ঢাকা, শনিবার 18 August 2018, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সিলেটের কাজীরবাজার পশুর হাট ক্রেতা শূন্য ॥ জমে উঠেনি গরু-ছাগলের বাজার

ক্রেতাশূন্য সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাজার পশুর হাট -ছবি : ফয়ছল আহমদ রানা

কবির আহমদ, সিলেট : আর ৩ দিন পর আগামী বুধবার মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। কুরবানীর ঈদ বা ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসলেও সিলেটের অন্যতম গরু-ছাগল বিক্রির বাজার নামে খ্যাত ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাজার পশুর হাট ক্রেতাশূন্য রয়েছে। জমে উঠেনি কুরবানীর পশুর বাজার। কাজীরবাজার পশুর হাট জমে না উঠলেও সিলেটে ওঁৎ পেতে আছেন অবৈধ পশুর হাটের ব্যবসায়ীরা। ঈদের ছুটির সাথে সাথে সক্রিয় থাকা এসব ব্যবসায়ীরা কুরবানীর পশু নিয়ে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ পশুর হাট বসাবেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতি বছর অবৈধ পশুর হাটের ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে খুবই কড়াকড়ি থাকে। পরে সরকারী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় বা প্রত্যক্ষ পরোক্ষ আশ্রয়ে গড়ে উঠে পশুর হাট। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যারা প্রতি বছর অবৈধ পশুর হাট বসান তারা এবারও সক্রিয়। নগরীর শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে প্রতি বছর সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের লোকজন এলাকাবাসী অনুরোধকে উপেক্ষা করে অবৈধ পশুর হাট বসান। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না ভেবে আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ সুজাত আলী রফিক এই অবৈধ পশুর হাটের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণকে নিয়ে সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন গত বুধবার। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে জানান, এই মাঠে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পশুর হাট বসানোর পায়তারা করছে। গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ করে কিছু হ্যালমেট পড়া যুবক প্রায় শতাধিক বাঁশ নিয়ে শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে প্রবেশ করলে মানুষ তাদেরকে প্রতিরোধ করে এবং পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ এলে এই যুবকরা পালিয়ে যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতা আশফাক আহমদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বলা যায়, এই অবৈধ পশুর হাট নিয়ে সিলেটের আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপ এখন মুখোমুখি।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কাজীরবাজার পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রচুর পশুর সমাগম ঘটলেও হাটগুলোতে ক্রেতা সমাগম এখনো বাড়েনি, তবে দালালদের উপচে পড়া ভীড় ছিল। সিলেটের সবচেয়ে বড় পশুর হাট কাজিরবাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। তবে কাজিরবাজারের গরু ব্যাবসায়ীরা বলছেন আজ শনিবার থেকে বেচাকেনো জমে উঠতে পারে। কাজিরবাজারে বিদেশী গরুর আধিপত্য এখনো শুরু হয়নি। ব্যাবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে আগামী রোববার অথবা সোমবার থেকে ভারতীয় গরু সিলেটের বাজারে এসে প্রবেশ করতে পারে। ব্যাবসায়ীদের মতে শেষ সময়ে সীমান্তে কিছুটা কড়াকড়ি কমলে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে কাজীরবাজার সহ সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা পশুর হাটের বাজারে ভারতীয় গরু নিয়ে আসতে পারেন।
নগরীর প্রধান এই পশুর হাট কাজিরবাজার ঘুরে আরো দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছোট-বড় বাহারি রংয়ের গরু নিয়ে বসে আছেন বেপারীরা। এছাড়া কিছু বিদেশী গরুরও সমাগম রয়েছে বাজারে। কিন্তু ক্রেতা কম। যারা আসছেন গরু দেখে দরদাম করেই চলে যাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাজিরবাজারে ট্রাক ভর্তি গরু এসে প্রবেশ করছে। অনেকে পথেপথে চাঁদাবাজী আর জোর জবরদস্তির ভয়ে আগেভাগেই  গরু নিয়ে আসছেন কাজিরবাজারে। সিলেট জেলায় এবার ১২টি কোরবানির পশুর হাট বসানোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা প্রশাসন। তবে বৈধ পশুর হাটের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। এছাড়া, জেলার কোথাও অবৈধভাবে পশুর হাট বসতে দেয়া হবে না এবং রাস্তায় জোরপূর্বক গরুবাহী ট্রাক আটকানো যাবে না বলে  গতকাল শুক্রবার দৈনিক সংগ্রামকে জানিয়েছেন এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব। তিনি জানান, সিলেট মহানগরী ও শহরতলীতে ১০টি বৈধ পশুর হাট রয়েছে। এগুলো হলো, সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালি থানার কাজীর বাজার পশুর হাট, বিমানবন্দর থানার লাক্কাতুরা চা বাগান মসজিদ সংলগ্ন মাঠ, দক্ষিণ সুরমা থানার লালাবাজার পশুর হাট, কামাল বাজার পশুর হাট, নাজিরবাজার পশুর হাট, মোগলাবাজার থানার রেঙ্গা হাজীগঞ্জ বাজার, জালালপুর পশুর হাট, রাখালগঞ্জ বাজার পশুর হাট, শাহপরান (রহ.) থানার পীরের বাজার পশুর হাট ও খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ মাঠ। অনুমোদন ছাড়া যত্রতত্র অবৈধ হাট উচ্ছেদে অভিযান চালানো হবে বলে জানান এসএমপির এই মিডিয়া কর্মকর্তা। প্রতি বছর তো অবৈধ পশুর হাটের ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে এমন সতর্ক বার্তা থাকে। প্রশাসনের নির্দেশকে উপেক্ষা করে অবৈধ পশুর হাট বসে। এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল ওয়াহাব জানান, এবারে প্রশাসন অবৈধ পশুর হাটের বিরুদ্ধে খুবই শক্ত অবস্থানে আছে। কোন ভাবেই ছাড় দেয়া হবে না।
মহানগরীতে একাধিক কুরবানির পশুর হাট বসানোর চাহিদা থাকলেও সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব কোনো হাট নেই। এ নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের নির্লিপ্ততার সুযোগ নেয় একটি চক্র। গত কয়েক বছর ধরে নগরবাসীকে কোরবানির পশু কিনতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। গত বছর নগরীতে কুরবানির পশুর সংকট থাকায় অনেকে ঈদের দিন কুরবানি দিতে পারেননি। নিরুপায় হয়ে তারা সিলেটের বাইরে থেকে পশুর ব্যবস্থা করে পরের দিন কুরবানি দেন। সিটি কর্পোরেশন টেন্ডারের মাধ্যমে সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট, চালিবন্দর, ঝালোপাড়া ও কদমতলী এলাকায় চারটি অস্থায়ী পশুরহাটের অনুমোদন দেয়ার প্রক্রিয়া করছে।
এর বাইরেও নগরীতে অন্তত ৩০টি অবৈধ পশুর হাট বসানোর জন্য তোলজোড় চলছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বসানো এসব অবৈধ পশুর হাট উচ্ছেদে প্রশাসন গত বছরের মত উদাসীন থাকলে নগরীর পরিবেশ দূষিত হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট জেলা বারের সাবেক সভাপতি, সিলেট স্টেশন ক্লাবের সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, অবৈধ হাটের বিষয়ে এখনো প্রশাসনের তেমন তৎপরতা চোখে পড়ছেনা। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে যারাই অবৈধ হাট বসাতে চাইবে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যাবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, বিশেষ করে নগরীর সদর উপজেলা মাঠকে খেলার বদলে গরু আর মেলার হাটে রুপান্তরিত করা হয়েছে। অথচ এটি শেষ রাসেল মিনি ষ্টেডিয়াম। একটি চক্র প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এখানে কুরবানির পশুর হাট বসায়। এতে ওই এলাকার মানুষ পরিবেশ দূষণের কবলে পড়েন। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। তবে সম্প্রতি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আশফাক আহমদ গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন এবার সদর উপজেলা মাঠে কোন কুরবানির পশুর হাট বসবেনা। একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। এছাড়াও অবৈধ পশুরহাট বসাতে নগরীর শাহী ঈদগাহ, লালটিলা, কয়েদীর মাঠ, আম্বরখানা (আবাসন হাউজিং), আখালিয়া, চণ্ডিপুল, মাদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা, দর্শন দেউড়ী, হাউজিং এস্টেট, টিলাগড়, বালুচর, শাহী ঈদগাহ, রিকাবীবাজার, মেন্দিবাগ জালালাবাদ গ্যাস অফিসের পেছনে, কদমতলী ফল মার্কেটের সামনেসহ বেশকিছু এলাকায় ওৎ পেতে বসে আছে দুর্বৃত্তরা।
সিলেটের ঝালোপাড়া ঔষধ ব্যবসায়ী মদীনা ফার্মেসীর সত্ত্বাধিকারী শামীম আহমদ অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসন নগরীর ‘যত্রতত্র কুরবানির পশুর হাট বসানো যাবে না’ ঘোষণা দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। ঈদের দু’একদিন আগে নগরীর যত্রতত্র কুরবানির পশুর হাট বসার প্রভাব পড়ে নগরীতে থাকা সিলেটের সর্ববৃহৎ পশুর হাট কাজীরবাজারে। সারা বছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এই বাজারে গরু ছাগল নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ঈদুল আজহার সময় তারাও হন বিড়ম্বনার শিকার। ট্রাক ভরে কাজীরবাজারে যাওয়ার পথে তাদের ট্রাক আটকে লাঠিয়াল দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাটে। বিভিন্ন এলাকা থেকে পশু নিয়ে আসা বেপারিরা নগরীর প্রবেশ পথেই অবৈধ হাটের লাঠিয়ালদের কবলে পড়েন। স্থানীয় প্রশাসনও ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের ম্যানেজ করেই এসব অবৈধ হাট বসানো হয়। অন্যান্য বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ঈদুল আজহার বাকি আর মাত্র ৪ দিন। তিনি বলেন, রাজনীতিতে বিরোধ থাকলেও সিলেটে কুরবানির পশুর অবৈধ হাট বসাতে তারা থাকেন ঐক্যবদ্ধ। কাজিরবাজার পশুর হাটের ম্যানেজার সাহাদাত হোসেন লুলন জানান-আজ শনিবার থেকে বেচাকেনা বাড়বে। পাশাপাশি পশুবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য দক্ষিণ সুরমায় পুলিশি টহল জোরদার করা এবং কাজিরবাজার সেতু দিয়ে পশুবাহী ট্রাক চলাচলে অনুমতির জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ