ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 August 2018, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এশিয়ান গেমসে আর্চারী, শুটিং ও কাবাডিতে পদক জয়ের প্রত্যাশা

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে সোনার হরফে নাম লেখা হয়ে আছে ক্রিকেটের। ২০১০ সালে গুয়াংজু আসরে প্রথমবারের মতো স্বর্ণপদক জিততে পেরেছিল বাংলাদেশ। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটির প্রতি মানুষের আবেদন সে কারণে আরো বেড়ে যায়। বিশেষ করে এশিয়ান গেমসের মতো আসরে স্বর্ণ জয়ী দলের তালিকায় নাম ওঠানোয়। ভবিষ্যতে হয়তো অন্য কোন ডিসিপ্লিন স্বর্ণ জিতবে, তবে প্রথম স্বর্ণ জেতার কারণে ক্রিকেটের নামটি থাকবে সবার উপরে। চার বছর আগে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আসরেও ক্রিকেট ছিল। নারী ক্রিকেট দল রৌপ্য পদক পেলেও ভাগ্যের খেলায় হেরে পুরুষ দলের ললাটে ব্রোঞ্চ পদকের বেশি পাওয়া সম্ভব হয়নি। এবার নারী ও পুরুষ কোন ডিসিপ্লিনই নেই ক্রিকেটের। সে কারণে নিশ্চিত পদকের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে লাল সবুজ প্রতিনিধিরা। আর প্রত্যাশার পারদটা এবার বাক নিয়ে চলে গেছে আর্চারী, শুটিং আর কাবাডিতে, অন্ততপক্ষে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) কর্মকর্তাদেও কথায় সেরকমটি পরিস্কার হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা ও পালেমবাংয়ে আগামী ১৮ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ার সেরা এই প্রতিযোগিতা। ৪০টি ডিসিপ্লিনে খেলা হলেও বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে ১৪টিতে। সেখানে ফুটবল, হকির পাশাপাশি আর্চারী, শুটিং, সাতার, ভারোত্তোলন, রেসলিং, বিচ ভলিবল, গলফ, রোইং, অ্যাথলেটিক্স, বাস্কেটবল, ব্রিজ ও কাবাডি। ফুটবলে যেমন সর্বোচ্চ ২০ জন খেলোয়াড় অংশ নেবেন অন্যদিকে সর্বনি¤œ ১ জন খেলোয়াড় রয়েছেন রোইংয়ে। অংশ নেওয়া  ১১৭ জন অ্যাথলেটের মধ্যে ৮৬ জন পুরুষ ও ৩১ জন নারী রয়েছেন। ১৯৮৬ সালে প্রথম পদক হিসেবে বক্সিং থেকে মোশাররফ হোসেন ব্রোঞ্চ জিতেছিলেন। সেটিই ১২টি পদকের মধ্যে সবার উপরে রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত পুরস্কারের দিক থেকে এটি এখনো একক কৃতিত্ব হয়ে আছে। এবার ব্যক্তিগতভাবে কোন পদক জয়ের সম্ভাবনার কথা কোন ডিসিপ্লনের খেলোয়াড়রা বলতে পারেননি। বিওএ কর্মকর্তারাও শুধুমাত্র সম্ভাবনা হিসেবে আর্চারী, শুটিং আর কাবাডির নাম বলেছেন। কোন পদক জয়ের কথা জোর দিয়ে বলতে পারেননি। এর বাইরে গলফ ও ব্রিজ সম্ভাবনাময় হিসেবে কমর্কর্তাদের প্রত্যাশায় রয়েছে। সে হিসেবে অনেকটা পরিস্কার করেই বলা যায় বাংলাদশের পদক জয় একটা অঘটনের মতোই মনে করছেন কর্মকর্তারা। পাশাপাশি এশিয়ান গেমসকে এসএ গেমসের প্রস্তুতির টুর্নামেন্ট হিসেবে নিয়েছেন খেলোয়াড়রা। কারণ কিছুটা কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দক্ষিন এশিয়ার অলিম্পিকখ্যাত টুর্নামেন্টে খেলতে হবে।
এখন তাই অংশগ্রহণ আর একটা দুইটা পদক জয়ের স্বপ্ন দেখাটাই মূল কাজ হয়ে আছে। এই যেমন সম্ভাবনা থাকলেও অনেক ডিসিপ্লিন ভাল করতে না পারার সম্ভাবনা রয়েছে। সাঁতারের নাম এলেই চোখে ভাসে মোশাররফ হোসেনের ছবি। সাফ গেমসে একাই পাঁচটি ইভেন্টে সোনা জিতে রেকর্ড বুকে নিজের নাম লিখে রেখেছেন। তার এই সাফল্য দেখে ভারতীয়রা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন সেদিন আর বেশি দূরে নয় অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ পদক জিতবে। এই কিংবদন্তি সাঁতারুকে ঘিরে সাঁতারে বাংলাদেশ বড় সাফল্যর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। তার বিদায়ের পরই সাঁতারে করুণ অবস্থা সৃষ্টি হয়। তৈরি হয়নি দ্বিতীয় আরেক মোশাররফ। অবস্থা এতটা নাজুক হয়ে পড়েছিল যে সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে পদক জেতাটা স্বপ্নে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে সেই বন্ধ দুয়ার খুলেন নারী সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শিলা। ভারতে অনুষ্ঠিত এস এ গেমসে একাই দুই ইভেন্টে সোনা জিতে চমক দেখান। অন্য কোনো প্রতিযোগিতায় নেই কোনো সাফল্য। গতবার এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। এবার সামনের মাসে জার্কাতায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে সাঁতারে দল পাঠানো হচ্ছে। পুরুষ বিভাগে মাহফিজুর রহমান সাগর ৫০, ১০০ ও ২০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে অংশ নিবেন। নারী বিভাগে খাদিজা ৫০ ও ১০০ মিটার বেস্ট স্টোক ও ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইলে অংশ নিবেন। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এম বি সাইফ বলেছেন, দুই সাঁতারু দীর্ঘ সময়ে প্রশিক্ষণে আছেন। সাগর থাইল্যান্ড থেকে উচ্চতর ট্রেনিংও নিয়ে এসেছেন। এরপরও পদক জেতার সম্ভাবনা নেই বলে জানালেন তিনি। তার কথা, এশিয়ান গেমসে পদক জিতব সেই মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারি না। তবে এতটুকু বলব ওরা টাইমিংয়ে উন্নতি করবে। লক্ষ্য আমাদের সামনে এস এ গেমস। এশিয়ান গেমস নিজেদের পরীক্ষা করে দুই সাঁতারু নিজেদের মেলে ধরবে আশা রাখি। অর্থাৎ এশিয়ান গেমসেই হবে দুই সাঁতারু ওয়ার্ম আপ। বুসান এশিয়ান গেমসে ৩২ গোল হজম করে দেশকে লজ্জায় ডোবানোর পরও এশিয়ান গেমসে পাঠানো হচ্ছে ২৪ সদস্যের ফুটবল দল।
ইন্দোনেশিয়ায় এবারের এশিয়ান গেমসের মহারণে অংশ নেবে ১৬৫ সদস্যের বাংলাদেশ দল। আরও ১৭ জন যুক্ত হয়েছেন লটবহরে। বাংলাদেশ দলের ১৬৫ জনের মধ্যে সরকারি খরচে যাচ্ছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সচিব মাসুদ করিম। নিজেদের খরচে যাচ্ছেন তিনজন। ১৮ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও পালেম্বাং শহরে উদ্বোধন হবে এশিয়াডের। তার আগেই ফুটবল মাঠে গড়াবে। গেমস শেষ হবে ২ সেপ্টেম্বর। ১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ প্রথম অংশ নেয়। সেই থেকে আটটি এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ অংশ নিয়ে একটি স্বর্ণ ও চারটি করে রুপা এবং ব্রোঞ্জ জেতে। এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ আর্চারী, অ্যাথলেটিক্স, বাস্কেটবল, গলফ, ব্রিজ, ফুটবল, হকি, কাবাডি, শুটিং, সাঁতার, ভারোত্তোলন, বিচ ভলিবল, কুস্তি ও রোইংয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা করবে। ২০১৬ সালে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে ভুটানের কাছে ৩-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল দল। তারপর থেকে দু’বছর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নির্বাসিত ছিল বাংলাদেশ। এতসব ব্যর্থতার পরও সবচেয়ে বড় ২৪ সদস্যের ফুটবল দল যাচ্ছে জাকার্তায়। ফুটবলের পরেই রয়েছে ২১ জনের হকি দল। পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে কাবাডি দল ২৮ জনের। ২২ জনের শুটিং দলে ১৭ জন শুটার এবং পাঁচজন কোচ ও ম্যানেজার রয়েছেন। আরচারি দলে রয়েছেন ১৭ জন। দু’জন অ্যাথলেটের সঙ্গে একজন কোচ ও বাস্কেটবলে কোচ কাম ম্যানেজার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন চার খেলোয়াড়কে। ছয় গলফারের সঙ্গে রয়েছেন একজন করে ম্যানেজার ও কোচ। এশিয়ান গেমসে কোয়ালিফাই করেছে ব্রিজও। ছয়জনের দল যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ায়। দুই সাঁতরু মাহফিজুর রহমান সাগর ও খাদিজা আক্তারের ম্যানেজার কাম কোচ নিবেদিতা দাস। ভারোত্তোলক মাবিয়ার সঙ্গে কোচ হয়ে যাচ্ছেন ফিরোজা পারভীন। বিচ ভলিবলে পালেম্বাং মাতাতে যাচ্ছেন মনির হোসেন ও শাহজাহান আলী। কুস্তিগীর শিরিন সুলতানা, শরৎচন্দ্র রায় ও আমজাদ আলীর সঙ্গী হয়েছেন রোয়ার আমিরুল ইসলাম মিঠু।
১৭ সদস্যের অফিসিয়াল প্রতিনিধি দলের অন্যরা হলেন- সেফ দ্য মিশন লে. জেনারেল আবুল হোসেন, ডেপুটি সেফ দ্য মিশন অভিজিৎ কুমার সরকার, বিওএ’র ডেলিগেট মাহমুদ জামাল, একেএম সেলিম, হামিদা বেগম, টিম ডাক্তার অধ্যাপক জাকির আহমেদ, ডাক্তার সুমাইয়া বিনতে আজাদ, টিম ফিজিও শৈলেন্দু কুমার মজুমদার, প্রেস অ্যাটাচি শেখ সাইফুর রহমান ও বিওএ’র চারজন স্টাফ। ১৯৮৬ সিউল এশিয়াডে বাংলাদেশের বক্সার মোশাররফ হোসাইন লাইট হেভিওয়েট ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতে দেশকে প্রথম পদক উপহার দেন। ১৯৯০ বেইজিং এবং ’৯৪ হিরোশিমা এশিয়াডে কাবাডি পুরুষ দল রুপা জিতলেও ১৯৯৮ ব্যাংকক এশিয়াডে তা হয়ে যায় ব্রোঞ্জ। ২০০২ বুসানে কাবাডি দল আবার রুপা জিতলেও পরেরবার দোহায় তা হারিয়ে যায়। ব্রোঞ্জ নিয়ে দেশে ফেরে বাংলাদেশ কাবাডি দল। এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন ২০১০ গুয়াংজু এশিয়াডে। ওই গেমসে বাংলাদেশ পুরুষ ক্রিকেট দল স্বর্ণ ও মহিলা দল রুপা এবং মহিলা কাবাডি দল ব্রোঞ্জ জেতে। ২০১৪ ইনচনে পুরুষ ক্রিকেট দল রুপা ও মহিলা দল ব্রোঞ্জ জেতে। কাবাডি মহিলা দল ব্রোঞ্জ নিয়ে দেশে ফিরলেও অন্য কোনো ডিসিপ্লিনে সাফল্য ছিল না। বাংলাদেশ কেন প্রতিবারই বড় বহরের দল নিয়ে অংশগ্রহণ করছে, অধিকাংশ কর্মকর্তা একটাই কথা বলবেন, অভিজ্ঞতা অর্জন। ১৯৭৪ সালে নতুন দেশ হিসেবে এশিয়ান গেমসে অভিষেক হয় বাংলাদেশের। ১৯৭৮ সাল থেকে ঢালাওভাবে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু এখনো যদি অভিজ্ঞতার কথাই বলে তাহলে শিখবে কবে?
শুটিংয়ে কমনওয়েলথ গেমসে দুবার সোনা ও একাধিকবার রুপা এলেও এশিয়ান গেমসে কোনো সাফল্য নেই। অ্যাথলেটিক্স ও সাঁতারে তো পদক জয়ের আশা স্বপ্নেও ভাবা যায় না। শুটিং থেকে আশা করা গেলেও খ্যাতনামা শুটারদের সামনে বাংলাদেশ কুলিয়ে উঠতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। পদকই যদি না আসে তাহলে গেমসে পাঠিয়ে লাভ কি? পদক যে আসবে সেধরনের প্রস্তুতি নিতে পারছে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন। অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন জানে, চার বছর পর পর এশিয়ান গেমস হয়ে থাকে। তাহলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে না কেন? ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই বা নীরব কেন? বার বার দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নেবেন আর খালি হাতে ফিরবেন এই লজ্জা থেকে কখনো কি বের হয়ে আসা যাবে না? এদিকে এশিয়ান গেমসে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার পর যাওয়া হচ্ছেনা তার। বাংলাদেশ দলেরও সদস্য তিনি। তা সত্ত্বেও বাবার অসুস্থতার দরুন ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়া হচ্ছে না লন্ডনপ্রবাসী ট্র্যাপ শুটার কাইসুর মিয়ার। বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইন্তেখাবুল হামিদ অপু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, ‘ক্যান্সারে আক্রান্ত কাইসুরের বাবা। বাবার পাশে থাকতে সে যেতে পারছে না। বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করেছি আমরা।’ এবারের এশিয়ান গেমস শুটিং ইভেন্ট হবে ইন্দোনেশিয়ার পালেম্বাংয়ে। বাংলাদেশের ২১ জনের শুটার দল গেমসে অংশ নেবে। ১৬ জন শুটার এবং পাঁচজন কোচ। গেমসের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল মিশ্র দলগতে অর্ণব শারার ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান, ১০ মিটার এয়ার পিস্তল মিশ্র দলগতে নূর হাসান আলিফ, আরদিনা ফেরদৌস লড়বেন। পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ব্যক্তিগত ইভেন্টে আবদুল্লাহেল বাকি ও রিসালাতুল ইসলাম, মহিলাদের এই ইভেন্টে উম্মে জাকিয়া সুলতানা ও শারমিন আক্তার রতœা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এখন দেখা যাক কতটা মান বাঁচে বাংলাদেশের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ