ঢাকা, সোমবার 20 August 2018, ৫ ভাদ্র ১৪২৫, ৮ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুরবানি আল্লাহ প্রেমের অনুপম নিদর্শন

মুফতী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম : কুরবানি শব্দটি আরবী কুরবুন শব্দ থেকে গঠিত। অর্থ নৈকট্য লাভ করা, নিকটবর্তী হওয়া, কাছে যাওয়া, ঘনিষ্ঠ হওয়া। যে কাজের মাধ্যমে বান্দাহ স্বীয় প্রভূর নিকটবর্তী হয় এবং তাঁর নৈকট্যতা অর্জিত হয়, তাকে কুরবানি বলে।
কুরবানির সূচনা
কুরবানির সূচনা করেন হজরত আদম (আ.) এর পুত্র হাবিল ও কাবিল। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- আর তাদেরকে আদমের দু’পুত্রের কাহিনী শুনিয়ে দিন, যখন তারা উভয়ে কুরবানি করলো, এক জনের কুরবানি কবুল হলো, অপর জনের কুরবানি কবুল হলো না। (সূরা আল মায়েদা: ২৭)
যখন আদম ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমন করেন এবং সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা এরূপ যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। এরূপে চল্লিশ জোড়া সন্তান মা হাওয়া (আ.) প্রসব করেন। আদম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে এক গর্ভের পুত্রের সাথে অন্য গর্ভের কন্যার বিবাহের ব্যবস্থা করতেন। অন্য কোন মানুষ না থাকায় এটাই ছিল শরয়ী বিধান। এ প্রথা ও নীতি অনুযায়ী হযরত আদম (আ.) বিবাহের বয়সে উপনীত হলে হাবিলের বিবাহের ব্যবস্থা করলেন কাবিলের সাথে জন্মগ্রহণ করা কন্যা আকলিমার সাথে। আকলিমা ছিল পরমা সুন্দরী। আর কাবিলের সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করলেন হাবিলের সাথে জন্মগ্রহণ করা কন্যার সাথে। সে ছিল সুশ্রী ও কদাকার। কিন্তু কাবিল এ বিবাহে সম্মত হলেন না। তখন হযরত আদম (আ.) উভয়কে কুরবানী করার নির্দেশ দিয়ে বলেন যার কুরবানী গৃহীত হবে সেই আকলিমার পানি গ্রহণ করবে। তৎকালে কুরবানি গৃহিত হওয়ার নিদর্শন ছিল আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে কুরাবানীকে ভস্মিভূত করা। হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি কুরবানী করল। কাবিল কৃষিকাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানী করার জন্য পেশ করল। আল্লাহ তা’য়ালা হাবিলের কুরবানী কবুল করলেন। আকাশ থেকে একখন্ড আগুন এসে হাবিলের কুরবানী জ্বালিয়ে দেয়। কিন্তু কাবিলের কুরবানীকে আগুন স্পর্শই করেনি।
সর্বযুগে কুরবানি
সকল নবী রাসূলের যুগে কুরবানীর প্রচলন ছিল। তবে রীতি-নীতি ছিল ভিন্নতর। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- আমি প্রত্যেক জাতির জন্যে কুরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা (জীবিকা হিসেবে) আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে (সূরা হজ- ৩৪)।
নামাযের সাথে কুরবানীর নির্দেশ
আল্লাহ তা’য়ালা মহানবী (সা.) কে নামাযের  সাথে কুরবানীর নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন- অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড়–ন ও কুরবানী করুন। আরো ইরশাদ করেন- হে রাসূল! আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন-মরণ বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে (সূরা আল আনয়াম- ১৬২)।
আল্লাহ প্রেমের অনুপম নিদর্শন
নবী-রাসূলদের মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর স্থান শীর্ষে। তাঁর উপনাম আবুল আম্বিয়া- নবীদের আদি পিতা, আবুল মিল্লাত- মুসলমানদের জাতির পিতা। সাতজন ছাড়া সকল নবী-রাসূল তাঁর বংশ থেকে এসেছেন। তিনি মুসলমান নামটি প্রথম রেখেছেন। ইবরাহীম শব্দটি সুরিয়ানী শব্দ। অর্থ আবে রাহীম- দয়ালু পিতা। শিশুদের প্রতি দয়ালু ছিলেন বলে এ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। জান্নাতে তিনি ও তাঁর স্ত্রী সারা মু’মিনদের অপ্রাপ্ত বয়সে মৃত শিশুদের দায়িত্বশীল হবেন (তাফসীরে কুরতুবী ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং- ৭৩)।
দয়াময় আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় একই সময়ে হযরত ইবরাহীম (আ.) কে ফিলিস্তিনে ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় নবী করে প্রেরণ করেন। একই সময় তাঁর ভাই হারানের পুত্র লুত (আ.) কে জর্দান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নবী করে প্রেরণ করেন। লূত (আ.) এর জাতি তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেনি বরং তারা নানাবিদ অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা কয়েকজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাঁরা লূত (আ.) কে তাঁর কাওমের শাস্তির সংবাদ দিয়ে হযরত ইবরাহীম (আ.) এর  নিকট গমন করেন। হযরত ইবরাহীম এর (আ.) বয়স তখন ছিয়াশি। তাঁর কোন সন্তান না থাকায় সদা আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দোয়া করতেন- হে আমার রব! আমাকে কোন নেক সন্তান দান করুন (সূরা আস্ সাফফাত- ১০০)। আল্লাহ তায়ালা তাঁর দোয়া কবুল করে ফেরেশতাদের অবহিত করলেন যে, তোমার একটি সন্তান হবে। যেমন আল্লাহর বানী- অত:পর আমি তাঁকে এক ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করলাম (সূরা আস্-সাফফাত- ১০১)। বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহ তায়ালা দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে পুত্র সন্তান দান করেন। তাঁর নাম রাখেন ইসমাঈল। পিতৃ-মাতৃ ¯েœহে ইসমাঈল (আ.) ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন, তখনই আল্লাহ তা’য়ালা হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে পরীক্ষা করার ইচ্ছা করেন। সে কি তাঁর পুত্রকে অধিক ভালবাসে নাকি আমাকে ভালবাসে।
হযরত ইবরাহীম (আ.) ক্রমাগত তিন রাত স্বপ্নে দেখেন। আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে আদেশ হচ্ছে, তুমি ঐ পাহাড়ে যাও এবং তোমার প্রিয় বস্তু কুরবানী কর। হযরত ইবরাহীম (আ.) উট কুরবানী করলেন, কিন্তু তারপরও একই স্বপ্ন দেখছেন, তোমার প্রিয় জিনিস কুরবানী কর। অত:পর তিনি বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ তা’য়ালা আমার ছেলেকেই কুরবানী করতে বলছেন। নবীদের স্বপ্নও অহী। তাই তিনি পুত্রকে কুরবানী করার ব্যাপারে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। আল্লাহ তা’য়ালা ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেন- অত:পর সে যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলো, তখন তিনি তাকে বললেন, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কি বল? সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছে তা-ই করুন। আল্লাহ ইচ্ছায় আমাকে আপনি ধৈর্যশীল পাবেন। অত:পর যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম স্বীয় পুত্রমে যবেহ করার জন্য কাত করে শায়িত করল এবং তখনই আমি তাকে    করে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করেছ। এভাবেই আমি সৎকর্মপরাণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পর্শ পরীক্ষা (সূরা আস্-সাফফাত- ১০২-১০৭)।
এ ধরায় কি এমন কোন পিতা আছেন যিনি তাঁর হৃদয়ের ধন পুত্রকে নিজ হাতে যবেহ করতে পারেন? কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর প্রেমে এতই উদ্বুদ্ধ ও পাগলপারা ছিলেন যে, কঠিনতর আদেশ স্বেচ্ছায় হাসিমুখে বরণ করে নিতে ক্রটি করেননি। তাঁর এ স্মৃতি চার হাজার বছর পরও বহাল রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে।  
শিক্ষা
কুরবানীর শিক্ষা হলো অন্যায়, অবিচার ও আল্লাহ তা’য়ালার মর্জির পরিপন্থী সকল কার্য-কলাপ পরিহার করা এবং তাঁর নির্দেশ পালনে সচেষ্ট হওয়া। তাঁর নির্দেশ পালনকে সব কিছুর উপর প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেয়া। তাঁর নির্দেশের সামনে সব কিছুকে তুচ্ছ মনে করা। আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশে তিনি স্নেহের পূত্রকে কুরবান করতে একটুও দ্বিধাবোধ করেন নি। আরো আশ্চর্যের বিষয় যে, তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কুরবান হওয়ার জন্য অকুণ্ঠ চিত্তে রাজী হয়ে গিয়েছেন। পিতা-পুত্র নজীর স্থাপন করেছেন কিভাবে স্রষ্টাকে ভালবাসতে হয় এবং কিভাবে স্রষ্টার নির্দেশ পালন করতে হয়। পিতা-পুত্রের এই ভালবাসা ও ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তা’য়ালা তাদেরকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেছেন এবং তাদের স্মৃতিকে মুসলমানদের জন্য অবশ্যিক করে দিয়েছেন। অবশ্যই হযরত ইবরাহীম (আ.) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) আল্লাহ প্রেমিকদের উত্তম আদর্শ (Model) ।
প্রধান ফকীহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ