুরু করলে তিনি হঠাৎ মোমবাতিটি নিভিয়ে দিলেন। মোমবাতি নেভানোর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, বন্যার্ত মানুষের জন্য সংগৃহীত রিলিফের টাকা দিয়ে মোমটি কেনা হয়েছে। রিলিফের টাকায় কেনা মোম দিয়ে সাংগঠনিক কাজ করা ঠিক নয়। পরে তিনি সংগঠনের টাকায় কেনা মোম জ্বালালেন। বন্যাটি ছিল ১৯৬৭ সালের। এ থেকে তার অত্যধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিচয় পাওয়া যায়।”
৮. অনুকরণীয় মডেল : শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (রহ) আবদুল মালেক ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “আমি যখন নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন জিঞ্জিরা (কেরানীগঞ্জ) পিএম হাইস্কুলে আয়োজিত এক শিক্ষাশিবিরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন মালেক ভাই। আমিও যোগদান করেছিলাম সেই শিক্ষাশিবিরে। আমার মনে হয় সেখানে আমি ছিলাম সর্বকনিষ্ঠ কর্মী। রাতে খাবার পর হাত ধৌত করার সময় মালেক ভাইকে দেখলাম তিনি নিজে থালাবাসন পরিষ্কার করছেন। এসএসসি পরীক্ষা শেষে আমি আরো একটি শিক্ষাশিবিরে অংশ নিয়েছিলাম। শহীদ আবদুল মালেক ভাই সেই শিক্ষাশিবিরের পরিচালক ছিলেন। রাতে মালেক ভাইয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের ১১২ নম্বর কক্ষে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হলো। আমার সাথে আমার এক সঙ্গীও সেখানে ছিল। রাতে প্রোগ্রাম শেষে আমরা শয়ন করলাম মালেক ভাইয়ের সিটে। লক্ষ্য করলাম অনেক রাতে তিনি শুইতে এলেন। অতঃপর মাথায় পত্রিকার কাগজ দিয়ে ফ্লোরে একটি চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। এক রাতের ঘটনা। আমার সঙ্গীটি হঠাৎ বিছানা থেকে পড়ে গেলেন। আর মালেক ভাই নিচে থেকে তাকে পাঁজাকোলে ধরে ফেললেন। ফলে সেই ভাইটি কোনো ব্যথা পায়নি। জামালপুরে আশেক মাহমুদ কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র থাকাকালীন একদিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য উঠে দেখি ছাত্রাবাসে আমার কক্ষের সামনের বারান্দায় একটি হালকা ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে মালেক ভাই। আবেগে অভিভূত হয়ে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। খুব অভিমানে জিজ্ঞেস করলাম, কতক্ষণ দাঁড়িয়েছেন, ডাক দিলেন না কেন? তিনি জবাবে বললেন, তিনটার দিকে পৌঁছেছি। ভাবলাম সকালে তো ফজরের নামাজ পড়তে উঠবেই। তাছাড়া চিন্তা করলাম অনেক পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়েছ, তোমার ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে লাভ কী? দুইজনের বদলে একজন কষ্ট করাই ভালো। তাই এখানে দাঁড়ালাম। আমার কিছু অসুবিধা হয়নি।
৯. দৃঢ়তা ও আপসহীনতা : শহীদ আবদুল মালেক জানতেন যে ইসলামী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া মানেই কঠিন পরীক্ষাকে মাথা পেতে নেয়া। সেটা জেনে পথ চলার কারণেই কোনো প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথ আগলে রাখতে পারেনি। ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি ছিলেন আপসহীন, নির্ভীক। পাহাড়সম দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে ছিলেন সম্মুখ পানে। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ভাই এক সময় শহীদ আবদুল মালেক ভাই সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, “আমি যখন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দিলাম তখন এক কর্মী শিক্ষাশিবিরে ঢাকায় এলাম। আবদুল মালেকের কথা শুনেছি কিন্তু তাঁকে তখন পর্যন্ত দেখা হয়নি। তিনি ছিলেন সেই শিক্ষাশিবিরের ব্যবস্থাপক। কিন্তু প্রায় তাঁকে দেখা যেত না। শেষ দিনে এসে তিনি একটা ছোট্ট বক্তব্য দিলেন। তাঁর বক্তব্যটা ছিল এ রকম, “আমরা তো জেনে বুঝেই এ পথে এসেছি। এই পথ থেকে ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।  আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে অনেক দূর পথ পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু সামনের দিকে তাকালে মনে হবে আমাদের আরও অনেক পথ চলতে হবে। এই পথে চলতে গিয়ে যদি আমরা দ্রুতগামী কোনো বাহন পাই তাহলে সেটাতে সওয়ার হয়েই মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছবো, যদি তেমনটা না পাই তাহলে শ্লোথ কোনো বাহনে করে হলেও আমরা সেই মঞ্জিলে পৌঁছার চেষ্টা করবো।”
১০. দাওয়াতি চরিত্র : দ্বীনের দাওয়াতি কাজে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন শহীদ আবদুল মালেক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের সেরা ছাত্র হয়েও তিনি কিভাবে দাওয়াতি তৎপরতায় শামিল ছিলেন এবং দাওয়াতি কাজের প্রতি তাঁর পেরেশানি কেমন ছিলো। এরূপ কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।
# মাসের ১ তারিখেই তিনি লিস্ট করে ফেলতেন কোন কোন ছাত্রের কাছে তিনি দাওয়াত পৌঁছাবেন। লিস্ট অনুসারে বেরিয়ে পড়তেন কাজে।
# আব্দুল মালেক ভাই সবাইকেই সালাম দিতেন। এক নাস্তিক তাঁকে একদিন বলল, আমি সালাম নেই না তবুও আপনি আমাকে বার বার সালাম দেন কেন? তিনি বললেন, সালাম মানে তো শান্তি কামনা করা। আমি কেন আপনার শান্তি কামনা করব না? এভাবেই কথা শুরু। অবশেষে একদিন এই নাস্তিকটিও ইসলামী আন্দোলনের পথে এসেছিলেন আবদুল মালেক ভাইয়ের দাওয়াতি তৎপরতার কারণে।
# আবদুল মালেক ভাই গভীর রাতে জায়নামাজে বসে কাঁদতেন নিজের গুনাহ মাফের জন্য, ইসলামী আন্দোলনের জন্য, বিশ্ব মুসলিমদের জন্য। আর একটি বিষয় নিয়েও কাঁদতেন। সেটি হলো তার দাওয়াতি কাজের সফলতার জন্য। যাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর চিন্তা করতেন তাদের নাম ধরে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে হেদায়েতের জন্য দোয়া করতেন।
# দাওয়াতি কাজ ছিল শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের প্রাণ। সেকারণেই তিনি বলেছিলেন, “আমার প্রিয় ক্যাম্পাসের ছাত্রদের ইসলামের দিকে ডাকব আমার ডান হাত দিয়ে, ইসলামের শত্রুরা যদি আমার ডান হাত কেটে ফেলে তাহলে বাম হাত দিয়ে ডাকব, ওরা যদি আমার বাম হাতও কেটে ফেলে, দুটো পা দিয়ে হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে ডাকব। ওরা যদি আমার দুটো পা-ও কেটে ফেলে তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ছেলেকে ইসলামের দিকে ডাকব। ওরা যদি আমার চলার গতিকে স্তব্ধ করে দেয়, তাহলে আমার যে দু’টি চোখ বেঁচে থাকবে সে চোখ দিয়ে হলেও ছাত্রদের ইসলামের দিকে ডাকব, আমার চোখ দু’টিকে যদি উপড়ে ফেলে তাহলে আমার হৃদয়ের যে চোখ রয়েছে তা দিয়ে হলেও আমি আমার জীবনের শেষ গন্তব্য জান্নাতের দিকে তাকিয়ে থাকবো।”
১১. পরিশ্রমপ্রিয়তা : শহীদ আবদুল মালেক ভাই ছিলেন অনেক বেশি পরিশ্রমী। নূর মুহাম্মদ মল্লিকের ভাষায়, “তাঁকে দেখতাম সারাদিন এবং অধিকাংশ রাতভর কত কাজ করতে। ক্লাস করছেন, সময় পেলে পড়ছেন। এরপর আন্দোলনের কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-আসা করছেন। রাতে হয়তো পোস্টারও লাগাচ্ছেন কর্মীদের সাথে। মনে পড়ে মালেক ভাই অনেক সময় পোস্টার লাগাবার পর অন্যদের কাজ শেষ করার পূর্ব পর্যন্ত একটু সময় পেতেন, তখন সিঁড়িতে ঠেস দিয়ে অথবা পিচঢালা নির্জন পথে একটু বসে বিশ্রাম নিতেন।”
আঁধার কেটেই আসবে আলোর ভোর : ইসলামী আন্দোলনের কাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন, যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার ওপর পাহাড়ের মতো অটল হয়ে থাকবে। অন্য কোন দিকে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে না। পৃথিবীতে যা-ই ঘটুক না কেন, তারা নিজেদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের পথ থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হবে না- সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (রহ)। এমন এক চরিত্রের সফল মানুষ হতে পেরেছিলেন শহীদ আবদুল মালেক। বড় অসময়ে তিনি কাণ্ডারির ভূমিকা রেখেছিলেন। পিছপা হননি দুনিয়ার মোহে বিন্দুমাত্র। শহীদ আবদুল মালেককে নিয়ে কবি মতিউর রহমান মল্লিক লিখেছেন-
মালেক মালেক শহীদ মালেক    
আমাদের সেনাপতি
ঘন দুর্যোগে শত দুর্ভোগে
নির্ভীক এক
চির অবিকল
ভাস্বর সভাপতি।
বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের পথিকৃৎ শহীদ আবদুল মালেক ভাই ছিলেন খুবই আশাবাদী একজন মানুষ। তিনি বলতেন “Shangha will rise, surely rise” অর্থাৎ বিপ্লবের নতুন সূর্য উদিত হবেই, অবশ্যই সেটা হবে। শহীদ আবদুল মালেক ছিলেন একজন জীবন্ত ইতিহাস। তাই প্রিয় আবদুল মালেক ভাইয়ের সংগ্রামী চেতনাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাই নতুনের স্বপ্ন বুনে।” [সমাপ্ত]
-লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ