ঢাকা, সোমবার 20 August 2018, ৫ ভাদ্র ১৪২৫, ৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় সিলেটে ১৫টি অবৈধ পশুর হাট

সিলেট : গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি এলাকা দিয়ে এভাবেই ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু আনা হচ্ছে

সিলেট ব্যুরো : কুরবানির অবৈধ পশুর হাট নিয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও ঠেকাতে পারেনি সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের। আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় সিলেট নগরীতে অন্তত ১৫টি অবৈধ পশুর হাট বসেছে। প্রতি বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নজরদারি থাকে। এরপর প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা অবৈধ পশুর হাট বসায়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এছাড়া সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানির মাধ্যমে ভারত থেকে গরুর চালান প্রবেশ করছে।
সিলেটের  জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো জেলায় ২২টি পশু হাটের অনুমোদন দেয়া হয়। অবৈধ হাট বসাতে নিষেধও করে জেলা প্রশাসন। তবে তা না মেনে বসানো হয়েছে অবৈধ হাট। জানা যায়, সিলেট নগরীতে বৈধ হাট রয়েছে ১২টি। এগুলো হচ্ছে - কোতোয়ালি মডেল থানার কাজির বাজার পশুর হাট, জালালাবাদ থানার শিবের বাজার পশুর হাট, কুড়িরগাঁও (ইসলামগঞ্জ বাজার) পশুরহাট, বিমানবন্দর থানার সাহেব বাজার সুন্নিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসার মাঠে স্থাপিত পশুর হাট, দক্ষিণ সুরমা থানার লালাবাজার পশুর হাট, কামালবাজার পশুর হাট, মোগলাবাজার থানার জালালপুর পশুর হাট, হাজীগঞ্জ বাজার ও রাখালগঞ্জ বাজার পশুর হাট এবং শাহপরান থানা এলাকায় আরও তিনটি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। এর বাইরে নগরী ও নগরীর আশপাশে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অবৈধ পশুর হাট। নগরীর লালটিলা, কয়েদির মাঠ, আম্বরখানা (আবাসন হাউজিং), টিলাগড়, শাহী ঈদগাহ (দলদলি চা বাগান), উপশহর, চৌকিদেখি, আখালিয়া, মেন্দিবাগ (জালালাবাদ গ্যাস অফিসের পেছনে), তেররতন, দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুল, কদমতলী (ফল মার্কেটের সামনে), লাক্কাতুরা, মাদিনা মার্কেট, পাঠানটুলা, হাউজিং এস্টেট (দর্শন দেউড়ি), কুমারগাঁও, শাহী ঈদগাহ, রিকাবীবাজার এলাকায় অবৈধভাবে পশুর হাট বসানো হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় রিকাবীবাজারের অবৈধ পশুর হাটে পুলিশের সাথে ছাত্রলীগের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। আর বিকেলে দলদলি চা বাগানের অবৈধ হাট উচ্ছেদ করে সদর উপজেলা প্রশাসন। তবে একটি হাট উচ্ছেদ করলেও বাকি অবৈধ পশুর হাট উচ্ছেদে নেই প্রশাসনের কোনো তৎপরতা।
জানা যায়, বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা পশুর হাটের নেতৃত্বে রয়েছে সরকার দলীয় প্রভাবশালী কিছু নেতা। টিলাগড় পয়েন্টে বিশাল সামিয়ানা টানিয়ে বাঁশ বেধে তৈরি করা পশুর হাটের নেপথ্যে উঠে এসেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ঘরনার এক কাউন্সিলরের নাম। অন্যদিকে নগরীর প্রবেশ মুখ কুমারগাঁও তেমুখী এলাকায় গড়ে তোলা অবৈধ অস্থায়ী পশুর হাটের নেতৃত্বে রয়েছেন সরকারদলীয় স্থানীয় কিছু নেতা। এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, বৈধ পশুর হাট ছাড়া রাস্তায় গরুর হাট বসানো যাবে না। এমন নির্দেশ ঢাকা থেকে পাওয়ার পর বিষয়টি পুলিশ কমিশনারকে জানানো হয়েছে। এখন এ ব্যাপারে পুলিশ-প্রশাসনই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এসএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুহম্মদ আব্দুল ওয়াহাব জানান, নগরীর কাজিরবাজারসহ ১১টি হাট বসানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর বাইরে কোথাও হাট বসতে দেয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে যদি কোন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। আর এতে আমাদের সহযোগিতা চাওয়া হয় আমরা অবশ্যই অবৈধ পশুর হাট বন্ধে উদ্যোগ নেব।

সীমান্ত পথে ভারতীয় গরু প্রবেশ করছে
এদিকে, সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের প্রকৃতি কন্যা হিসেবে খ্যাত জাফলং ও অন্যতম পর্যটন এলাকা বিছনাকান্দি। প্রতিদিন এইস্থানে ভিড় করেন হাজারো পর্যটক। তবে মাসখানেক ধরে বিছনাকান্দিতে বেড়ে গেছে গরুর আনাগোনা। আর এই সীমান্ত পথ দিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চোরাচালানির মাধ্যমে সিলেটের বাজারগুলোতে প্রবেশ করছে ভারতীয় গরু। আর ঈদুল আযহা আসলেই ভারতীয় গরু দিয়ে সয়লাব হয়ে যায় সিলেটের বাজার। শুধু সিলেট নগরীর বাজার নয়, সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বনাথ, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর এবং সীমান্তবর্তী কানাইঘাট ও জকিগঞ্জসহ বিভিন্ন বাজারে ভারতীয় গরু প্রবেশ করছে।
কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেট, সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে- ভারত বৈধভাবে বাংলাদেশে গরু রপ্তানি করে না। তবু প্রতিবছর ঈদুল আযহার মৌসুমে সিলেটের সীমান্তগুলো দিয়ে ভারত থেকে আসে অসংখ্য গরু। এসব গরু আমদানি বন্ধ করতে না পেরে গতবছর সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তে চারটি করিডোর খোলা হয়েছে। এসব করিডোর নিয়ে আনা গরু মাত্র ৫শ’ টাকা রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশের বৈধতা প্রদান করা হয়। তবে চোরাকারবারিরা এই পাঁচশ’ টাকা ফাঁকি দেওয়ার জন্য করিডোর দিয়ে না এনে অন্যান্য সীমান্ত নিয়ে অবৈধভাবে দেশে গরু নিয়ে আসছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের উপ পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন আহমদের দাবি, সিলেটে কুরবানির চাহিদা পুরণের মতো যথেষ্ট গবাদিপশু রয়েছে। ফলে গরু আমদানির প্রয়োজন নেই। আমদানি করলে স্থানীয় খামারিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সিলেট বিভাগে এই ঈদে প্রায় ৫ লাখ গবাদিপশু কুরবানি দেওয়া হবে বলে ধারণা তাঁর। এ ব্যাপারে বিজিবি ৪৮ ব্যাটেলিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মহসেনুল হক কবির বলেন, করিডোর দিয়ে নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান করেই গরু বাংলাদেশে আসছে। করিডোরের বাইরে কোনো সীমান্ত দিয়ে গরু আসছে না। সীমান্তে বিজিবির কড়া নজরদারি রয়েছে। অবৈধভাবে কোনো গরু নিয়ে আসলে বিজিবি তা আটক করে নিকটবর্তী রাজস্ব কার্যালয়ে হস্তান্তর করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ