ঢাকা, সোমবার 20 August 2018, ৫ ভাদ্র ১৪২৫, ৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দিনভর দফায় দফায় ৪২ শিক্ষার্থীর জামিন ॥ স্বজনদের চোখে আনন্দাশ্রু

স্টাফ রিপোর্টার : জাফরিন হক চিৎকার দিয়ে ‘আব্বু, ভাইয়ার (জাহিদুল হক) জামিন হয়ে গেছে’ বলেই আদালতের বারান্দায় আনন্দে কেঁদে ফেলেন। জাহিদুল হক সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলার সময় ৬ আগস্ট বাড্ডার ভাঙচুরের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন তিনি কারাগারে আছেন। জাহিদুল হকের মতো আরও ৪১ শিক্ষার্থীকে গতকাল রোববার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত (সিএমএম) দিনভর দফায় দফায় জামিন দিয়েছেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের কাজে বাধা এবং গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে করা মামলায় এসব শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন।
ঢাকার থানা ও আদালত সূত্র বলছে, আন্দোলনের সময় সংঘাত, ভাঙচুর, উসকানি ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ এ পর্যন্ত ৫১টি মামলায় ৯৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এঁদের মধ্যে ৫২ জন শিক্ষার্থী। গতকাল ঢাকার আদালতে জামিন চেয়ে প্রথমে ২৫ শিক্ষার্থীর পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের আইনজীবীরা জামিনের পক্ষে শুনানি করেন।
শুনানিতে ছাত্রদের আইনজীবীরা আদালতের কাছে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, এসব ছাত্রের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। মামলার এজাহারেও তাঁদের নাম নেই। সন্দেহজনকভাবে তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার সবাই ছাত্র। আদালত শুনানি নিয়ে প্রথম দফায় ২৫ শিক্ষার্থীর জামিন মঞ্জুর করেন।
প্রথম দফায় বাড্ডা থানার মামলায় গ্রেপ্তার ১৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে গতকাল  জামিন পেয়েছেন ১০ জন। আর ভাটারা থানার মামলায় গ্রেপ্তার আট শিক্ষার্থীর মধ্যে জামিন পেয়েছেন ছয়জন। অন্যদিকে, ধানমন্ডি থানার পৃথক তিন মামলায় গ্রেপ্তার নয় শিক্ষার্থীকে জামিন দিয়েছেন আদালত। ধানমন্ডি এলাকায় ভাঙচুর ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত সূত্র বলছে, গ্রেপ্তার বাকি শিক্ষার্থীদের কারও কারও জামিন শুনানি আগামীকাল হতে পারে।
কয়েক ছাত্রের স্বজনেরা জানান, জামিন হওয়ায় এখন তারা কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে যাচ্ছেন। আদালত সূত্র বলছে, আদালত থেকে ছাত্রদের জামিনের কাগজ কারাগারে পাঠানো হবে।
গত ২৯ জুলাই রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হন। এরপর ঘাতক বাসচালকের শাস্তি এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা।

স্বজনদের চোখে আনন্দাশ্রু
জামিনের আবেদন করেছেন-এমন শিক্ষার্থীদের বাবা-মা, ভাই-বোন গতকাল সকাল থেকে আদালতে ভিড় করতে থাকেন। ধানমন্ডির মামলায় গ্রেপ্তার দুই ভাই মাহমুদুর রহমান ও মাহবুবুর রহমান। মাহমুদ পড়েন ইউল্যাবে। আর মাহবুব বিএফ শাহীন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে এখন আইইএলটিএস করছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জামিন হওয়ার খবর শুনেই তাঁদের মা বলে ওঠেন, ‘আমার ছেলেদের জামিন হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।’
বাড্ডার মামলায় গ্রেপ্তার মেহেদী হাসানের জামিনের সংবাদ শুনে তার বাবা এম এ মাসুদ খান আদালতের বারান্দায় কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আজ আমার আনন্দের দিন। ছেলে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কত যে যন্ত্রণায় ছিলাম, সে কথা কাউকে বোঝাতে পারব না।’ ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্র রেদোয়ান আহমেদের বাবা অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ছেলের জামিন হওয়ায় বেজায় খুশি। তিনিও  বলেন, ছেলের জামিন হওয়ায় খুব ভালো লাগছে।
 বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নূর মোহাম্মাদের বোন মাবিয়া বললেন, ‘ভাইয়ার জামিন হওয়ায় আমার অনেক ভালো লাগছে। আমরা একসঙ্গে ঈদ করতে পারব’।

সেদিন স্বজনদের চোখে ছিল উৎকণ্ঠা  ভয়
বাড্ডার আফতাবনগর এলাকার ভাঙচুরের মামলায় ১৪ ছাত্রকে এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ভাঙচুরের মামলায় ৮ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৭ আগস্ট ২২ শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এজলাসে স্বজনদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ছাত্ররা। দুই দিনের রিমান্ড শেষে যখন ছাত্রদের প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা।
জাহিদুল হক ও নূর মোহাম্মাদের আইনজীবী আখতার হোসেন বলেন, ছাত্রদের জামিন করাতে পেরে তিনি নিজেও খুব আনন্দিত।

শেষ বেলায় আরও ১৭ শিক্ষার্থীর জামিন
বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আরও ১৭ শিক্ষার্থীকে জামিন দিয়েছেন আদালত। এর আগে দিনের শুরু থেকে বিকাল পর্যন্ত ২৫ জন জামিন পেয়েছেন। পুলিশের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে রাজধানীর ৯টি থানার ১২ মামলায় গ্রেফতার হওয়া মোট ৪২ শিক্ষার্থীকে ঢাকা মহানগরের ভিন্ন ভিন্ন হাকিম আদালতের বিচারক এ জামিন দেন। সংশ্লিষ্ট থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তারা (জিআরও) এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভাটারা থানার জামিনপ্রাপ্ত ৬ শিক্ষার্থী হলেন- সাখাওয়াত হোসেন নিঝুম, শিহাব শাহরিয়ার, আজিজুল করিম অন্তর, মাসহাদ মুর্তজা আহাদ, মেহেদী হাছান, ফয়েজ আহমেদ।বাড্ডা থানার জামিনপ্রাপ্ত ১২ শিক্ষার্থী হলেন-নূর মোহম্মদ, আজিজুল হক, মো. হাছান, দোয়ান আহম্মেদ, তরিকুল ইসলাম, রেজা রিফাত আখলাক, এ এইচ এম খালেদ রেজা, রাশেদুল ইসলাম, মুশফিকুর রহমান, ইফতেখার আহমেদ ও জাহিদুল হক।ধানমন্ডি থানার জামিনপ্রাপ্ত ৯ শিক্ষার্থী হলেন- সোহাদ খান, মাসরিকুল ইসলাম, তমাল সামাদ, মাহমুদুর রহমান, ওমর সিয়াম, মাহাবুবুর রহমান, ইকবাল হোসেন, নাইমুর রহমান ও মিনহাজুল ইসলাম।উত্তরা পশ্চিম থানার জামিনপ্রাপ্ত ৩ শিক্ষার্থী হলেন- মাহবুব খান রবিন, তোফায়েল ও আশিক।কোতোয়ালি থানার জামিনপ্রাপ্ত ৩ শিক্ষার্থী হলেন-মেহেদী, জাহিদুল ও দুলাল।নিউমার্কেট থানার জামিনপ্রাপ্ত ৩ শিক্ষার্থী হলেন- আজিজুর, আমিন ও নূর আলম।
শাহবাগ থানার জামিনপ্রাপ্ত ২ শিক্ষার্থী হলেন-আবু বকর সিদ্দিক, রিয়াজুল হক উলু হাজী।পল্টন থানার জামিন প্রাপ্ত একজন শিক্ষার্থী হলেন- সাইফুল ওয়াদুদ। রমনা থানার জামিনপ্রাপ্ত ৩ শিক্ষার্থী হলেন-আরমানুল হক, খাইরুল আলম দিপু ও দাইয়ান নাফিজ প্রধান
জানা গেছে, সকালে বাড্ডা থানার ১০ জন শিক্ষার্থী এবং ভাটারা থানার ৬ জন শিক্ষার্থীর জামিন দেন ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত। এর মধ্যে ইফতেখার আহমেদ নামের এক শিক্ষার্থীর জামিন দেন সিএমএম আদালতের বিচারক সাইফুজ্জামান হিরু। এরপরে একে একে ভিন্ন ভিন্ন থানার মামলায় অন্যন্যা বিচারকরা বাকি শিক্ষার্থীদের জামিন দিয়েছেন।
সূত্র জানায়, বাড্ডা ও ভাটারা থানার ২২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৮ জন জামিন হলেও আরও ৪ জন কারাগারে আছেন। এছাড়া আরও বিভিন্ন থানায় কিছু শিক্ষার্থী আটক আছে বলেও জানা গেছে।
গত ৪ আগস্ট বিকালে সায়েন্স ল্যাব, জিগাতলা ও ধানমন্ডিতে  নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় গুজব রটানো হয় আওয়ামী লীগ অফিসে ৪ শিক্ষার্থীকে মারধর করে হত্যা, একজনের চোখ উপড়ানো এবং আরও চার ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এ গুজব শুনে শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে তেড়ে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ ঘটে। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলন চলাকালে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এসব ঘটনায় পুলিশের ও আওয়ামী লীগের পক্ষে নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ