ঢাকা, রোববার 19 August 2018, ৪ ভাদ্র ১৪২৫, ৭ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হজ্জ একটি দৈহিক ও আর্থিক ইবাদাত

ডক্টর বি. এম. শহীদুল ইসলাম : ভূমিকা : ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ পাঁচটি ভিত্তির মধ্যে হজ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বা স্তম্ভ। হজ্জের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। হজ্জের এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব উপলব্ধি করলে এর তাৎপর্য, ফজিলত ও মূল উদ্দেশ্য বুঝা সহজ ও সাবলিল হয়। হজ্জের মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি এখলাসের সাথে তাওহীদের ঘোষণা দিয়ে থাকেন। হজ্জের মাধ্যমে জালিম শক্তির বিরাট প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে মুসলিমগণ ঈমান, এখলাস, তাকওয়া এবং মহান আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রেরণা পেয়ে থাকেন। ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হন ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ। তারা নিরংকুশ ও ভেজালমুক্ত আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠা ও পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক প্রেরণা ও নেক আমলের মাধ্যমে ইসলামের পরিপূর্ণ ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম হন। মুমিনগণ তাওহীদ ও এখলাসের এমন এক ভিত্তি স্থাপন করেন যা দুনিয়ার শেষ সময় অবধি এর মাধ্যমে বিশ্ব মানবতা তাওহীদের পয়গাম পেতে থাকে। প্রতি বছর হজ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন করে স্মরণ করার জন্য এবং মানুষের মাঝে আবেগ অনুভূতি ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টির জন্য পৃথিবীর দূরদূরান্ত থেকে ঈমান, ইসলাম ও তাওহীদের প্রেমানুগ মানুষগুলো পবিত্র বায়তুল্লাহতে জমায়েত হয়ে এমন সব কিছু করে থাকেন যা মুসলিম জাতির পিতা ও পথ প্রদর্শক হযরত ইবরাহীম (আ:) করেছিলেন। মুসলমানগণ দুখ- সাদা কাপড় পরিধান করে অত্যন্ত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সাথে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে থাকেন। কখনো সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী অংশে দৌঁড়ায়। কখনো আরাফাতের বিশাল ময়দানে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনায় মশগুল থাকে। কখনো মিনায় ও মুজদালিফায় অবস্থান করে। কোনো সময় জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করে এবং কখনো কুরবাণীগাহে পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে আল্লাহর সাথে নৈকট্য হাসিল ও ভালোবাসার শপথ গ্রহণ করে থাকে। চলতে ফিরতে উঠতে বসতে প্রতিটা ক্ষণে মুমিনদের কন্ঠে বায়তুল হারামের সমগ্র পরিবেশ মুখরিত হতে থাকে এ বাক্যের মাধ্যমে-“লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! লাব্বাইকা লা-শারীকালাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদ ওয়ানি’মাতালাকাল মুলক লা-শারীকালাকা”। প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার ব্যক্তি নিজেকে পরিপূর্ণরুপে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করার নামই হজ্জ।
হজ্জের আভিধানিক অর্থ : হজ্জ শব্দের আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা বা জিয়ারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হজ্জের অর্থ হচ্ছে- সেই সার্বিক ইবাদত যা একজন মুমিন ব্যক্তি পবিত্র বায়তুল্লাহ শরীফে পৌঁছে সম্পন্ন করে থাকে। মুসলমানগণ আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহ জিয়ারাতের সংকল্প করে থাকে বিধায় একে হজ্জ বলা হয়।
হজ্জের মহত্ব ও গুরুত্ব : হজ্জের মহত্ব ও গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে হজ্জের হিকমত, ইসলামী বিধানের মধ্যে হজ্জের মর্যাদা এবং হজ্জের মহত্ব ও গুরুত্বের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন; “মানুষের ওপর আল্লাহর এ অধিকার যে, বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবার শক্তি ও সামর্থ্য যে রাখে সে যেন হজ্জ করে এবং যে এ হুকুম অমান্য করে কুফরী আচরণ করবে তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ বিশ্ব প্রকৃতির ওপর অবস্থানকারীদের মুখাপেক্ষী নন”। (সুরা আল ইমরান: ৯৭ আয়াত)।
কুরআনের এ আয়াতে দুটি সত্যের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করা হয়েছে।
১. হজ্জ হচ্ছে বান্দহর ওপর আল্লাহর হক। যারা বায়তুল্লাহ পর্যন্ত যাবার শক্তি ও সামর্থ রাখে, তাদের জন্য আল্লাহর হক আদায় করা ফরজ। যারা সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ করে না, তারা আল্লাহর হক নষ্ট করে। নবী করিম সা: বলেছেন; হে লোকেরা!  তোমাদের ওপর হজ্জ ফরজ করা হয়েছে। অতএব, তোমরা হজ্জ আদায় কর- (সহীহ মুসলিম)।
২. হজ্জের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ হক হচ্ছে-সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ না করা একটি কুফরী আচরণ যেমন বলা হয়েছে। ঠিক যেভাবে কুরআনে নামাজ ত্যাগ করাকে এক স্থানে মুশরিকী কার্যকলাপ বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন; “নামাজ কায়েম কর এবং মুশরিকদের মধ্যে শামিল হয়ো না”-(সুরা রূম:৩১ আয়াত)। নবী করিম সা: এরশাদ করেছেন; যে ব্যক্তির কাছে হজ্জের জরুরি খরচের অর্থ সামগ্রী মজুদ আছে, যানবাহন আছে যার দ্বারা সে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, তারপরও সে হজ্জ করে না, তাহলে সে ইহুদী হয়ে মরুক অথবা খৃষ্টান হয়ে মরুক তাতে কিছু আসে যায় না। এ থেকে আমরা পরিস্কার বুঝতে পারি যে, সামর্থ থাকার পর যদি কেউ হজ্জ না করে তাহলে তার আচরণকে কুফরী আচরণ বলা হয়েছে এবং তাকে ইহুীদ খৃস্টানদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সুন্দর সুষ্ঠুভাবে হজ্জ সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে জন্ম দিনের মত নিষ্পাপ বলা হয়েছে।
হজ্জের প্রতিদান জান্নাত : হজ্জের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। হযরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন; আমি রাসুল সা: কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি হজ্জ করে তার মধ্যে অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করেনি, সে নিজের গুনাহ থেকে তার জন্ম দিনের মত মুক্ত ও পাক পবিত্র হয়ে ফিরে যায়- (সহীহ আল বুখারি ও মুসলিম)।  অন্য একটি হাদিসে আছে, কোনো ব্যক্তির হজ্জ কবুল হলে তার জন্য মহা পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। নবী করিম সা: এ প্রসঙ্গে এরশাদ করেছে; এক উমরা থেকে আর এক উমরা পর্যন্ত অন্তর্বতীকালীন গুনাহর কাফফারা হয়। আর কবুল হওয়া হজ্জের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। (সহীহ আল বুখারি)।
হজ্জ একটি সার্বক ইবাদাত : ইসলামে দুই ধরণের ইবাদাত রয়েছে। এক. দৈহিক ইবাদাত।  যেমন: নামাজ, রোজা ইত্যাদি দৈহিক ইবাদাত। দুই.আর্থিক ইবাদাত। যেমন: যাকাত, সাদকা, দান-খয়রাত ইত্যাদি আর্থিক ইবাদাত। কিন্তু হজ্জ একটি ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। এ ইবাদাত একই সাথে জান ও মালের ইবাদাত। অর্থাৎ হজ্জ একটি দেহিক ও আর্থিক ইবাদাত। অন্যান্য ইবাদাতের দ্বারা তাকওয়া, বিনয়, এখলাস, নম্রতা আনুগত্য, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণ, কুরবাণী, আল্লাহর নৈকট্য হাসিল ইত্যাদির ভাবাবেগ ও প্রেরণা বিকশিত হয়। আর হজ্জের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উপর্যুক্ত সকল অনুভূতি একই সাথে তৈরি হয় ও বিকশিত হয়। এ জন্য হজ্জকে সার্বিক ইবাদাতও বলা হয়। সুতরাং মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য ও জান্নাত লাভের প্রত্যাশায় প্রত্যেক স্বচ্ছল ব্যক্তির জন্য এ ইবাদাত পালন করা অবশ্য কর্তব্য।
লেখক : প্রবাসী ইসলামী গবেষক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ