ঢাকা, শুক্রবার 17 August 2018, ২ ভাদ্র ১৪২৫, ৫ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি

বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ অন্দোলনকে ঘিরে গণগ্রেফতার চলছে এবং বিরোধী ও ভিন্নমত দমন করতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। গত বুধবার নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটি নির্বিচার গ্রেফতার বন্ধ করার, ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে আটককৃতদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংস হামলার ঘটনাগুলোতে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করার জন্য সরকার একটি অস্পষ্ট ও বিতর্কিত আইনের ব্যবহার করছে বলে উল্লেখ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করে ইতিমধ্যেই কয়েক ডজন মানুষকে সরকারের সমালোচনা করার দায়ে আটক করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক ও অনুসারীরা রামদা, লাঠি-সোটা ও রডের পাইপ দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় পরিষ্কার হয়েছে, সরকার কোনো ভিন্নমত ও সমালোচনা সহ্য করছে না। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর চালানো গণগ্রেফতারের অভিযানে সারাদেশে আতংকজনক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যা গণমাধ্যমের তথা বাক-স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরো বলেছে, সরকারের উচিত এই সত্য মেনে নেয়া যে, সমালোচনা হচ্ছে ক্রিয়াশীল ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রের একটি অংশ ও পূর্বশর্ত। সে কারণে সরকারের উচিত অস্পষ্ট ও বিতর্কিত আইসিটি আইনের পরিবর্তে এমন আইনের প্রবর্তন ও ব্যবহার করা, যাতে মানুষের বাক-স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত থাকে।

উল্লেখ্য, এবারই প্রথম নয়, এর আগেও বিভিন্ন উপলক্ষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশ প্রশ্নে বেশ কয়েকটি বিবৃতি দিয়েছে। মাত্র মাস কয়েক আগে দেয়া এ ধরনের এক বিবৃতিতে সংস্থাটি আওয়ামী লীগ সরকার সম্পর্কে ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে ওঠার গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে বলেছিল, বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশের বিষয়টি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। দেশটিতে বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলা দায়ের করেছে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতন, হত্যা ও গুম হওয়ার মতো ভয়ংকর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। অন্যদিকে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হলেও সরকার কিন্তু ওই রিপোর্টে বর্ণিত কোনো একটি বিষয়েই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। মন্ত্রীরা কেবল রিপোর্টটিকে কাল্পনিক বলে প্রত্যাখ্যান করেই নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। 

অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনায় বলা হচ্ছে, এবারও সরকারের দিক থেকে ব্যতিক্রমী এবং শুভ বা ইতিবাচক কোনো প্রতিক্রিয়া আশা করা যায় না। অন্যদিকে সত্য হলো, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রদত্ত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতির কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গেই ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। বড় কথা, বিবৃতিটি সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর হয়ে আসেনি। সুতরাং কেবলই অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করলে চলবে না। সেটা যথেষ্টও হবে না। কারণ, সবই ঘটে চলেছে জনগণের চোখের সামনে, আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্তও তারাই হচ্ছে। তাছাড়া সবদিক থেকেই বিবৃতিতে সত্যের প্রকাশ ঘটেছে। সুতরাং কেবলই ঘাড় বাঁকিয়ে প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের বরং বিবৃতির মূলকথা ও সুর অনুধাবন করা এবং সে অনুযায়ী নিজেদের সংশোধন করা দরকার। কারণ, প্রতিটি বিষয়েই তারা গণতন্ত্রের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, তাদের বাড়াবাড়ির ফলে দেশে মানবাধিকারের লেশমাত্রও আর অবশিষ্ট নেই। রাজনীতিক থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ পর্যন্ত প্রত্যেককেই এখন নির্যাতনের কবলে পড়ারÑ এমনকি বেঘোরে প্রাণ হারানোর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে নিরীহ কিশোর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ফটো সাংবাদিক শহিদুল আলমের উদাহরণ উল্লেখ করাই সম্ভবত যথেষ্ট।

আমরা মনে করি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান যখন অভিযোগ উত্থাপন করে তখন বোঝা দরকার, এমন অবস্থা কোনো সরকারের ভবিষ্যতের জন্য শুভ হওয়ার নয়- দেশের ভাবমর্যাদার কথা না হয় বাদই দেয়া গেলো। সুতরাং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনের পরপর মামলা, গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটির ছাত্রীদের ওপর পর্যন্ত নির্যাতন কাল বিলম্ব না করে বন্ধ করা দরকার।

সরকারকে একই সঙ্গে কল্পিত অভিযোগে গ্রেফতার করা সকল ছাত্রছাত্রীকে মুক্তি দিতে এবং আইসিটি আইনের যথেচ্ছ প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালানো বন্ধ করার পাশাপাশি ভিন্নমত তথা বাক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সরকারকেই পালন করতে হবে। কারণ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে এবং একথা সত্যও যে, ভিন্নমত ও সমালোচনা হচ্ছে কার্যকর ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রের একটি অনস্বীকার্য অংশ ও পূর্বশর্ত। একই কারণে সরকারের উচিত অস্পষ্ট ও বিতর্কিত আইসিটি আইনের পরিবর্তে এমন কোনো আইন তৈরি ও ব্যবহার করা, যা সুষ্ঠু গণতন্ত্রের বিকাশে সুফলপ্রসূ অবদান রাখতে পারবে। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা কিশোর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী গু-া-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেনÑ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যার আহ্বান জানিয়েছে। 

আমরা আরো মনে করি, সব মিলিয়েই দেশে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তৈরি করা দরকার, জনগণকে যাতে আর ভীতি-আতংকের মধ্যে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকতে না হয়। এজন্যই মানবাধিকার সংস্থাটির বিবৃতিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে তার বিভিন্ন পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আমরা চাই না, সামান্য কোনো ভুলের জন্য পরিস্থিতি দেশ ও সরকারের জন্য অশুভ পরিণতির কারণ সৃষ্টি করুক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ