ঢাকা, শনিবার 18 August 2018, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সর্বমহলে প্রশংসিত নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : মোড়ে মোড়ে সব ধরনের যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করে শিক্ষার্থীরা। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও গাড়ির কাগজপত্র না থাকায় আটকে দেয় তারা। যানবাহনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে শিক্ষার্থীদের চেষ্টাকে সাধুবাদ জানায় সাধারণ মানুষ। পরিবহণ না থাকায় রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষ হেঁটে, রিকশায় বা বিকল্প যানে দুর্ভোগ সঙ্গী করে চলাচল করলেও এতটুকু বিরক্তি ছিল না কারও। সাধারণ মানুষ বলছেন দুর্ভোগ সহ্য করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরলে এটি হবে দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। এদিকে শিক্ষার্থীদের তল্লাশিতে সরকারি যানবাহনের কাগজপত্র ও লাইসেন্স না থাকার বিষয় ধরা পড়া এবং তা ব্যাপক হারে প্রচার হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে গাড়িতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। অথচ এমন একটি সাধুবাদ পাওয়া নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের এখন গণহারে গ্রেফতার এবং তাদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের সাথে সরকারের এমন আচরণে দেশের জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন এবং শংকিত। প্রতিদিনই শিক্ষার্থীদের ধরে নেয়ার ঘটনায় আতংকে দিন কাটছে অভিভাবকদেরও। দেশে-বিদেশে এখন একটাই প্রশ্ন, যে অপরাধে তাদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে, জেলে পাঠানো হচ্ছে, মামলা দেয়া হয়েছে সেই আন্দোলনকে কেউই দোষ হিসেবে দেখেনি।
প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে যারা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়েছে তারাও এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে এসে তোপের মুখে পড়া মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও বলেছেন, আমি তোমাদের আন্দোলনের সাথে একমত পোষণ করতে এসেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাচ্চা শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। যেটি দীর্ঘ ৪৫ বছরে হয়নি সেটি ছাত্ররা কয়েকদিনে দেখিয়ে দিয়েছে। তাহলে এখন গ্রেফতার, জেল বা রিমান্ড কেন? সরকারের এমন আচরণ কেউই ভালোভাবে গ্রহণ করছেননা। সবাই বলছেন, এতে করে সরকারের ইমেজটাই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে আন্দোলনের কোনো কমিটি হয়নি, যে আন্দোলন ছিল একেবারেই স্বত:স্ফূর্ত, যেটি ছিল সর্বমহলে প্রশংসিত। আন্দোলনতো দীর্ঘদিনের ক্ষোভের একটি প্রতিফলন। প্রতিদিন শতশত দুর্ঘটনা ঘটছে, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে। অথচ এগুলোর কোনো বিচার নেই। তারই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই আন্দোলনে। আন্দোলন যে সঠিক ছিল সেকথা সরকারের মন্ত্রীরা সরকারি লোকরাও বারবার বলেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আন্দোলনের কারণে যারা যাত্রাপথে লাইসেন্স দেখানোর মতো বাধার শিকার হয়েছেন, তারাও বলেছেন, এই আন্দোলন দরকার ছিল। তারা এই আন্দোলনকে ওয়েলকাম জানিয়েছেন। অথচ সেই আন্দোলনে অংশ নেয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে। তাদের জেলে পাঠানো হচ্ছে। রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর নুরুল ইসলাম বেপারী বলেন, আগামী ৫০ বছর এই বাচ্চারাই দেশের নেতৃত্ব দিবে। তারা দেশবাসীকে আমাদের ভুলগুলো হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়েছে। এগুলো ছিল মারাত্মক ভুল। যেখানে তাদের পুরস্কৃত করার কথা সেখানে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। জেলে পাঠানো হচ্ছে। এতে করে আমরা দেশের ভাবমর্যাদাটাকেই শেষ করে দিচ্ছি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে। অথচ সরকার দলীয় নেতাকর্মীরাই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ছোটদের আন্দোলন যখন বিস্তৃত হচ্ছে তখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এগিয়ে আসে। মূলত ছোটদের সাহস জোগাতেই তারা এতে যোগ দেয়। কিন্তু সেই বড়দের আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে সরকার দলীয় সমর্থকরা। তাদের সহায়তা করেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যেতে বলা হয়। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা কোটার দাবি পূরণ নিয়ে সরকারের ইউটার্নের কারণে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দেয়। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ক্লাসেই ফিরে গেছে। পর্যবেক্ষক মহলের প্রশ্ন, যে আন্দোলনে সরকারি দল হামলা করলো, যে আন্দোলন সবার কাছে প্রশংসনীয় ছিল সেই আন্দোলনের কারণে কেন মামলা দেয়া হচ্ছে। কেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জেলে পাঠানো হচ্ছে।
জানা গেছে, কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার চলছেই। এর সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেয়ার অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘উসকানি দেয়ার’ অভিযোগে ঢাকার বাইরে থেকেও শিক্ষার্থীদের ধরে আনা হচ্ছে। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে সহিংসতা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত ৫১টি মামলায় মোট আসামী ৩৯৬৭ জন। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯৭ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রিমান্ডে নেয়া হয়েছে ২২ জনকে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার লুৎফুন নাহার লুমা নামের এক শিক্ষার্থীকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। গত বুধবার লুমাকে সিরাজগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। শিক্ষার্থী ছাড়াও ফেসবুকে উসকানি দেয়ার অভিযোগে অভিনেত্রী নওসেবাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়। শেষ হয়ে যাওয়া নিরাপদ সড়ক চাই ও অনেকটাই মীমাংসিত কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারিদের একের পর এক গ্রেফতারের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিন যতো যাচ্ছে আতঙ্ক ততোই বাড়ছে।
সরকারের এমন আচরণের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশ এখন জুলুমের গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকার শিশু-কিশোরদের সাথে নিষ্ঠুর প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠেছেন। তিনি বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোরদের চলমান আন্দোলনে সামাজিক গণমাধ্যমে উসকানি ও সহিংসতার মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন থানায় ৫১টি মামলায় শ’খানেক ছাত্রছাত্রীকে আটক করা হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীকে ওইসব মামলায় আসামী করা হয়েছে। এই কোমলমতি শিশু-কিশোরদের আন্দোলন বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তারা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সমাজের অগ্রগণ্য মানুষরাও বিশ্মীত হয়েছে তারা যা পারেনি শিশু-কিশোররা চোখে আঙুল দিয়ে সেটা করে দেখিয়েছে। সরকারের এবং বেসরকারি অনেকেই বলেছিলেন, শিশু-কিশোররা পথ দেখিয়েছে। কিন্তু এখন আন্দোলনরত শিশু-কিশোররা যে পথ দেখছে তাতে তারা প্রতিদিনই শিহরিত হয়ে উঠছে। তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, পাঠানো হচ্ছে জেলখানায়। অভিভাবকেরা বাচ্চাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত, ভীত, শিহরিত। এখন শুধু ছাত্ররাই নয়, ছাত্রীরাও রেহাই পাচ্ছে না আটক ও জুলুমের করালগ্রাস থেকে। গোয়েন্দা পুলিশ একটার পর একটা ছাত্রী আটকের লোমহর্ষক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্ন্াহার হলের সামনে থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের তাসনিম ইমিকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। তাকে পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে কয়েক ঘন্টা নির্মম প্রহর গুণতে হয়। ইমির আটকের ১২ ঘন্টা পর ইডেন কলেজের কোটা আন্দোলনের আরেক নেত্রী লুৎফুন্নাহার লুমাকে সিরাজগঞ্জে বেলকুচি থানার একটি গ্রাম থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্রী ও সমর্থনকারী নারীরাও রেহাই পাচ্ছে না। এই সকল ঘটনায় জাতির সম্ভ্রম ধুলায় লুটিয়ে গেলেও সরকারের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের গ্রেফতার করে সভ্যতার শেষ রশ্মিটুকু নিভিয়ে দিল সরকার।
আন্দোলনে অংশ নেয়া গ্রেফতারকৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন আন্তর্জাতিকমহলসহ সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ দেশের বিশিষ্টজনেরাও গ্রেফতারকৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি করছেন। একই সাথে তাদের ওপর ‘অমানবিক নিপীড়ন’ বন্ধে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। এবং এই গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক বাড়ছেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে বলেছে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশে সরকারের সহিংস অভিযান নিয়ে যারা সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছিলেন, তাদের গ্রেফতারে কর্তৃপক্ষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এই দফায় মূলত গ্রেফতার করা হচ্ছে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র ও সাংবাদিকদের। এতে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে নিরাপদ সড়ক, কোটা সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ জন শিক্ষক। এর আগে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ‘৯০-এর আন্দোলনের ছাত্রনেতা, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিগণ, প্রগতিশীল ছাত্রজোট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, প্রফেসর আনু মোহাম্মদ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, প্রফেসর ফাহমিদুল হক, গণসংহতির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, বাম ছাত্রজোট, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সাদা দল।
এক বিবৃতিতে দেশবরেণ্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকগণ বলেন, আন্দোলনে উসকাানি’র অভিযোগে ৫১ মামলায় ৯৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা সংবাদপত্রের চিত্রে দেখেছি গ্রেফতারকৃত ছাত্র ছাত্রীদের কোমড়ে দড়ি বেঁধে দাগী আসামীদের মতো আদালতে নিয়ে আসা হচ্ছে। এইসব অত্যন্ত গর্হিত মানবাধিকার লংঘন এবং একটি ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করার প্রয়াস। এই ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, এরা লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল দিয়ে রাস্তার গাড়ি ভাঙচুর করে এবং পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। কিন্তু এই গ্রেফতারকৃত ছাত্ররা কিভাবে এই গুরুতর অপরাধগুলোর সাথে জড়িত তার প্রমাণ এখনও পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী গণমাধ্যমকে সরবরাহ করে নি। অথচ অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি নিরাপত্তা বাহিনীকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অপরাধী এবং অপরাধের প্রমাণ গণমাধ্যমে সম্প্রচার করতে। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মতোও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সময় গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের বিরুদ্ধে ঐ ধরনের কোনো প্রমাণ সাধারণ জনগণের কাছে প্রকাশিত হয়নি।
আন্দোলনে অংশ নেয়ার অভিযোগে যেভাবে ছাত্রদের গ্রেফতার করা হচ্ছে তাতে খুবই উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, আর কয়েক দিন পরেই মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, এই উৎসব মুখর পরিবেশে নির্যাতিত এবং গ্রেফতারকৃত ছাত্ররা এবং তাদের পরিবার নিশ্চিতভাবে খুবই উৎকন্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং ভীতির মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। এইরকম ভীতিকর এবং উৎকন্ঠাপূর্ণ পরিবেশ এই পরিবারগুলোর উপরে চাপিয়ে দেয়া অত্যন্ত অন্যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ঈদের ছুটিকে ধরপাকড়ের মওকা ধরে নেয়া হয়েছে, কারণ ছুটির মধ্যে সংগঠিত প্রতিবাদ হবার সম্ভাবনা কম।
গ্রেফতারকৃত শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি করে শিক্ষকরা বলেন, আমাদের সন্তানতুল্য এইসব শিক্ষার্থীদের প্রতি আইনের সঠিক প্রয়োগ চাই এবং অন্তত পক্ষে ঈদের আগে জামিনে তাদের মুক্তি চাই। এসব শিক্ষার্থীদের বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের হাহাকার আমরা প্রতিদিনই সংবাদ মাধ্যমে জানছি, পড়ছি এবং এগুলো আমাদের তীব্রভাবে ব্যথিত করছে। তাই আমরা অবিলম্বে আমাদের ছাত্রদের উপর এই অমানবিক নিপীড়নের সমাপ্তির জন্য সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুস্বরণ করে গ্রেফতার ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা চলছেই। তবে পুলিশ বলছে, তারা গুজব ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, গুজব ঠেকাতে পুলিশের হাতে যতগুলো মেকানিজম আছে, তার সবটাই আমরা প্রয়োগ করছি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে যারা গুজব ছড়িয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে আমরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। গত বুধবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। নিজস্ব ওয়েবপোর্টালে ডিএমপি বলেছে, শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুজন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে সহিংস ঘটনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন থানায় মোট ৫১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ৯৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে ২৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। গ্রেফতার হয়েছেন ১৬ জন। সিআইডি ফেসবুক পেজে উসকানিমূলক প্রপাগান্ডা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে এমন মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্য, পোস্ট, ফটো বা ভিডিওতে লাইক, শেয়ার ও কমেন্ট না করার অনুরোধ করেছে।
গত ২৯ জুলাই দুপুরে ছুটির পরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবদুল করিম ওরফে সজীব এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম ওরফে মিম নিহত হন। তারা রাস্তার পাশে ফুটপাথে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় জাবালে নূর পরিবহণের একটি বাস তাদের চাপা দেয়। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার পর ৯ দফা দাবিতে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলোর সাথে নৌপরিবহণ মন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবিও পরে যুক্ত হয়। বৃহস্পতিবার সরকার বন্ধ ঘোষণা করে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষার্থীদের উত্তাঙ্গ ঢেউ তাতে কমেনি, বরং আরো বেড়েছে। এ দিন ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে। রাজধানী শহর ছিল অচল। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে জেলায় জেলায়। অবরোধে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে। তবে তারা তা মেনে নিয়েছেন হাসি মুখেই। মন্ত্রী, সচিব, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, সাংবাদিক সমাজের প্রভাবশালী একটি বড় অংশ যে কোনো আইনের তোয়াক্কা করেন না, আইনি ব্যবস্থা যে এখানে বহুলাংশে ভেঙে পড়েছে এই শিশুরা আমাদের সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে সারা দেশে। টানা কর্মসূচি চলার মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহণ মালিকরা। তারা বাস বন্ধে নিরাপত্তার কথা বললেও শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে দূরপাল্লার কোনো বাসে হামলা করেছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেই শিশু-কিশোররা পথ দেখিয়েছে। যারা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে মৌলিক গলদ কোথায়? যারা বাবা মায়ের হাত ধরে স্কুলে আসা যাওয়া করতো, ক্লাস শেষে কোচিং করলে সেখানেও অভিভাবকদের হাত ধরেই যেতো। তারাই নিরাপদ সড়কের দাবিতে নেমে আসে রাজপথে। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ছাত্রছাত্রীরা গাড়ির ফিটনেস আর চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করেছে। সড়কে গাড়ি চলাচলের লেনও ঠিক করে দিয়েছে। এ সময় বেরিয়ে আসে মন্ত্রী, সচিব, পুলিশ থেকে শুরু করে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকেরই গাড়ির ফিটনেস নেই, চালকদের লাইসেন্সও নেই। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাদের এই দাবি, তাদের উদ্যোগের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। দেশে বিদেশে সব মহল থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাদের মুখে মুখে ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। তারা চেয়েছিল বিচার। এখন তাদেরই বিচার করা হচ্ছে। রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। গত বুধবার এক সভা থেকে তাদের সাধারণ ক্ষমা করার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের অপরাধটা কী? বিচার চাওয়াটা অপরাধ? ‘রাষ্ট্রের মেরামত কাজ চলছে’ এই কথা বলা কী অপরাধ? দাবির জন্য মাঠে নামা কী অপরাধ? তাহলে তাদের সাধারণ ক্ষমা করার প্রশ্ন আসছে কেন?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ