ঢাকা, রোববার 19 August 2018, ৪ ভাদ্র ১৪২৫, ৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চলছে অজ্ঞান মলম টানা পার্টির মওসুম

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে সক্রিয় হয়েছে অজ্ঞানপার্টি  মলমপার্টি ও টানা পার্টির সদস্যরা। প্রতিবছর ঈদ আসলেই এই তিন পার্টির দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়,তার সাথে বাড়ে সদস্য সংখ্যাও। উৎসব,পূজা পার্বণ কেন্দ্রীক  কখনও সদস্য সংখ্যা  দ্বিগুন হারে বেড়ে যায়। কুরবানীর ঈদে তাদের লক্ষ্য থাকে, পশুর হাট, টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, রেল স্টেশন ও অভিজাত মার্কেটে আসা লোকজনের টাকা বিভিন্ন উপায়ে আত্মসাত করা। তাছাড়া শপিং মল, গরু ব্যবসায়ী ও ঘর মুখো যাত্রী তো আছেই।
রাজধানী ঢাকায় তাদের উৎপাত এমনভাবে বেড়েছে যে,ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গত ২৪ ঘন্টায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অভিযান চালিয়ে শুধুমাত্র অজ্ঞান পার্টিরই ৫৭ সদস্যকে বমাল গ্রেফতার করেছে। ডিবির অভিযানে শ্যামপুর ও জুরাইন এলাকা থেকে ৭ জন, গুলিস্তান, নিউমার্কেট, শাহবাগ এলাকা থেকে ৩১ জন, সায়েদাবাদ এলাকা থেকে ৭ জন এবং নিউমার্কেট এলাকা থেকে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে। অজ্ঞান পার্টির কাছ থেকে চেতনানাশক ৫৫৩টি ট্যাবলেট, ৭ কৌটা মলম ও ৭ বোতল বিষ মেশানো পানীয় উদ্ধার করা হয়।
শুক্রবার সকাল থেকে গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, বিভিন্ন বাসযাত্রীকে অচেতন করে তাদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ‘অজ্ঞান পার্টি’র তৎপরতা ঈদের সময় বেড়ে যায়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান,ভাব জমিয়ে অজ্ঞান করেন তাঁরা। প্রথমে তাঁরা কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করেন। এরপর ভাব জমিয়ে ফেলেন। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিকে চা, কফি, ডাবের পানি, পান, বিস্কুট খাইয়ে দেন। খাওয়ার পর অচেতন হয়ে গেলে ওই ব্যক্তির কাছে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতেন।
ঈদ উৎসবের সময় যত এগিয়ে আসছে, দেশের প্রতন্ত অঞ্চল থেকে রাজধানীতে কুরবানির গরু আসতে শুরু হয়েছে। ততই এই তিন পার্টির তৎপরতা বাড়ছে। গত রমজানের ঈদে অজ্ঞান পাটিূর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সড়কপথের রুটগুলো ভাগাভাগী করে নিয়েছিল। এবছর সড়কপথের পাশাপাশি রেল ও নৌপথেও নিজেদের মধ্যে রুট ভাগাভাগী করে নিয়েছে মলমপার্টি ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। যাতে এক রুটের সদস্য আরেক রুটে ঢুকে পড়ায় নিজেদের মধ্যে ঝামেলা না বাঁধে।
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে গড়ে প্রতিদিন ২০-২২ জন আসেন বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত রোগী। এর মধ্যে ১৬-১৭ জনের পাকস্থলী ধোয়া (স্টমাক ওয়াশ) হয়। তাদের বেশিরভাগই অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া। অজ্ঞান পার্টির সদস্য দ্বারা আক্রান্ত রোগীকে স্টমাক ওয়াশের পর দ্রুত মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। তবে এ ক্ষেত্রে আক্রান্তকে দেরিতে ভর্তি করা হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। কোনো লোক অজ্ঞান পার্টি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারলে তার উচিত দ্রুত টেলিফোনে আত্মীয়স্বজনকে জানানো যেন দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনা যায়।
সূত্র জানায়, পুলিশ-র‌্যাবের ব্যর্থতার কারণেই অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ইতোমধ্যে বাস, ট্রেন ও নৌপথে জেঁকে বসতে শুরু করেছে। তাদের লক্ষ গরু বেপারিসহ দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চযাত্রীদের অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেওয়া।
জানা গেছে, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা কখনো যাত্রী, কখনো হকার, আবার কখনো সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার বেশে মানুষকে অজ্ঞান করছে। আবার কখনো চেতনানাশক পাউডার মিশ্রিত রুমাল ঝেড়ে শ্বাস-নিঃশ্বাসের মাধ্যমেও যাত্রীকে অচেতন করছে। এ ছাড়া চা, কফি, জুস, ঝালমুড়ি, শরবত, ডাবের পানি, বিস্কুট ও হালুয়াসহ নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্যে চেতনানাশক দ্রব্য মিশিয়ে অজ্ঞান করে থাকে। পুলিশ সূত্র জানায়, ঈদ ঘিরে অজ্ঞান পার্টির প্রায় ৩০টি গ্রুপ বাস, ট্রেন ও নৌপথে জেঁকে বসেছে। হাইওয়ে রুটের মধ্যে মানিক গ্রুপ ঢাকা-সিলেট রুটে, সজীব গ্রুপ ঢাকা-উত্তরবঙ্গ রুটে, ইসমাইল ও বেলাল গ্রুপ ঢাকা-ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা রুটে, মাসুম চৌধুরী গ্রুপ ঢাকা-খুলনা রুটে, সামু হাজি গ্রুপ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আজাদ গ্রুপ ঢাকা-মাওয়া-খুলনা রুটে এবং আল আমীন গ্রুপ ঢাকা-কুষ্টিয়া রুটে তৎপর হয়ে উঠেছে।
ঢাকা-বরিশাল লঞ্চ রুটে হেলাল ও বাদশা গ্রুপ সক্রিয়। এই গ্রুপে আছে- পিরোজপুরের জাহিদ হাসান, বরিশালের ইউসুফ, হালিম, মিল্টন, বরগুনার রনি। নৌরুটের আরেক গ্রুপ হলো মিন্টু শিকদার ও ফারুক ওরফে বিডিআর ফারুক গ্রুপ। এই গ্রুপে রয়েছে শফিকুল, রফিক শিকদার, আবুল, মান্নান, নুরুল ইসলাম, ফরিদ, হাবিব, মানিক। প্রতিটি রুট আবার ভাড়া দিয়েছে অজ্ঞান পার্টির রিং লিডাররা। বিনিময়ে তারা গ্রুপগুলোর কাছ থেকে কমিশন নিয়ে থাকে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। কারণ এ ঈদে কেনাবেচা ঘিরে বিপুল অঙ্কের অর্থ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় নিয়ে যান ক্রেতা-বিক্রেতারা। ঈদে অজ্ঞান পার্টির সবচেয়ে লোভনীয় রুট হলো উত্তরবঙ্গ। কারণ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বেপারিরা  কেনাকাটা শেষে টাকা নিয়ে চলে যান।
পুলিশ সূত্রগুলো জানায়, এসব গ্রুপের মধ্যে কোনোটি অপারেশন করছে যমুনা ব্রিজের ওপারে। কোনো গ্রুপ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে। আবার কোনো গ্রুপ খুলনায়। ঢাকা ও আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রুপ তাদের তৎপরতা শুরু করেছে। এদের মধ্যে শহর আলী গ্রুপ, আব্দুল হক গ্রুপ, ফরিদ গ্রুপ, এমরান হাজির গ্রুপ, ডন চৌধুরীর গ্রুপ অন্যতম। এরা সবাই মলম ও অজ্ঞান পার্টির গডফাদার।
সূত্র জানায়, রাজধানীর গুলিস্থান, মগবাজার, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, রামপুরা, বনানী, আরামবাগ, ফার্মগেট, আসাদগেট, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, ফকিরাপুল বাজার,   দৈনিক বাংলা মোড়, মতিঝিল শাপলা চত্বর, মিরপুর এবং সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় বেশি তৎপর অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা।
এবিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. ফিরোজ জানান, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ডাব, জুস, হালুয়া ও আচারে নেশা জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে তাদেরকে অচেতন করেছে। ওই সব পানীয়তে যে পদার্থটি মেশানো হয় তা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব চক্র সুসসংগঠিত হওয়ায় অধিকাংশ সময়ই তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তবে প্রতিনিয়তই এসব চক্রের সদস্যদের আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু এসব চক্রে হাজার হাজার সদস্য জড়িত থাকায় কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। তাই এসব অপরাধ ঠেকাতে সবার সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।
 খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর গুলিস্তান, সদরঘাট, গাবতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, আবদুল্লাহপুর, সায়েদাবাদ ও মহাখালীর মতো রাজধানীতে প্রবেশ ও রাজধানী থেকে বের হওয়ার পয়েন্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। বিশেষ করে ঈদ বা উৎসবের মুখে তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এ সময় খেটে খাওয়া মানুষরা উপার্জিত অর্থ নিয়ে  গ্রামে ফেরেন স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে। কিন্তু অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে বেদনার ভাগিদার হতে হয় তাদের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, চক্রের সদস্যদের টার্গেটে থাকে শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির সাধারণ মানুষ। কারণ তাদের সচেতনতার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি চক্রের সদস্যদের প্রতিহত করার সক্ষমতাও তাদের কম। কখনও কখনও ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতার সহযোগিতায় চক্রের দুয়েকজন সদস্য আটক হলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে তাদের আটকে রাখা যায় না। আবার ঈদ বা উৎসব শেষে চক্রের সদস্যরা শহর ছেড়ে গ্রাম ও উপশহরগুলোতে আশ্রয় নেয়। ফলে তাদের ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এসব চক্রের সদস্যদের তৎপরতা আগের চেয়ে কমেছে। যদিও একেবারেই নির্মূল হয়নি।
অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা বলছেন, তারা বাস, ট্রেন ও লঞ্চ ও সেগুলোর টার্মিনালের আশপাশের এলাকায় অবস্থান করেন। অবস্থান বুঝে প্রতিটি চক্রে ২০ থেকে ২৫ জন, কখনও কখনও আরও বেশি সদস্য উপস্থিত থাকেন। এরপর পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে ২ থেকে ৫ মিনিটে যাত্রীদের অবচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেন তারা। কখনও কখনও যাত্রীদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতেও দীর্ঘসময় ব্যয় করতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ ঘটনাতেই সাফল্য মেলে বলে জানান তারা।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ঈদকে ঘিরে অজ্ঞান পার্টিসহ অন্য যেকোনো পার্টি যেন তৎপর হতে না পারে সেজন্য পুলিশ সর্বদা কড়া নজরদারি করছে। সেই সঙ্গে নিয়মিত অভিযানও পারিচালিত হচ্ছে।’
তবে আইশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি ঈদে ঘরমুখো মানুষকে খুব বেশি সচেতনতায় চলাচল করতে অনুরোধ জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘পুলিশ তো সবসময় এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তবে জনগণ সচেতন না হলে এ ধরনের চক্রকে একেবারে নির্মূল করা খুব কঠিন।’
সাম্প্রতিক তৎপরতার খবর : ৭ আগস্ট সকালে ধামরাইয়ের আলাউদ্দিন পার্কের স্টাফ রুহুল আমিন (৪০) সিটি পরিবহনে মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তান যাচ্ছিলেন পার্কের জিনিসপত্রের জন্য। সঙ্গে ছিল ৭০ হাজার টাকা। বাসে বসে হকার কাছ থেকে একটা চিপস কিনে খেয়েছিল তিনি। সেটাই কাল হয় তার জন্য। পকেটে থাকা টাকা ও সঙ্গের মোবাইল ফোন খোয়ান তিনি। পরে শাহবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করে এক পথচারী তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভর্তি করান।
একই দিন যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গাবতলীগামী ৮ নম্বর বাস থেকে অবচেতন অবস্থায় সিদ্দীক আলী (৭৪) নামে এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে ওই বাসেরই আরেক যাত্রী। তিনি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ এলাকার একটি পলিটেকনিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। ঢাকা থেকে পেনশনের টাকা নিয়ে এলাকায় যাওয়ার সময় অজ্ঞান পার্টির খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব হারান তিনিও। পরে তাকে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। একই দিন পশ্চিম জুরাইন এলাকা থেকে আরিফুল নামে (২৮) একজনকে উদ্ধার করেন কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সেলিম। তারও পকেট কাটা ছিল। অর্থাৎ সর্বস্ব খুইয়েছেন তিনিও।
গত ৭ আগস্টের এই তিন ঘটনাসহ ৭ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত এক সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞান পার্টি ও ছিনতাইকারীর খপ্পড়ে পড়েছেন প্রায় ২৫ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বরাবরের মতোই ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তৎপর হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীদের বিশেষ গ্রুপ অজ্ঞান পার্টি। তাদের দৌরাত্ম্যে সহজ-সরল মানুষেরা উপার্জিত অর্থ নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাইলেও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। অনেককেই মারাত্মক আহত হয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে হাসপাতালের বেডে।
বেপরোয়া টানাপার্টি টার্গেট নারী :
ফের বেপরোয়া টানাপার্টি চক্র। অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ চক্র। দিনরাত সমান তালেই চক্রের সদস্যরা তৎপর। পথচারী, রিকশা বা বাসযাত্রীর কাছ থেকে টান দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাগ-মোবাইল ফোন। চলতি মাসেই অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ টানাপার্টির কবলে পড়েছেন। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ইদানীং ছিনতাইয়ের কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হচ্ছে।
পথচারী বা রিকশার নারী-যাত্রীদের টার্গেট করে এ চক্র। সুযোগ বুঝেই মোটরসাইকেল থেকে টান দিয়ে ব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করছে। চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হেচকা টানে অনেক যাত্রী রিকশা থেকে পড়ে আহত হচ্ছেন। পুলিশ বলছে, প্রায়ই টানাপার্টির কবলে পড়ে ব্যাগ, টাকা, মোবাইল হারানোর ঘটনার তথ্য আসলেও থানায় অভিযোগ আসে কম। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, সার্টিফিকেট বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারালে সেগুলোর জন্য সাধারণ ডায়েরি করে ভুক্তভোগীরা।
গত সপ্তাহের শনিবার রাত ১০টা। লালমাটিয়া থেকে রিকশাযোগে তালতলা যাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মুনতাহা আফরিন। তাকে বহনকারী রিকশাটি মানিক মিয়া এভিনিউ এলে হঠাৎ করেই তার কাছে থাকা ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী। ব্যাগ টান দিয়ে নেয়ার পর গতি বাড়িয়ে তারা নিমিষেই সেখান থেকে চলে যায়। মুনতাহা বলেন, কম গতির একটি মোটরসাইকেল রিকশার পাশে আসে। দুজনের মাথায়ই হেলমেট ছিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমার ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়। আমি চিৎকার করেছিলাম কিন্তু ততক্ষণে তারা  সেখান থেকে চন্দ্রিমা উদ্যানের সড়ক দিয়ে চলে যায়। তিনি বলেন, আমার ব্যাগের মধ্যে ৫ হাজার ৪০০ টাকা, দুটি মোবাইল ফোনসহ আরো কিছু জিনিস ছিল। একই দিন বিমানবন্দর সড়কের খিলক্ষেত ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের সামনে ঘটে আরেক ঘটনা। ওই রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৯টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা বলে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলেন মধ্যে বয়সী সোলায়মান হোসেন। কথা বলায় মগ্ন থাকায় আশপাশে তার তেমন একটা নজর ছিল না। তখন হঠাৎ করেই পেছন থেকে আসা দুই মোটরসাইকেল আরোহী তার মোবাইল ফোনটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। এই দুই ভুক্তভোগীর কেউই সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করেননি। পরদিন রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের ঈদগাহ রোড দিয়ে রিকশা করে বাসায় ফিরছিলেন আতিক হাসান নামের এক চাকরিজীবী। তিনি একটি আইটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। অফিস শেষে করে বাসায় ফেরার পথে তার ব্যবহৃত ল্যাপটপটি সঙ্গে ছিল। আতিক বলেন, তখন সড়কে তেমন একটা যানবাহন চলাচল ছিল না। আনুমানিক ২০-২২ বছরের দুই তরুণ আমার রিকশার পাশে এসে টান দেয়। চলন্ত অবস্থায় টান দিলে ব্যাগসহ আমি পাকা রাস্তায় পড়ে যাই। এসময় মোটরসাইকেলের পেছনের যাত্রী নেমে জোর করে টান দিয়ে আমার ব্যাগ নিয়ে চলে যায়। আমার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসলেও কোনো লাভ হয়নি। আতিক বলেন, ল্যাপটপ নিয়ে গেছে এটা কোন সমস্যা নয়। কিন্তু ল্যাপটপের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু ডকুমেন্টস ছিল,যেগুলো আর পাওয়া যাবে না।
টানাপার্টির কবলে পড়ে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু হারানোর ঘটনার পাশাপাশি অনেকেই আহত হচ্ছেন মারাত্মকভাবে। গত সোমবার সিলেট থেকে উপবন ট্রেনে ঢাকায় আসেন সায়মা হক তুসি নামের এক শিক্ষার্থী। সাড়ে ৫টার সময় কমলাপুর স্ট্রেশনে নেমে একটি রিকশা করে তিনি বাসাবোর বাসায় ফিরছিলেন। তাকে বহনকারী রিকশাটি শাহজানপুর রেলওয়ে কলোনি যাওয়ার পরই কয়েক যুবক তার রিকশার গতিরোধ করে। এসময় যুবকরা তার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে। কিন্তু তুসি তার ব্যাগ শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। এসময় এক যুবক জোরে হেঁচকা টান দেয়। তখন রিকশা থেকে উল্টে পড়েন তুসি। পড়ে গিয়ে তার বাম পা ও হাত মচকে যায়। উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি ব্যাগটি ছেড়ে দেন। পরে যুবকরা তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। আহত তুসি পরে একটি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেন। গত সপ্তাহেও দারুস সালাম ব্রিজের নিচে টানাপার্টির কবলে পড়ে আহত হন এক নারী। সালমা ইসলাম নামের ওই নারী হেঁটে হেঁটে কল্যাণপুর থেকে গাবতলী যাচ্ছিলেন। দারুসসালাম এলাকায় যাওয়ার পর তিনি ছিনতাকারীর কবলে পড়েন। তার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয় এক ছিনতাইকারী। শক্ত করে ধরে ব্যাগ নিতে ব্যর্থ হয়ে ওই ছিনতাইকারী তার হাতে ছুরিকাঘাত করে। এতে রক্তাক্ত হয়ে ওই নারী ব্যাগ ছেড়ে দেন। ব্যাগের মধ্যে ১১ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণের রিং, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আরো কিছু সামগ্রী ছিল।
চলতি বছরের শুরু ও গত বছরের শেষের দিকে টানাপার্টির কবলে পড়ে বেশকিছু প্রাণঘাতী ঘটনাও ঘটে। গত বছরের ১৮ই ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীর দয়াগঞ্জে টানাপার্টির কবলে পড়ে প্রাণ হারায় ৬ মাস বয়সী শিশু আরাফাত। শরীয়তপুরের শাহআলম ও আকলিমা দম্পতি তাদের বড় ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকা আসেন। লঞ্চে সদরঘাট এসে একটি রিকশা দিয়ে শনির আখড়ায় তাদের এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার সময় ঘটনাটি ঘটে। আকলিমার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টানাটানির সময় কোল থেকে মাটিতে পড়ে শিশু আরাফাত। মাথায় আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। চলতি বছরের ২৬শে জানুয়ারি ধানমন্ডিতে টানাপার্টির কবলে পড়ে মৃত্যু হয় গ্রিনলাইফ হাসাপাতালের মিডওয়াইফারি ৩৫ বছর বয়সী হেলেনা বেগমের। বরিশালের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গ্রিনরোডের বাসায় ফেরার পথে একটি প্রাইভেটকার থেকে হেলেনার ব্যাগ ধরে টানাটানি করে ছিনতাইকারীরা। চলন্ত গাড়ি থেকে টানাটানির একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন হেলেনা। এসময় ওই প্রাইভেট কারটি হেলেনার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এছাড়া টানাপার্টির কারণে একজন সেবিকা, চিকিৎসক মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
শুধু দেশি মানুষ নন ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন বিদেশিরাও। গত ১৪ই জুন সীমান্ত স্কয়ারের সামনে টানাপার্টির কবলে পড়ে সর্বস্ব হারান ফটোগ্রাফির কোর্স করতে আসা জার্মান এক তরুণী। এসময় টানাপার্টির সদস্যরা তার কাছে থাকা ব্যাগে ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক, ক্যামেরা, টাকা ছাড়া আরো অনেক কিছু নিয়ে যায়। পরে সুইন্ডে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করেন। দেশে ফেরার আগে সুইন্ডে ইনস্টাগ্রামে দেয়া একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বাংলাদেশে একা ভ্রমণ করা ঠিক নয় বলে তার উপলব্ধি হয়েছে। তিনি লিখেছেন, রিকশায় ভোরে এবং সন্ধ্যায় কখনও ওঠা উচিত না। এ সময় মোটেও নিরাপদ নয়।
সূত্র বলছে, পরপর আলোচিত বেশ কয়েকটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ তৎপর হয়ে উঠেন। বিশেষ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু টানাপার্টির সদস্যদের গ্রেপ্তারও করেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। বিশেষ করে পুলিশ ও র‌্যাবের বিশেষ অভিযানের কারণে রাতের বেলায় পথচারীরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই চলাফেরা করে। কিন্তু ইদানীং হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে এসব ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে কোথাও না কোথাও টানাপার্টির কবলে পড়ার খবর। যেভাবে ঘটনা ঘটছে সে তুলনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হচ্ছে না। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে টানাপার্টির চক্র। অন্তত ২০টি স্পর্টে অর্ধশতাধিক চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০টি স্পটের মধ্যে দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, ওয়ারি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, দারুসসালাম, বিমানবন্দর সড়ক, মানিক মিয়া এভিনিউ অন্যতম। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান বলেন, টানাপার্টির সদস্যদের ধরতে আমাদের অভিযান চালু আছে। ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায় টহল পুলিশ কাজ করছে। ঈদকে সামনে রেখে টানাপার্টির তৎপরতা একটু বেড়ে যায়। সেজন্য আমাদেরও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কাজ করে যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ