ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভাষণে ইমরান খানের সংযমের ডাক

প্রথম বারের মতো টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান - রয়টার্স

২০ আগস্ট, ডন, রয়টার্স : পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ধনীদের কর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ঋণের চাপ কমাতে দ্রুতই দেশজুড়ে কৃচ্ছ্রতা অভিযান শুরু করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বুলেটপ্রুফ গাড়িবহরের বেশিরভাগ গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে নিজেই এ কৃচ্ছ্রতা অভিযানের উদ্বোধন করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গত রোববার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রথম ভাষণে ইমরান ঋণের মাত্রা ও দারিদ্রতা কমিয়ে ইসলামী কল্যাণমূলক ব্যবস্থায়‘নতুন পাকিস্তান’ গড়ে তোলার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, “ঋণ নিয়ে জীবনযাপন ও অন্য দেশের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে চলার বাজে অভ্যাস করেছি আমরা। কোনো দেশ এভাবে উন্নতি করতে পারে না। একটি দেশকে অবশ্যই নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।”

ভাষণ দেওয়ার সময় ইমরানের পেছনে ছিল তার ‘নায়ক’ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা রাজনীতিক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি।

৬৫ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেট কিংবদন্তি ইমরান গত মাসের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর শনিবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণা দিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ ভোটার ও পাকিস্তানে ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মন জিতে ইমারান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন বলে ধারণা পর্যবেক্ষকদের। এভাবেই তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের (পিটিআই) এ শীর্ষ নেতা ২০ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির শীর্ষ নেতায় পরিণত হয়েছেন বলে ধারণা তাদের। তবে বিরোধী রাজনীতিকরা ইমরানের জয়ের পেছনে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর হাত আছে বলে অভিযোগ করেছেন।

মুদ্রা সংকট ও দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েনসহ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বেশকিছু সমস্যার মুখেও পড়তে হচ্ছে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে। অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘বেইলআউট’ সুবিধা পেতে আরেক দফা আবেদন করা লাগবে বলেও অনুমান আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের।

সংকট মোকাবিলায় নীতিগত পরিকল্পনা কী হবে, ভাষণে সে বিষয়ে কোনো ধরনের আলোকপাত না করলেও ইমরান কৃচ্ছ্রতা অভিযান পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ইশরাত হুসেনের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন।

ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা ও অভিজাত পাকিস্তানিদের বিলাসী জীবনযাপনের সমালোচনা করে পিটিআইর এ নেতা প্রাসাদোপম প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বদলে তিন কক্ষবিশিষ্ট একটি ছোট বাসায় থাকবেন বলে ঘোষণা দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর জন্য নিয়োজিত ৫২৪ জন কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে ২ এ নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন, পাশাপাশি বুলেট প্রুফ গাড়ি বহরের অধিকাংশই বিক্রি করে দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ঘাটতি মোকাবিলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

মুসলিম জঙ্গিদের হুমকির মুখে থাকা পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রীর জন্য এমন পদক্ষেপ ‘বেশ সাহসী’ বলে মন্তব্য রয়টার্সের।

“আমি আমার জনগণকে বলতে চাই, আমি সাধারণ জীবনযাপন করবো, আমি আপনাদের অর্থ বাঁচাবো,” বলেন পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।ভাষণে প্রবাসী পাকিস্তানিদের নিজের দেশে বিনিয়োগ ও ধনীদের নিয়ম মেনে কর দেওয়ারও আহ্বান জানান ইমরান। ব্যক্তি পর্যায়ে কর ফাঁকির জন্য পাকিস্তান বিখ্যাত, দেশটির মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম লোক নিয়মিত আয়কর দেয় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

“কর দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব। মনে করুন এটি জিহাদ, আপনার দেওয়া কর দেশের উন্নতিতে ব্যয় হবে,” বলেছেন পিটিআইপ্রধান।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পাকিস্তান ভয়াবহ বিপদে আছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। নবজাতক ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।পাশাপাশি স্কুলের বাইরে থাকা সোয়া দুই কোটিরও বেশি শিশুকে সাহায্য করার বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন তিনি, এ সময় আগে কখনোই সরকারি কোনো দায়িত্বে না থাকা ইমরানের কণ্ঠে ছিল আবেগের রেশ।প্লেবয় জীবনযাপন থেকে ধর্মীয় রাজনীতিতে আকৃষ্ট হওয়া এ সাবেক ক্রিকেটার বলেছেন, মদিনায় নবী মোহাম্মদ (সাঃ) যে আদর্শ রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন, পাকিস্তানকে সেই আদলেই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান তিনি।

“আল্লাহ যাদের পর্যাপ্ত দেননি আমি তাদের পেছনেই খরচ করতে চাই,” বলেছেন ইমরান।

পাকিস্তান সফরে যাবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠক করতে ইসলামাবাদ সফর করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে সেদেশের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

নবনির্বাচিত এ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে ইসলামাবাদ সফরের পরিকল্পনা করেছেন মাইক পম্পেও। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদ সফর করার কথা তার। বৈঠকটি হলে, পম্পেওই হবেন নবনির্বাচিত পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককারী প্রথম কোনও বিদেশি প্রতিনিধি।

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় পম্পেও দুইটি বড় ইস্যুর ওপর প্রাধান্য দিতে পারেন। সেগুলো হলো, দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এক সময়কার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে পুনর্জাগরিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগান শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে পাকিস্তানের সমর্থন আদায় করা। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর কাছ থেকে ১২০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক প্যাকেজ পাওয়ার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সমর্থন চাইতে পারে পাকিস্তান।

জানা গেছে, পররাষ্ট্র দফতরের ব্যুরো ফর সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স-এর প্রধান অ্যালিস ওয়েলসও পম্পেওর সফরসঙ্গী হতে পারেন। পম্পেও ও তার প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত ও আফগানিস্তানও সফর করতে পারে। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী কংগ্রেসনাল নির্বাচনের আগে আফগানিস্তানে একটি শান্তি চুক্তি চাইছে পাকিস্তান। এরই অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তান সফর করতে পারেন পম্পেও।

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে মার্কিন কর্মকর্তারা আফগান যুদ্ধ বন্ধে সহায়তা করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানান। বলা হয়, আফগানিস্তানে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পরও তালেবানের কিছু অংশের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র নিরুৎসাহী হয়নি। ওয়েলস তখন পাকিস্তানকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আফগানিস্তানে ১৭ বছরের যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ অবসানের এখনই সময়। এ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালনের জন্য ইসলামাবাদকে আহ্বান জানানো হয়। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস, শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্যে আফগান তালেবানকে রাজি করানোর যথেষ্ট ক্ষমতা পাকিস্তানের আছে।

সাম্প্রতিক বিবৃতিতেগুলোতেও দেখা গেছে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো সে সম্পর্ক পুনর্জাগরিত করার আকাঙ্ক্া প্রকাশ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর নবনির্বাচিত পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। এর আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে।উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিক অভিযোগ করে আসছে,আফগান তালেবান ও তাদের মিত্র হাক্কানি নেটওয়ার্ককে নিরাপদ স্বর্গ গড়ে তুলতে দিয়েছে পাকিস্তান। আর সন্ত্রাসীরা তা ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে আফগানিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। পাকিস্তান বরাবর সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ অস্বীকার করে আসলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা কঠোর করেছেন। এর শেষ ফলাফল হিসেবে এ বছরের জানুয়ারিতে সন্ত্রাসবাদে মদদের অভিযোগ এনে পাকিস্তানে নিরাপত্তা সহযোগিতা স্থগিতের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে তখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস ট্রাম্পের ঘোষণার পরও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন,সহায়তা স্থগিত সাময়িক। আর এটি আপাতত স্থগিত করা হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলবে যুক্তরাষ্ট্র।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ