ঢাকা, বৃহস্পতিবার 16 August 2018, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ৪ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাজে সময় পার করছে ভারতীয় ক্রিকেট দল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে টানা দুটি টেস্ট হারল ভারত। লর্ডসে তো রীতিমতো নাস্তানাবুদই হয়েছে বিরাট কোহলির দল। আকাশে উড়তে থাকা ভারতীয় ক্রিকেট দলের সামনে হঠাৎ করেই যেন মন্দ সময় উপস্থিত। অনেকেই বলছেন, ভারত অতীতে কখনোই এমন বাজে সময় পার করেনি। ভারতের এমন বাজে হারে সমালোচনার মুখে কোহলিরা।
ইংল্যান্ডে গিয়ে কি ব্যাটিংটাই ভুলে গেল ভারত! এজবাস্টনে তা-ও বিরাট কোহলির ধ্রুপদি এক ইনিংস কিছুটা হলেও মান বাঁচিয়েছিল ভারতীয়দের। কিন্তু লর্ডসে ইংল্যান্ডের সুইং বোলিংয়ে কোনো জবাবই দিতে পারল না বিরাট কোহলির দল। ফল, কোহলির অধিনায়কত্বে প্রথমবারের মতো ইনিংস পরাজয় জুটল ভারতের। তা-ও কিনা তিন দিনের মধ্যে। ইংল্যান্ডের ইনিংসের এক পর্যায়ে তেমন একটা সুইং পাচ্ছিলেন না ভারতের পেসাররা। মনে হচ্ছিল ব্যাটিংয়ের জন্য ভালোর দিকে লর্ডসের উইকেট।
তবে ভারতের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হতেই দেখা মিলল সুইংয়ের। তাতে উড়ে গেল অতিথিদের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপ। অনায়াসে জিতল ইংলিশরা। দ্বিতীয় টেস্ট ইনিংস ও ১৫৯ রানে জিতেছে জো রুটের দল। পাঁচ ম্যাচের সিরিজে স্বাগতিকরা এগিয়ে ২-০ ব্যবধানে। প্রথম ইনিংসে ১০৭ রানে গুটিয়ে যাওয়া ভারত দ্বিতীয় ইনিংসে করেন ১৩০ রান। চার দিনে শেষ হয়ে যাওয়া ম্যাচের প্রথম দিন মাঠে গড়ায়নি কোনো বল। পরের তিন দিনও বারবার বিঘœ ঘটে বৃষ্টির বাধায়। ইংল্যান্ডকে আরেকবার ব্যাটিং করাতে দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৯ রান করতে হতো ভারতকে। তবে ব্যাটিং ব্যর্থতায় তার ধারে কাছে যেতে পারেনি বিরাট কোহলির দল।
ভারতজুড়েই এখন সমালোচনা কোহলির দলের। টাইমস অব ইন্ডিয়ার শিরোনাম, ‘লর্ডসে ভিখারি ভারত’। তা ভিখারির মতোই সিরিজ কাটছে ভারতের, বিশেষ করে ব্যাটসম্যানদের। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে প্রতি ১৬.৮২ রানে একটি করে উইকেট হারিয়েছে ভারত। ব্যাটিং গড়টা ২০০২ সালের নিউজিল্যান্ড সফরের পর ভারতের সর্বনিম্ন। দেশের বাইরে ঠিক আগের সিরিজটাতেও ভারতের ব্যাটিং ভালো হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই সিরিজে ভারতের ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ২০.৬০। ঊঢ়ৎড়ঃযড়সধষড় ইংল্যান্ডে সর্বশেষ দুই সফরে অবশ্য এতটা বাজে ছিল না ভারতের ব্যাটিং। ২০১৪ সালে যে সিরিজে ৩-১ ব্যবধানে হার সেই সিরিজে ভারতের ব্যাটিং গড় ছিল ২৫.৭৩। ২০১১ সালে ৪-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই হওয়া সিরিজেও ২৫-এর ওপরে ছিল কোহলিদের গড়। লর্ডসে ভারতের ব্যাটিং কত বাজে হয়েছে, তার প্রমাণ একটি তথ্যেই আছে। দুই ইনিংসেই দলটির হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংস ৮ নম্বর ব্যাটসম্যান রবিচন্দ্রন অশ্বিনের। অ্যান্ডারসন-ব্রডদের সুইংয়ের সামনে ভারতীয়দের অসহায়ত্বটাই ফুটে উঠছে। সমালোচনাটা ব্যাটিংয়ের টেকনিক নিয়েই বেশি। ভারতের দলপতি কোহলিও মাথা পেতে নিচ্ছেন সেসব সমালোচনা। ব্যর্থতার পেছনে কোনো অজুহাতও দাঁড় না করিয়েই বললেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে দেশের জন্য খেলা। আমাদের এর চেয়ে ভালো খেলা দরকার ছিল। এটা মেনে না নিলে উন্নতি করা সম্ভব না, সম্ভব না প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। যেসব ভুল করেছি সেগুলো মেনে নিতে হবে। ভুল তো হতেই পারে...। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওগুলোর পুনরাবৃত্তি না করা।’
ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চান না বলেই কোহলি বেশি ভাবতে চান না হেরে যাওয়া দুটি টেস্ট নিয়ে। চোখ রাখছেন ট্রেন্ট ব্রিজে আগামী শনিবার শুরু হওয়া তৃতীয় টেস্টে। লর্ডস টেস্টটা এক দিন আগে শেষ হওয়াটাকে শাপেবর হিসেবেই দেখছেন পিঠের চোট নিয়ে ব্যাটিং করা কোহলি। সেরে উঠতে একদিন সময় যে বেশি পাওয়া গেল! আপাতত দলের ব্যাটিং লাইনআপের যা অবস্থা, পুরো ফিট কোহলিকেই দরকার হবে ভারতের। বাকিদের ব্যাটিং দেখে তো অনেকেই ভাবছেন ভারত না আবার ধবলধোলাই হয়ে যায় সিরিজে। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জো রুট অবশ্য মনে করছেন কাজটা কঠিন। ভারতকে ধবলধোলাইয়ের স্বপ্ন দেখেন কি না, পরশু এই প্রশ্নে একটু সাবধানী উত্তরই দিলেন রুট, ‘অবশ্যই, এটাই তো স্বপ্ন হওয়া উচিত। পাঁচটি পরিপূর্ণ পারফরম্যান্স, পাঁচটি জয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মতুষ্টিতে না ভোগা, ঔদ্ধত্য না দেখানো ও বেশি দূরে চোখ না রাখা।’ ভারত যে বিশ্বের এক নম্বর টেস্ট দল সেটাও মনে করিয়ে দিলেন রুট, ‘আমরা বিশ্বের এক নম্বর দলের বিপক্ষে খেলছি। ওদের প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে উন্নতির ধারাটা যেন থাকে।’ এদিকে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে প্রশ্ন উঠেছে রবি শাস্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের জন্য শাস্ত্রীর নিয়োগ কতটা উপকার বয়ে এনেছে, সেটি নিয়ে ভাবা শুরু করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারা। বিসিসিআইয়ের এক কর্তা বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বলেছেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না রবি শাস্ত্রী ও দলের বর্তমান কোচিং স্টাফের অধীনে আমরা ২০১৪-১৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে হেরেছিলাম। গত বছর হেরেছি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। দুটিই ছিল বড় টেস্ট সিরিজ। এখন আমরা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খাদের কীনারায় আছি।’ বিসিসিআইয়ের অন্তর্র্বতীকালীন কমিটি ইতিমধ্যেই শাস্ত্রীর কাছে বার্তা পাঠিয়েছে। সেখানে স্পষ্টই বলে দেওয়া হয়েছে, ইংল্যান্ডে ভারতীয় দল যা খেলেছে, সেটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ভারতীয় ক্রিকেট দল শেষ কবে পড়েছিল অনেকেরই হয়তো মনে নেই।
ইংল্যান্ডের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ ভারতের। ফলে ক্ষোভটাও বেশী। বড় ব্যবধানে হারের পর কোহলিদের উপর ভীষণ ক্ষেপেছেন সাবেকরা। বীরেন্দ্রর শেবাগ থেকে শুরু করে বিষেণ সিং বেদী-ভারতীয় কিংবদন্তিরা রীতিমত ধুয়ে দিচ্ছেন উত্তরসূরীদের। টানা দুই টেস্টে ভারতের হার দেখে সাবেক ওপেনার বীরেন্দ্রর শেবাগ টুইট করেছেন, ‘খুবই বাজে পারফরম্যান্স ভারতের। যখন আমরা সবাই দলের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের সমর্থন দিচ্ছি, তখন তারা ভালো করছে না। নিদেনপক্ষে লড়াইটাও করতে পারছে না, এটা দেখা আসলেই খুব হতাশার। আশা করছি এই অবস্থা থেকে আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক শক্তি নিয়ে ফিরতে পারবে।’ কিংবদন্তি স্পিনার বিষেণ সিং বেদী লিখেছেন, ‘লর্ডসে অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারত। যারা দূর থেকে ভারতীয় ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত, তারা সবাই জানেন সমস্যাটা কি কিংবা কোথা থেকে এটার উৎপত্তি। তবে তারা দলকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কোনো কথা বলবেন না। ব্যাটিং বিপর্যয়ের চেয়ে এটা বেশি হতাশাজনক।’
সাবেক ব্যাটসম্যান ভিভিএস লক্ষ্ণ লিখেছেন, ‘প্রতিকূল কন্ডিশনে ধরা পড়তে হলো। ভারতের লর্ডস টেস্ট দেখে মনে হলো, প্রতিপক্ষ কি ছুঁড়ছে, সেটা বুঝতে পারছ না তারা। লড়াইটাও করতে পারল না।’ আরেক সাবেক মোহাম্মদ কাইফের টুইট, ‘দুই ইনিংসে মাত্র ৮২ ওভার টিকতে পারল ভারত। ভুল থেকে তারা শিখছে না, যেটা দেখা খুবই হতাশার। এই টেস্টে তো সব ডিপার্টমেন্টেই ভেঙে পড়েছে।’ শচীন টেন্ডুলকারের বন্ধু ও সাবেক ব্যাটসম্যান বিনোদ কাম্বলি লিখেছেন, ‘এই টেস্টে আমাদের পুরো মনোভাবই ছিল রক্ষণাত্মক। তার চেয়ে বড় কথা, আমরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা না খেলে ইংলিশ বোলারদের চড়ে বসতে দিয়েছি। সামনের দিনগুলোর জন্য টিম ইন্ডিয়ার থিংক ট্যাংককে আরও অনেক বেশি ভাবতে হবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ