ঢাকা, শনিবার 18 August 2018, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এতিম ও গরিবের প্রাপ্য নিয়ে ছিনিমিনি

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশেও কুরবানিতে লাখ লাখ পশু তথা গরু, ছাগল, ভেড়া জবাই করা হয়। এই কুরবানির চামড়া মূল্যবান সম্পদ। চামড়াজাত পণ্য ব্যাগ, জুতো ইত্যাদি রফতানি হয়। এতে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় হয়। এই চামড়া দিয়েই বহু ট্যানারি শিল্প গড়ে উঠেছে দেশে। ট্যানারি বা চামড়ার ব্যবসা করেই অনেকে হয়েছেন বড়লোক বা শিল্পপতি। হোন, আপত্তি নেই। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পপতিদের অবদানের কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু চামড়াশিল্প নিয়ে যে খেলা চলছে তা ঠেকাবে কে?
সেদিন যেনতেন একটি প্যান্টের বেল্ট কিনলাম চামড়ার। দাম নিল ৫ শত টাকা। সামান্য একজোড়া স্যান্ডেল কেনা হলো তাও হাজার টাকা। একটা যেনতেন মানিব্যাগ কিনবো। দাম চাইলো ৩ শত টাকা। মানে চামড়াজাত জিনিসে হাত দেয়া মুশকিল। অগ্নিমূল্য বলতে যা বোঝায় তা চামড়ার জিনিসেরও। কিন্তু কুরবানি এলে প্রতিবছর চামড়ার দাম কমানো হয় ঘোষণা দিয়ে। এবারও কমানো হয়েছে। বেঁধে দেয়া হয়েছে নতুন দাম। বর্গফুট অনুযায়ী যে দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয় তাও দেয় না ক্রেতারা।
একজোড়া জুতোয় কয় বর্গফুট চামড়া লাগে? প্যান্টের ১টা বেল্টে কতটুক চামড়া দেয়া হয়? একটা মানিব্যাগ বানাতে কয়টা ছাগলভেড়ার চামড়া দরকার পড়ে? মহিলাদের হ্যান্ডব্যাগ ইত্যাদি তৈরিতে কতো চামড়া লাগে হিসেব করে দেখেছেন কেউ? দেখেননি। হিসেব করলে দেখা যাবে এক গরুর চামড়া দিয়ে ৩০/৪০ জোড়া বা তারও বেশি জুতো তৈরি হতে পারে। প্যান্টের বেল্ট তৈরি হতে পারে কয়েক শত। অবশ্য এসব পণ্য প্রস্তুত করতে আরও জিনিস লাগে। শ্রম দিতে হয়। এসবের খরচ আছে প্রচুর। নিশ্চয়ই। তাই বলে চামড়া বিক্রি হবে পানির মূল্যে আর চামড়াজাত পণ্য কিনতে হবে অগ্নিমূল্যে কেন? ফারাকটা আগুন আর পানির মতো হবারতো কথা নয়?
কুরবানি ছাড়া অন্যসময় চামড়ার দাম তেমন কমে না। সে সময় দাম ঠিকই থাকে। কমানো হয় শুধু কুরবানির চামড়ার। কারণ কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ গরিব, মিশকিন ও এতিমদের হক। এ দেশে লাখ লাখ এতিম, নিঃস্ব, গরিব আছে। তাদের লেখাপড়া, ভরণপোষণ, চিকিৎসার জন্য অর্থ প্রয়োজন পড়ে। জাকাত, ফিতরা ও কুরবানির চামড়া তাদের হক। বছরে একবার কুরবানির চামড়া থেকে এতিম ও হতদরিদ্র মানুষ কিছু অর্থ পায়। কিন্তু বেশ কয়েক বছর থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কুরবানির চামড়ার দাম কমিয়ে এদের হক নষ্ট করা হচ্ছে। তাও বড়লোক ব্যবসায়ীদের স্বার্থে।
কুরবানির চামড়ার দাম কমিয়ে দেবার অজুহাত দাঁড় করানো হয় বিশ্ববাজারে দাম পড়ে গেছে বলে। তাহলে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চামড়া পাচার হয় কেন? তারা কি চোরাপথে পাচার হওয়া চামড়া বেশি দামে কেনে লোকসান গুণতে? এর কী জবাব দেবেন আমাদের ব্যবসায়ীমহল?
উল্লেখ্য, সারাবিশ্বে সিনথেটিকের ব্যবহার কমছে। কারণ সিনথেটিক পরিবেশদূষণ করে নানাভাবে। মানবদেহেরতো বটেই, পানি, মাটি, আবহাওয়া সবকিছু দূষিত হয় সিনথেটিকের মাধ্যমে। এমনকি মানবদেহে মারণব্যাধি ক্যান্সার পর্যন্ত সৃষ্টি করছে এই সিনথেটিক। তাই সিনথেটিকের ব্যবহার কমিয়ে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে চামড়াজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে চামড়ার দাম সবদেশে বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে কমছে বিস্ময়করভাবে।
বুদ্ধি ও কৌশল খাটিয়ে কুরবানির চামড়ার দাম কমিয়ে যারা গরিবের হক নষ্ট করেন, তাদের কি মৃত্যু হবে না? জবাবদিহি করতে হবে না? নিশ্চয়ই হবে। শুধু এতিম ও দুস্থের হক নষ্ট করলেই জবাবদিহি করতে হবে এমন নয়। কারুরই হক নষ্ট করবার অধিকার মুসলিমদের নেই। এমনকি কেউ অমুসলিম হলেও তার হক বা অধিকার নষ্ট করতে পারবে না কোনও মুসলিম। কাজেই আমাদের সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।
দৈনিক সংগ্রামের রিপোর্টে প্রকাশ, এবছর প্রতিবর্গফুট চামড়ার মূল্য কমেছে ১০ টাকা। এক বছরে এতিম-গরিবের প্রাপ্তি কমছে ১৫৯ কোটি টাকা। ৬ বছরে কমেছে ৪ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। ফলে অর্থসংকটে পড়ছে দেশের এতিমখানাগুলো। রফতানিখাত হিসেবেও পিছিয়ে পড়ছে দেশের চামড়াশিল্প। এবছর প্রায় ৫৫ লাখ খাশির চামড়া ফেলে দিতে বা কুকুর-শেয়াল দিয়ে খাওয়াতে হবে।
প্রতিবছর কুরবানিতে ৬০ লাখ গরু-মোষ জবাই হয়। ছাগল-ভেড়া জবাই হয় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ। এতো চামড়া প্রসেস করতে প্রস্তুত হয়ে ওঠেনি সাভারের ট্যানারি কারখানাগুলো। তাই কাঁচা চামড়া পাচার হয়ে যাবে।
এবার চামড়ার যে দাম নির্ধারণ করেছে সরকার তাতে গরুর চামড়ার মূল্য পড়বে ৫ থেকে ৬ শত টাকা। ছাগল বা খাশির চামড়ার দাম হবে মাত্র ৩০/৩৫ টাকা। এরপর লবণ দিতে হয় চামড়ায়। পরিবহন খরচ আছে। ফলে এবার চামড়া পড়ে থাকবে। চামড়া পচনশীল পণ্য। দ্রুত প্রসেস না করলে নষ্ট হয়ে যায়। দাম পাওয়া যায় না। তাই বলা যায়, চামড়ার দুর্দশা বেড়েই চলেছে দেশে। অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণেও আনুকূল্য পাচ্ছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর। বিশেষত ব্যবসায়ীদের পরামর্শেই চামড়ার দাম কমিয়ে দেয়া হয় বারবার। এর দুটো লক্ষ্য থাকে ক্ষমতাসীনদের। এক. নির্বাচনে ভোটপ্রাপ্তি। দুই. নির্বাচনী ব্যয়বহনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থানুকূল্য। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোকেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একই সুযোগ নিতে হয়। ফলে তারাও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের এতিম ও গরিব মানুষ। তাই কুরবানির চামড়া নিয়ে টানাটানিকে এতিম, গরিব ও অসহায় মানুষের প্রাপ্য নিয়ে ছিনিমিনি বললে কি অত্যুক্তি হবে? তবে সবার মনে রাখা জরুরি যে, গরিব ও দুস্থরাও কিন্তু ভোটার। কথা হলো, আজকাল নির্বাচিত হতে ভোটের তেমন প্রয়োজনই হয় না। ব্যালট বাক্স অদ্ভুত অলৌকিকতায় ভরে যায়। তাই গরিব ভোটারদের তেমন গুরুত্ব নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ