ঢাকা, শনিবার 18 August 2018, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ৬ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মহাদেবপুরে টুং-টাং শব্দে মুখরিত কামারপট্টি

মহাদেবপুরে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কামার শিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছে

ইউসুফ আলী সুমন, মহাদেবপুর (নওগাঁ): নওগাঁর মহাদেবপুরে আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প। আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, কারিগরদের মজুরী বৃদ্ধি, তৈরি পণ্যসামগ্রীর বিক্রয় মূল্য কম, কয়লার মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে বড় বড় ব্যবসায়ীদের স্টীল সামগ্রী আমদানি, চরম আর্থিক সংকট, উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কম ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে সময়ের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এ শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব আগমনী ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে কামারপট্টিতে দেশী প্রযুক্তির ছুরি, কাটারি, বটি, দা ও কুঠার বানাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে কামাররা। কোরবানীর পশু জবাই ও গোস্ত বানানোর কাজে ব্যবহৃত অস্ত্র তৈরির কাজে ১১মাস অলসের পর এক মাস ব্যস্ত সময় কাটান তারা। উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ইতিমধ্যেই গ্রামের লোকজন কামারীদের ধারালো চাকু, বটি ও কাটারি তৈরির আগাম অর্ডার দেওয়া শুরু করায় কামার পল্লী ও হাট-বাজারগুলো এখন টুং-টাং শব্দে মুখরিত। ঘুমাতে পারছে না কামার পাড়ার পাশের বাড়ির মানুষেরা। সরেজমিনে কামার পল্লী ও হাট-বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, কয়লার আগুনে লাল টকটকে তেঁতে ওঠা লোহায় হাতুড়ি দিয়ে দু’দিক থেকে ইচ্ছামতো পেটাচ্ছেন কামাররা। লোহায় হাতুড়ি পেটায় ছড়াচ্ছে স্ফুলিঙ্গ। লাল রঙ ফিকে হয়ে এলে পানিতে ভিজিয়ে আবারও পেটানো হচ্ছে। কেউ বা শান দিয়ে ধার দিচ্ছে ছুরি-কাটারি। রেত দিয়ে কেউ আরও ধারালো করছে দা কিংবা বটি। এখন ২৪ ঘন্টা টুং-টাং শব্দ লেগেই আছে। কয়েকজন কামারের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা সাধারণত এ দুই ধরনের লোহা ব্যবহার করে এসব উপকরণ তৈরি করা হয়। স্প্রিং লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণের মান ভাল, দামও বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি উপকরণগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়াও ব্যবহার করা হয় এঙ্গেল, ব্লাকবার, রড, স্টিং, রেললাইনের লোহা, গাড়ির পাত ইত্যাদি। অনেকে লোহা কামারদের কাছে এনে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে। এর মজুরিও লোহাভেদে নির্ধারণ করা হয়। আর বেশিরভাগ কামারদের কাছ থেকেই লোহা কিনে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে বা রেডিমেট বানানো জিনিস নিয়ে যায়। আধুনিকতার উৎকর্স, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে নানাবিধ সমস্যার কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের গ্রাম-বাংলার মানুষের প্রিয় এই কামার শিল্পটি। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে শত শত কর্মকার পরিবার থাকলেও বর্তমানে তাদের তৈরি পণ্যসামগ্রী প্রযুক্তির ছোঁয়ায় টিকে থাকতে না পারায় বেশকিছু পরিবার তাদের পৈত্রিক পেশা ধরে রাখতে পারছে না। কিছুটা বাধ্য হয়েই পরিবারের অভাব-অনাটন ও চাহিদার তাগিদে লাভজনক পেশায় চলে যাচ্ছে। বর্তমানে উপজেলার পাহাড়পুর, জিগাতলা, মুমিনপুর, কালিতলা, বনগ্রাম সহ বিভিন্ন গ্রামে প্রায় শতাধিক পরিবারের কর্মকাররা তাদের পৈতিক পেশা অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে হলেও দু’মুঠো ভাতের আশায় এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। যতটুকু লাভ হকনা কেন কোন রকম দিন চললেই তারা বেজাই খুশি, অন্য পেশায় যেতে নারাজ। মহাদেবপুর বাজার, ছাতুনতলী হাট, সরস্বতী বাজার, মহিষবাথান বাজার, মতাজি হাট সহ প্রতিটি হাট-বাজারে কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে কামারপাড়ার কারিগররা সারা বছর অলস সময় কাটালেও এখন ঈদের কারণে রাত-দিন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। এখানকার কামাররা নিপুন হাতে বটি, ছুরি, কাটারি, দা, বেকি, কুঠার, খুন্তা ও লাঙ্গলের ফলাসহ বিভিন্ন ধরণের যাবতীয় প্রয়োজনীয় লৌহজাত দ্রব্য তৈরি করেন। উপজেলার মুমিনপুর গ্রামের সুজন কর্মকার জানান, সারাদিন হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যে কয়টি জিনিস তৈরি করি তা বিক্রয় করে খুব বেশি লাভ না হলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে বেচে থাকার স্বার্থে আদি এই পেশা আমি ধরে রেখেছি। তবে সারাবছর কাজ-কর্মের ব্যবস্থা তেমন না থাকলেও কুরবানী ঈদকে সামনে রেখে আমাদের কর্ম ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। সাড়া বছর এই রকম কাজ থাকলে ভালই হত। একই গ্রমের রধুনাথ কর্মকার জানান, এ পেশা বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া তাই কষ্ট হলেও এ পেশা ধরে রেখেছি। সারাবছর তো তেমন কাজই থাকে না। ঈদে ভাল ব্যবসা হচ্ছে। প্রচুর কাজ। তাই একটু পরিশ্রমও বেশি করতে হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ