ঢাকা, শনিবার 18 August 2018, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বখতিয়ারের বাংলাদেশ

মাহমুদ ইউসুফ : বখতিয়ার ফারসি শব্দ। বাংলা ভাষায় যার তরজমা করলে অর্থ দাঁড়ায় ভাগ্যবান বা সৌভাগ্যশালী। নামের সাথে জীবনের এ ধরনের পূর্ণ সামাঞ্জস্য দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। বখতিয়ার কেবল নিজেই ভাগ্যবান নয়; বাঙালি জাতির জীবনেও সৌভাগ্যের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। বখতিয়ার নদিয়া-লাখনৌতি জয় করেই ঘোষণা দেন: বাংলা মুলুকে এসেছে আলো, দূর হয়েছে অন্ধকার। অত্যাচারী পরাভূত, ন্যায়পরায়ণরা বিজয়ী। ইনসাফের উত্থান, জুলমাতের পতন। সামনে সবার শুভদিন। মিলেমিশে গড়ব সবাই সোনার দেশ।
এগারো-বারো শতক বাংলাদেশের ইতিহাসে আইয়ামে জাহেলিয়াত; ঘোর অমানিশার অন্ধকার যুগ। সমাজ দ্বিধাবিভক্ত। একদল উঁচুস্তরে যারা রাষ্ট্রের সব সুযোগ সুবিধাভোগী। আর অন্যদল সুবিধাবঞ্চিত তৃণমূল জনগোষ্ঠী; যারা রাষ্ট্র ও সরকার কর্তৃক নিগৃহীত। প্রথম দল বহিরাগত, আর দ্বিতীয় দল এ মাটির সন্তান। প্রথম দল আর্য বংশধারার সাথে সম্পৃক্ত। আর দ্বিতীয় দল নুহ নবির উত্তরসূরী। প্রথম দল আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু। আর দ্বিতীয় দল বঙের উত্তরসূরী বাঙালি।
দক্ষিণ ভারত থেকে আগত সেন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বাংলাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করে এগারো শতাব্দীর শেষের দিকে। ভাষাবিজ্ঞানী ড. কাজী দীন মুহাম্মদ লিখেছেন, ‘আর্য বংশোদ্ভূত সেন রাজাদের আমলেই সর্বপ্রথম বাংলার স্বাধীন সত্তা খর্ব হয়। বরং বলা চলে, সেন রাজাদের সময়ই সর্বপ্রথম বঙ্গ পরাধীন হয়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আর্য ভারতীয় ব্রাহ্মণ্য সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শক্তির বাহন হিসেবে এদেশের উপর আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যেই সেন বংশের আগমন।’ সিংহাসনে সওয়ার হয়েই সেনরা জ¦ালাও পোড়াও নীতি গ্রহণ করে। আম জনকওমের ওপর চলে নির্যাতনের স্টিম রোলার। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে স্বৈরাচার ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়রা জন্তু জানোয়ার থেকেও হীন মনে করত। সেই সমাজে ‘গরু হত্যা ছিলো মহাপাপ’। কিন্তু ‘মানুষ হত্যা ছিলো মহাপূণ্য’। ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়রা এখানকার আদিবাসীদের রাস্তা দিয়ে চলাফেরার অধিকারকেও খর্ব করে। কারণ তাতে সেন-বামুনদের জাতভ্রষ্ট হতো। কৌলিন্য প্রথা, বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা-দ্বেষ রন্দ্রে রন্দ্রে প্রবেশ করে ব্রাহ্মণ্য আগ্রাসনে। অধ্যাপক শ্রী অতীন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘চর্যাপদ’ কিতাবে বলেন, ‘গোটা সমাজ তখন তিনটি বৃহৎ প্রাচীরের দ্বারা বিভক্ত- সবার উপরে ব্রাহ্মণ, মাঝে অগণিত শুদ্র পর্যায়ের সাধারণ লোক আর সবার পিছে সবার নিচে সমস্ত রকম সামাজিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত অস্পৃশ্য দীন ও নিরন্তর দুঃখের দাহনে দগ্ধ অন্তজ ও ম্লেচ্ছ সম্প্রদায়। প্রত্যেকটি বর্ণের মধ্যে দুর্লঙ্ঘ দুরাতিক্রম্য বাধার প্রাচীর। ... এর পরিণতি তাই শেষ পর্যন্ত দাঁড়ালো ব্রাহ্মণ এবং অব্রাহ্মণের মধ্যে একটা গুপ্ত বিরোধ এবং অবিশ্বাস। এই বিরোধ, অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং অপমানের ধূমকলঙ্কে মলিন পরিবেশ সেদিন বাংলার সমাজ-জীবনকে ঘোলাটে করে তুলেছিলেন। ... একদিকে সামাজিক গোঁড়ামি, ঐশ্বর্য বিলাস এবং কামনাবাসনার সোৎসাহ আতিশয্য। জীবনের সমস্ত দিকে কদর্যতার সমাবেশ; আর অন্যদিকে নিদারুণ দারিদ্র, ক্ষুধা, অভাব, পীড়ন, শোষণ, বর্জন, যন্ত্রণা এবং মৃত্যু।’ রমাপ্রসাদ চন্দ্র তাঁর ‘গৌড়রাজমালা’ কিতাবে বিজয়সেনের অভ্যুদয়কেই গৌড়ের সর্বনাশের মূল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ঐতিহাসিকদের মতে, বখতিয়ার খলজি বঙ্গ অভিযান পরিচালনা করেন ১২০৫ সনের ১০ মে (১৯ রমযান ৬০১ হিজরি)। ১০ মে ‘বখতিয়ার দিবস’ পালন করা বাঙালি জাতির নৈতিক দায়িত্ব। এ বছর বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের ৮১৩তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। দল-মত নির্বিশেষে সকলের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, বখতিয়ার খলজিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করুন, ইতিহাসের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি নিন। বিনা রক্তপাতে, বিনা যুদ্ধে একটি রাষ্ট্র বিজয় বখতিয়ারের মত দিগ¦বিজয়ী বীরের পক্ষেই সম্ভব। যে মহাবীরের হায়দারি ডাকে জাহেলিয়াত নির্মূল হয়, খোদাদ্রোহীদের সিংহাসন ভেঙে চুরমার হয়, অত্যাচারী লক্ষ্মণ সেন পালিয়ে যায় এবং তাঁর নিরাপত্তা বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। জনগণ রেহাই পায় জুলুমবাজ লক্ষ্মণ সেন সরকারের কবল থেকে। তারা খোশ আমদেদ জানায় বখতিয়ার ও তাঁর মুজাহিদ বাহিনীকে। দু’শো বছর পর বাংলায় কায়েম হয় সুশাসন। আম জনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
বখতিয়ারের আগমনেই আমরা ভাষা পেয়েছি, দেশ পেয়েছি, স্বাধীনতা পেয়েছি। মুক্তভাবে চলতে ফিরতে শিখেছি, মানুষ হিসেবে বাঁচতে শিখেছি। প্রতিরোধ-প্রতিবাদ করতে শিখেছি। মানুষ হতে পেরেছি। অন্যথায় আজও দিল্লির বেদীমূলে হাঁস-ফাঁস করতে হতো। আর ভারতীয় আর্যব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি দলিত মথিত করে ফুটবল বানিয়ে খেলত আমাদেরকে। বখতিয়ারের বীরত্ব প্রদর্শিত না হলে বাঙালির আযাদি হতো সুদূরপরাহত। স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার কল্পনা-ভাবনার ফুরসতই দিত না সা¤্রাজ্যবাদী রাম-কৃষ্ণীয় ভারত। পাঠকরা বলতে পারেন, বর্তমান বাংলাদেশের সাথে বখতিয়ার খলজির রিশতা কী? আমরা বলব, বখতিয়ার খলজিই আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক। কিন্তু কীভাবে? বিস্তারিত বলার সুযোগ এখানে নেই।
পূর্বেই বলা হয়েছে, বখতিয়ারের আগমনের পূর্বে এদেশে বহিরাগত সেন শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। সেনরা ছিলো দাক্ষিণাত্য থেকে আগত উচ্চবর্ণের হিন্দু। তারা পাল শাসকদের কুপোকাত করে মসনদ দখল করে। জনগণ থেকে তারা ছিলো বরাবরই বিচ্ছিন্ন। জনগণকে তারা নানা শ্রেণিতে, বর্ণে, দল-উপদলে বিভক্ত করে। কৌলিণ্যপ্রথা চালু করে সমাজের সকল স্তরে। তাদের শোষণ, জুলুম, নির্যাতনে জনগণ ছিলো অতিষ্ঠ। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যিকভাবে তাদেরকে পঙ্গু করে দেয় সেন সরকার। শুধু তাই নয়, তাদের কণ্ঠকেও রুদ্ধ করে দেয় বিজয়সেন-বল্লালসেন-লক্ষণসেনরা। বাংলা ভাষাকে নিষিদ্ধ করে সংস্কৃত জবানের পৃষ্ঠপোষকতা করে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। বাংলা বুলি, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ঐতিহ্য বিলুপ্ত হতে চলেছিল- ঠিক এমনি এক দুর্যোগময় মুহূর্তে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বীর জেনারেল বখতিয়ার খলজির আবির্ভাব। তাঁর আগমনে বাংলা জবান ফিরে পায় হারিয়ে যাওয়া মর্যাদা। জনগণ ফিরে পায় স্বাধীনতার সম্মান। মুক্ত বাতাসে মুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার অর্জন করে। প্রখ্যাত কবি ফাহিম ফিরোজ ‘উত্তর আধুনিক জনক’ কবিতায় লিখেছেন: পথ-প্রান্তর। কোথায় ঘুরিনি মহাশয়/কোথাও শান্তির খোঁজে হয়েছি তো দ্বিজ/দ্বিজাম্বর পেয়েছিলাম বখতিয়ার হাতে।’
তদানীন্তন বাংলায় মানবাধিকার ছিলো চরমভাবে বিপর্যস্ত। বারো শতকের বাংলায় মানুষ, মানবতা, মনুষ্যত্ববোধ, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, ইনসাফ, বিবেকবোধ, নৈতিকতার কোনো মূল্যায়ন ছিলো না। মূল্যায়নের একমাত্র নির্ণায়ক ছিলো জন্ম পরিচয়। জাতিগত পরিচয়ে এরা ছিলো ব্রাহ্মণ। তারা ছিলো সমাজর উঁচুতলার মানুষ। রাষ্ট্রক্ষমতা, তেজারতি, সমাজ-সংস্কৃতি, অর্থব্যবস্থা ছিলো তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে। ওরা বাংলাদেশের অধিবাসী ছিলো না। বহিরাগত হয়েও তারা ছিলো সর্বেসর্বা। সমাজ ও রাষ্ট্রের চাবিকাঠি ছিলো তাদের কুক্ষিগত। আম জনতা শুধুই খেটে মরত। উৎপাদন কাজে তাদেরকে  পশুর মতো ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ফল ভোগ করত ব্রাহ্মণ সমাজ। বাঙালির মুক্তির দূত বখতিয়ার খলজির নদিয়া জয় করে এই অরাজকতার অবসান ঘটান। তাইতো তিনি চির নমস্য, চির পূজনীয়।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ারের আগমন না ঘটলে আজ বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সংস্কৃতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশ বলতে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব থাকত না। কারণ সেন আমলে বাংলা ভাষা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর প্রবর্তন হয়েছিল সংস্কৃত ভাষা। আবার বখতিয়ার খলজির আবির্ভাব না হলে হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ‘বাঙালাহ’ নামে স্বাধীন দেশ সৃষ্টিরও প্রশ্ন উঠে না। আবার ১৯৪৭ সনে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম হবার কারণেই পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান অংশে পড়ে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে এদেশ ভারতভুক্ত হয়েই থাকত। তখন আর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়া কারও কল্পনাই আসত না। জেনারেল বখতিয়ার খলজি বাংলা জয় করার কারণেই আট’শ বছর যাবত এদেশে ইসলামের ব্যাপক প্রচার হয়। ফলে মুসলিমগরিষ্ঠ ভূখ-ে রূপ নেয় দেশ। যার চূড়ান্ত পরিণতি আজকের বাংলাদেশ। আজও মুসলিম সেন্টিমেন্ট বিলুপ্ত হলে দেশ দিল্লির করতলগত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই ইসলাম ও মুসলিমরাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। আর এই আযাদির মূল ভিত্তি পয়দা করেন মহাবীর বখতিয়ার খলজি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ