ঢাকা, শুক্রবার 17 August 2018, ২ ভাদ্র ১৪২৫, ৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদুল আযহার কাহিনী

ইকবাল কবীর মোহন : ঈদ মানে খুশি। বছর ঘুরে এই ঈদ উৎসব আমাদের জীবনে বয়ে আনে অনাবিল আনন্দ। মহান স্রষ্টা  মুসলমানদের জন্য বছরে দু’টি খুশির দিন নির্ধারণ করেছেন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। আমরা ঈদুল আযহা নিয়ে আলোচনা করব।  ঈদুল আযহাকে আমরা কুরবানির ঈদ বলে জানি। কুরবানি মানে কি, তা দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। 

‘কুরবানি’ আরবি শব্দ। আরবি ‘কুরবুন’ বা ‘কুরবানুন’ থেকে এর উৎপত্তি। এর অর্থ নৈকট্য, উৎসর্গ, ত্যাগ ইত্যাদি। অতএব, কুরবানি বলতে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে তাঁরই দেয়া বিধান অনুযায়ী ত্যাগ বা উৎসর্গ করাকে বুঝি। ঈদে আমরা আনন্দ করি, নতুন নতুন জামা-কাপড় পরি। নানা রকম মজার খাবার খেয়ে তৃপ্তি পাই। অথচ এই আনন্দময়  ঈদের সাথে ত্যাগের সম্পর্ক কি তা আমাদের জানতে হবে। 

কুরবানির এই ইতিহাস বেশ পুরোনো। দুনিয়ার প্রথম মানব হজরত আদম (আ) এর সময় থেকেই কুরবানি চলে আসছে। তারপর থেকে সকল নবী-রাসূলের সময় কুরবানির প্রথা প্রচলিত ছিল। এ প্রসঙ্গে সূরা আল্লাহ পাক বলেন, ‘এবং আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির এক রীতি-পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ঐসব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে যেসব আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন।’- সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত : ৩৪

শেষনবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর আমলেও কুরবানির নিয়ম প্রচলিত ছিল। আদম (আ)-এর দুই ছেলের কুরবানির ঘটনা কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আর তাদেরকে আদমের দুই ছেলের সঠিক কাহিনী শুনিয়ে দাও। তারা দু’জন কুরবানি করলে তাদের একজনের কুরবানি কবুল করা হলো। অন্য জনেরটা কবুল করা হলো না।’- সূরা আল-মায়েদা, আয়াত : ২৭ 

তবে ঐ কুরবানির ঘটনার সাথে ঈদুল আযহার কুরবানির প্রেক্ষাপট একেবারে আলাদা। বর্তমানে যে কুরবানি প্রচলিত আছে তা মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ)-এর প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাইল (আ)-কে কুরবানি করার ঘটনার সাথে জড়িত। ইবরাহিম (আ)-এর সুন্নাত হিসেবে ঈদুল আযহা উদযাপিত হয়। আরবি জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পালিত হয় ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহার নামাজ জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। তবে জিলহজ্ব মাসের ১০,১১ ও ১২ এই তিন দিন  হালাল পশু কুরবানির বিধান রয়েছে। জিলহজ্ব মাসে ঈদুল আযহা পালিত হয় বলে মহান আল্লাহ এই মাসকে অনেক মর্যাদা দান করেছেন। 

 

হজরত ইবরাহিম (আ)-এর কুরবানির ঘটনা খুবই চমকপ্রদ। আজও মুসলিম জাতি অতি পবিত্রতা ও শ্রদ্ধার সাথে এই ঘটনা স্মরণ করে। আল্লাহর প্রিয়নবী হজরত ইবরাহিম (আ)। ইরাকের এক পুরোহিত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নাম আজর এবং মাতার নাম আদনা। পিতা ছিলেন মূর্তিপূজক। কিন্তু ইবরাহিম (আ) মূর্তিপূজা পছন্দ করতেন না। তিনি সত্যকে গ্রহণ করে আল্লাহর প্রিয়পাত্রে পরিণত হন। এ জন্য তিনি নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং দেশের বাদশাহ নমরুদের চক্ষুশুলে পরিণত হন। তারা সবাই ইবরাহিম (আ)Ñএর ক্ষিপ্ত হয়। শুধু তাই নয়। সবাই মিলে ইবরাহিম (আ)-কে আগুনে পুড়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। একদিন আগুনে ফেলা হলো তাঁকে। তবে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতে তিনি বেঁচে যান। এটা ছিল নবী ইবরাহিম (আ) এর উপর এক কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হলেন। তবে আত্মীয়-স্বজন ও আপন জাতির লোকদের ব্যবহারে তিনি নিরাশ হয়ে পড়লেন। তাই ইবরাহিম (আ) দেশ ত্যাগ করলেন। 

সিরিয়া ও মিশর ঘুরে তিনি ফিলিস্তিনে গিয়ে ইসলাম প্রচার করতে লাগলেন। ইবরাহিম (আ)-এর বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলেন। তাঁর বয়স যখন ৮৬ বছর তখন স্ত্রী হাজেরার ঘরে এলো এক পুত্র সন্তান। তাঁর নাম রাখলেন হজরত ইসমাইল (আ)। দেখতে দেখতে পুত্র ইসমাইল (আ) বড় হলেন। তখন তাঁর বয়স নয় বছর। এমন সময় ইবরাহিম (আ) আরেক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়লেন। এক রাতে স্বপ্নযোগে তিনি আল্লাহর এক আদেশ পেলেন। তাঁকে প্রিয়বস্তু কুরবানি করার নির্দেশ দেয়া হলো। এই আদেশ পেয়ে ইবরাহিম (আ) একশত দুম্বা কুরবানি করে দিলেন। পরের রাতে একই স্বপ্ন দেখলেন। এবারও আল্লাহর নবী আরো একশত উট কুরবানি করলেন। তাতেও কাজ হলো না। আবার নির্দেশ এলো, তুমি তোমার প্রিয় বস্তুকে কুরবানি কর। 

এই নিদের্শের মর্ম বুঝতে হজরত ইবাাহিম (আ)-এর বাকি রইল না। ইসমাইল (আ) তাঁর প্রিয়পুত্র। তিনি বুঝতে পারলেন, প্রিয়পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি করা ছাড়া গতি নেই। তাই ইবরাহিম (আ) ইসমাইলকে কুরবানি করার জন্য মনস্থির করলেন। তিনি পুত্রকে ডেকে তাঁর স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। পিতা ইসমাইল (আ)-এর মতামত জানতে চাইলেন। বালক ইসমাইল (আ) পিতার কথা শুনে অবাক হলেন না। তিনি আল্লাহর খুশির জন্য নিজে কুরবানি হতে রাজি হয়ে গেলেন। ইসমাইল (আ) পিতাকে বললেন, হে পিতা! আপনি যে আদেশ পেয়েছেন তা বাস্তবায়ন করুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে আপনি ধৈর্যশীল পাবেন। হজরত ইসমাইল (আ)-এর এই কথা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে : ‘যখন সে (ইসমাইল) তার সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছল তখন একদিন ইবরাহিম তাকে বলল, প্রিয়পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যেন জবেহ করছি। বল দেখি কি করা যায়? পুত্র (বিনা দ্বিধায়) বলল, আব্বা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা শীঘ্রই সেরে ফেলুন। ইনশা-আল্লাহ আপনি আমাকে অবিচল (ধৈর্যশীল) দেখতে পাবেন।’ - সূরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১০২  

হজরত ইবরাহিম (আ) প্রিয়পুত্রকে কুরবানি করার জন্য একদিন রওয়ানা করলেন। মিনা প্রান্তরে গিয়ে চোখ বেঁধে ইবরাহিম (আ) পুত্রের গলায় ছুরি চালালেন। কিন্তু প্রথম চেষ্টায় ইবরাহিম (আ) ব্যর্থ হলেন। ইসমাইল (আ)-এর পরামর্শে ইবরাহিম (আ) পুত্রকে উপুড় করে চোখ বন্ধ করে আবার ছুরি চালালেন। মহান আল্লাহর কি শান! চোখ খুলেই ইবরাহিম (আ) দেখতে পেলেন একটি দুম্বা জবেহ হয়ে পড়ে আছে। আর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন প্রাণাধিক পুত্র ইসমাইল (আ)। 

ইবরাহিম (আ) প্রিয়পুত্রকে কুরবানি করার যে উপমা পেশ করলেন, তা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। এটা ছিল মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি ইবরাহিম (আ)-এর ত্যাগ ও ভালোবাসার পরম নিদর্শন। ইবরাহিম (আ)-এর এই কুরবানির কারণে আল্ল¬াহ অত্যন্ত খুশি হলেন। এই ঘটনার মাধ্যমে ইবরাহিম (আ) ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত হলেন। হজরত ইবরাহিম (আ) এর এই ঘটনাকে চির জাগরুক রাখার জন্য মহান আল্লাহ সচ্ছল মুসলমানদের জন্য প্রতি বছর ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত হালাল পশু কুরবানি ওয়াজিব করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘অতএব তোমার রবের উদ্দেশে সালাত আদায় কর এবং কুরবানি কর।’- সূরা আল-কাউসার, আয়াত : ২ 

কুরবানি ও জীবন দানের প্রেরণা ও চেতনা সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্য মহানবী (সা)-কে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘বল  হে মুহাম্মদ) আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। তাঁর কোন শরিক নেই, আমাকে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফরমাবরদার।’-সূরা আল-আনআম, আয়াত : ১৬২-১৬৩

এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, একবার সাহাবিগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানি কি?’  মহানবী (সা) জবাব বললেন, ‘এটা তোমার পিতা হজরত ইবরাহিমের সুন্নাত।’-তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ 

কুরবানির গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী (স) আরো বলেছেন, ‘সামর্থ থাকা সত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-তিরমিজি

মহানবী (সা) এক হাদিসে বলেছেন, ‘নাহারের দিন অর্থাৎ জিলহজ মাসের ১০ তারিখ কুরবানির রক্ত প্রবাহিত করা থেকে ভালো কাজ আল্লাহর কাছে আর কিছু নেই।’-তিরমিজি, ইবনে মাজা 

আল্লাহর রাসূল (সা) আরো বলেন, ‘কুরবানির পশুর রক্ত জমিনে পরার আগেই তা কবুল হয়ে যায়। অতএব, তোমরা মনের আগ্রহসহ ও সন্তুষ্ট চিত্তে কুরবানি কর।’-তিরমিজি, ইবনে মাজা 

কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহার এই ঘটনা আমরা মনে রাখব। আল্লাহর আদেশ পালনে নবী ইবরাহিম (আ) কতই না আন্তরিক ও অটল-অবিচল ছিলেন! হজরত  ইসমাইল (আ)ও আল্লাহর নির্দেশ পালনে ছিলেন আপোষহীন। আল্ল¬াহর খুশির জন্য তিনি নিজের জীবন হাসিমুখে বিলিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করেন নি। 

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করার কোন বিকল্প নেই। হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ)-এর ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা এই শিক্ষাই পাই। কুরবানি ও ত্যাগের এই শিক্ষা তা আমাদের জীবনে কাজে লাগাতে হবে। ঈদের খুশি তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা ঈদুল আযহা থেকে সঠিক শিক্ষা নিয়ে অগ্রসর হতে পারব। 

ঈদুল আজহা সবার জন্য নিয়ে আসুক অনাবিল আনন্দ। ত্যাগের মহিমায় এই ঈদ হউক আমাদের জীবন চলার পাথেয়। ঈদের নির্মল আনন্দ উপভোগ করে একটি সুন্দর জীবনের পথে আমরা সবাই এগিয়ে যাব-এটাই হউক আমাদের দৃপ্ত অঙ্গীকার।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ