ঢাকা, শুক্রবার 17 August 2018, ২ ভাদ্র ১৪২৫, ৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সার্টিফিকেট মামলায় দিশেহারা ১ লাখ ৬৮ হাজার কৃষক

 

ইবরাহীম খলিল : ব্যাংক ঋণের জন্য সারাদেশের এক লাখ ৬৮ হাজারের বেশি কৃষকের নামে ঝুলছে সার্টিফিকেট মামলা। এদের মধ্যে আবার ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে ১১ হাজার ৭৭২ জন কৃষকের নামে, যারা অর্থ পরিশোধ করতে না পেরে গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী এই চার বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এই মামলাগুলো করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে কৃষিঋণ সার্টিফিকেট মামলার এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, সারাদেশের মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭৫ জন কৃষকের নামে সার্টিফিকেট মামলা চলছে। ১১৯১ সাল থেকে গত ৩৭ বছরে এই মামলাগুলো করা হয়েছে। শুধু চলতি বছর মে মাসেই নতুন করে ৩৪১টি মামলা হয়েছে কৃষকদের নামে। হিসাব অনুযায়ী, প্রত্যেক কৃষকের কাছে ব্যাংকগুলোর গড় পাওনার পরিমাণ মাত্র ৩০ হাজার ৬৬৭ টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭৫ জন কৃষকের কাছে ব্যাংকগুলোর মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ৫১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর এই টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হয়েই মামলা ঠুকে দিয়েছে ব্যাংকগুলো।

টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সবচেয়ে বেশি মামলা করেছে কৃষি ব্যাংক। এই ব্যাংকটি একাই ৮১ হাজার ৫৫৫ জন কৃষকের নামে মামলা করেছে, যাতে জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। বিশেষায়িত আরেক ব্যাংক রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ১৩২ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ায় ২৬ হাজার ১২১ জন কৃষকের নামে মামলা করেছে। বাকি মামলাগুলো করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। 

চলতি বছরের মে পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত ১৬ মাসে মামলা কমেছে প্রায় ১১ হাজার ৮২৫টি, যার মধ্যে মে মাসে নিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩৩৭টি। 

জানা গেছে, এসব মামলায় দরিদ্র এমন অনেক বর্গাচাষি রয়েছেন, যাদের নিজের জমি নেই। দুর্যোগের কারণে বা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ব্যাংক থেকে নেওয়া কৃষিঋণের অর্থ পরিশোধ করতে পারেননি বর্গাচাষি। এদের অনেকে আবার পাঁচ হাজার টাকার মূল ঋণ নিয়েছেন, যা ১০ থেকে ১৫ বছরে সুদে-আসলে বেড়ে দ্বি-গুণ বা তার বেশি হয়ে গেছে। ফলে অর্থ পরিশোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে ভূমিহীন বর্গাচাষির জন্য। উপরন্তু মামলা থাকায় নতুন করে তারা কোনো ব্যাংক ঋণ নিতে পারছেন না। ফলে তারা অর্থ পরিশোধের সুযোগও পাচ্ছেন না।

কৃষকরা বলছেন, প্রতিবছর সারাদেশে আগাম বৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ি ঢলের পানিতে কৃষকরা ব্যাপকভাবে কৃষিপণ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তারা যথা সময় পরিশোধ করতে পারেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর ও কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ মনে করেন সোনালী ব্যাংকের আড়াই হাজার কোটি টাকা যদি পুনর্ভরণ করতে পারে সরকার, তবে মাত্র ৫০০ কোটি টাকার জন্য লাখ লাখ গরিব কৃষকের নামে বছরের পর বছর মামলা চলবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের উচিত ১০-২০ বছরের যেসব মামলা এখনো চলছে, সেগুলোর অর্থ হিসাব করে ব্যাংকগুলোকে পুনর্ভরণ করে দেওয়া। এতে মামলাও কমবে, কৃষকরাও রেহাই পাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, ছোট ছোট এই ঋণ আদায়ে শুরুতেই মামলা না করে আপস-মীমাংসার জন্য একাধিকবার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে। এর ফলে ব্যাংকের টাকাও উদ্ধার হয়, আবার খেলাপি কৃষকও হয়রানি থেকে বেঁচে যায়। এ ধরনের নির্দেশনায় কিছু ফল মিলেছে বলেও জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

কৃষিঋণ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে কৃষকের বিরুদ্ধে এই ছয়টি ব্যাংকের অনিষ্পন্ন সার্টিফিকেট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। আর জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৬২ কোটি টাকা।

এদিকে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭৫ জন কৃষকের নামে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও ঋণ মওকুফের দাবি জানিয়ে গত কিছু দিন ধরে দেশের বিভিন্নস্থানে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে  কৃষক ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন। তারা বলছেন, সরকারের যোগসাজশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে দুর্নীতিবাজরা। তাদের কাছ থেকে এসব টাকা আদায়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। লুটপাটকারীদের শাস্তির কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে না অথচ কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে।

সমাজ তান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. সামছুল আলম বলেন, প্রতিবছর সারাদেশে আগাম বৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ি ঢলের পানিতে কৃষকরা ব্যাপকভাবে কৃষিপণ্য নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তারা যথা সময় পরিশোধ করতে পারেননি। তিনি দ্রুত এসব নিরীহ কৃষকদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ