ঢাকা, সোমবার 20 August 2018, ৫ ভাদ্র ১৪২৫, ৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনায় ভিজিএফের চাল কম দেয়ার অভিযোগ

খুলনা অফিস : ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে অসহায় ও দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল ওজনে কম দেয়ার অভিযোগে তুলকালাম কান্ড ঘটছে খুলনায়। সর্বশেষ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে চাল কম পেয়ে দুস্থরা ক্ষুব্ধ হয়ে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে হামলা চালায়। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়েও পরিস্থিতি শান্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষুব্ধ জনতা তাকেও অবরুদ্ধ করেন। প্রায় দু’ঘন্টা চাল বিতরণ বন্ধ থাকার পর পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পুনরায় চাল বিতরণ শুরু হয়। ভিজিএফ’র চাল কম দেবার আরও অভিযোগ উঠেছে রূপসা ও তেরখাদা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নেও। সারাদেশের ন্যায় খুলনার ৬৮টি ইউনিয়নে পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে ভিজিএফ চাল বিতরণ করছেন সরকার।
ইউপি কার্যালয় সূত্র জানায়, ঈদ উল আযহা উপলক্ষে অসহায় ও দুস্থ ব্যক্তিদের জন্য সরকার উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়নের ৫ হাজার ২৯৬ জনের মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার ৯২০ কেজি চাল বরাদ্দ দেয়। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ইউপি চেয়ারম্যান গাজী জিয়াউর রহমান ওরফে জিয়া গাজী চাল বিতরণ শুরু করেন। এ সময় ট্যাগ অফিসার উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা না থাকায় তার প্রতিনিধি নবীর হোসেন ও প্রকল্প অফিসের উপ-সহকারী সিরাজুল ইসলামের উপস্থিতিতে চাল বিতরণ শুরু হয়। কিন্তু মাথাপিছু ২০ কেজির স্থলে ১৫ থেকে ১৭ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে অসহায় ও দুস্থদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। বিষয়টি এক এক করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধরা ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী উপজেলা প্রেস ক্লাবের সামনের খোলা জায়গায় জড়ো হতে থাকে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শম্পা কুন্ডু ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি নিজেই চাল ওজন করে তাতে ৩/৪ কেজি করে কম পান। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি দুস্থ-অসহায়দের লিখিত অভিযোগ করতে বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাৎক্ষণিক সমাধানের দাবিতে তারা তাকে ঘেরাও করে রাখেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে তিনি সেখান থেকে সেনহাটি ইউপি কার্যালয়ে গিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টায় চাল বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেন। এ সময় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা ইট পাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে ইউপি কার্যালয়ে হামলা চালায়। জানালার গ্লাস ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। তবে কোন আহতের খবর পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাইমুল ইসলাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের উপস্থিতিতে চাল বিতরণ শুরু হয়। চাল কম দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শম্পা কুন্ডু বলেন, যারা চাল কম পেয়েছে তাদের লিখিত অভিযোগ করতে বলা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ভিজিএফ’র চাল কম দেয়াকে কেন্দ্র করে সেনহাটি ইউপি কার্যালয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে, সামান্য ভাংচুরের ঘটনা ঘটলেও কেউ আহত হয়নি। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ঈদ-উল-আযহায়ও ১৫০ বস্তা চাল আত্মসাতের ঘটনায় একই ইউপি চেয়ারম্যান গাজী জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে দিঘলিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হলে গত ১৯ জুলাই স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ইউপি-১ অধিশাখার এক প্রজ্ঞাপনে চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু তিনি প্যানেল চেয়ারম্যানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই উচ্চ আদালতে আপীল করেন।
অন্যদিকে, রূপসার শ্রীফলতলায় ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইসহাক সরদার ভিজিএফ কার্ডের চাল আত্মসাত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগপত্র থেকে জানা গেছে, ঈদ উল আযহায় সারাদেশের ন্যায় শ্রীফলতলা ইউনিয়নে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাথা প্রতি ২০ কেজি করে ৪ হাজার কার্ড বরাদ্দ দেয় সরকার। ইউনিয়নের নয়জন ইউপি সদস্যের প্রত্যেককে ২০০ করে কার্ড দিয়েছেন চেয়ারম্যান ইসহাক সরদার। অথচ দেবার কথা ৪৪০টি করে কার্ড। এখানেই প্রায় দুই হাজার কার্ডের বিপরীতে ৪০ মেট্রিক টন চাল আত্মসাত করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান। এছাড়া চাল দেয়া হচ্ছে ২০ কেজির স্থলে ৯ থেকে ১৫ কেজি করে। মুখ দেখে নিজ এলাকার হলে ১৫ কেজি আর অন্য এলাকার হলে ৯ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ গেলে চাপে পড়ে আত্মসাতকৃত চাল আজ রবিবার সকাল থেকে পুনরায় বিতরণ শুরু করবেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইসহাক সরদার।
অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বললেন, ‘আমার ইউনিয়নে ৪০২১টি কার্ড আছে। ১৪৪টি কার্ডের চাল কম পড়েছে। রোববার সকালে নিজের টাকায় চাল নিয়ে বিতরণ করবো। নিন্দুকের অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে পাল্টা অভিযোগ তার।’
অপরদিকে, তেরখাদা উপজেলার ২নং বারাসাত ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল বিতরণে অনিয়মের প্রতিবাদ করায় সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রিনা বেগম ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আলমগীর হোসেনের হাতে লাঞ্ছিত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনাটি জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও তেরখাদা থানা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন লাঞ্ছিত মহিলা মেম্বর।
অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৩ জুন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ২নং বারাসাত ইউনিয়ন পরিষদের ভিজিএফের জাল দেয়ার জন্য ইখড়ি দাখিল মাদরাসায় যান তিনি। দুপুর ১২টার দিকে ভিজিএফ’র চাল বিতরণে অনিয়ম দেখে প্রতিবাদ করেন সংরক্ষিত ইউপি সদস্য রিনা বেগম। এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আলমগীর হোসেন, তার ভাই মো. নূর ইসলাম ও মো. দ্বীন ইসলাম মিলে মহিলা মেম্বরকে গলা ধাক্কা দিয়ে বলে-‘তুই কেন এখানে এসেছিস?’ তাকে টেনে-হিছড়ে শ্লীলতাহানীর ঘটনায় বলে অভিযোগ তার।
তবে, পাল্টা অভিযোগ করে ইউপি চেয়ারম্যান কেএম আলমগীর হোসেন বলেন, ওই মহিলা মেম্বর তালিকার বাইরে দু’জনকে ভিজিএফের চাল দিয়েছে। তাহলে তালিকাভুক্তদের চাল কম পড়ে যাবে না? এসবের প্রতিবাদ করায় ওই মহিলা মেম্বর অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন বলে দাবি তার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ