ঢাকা, শুক্রবার 17 August 2018, ২ ভাদ্র ১৪২৫, ৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রতিশ্রুতিশীল কবি শাহিদ উল ইসলাম ও তার ‘কাকাতুয়া তব হেরা’

রাজু ইসলাম : যুগশ্রেষ্ঠ কবি তিনি নন, তবে তিনি যুগকে ধরতে পেরেছেন। কালের সমসাময়িক বিষয় তার কবিতায় উঠে এসেছে আধুনিক কাব্যধারায়। উত্তরাধুনিকতা তার কবিতার প্রধান উপসর্গ। কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন গ্রাম-বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য। বাংলার মাঠ, ঘাট, নদী মাটি, প্রকৃতি, প্রেম ও বাংলার মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা। কবিতাই তার অনবদ্য ভালোবাসার উপকরণ তা কবির এই কবিতায় স্পষ্ট। 

‘প্রিয়া, তোমার চাইতে অধিক প্রিয় আমার আলুথালু

কাব্য

নেই ক্ষতি নেই কোন এতে যদি আমার প্রতি তোমার 

ভালোবাসা হলেও হয় নাব্য

............................................

জুড়ে তাই কাব্য চাষ তোমার চেয়ে ঢের বেশী চষি বিশ্বাসে।’

                              -প্রিয়ার চেয়ে অধিক প্রিয়।

কবিতায় কি করে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে প্রকৃতি, কবিতা কি করে পাবে অমরতা, কি করে কবিতায় চাষ হবে শব্দ ও কৃষকের স্বপ্নের চারণভূমি, কি করেই বা কবিতা প্রাণ পাবে শব্দের খেলায়, ন্যায্য অধিকারের কথা কোন কিছু বাদ যায়নি তার কবিতায়। ন্যায্যতার দাবীতে কবি তার প্লট এঁকেছেন এইভাবে-

‘শস্যবন্ত হয়ে উঠুক কালের কবি ওহে 

তোমার চারণভূমি

...........................

লেখো খোদার রাহে

জমিনের সব কথা ও লাল গালিচার সমাচার, 

লেখো ভূমির প্রতি 

জলের, বৃক্ষের প্রতি কুঠারের অধিকার।’

Ñশিরোনামহীন কবিতা

বর্ষায় জলের জন্য কতক জলজ জীবন প্রাণ পায়, পায় বৃক্ষ প্রাণ, প্রাণ পায় জমিন চাষাবাদের নিমিত্তে। বর্ষায় যদি বর্ষণই না হয় তবে তা কিসের বর্ষা ? উত্তরাধুনিক যুগে গান গেয়ে গেয়ে ছেলে মেয়েরা বৃষ্টির আরাধনা করতো। আনন্দে গাইতো, আল্লাহ মেঘ দে, ছায়া দে, পানি দে...। তা-ই কবি তুলে এনেছেন এই কবিতায়। 

‘বৃক্ষের লোলুপ দৃষ্টি আটকে থাকে নীলের মেঘ 

এই দেখে যায় বোঝা এলোরে বাণ আকাশ ভেঙে।

আল্লাহ মেঘ দে ছায়া দে পানি দে কেউ উঠে গেয়ে 

উলঙ্গ জমিন ও নেংটা বৃক্ষও শূন্যে থাকে চেয়ে।’

                               -জলকুমারী

 

উত্তরাধুনিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন কবি আরো একটি কবিতায়-

 

‘আমার রূপ কথার ঘোড়া কদভানু দাদীজান 

যেমন খোয়া গেছে, তেমন হারিয়েছে শরৎ।’

                           -শরৎ নেই শরতে।

কবিতায় কবির চিরচেনা শরতের প্রকৃত রূপ হারিয়ে গেছে। ঠিক যেমন হারিয়েছে দাদীজান। কাশবন আকাশ বাতাস প্রকৃতি কোথাও শরতের প্রকৃত রূপ নেই। বর্ষাই যেন খেয়ে নিয়েছে শরতের সুন্দর আকাশ ও নদ-নদী।

ভাষা চিরকাল পরিবর্তনশীল, প্রতি নিয়তই ভাষার সংস্কার পরিবর্তন পরিবর্ধন হচ্ছে। এতে কবি শংকায় পড়ে গেছেন কবির ভাষাই আবার না অবোধগম্য হয়ে যায়। অস্থিরতা থামিয়ে ভাষাকে স্থির হয়ে যেতে বলেছেন কবি তার এই কবিতায়।

‘ভাষা ও বিশ্বাস ঘাতক কেবলি খোলস পাল্টায় 

কালো ঘষা মাজায় সে এক প্লাটফর্ম থেকে 

অন্য প্লাটফর্মে দাঁড়ায়। 

চন্ডিদাসের ভাষাও যেন আজ 

বিশেষজ্ঞ ছাড়া গলধঃকরণও ভীষণ দায়!

এখনো কি হয়নি সময়

ভাষা তোমার স্থির চিত্তে বসবাস করার!’

                            Ñবুঝে নিও কবির ভাষা।

শহুরে মেকী খাবারে বিরক্ত হয়ে শিশুরা গ্রামীণ ঐতিহ্য শিতের পিঠাপুলি আর গ্রাম্য পিঠায় মানুষ ফিরে যাবার ফুসরত না পেলেও শিশুরা দাদী নানীর কাছে শুনে শুনে শীতপিঠার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে। শেষে দাবী জানায় জোর দাবী। এবার শীতে তারা গ্রামে যাবেই যাবে। কবিতায়- 

 

‘শিশুর দফায় এক দাবী দাদী বাড়ী যাবো।

খেজুর রসে ভেজা ভেজা চিতই পিঠা খাবো

পরগাছা সব হটডগে আর নেই তো আজ রুচি

ভাঁপা সেয়ই পাটিসাপ্টায় তাইতো রুচি খুঁজি।’

                       - কালের শীতের পাখি

 

                       Ñএ দেশ আমার শস্যমালীর

 

 

রাজনৈতিক বলি হয়ে রাস্তায় পরে থাকে লাশ। লাশগুলো কোনটি কোন দলের তা চিনে চিনে চলে আলাদাকরণ কিন্তু যে রক্ত পরে থাকে রাজপথে তার বিভাজন হয় না। হয় না কোন সনাক্তকরণ। তারই উজ্জ্বল বয়ান কবির এই কবতিায়-

 

‘হঠাৎ হঠাৎ চিৎকারে কেঁপে ওঠে

ক্যাম্পাসের বায়ু অতপর লাশ

................................

অথচ পৃথকত্ব পায় না কোন রক্তে

খুনে লাল এক হয়ে যায় মাটি।’

- খুন এক ও অবিভাজ্য (পঙক্তি)

 

এতকিছুর পরও কবি প্রেম ও প্রেয়সীকে ছোট করে দেখেননি। দেখেছেন এক উদার মূর্তি নিয়ে। ঊর্ধ্বে তুলেছেন হৃদয় সিংহাসনে।

ফুলের চেয়ে সৌন্দর্য ও সুশোভিত বলেছেন প্রিয়াকে-

 

‘আমি ক্ষণজন্মা ফুল শুকি না

শুকি তোমার হৃদয়ের কোমল ঘ্রাণ

ফুলেতে তৃপ্তি আসে না আমার

খুঁজি আত্মার প্রেয়সী মহাপ্রাণ।’

- প্রত্যাবর্তন

 

মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে হাজারো স্বপ্ন দেখে, কেউ সাদা কালো কেউ রঙিন, একেকজনের স্বপ্ন একেক রকম। স্বপ্নে কেউ প্রাসাদ গড়ে কেউ আবার খুজে প্রিয়া। হাজার দুঃখেও মানুষ স্বপ্ন দেখে পাহাড়সম সুখের। কিন্তু কল্প স্বপ্ন আর বাস্তব স্বপ্ন এক নয়। চিরকাল সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। কবির ভাষায়-

‘স্বপ্নে স্বপ্নে বেঁচে আছি

আমি তুমি আর অন্য সবে

নেই স্বপ্নের কাছাকাছি

আছে কি এমন কেহ ভবে।’

      -কল্প স্বপ্ন যথা তথা

 

এক অনবদ্য রাজনৈতিক সত্যি কথন লিখেছে কবি ‘ল্যাখ এক একে এক’ কবিতায়। রাজনৈতিক ডামাডোলে পিষ্ঠ হয়ে মরে নাবুঝ যুবক। কিন্তু তার ফায়দা লুটে রাজনৈতিক দল। বলি হতে হয় তৃণমূল কর্মীকে। কখনো কখনো আন্দোলন চাঙ্গা করতে নিজের দলের কর্মী হত্যা করে তার লাশ নিয়ে মিছিল করতেও এই পৈচাশিক সমাজের রাজনীতিকরা কুণ্ঠা বোধ করে না।

কবিতায়- 

‘রাজ রাজারা ঠিকই আছে কালের প্রলেপ মেখে

কলুর বলদ মানুষ এখন লাইনটা যেমন ল্যাখে

তবু আামর নাবুঝ ছেলে রাজমিছিলেই হাঁটে

কররোজ তাই তার মাথাতেই রাজনীতিটা ফাটে।’

                  -ল্যাখ, এক একে এক

অবশেষে বলা যায় কবি শাহিদ উল ইসলাম তার কবিতায় তুলে এনেছেন সমাজের নানা অনিয়ম, নানা ক্রাইসিস। কালের স্বাক্ষী তার প্রত্যেকটি কবিতা। যুগের পরিস্থিতি সমহিমায় বিরাজ করে তার লেখায়। অমর হোক তার কবিতা, অমর হোন তিনি। ১৬ আগস্ট কবির পঞ্চাশতম জন্মদিনে আমাদের এই-ই চাওয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ