ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলে চামড়া পাচারকারী সিন্ডিকেট সক্রিয়

* এবার ট্যানারি মালিকরা চামড়া নিতে অনীহা
* চামড়া বিক্রয় নিয়ে শঙ্কায় খুলনার মাদরাসাগুলো
খুলনা অফিস : কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলে সক্রিয় হয়ে উঠছে চামড়া পাচারকারী সিন্ডিকেট। সরকারিভাবে কুরবানির পশুর চামড়ার দর কম নির্ধারণ হওয়ায় সিন্ডিকেটের তৎপরতা বেড়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসায়িক মন্দা ও ট্যানারীতে চামড়া ক্রয়ে অনীহার কারণে পাচারের আশঙ্কা বাড়ছে।
তবে দক্ষিণাঞ্চল থেকে চামড়ার পাচার ঠেকাতে সক্রিয় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে সীমান্তবর্তী ৭ জেলায় কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। একই সাথে খুলনার ৪ উপজেলার ১২টি পয়েন্টে ঈদ পরবর্তী সময়ে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জানা যায়, দেশে প্রতিনিয়ত কমছে কুরবানির পশুর চামড়ার দাম। ছয় বছরে ক্রমান্বয়ে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ছয় বছর আগে বিক্রি হওয়া ৯০ টাকা বর্গফুট দরের গরুর চামড়া এবার বিক্রি হবে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়। সরকার এই দরই নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখানেও শর্ত আছে। এই দাম পেতে হলে চামড়ায় লবণ মাখিয়ে দিতে হবে। লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া এবার বিক্রি করতে হবে সর্বোচ্চ ৫০ আর সর্বনিম্ন ৪৫ টাকা। একইভাবে খাসির চামড়ার দর ঠিক করে দেয়া হয়েছে সর্বনিম্ন ১৩ আর সর্বোচ্চ ১৫ টাকা। দেখা গেছে, গত ছয় বছরে কোরবানির গরু ও খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে কমেছে ৪০ টাকা।
খুলনা চামড়া মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল সালাম ঢালী জানান, দাম সঠিকভাবে নির্ধারণ না করার কারণেই প্রতিবার চামড়া পাচার হয়। পার্শ্ববর্তী দেশে চামড়ার অনেক দাম। প্রতিনিয়ত সেখানে নতুন নতুন ট্যানারি গড়ে উঠছে। আর আমরা সিন্ডিকেটের কারণে ব্যবসায় মার খাচ্ছি। তিনি বলেন, দেশে চামড়ার দাম কম থাকায় বরাবরের মতো এবারও চামড়া পাচার হবে। সীমান্তবর্তী অনেক স্থানে এরই মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ের খুচরা ও মওসুমী ব্যবসায়ীদের যৌথ সিন্ডিকেটে চামড়া পাচারের প্রস্তুতি নিয়েছে।
জানা গেছে, পাচারকারী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে খুলনার প্রকৃত ব্যবসায়ীরা আর্থিক মন্দায় তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। খুলনায় প্রতিদিন যে গরু জবাই হয় তার অধিকাংশ চামড়া গোশত বিক্রেতারা নিজেরাই সংরক্ষণ করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকে।
সূত্র অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীর শেখপাড়া চামড়াপট্টি একসময় চামড়া বিক্রির বড় মার্কেট হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে প্রতি কুরবানির ঈদে ৭ থেকে ১০ কোটি টাকার চামড়ার বেচাকেনা হতো। কিন্তু মধ্যস্বত্ত্বভোগী ও পাচারকারী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ব্যবসায়িক মন্দায় অনেকেই পেশা বদল করেছেন। বর্তমানে এখানে মাত্র দু’টি দোকানে চামড়ার বেচাকেনা হয়।
চামড়া ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে ট্যানারিগুলোতে গতবারের অবিক্রিত চামড়া রয়ে গেছে। সাভারে ট্যানারি স্থানাস্তরের জন্য ব্যয় হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা। এ অবস্থায় ট্যানারি মালিকরা আগেভাগেই চামড়া কিনতে অনীহার কথা জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত তিন-চার বছর ধরে খুলনায় কুরবানির গরুর চামড়ার কম দর নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলতে থাকায় প্রান্তিক খুচরা বা মওসুমী ব্যবসায়ীরা সীমান্তের এপার-ওপার সিন্ডিকেটের হাতে চামড়া পৌঁছে দেয়। তবে পাচার ঠেকাতে এবার খুলনার বহির্গমন পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট বসানোর কথা জানিয়েছেন খুলনা পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ। তিনি বলেন, খুলনা থেকে কুরবানির পশুর চামড়া পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। খুলনার কয়রা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও ফুলতলায় ১২টি বহির্গমন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ঈদের পরবর্তী সময়ে চামড়া পাচার রোধে সব পয়েন্ট সিল করে দেয়া হবে যাতে চামড়া নিয়ে কেউ সীমান্তের ওপারে যেতে না পারেন।
এদিকে কুরবানি পশুর চামড়া বিক্রয় নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে খুলনার মাদরাসাগুলো। ব্যবসায়ীরা এবার চামড়া কিনবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। যদিও ক্রয় করে তাহলে নামমাত্র মূল্যে। তারা বলছেন চামড়ার নিয়ে সিন্ডিকেট করছে ট্যানারী মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তবে ব্যবসায়ীরা বলছে, এবার চামড়ার মূল্য কম হওয়া এবং অর্থ সংকটের কারণে কুরবানি পশুর চামড়া সংগ্রহে এই অনীহা।
মাদরাসা ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, কুরবানি পশুর অধিকাংশ চামড়াই সংগ্রহ করে খুলনার মাদরাসাগুলো। প্রতি বছর মাঠ পর্যায় থেকে এসব চামড়া সংগ্রহ করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। পরে সেগুলো একত্রিত করে এসব চামড়া ট্যানারী মালিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করা হয়। এই বিক্রয় লব্ধ অর্থ মাদরাসা পরিচালনায় ব্যয় করা হয়। কিন্তু এবার মাদরাসাগুলো থেকে চামড়া কিনতে অনীহা প্রকাশ করেছেন  ট্যানারী মালিক ও ব্যবসায়ীরা। ফলে চামড়া বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, দেশের চামড়ার বাজার নষ্ট করা এবং দাম কমানোর কারসাজি। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থ সংকটে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ায় এবার চামড়া ব্যবসায়ীর সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে এবার চামড়ার মূল্য কমিয়ে দেয়ায় ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে অনীহা প্রকাশ করছে। এর মধ্যেও চামড়া সংগ্রহ করা হবে বলে অনেকেই জানিয়েছে।
খুলনা আলীয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ আ খ ম জাকারিয়া জানান, প্রতি বছর কুরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করে তা ট্যানারী মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। তবে এবার ট্যানারী মালিকরা চামড়া নিতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নামমাত্র চামড়ার মূল্য বলছেন। চামড়া প্রতি মূল্য দিতে চাইছে ৫শ’ টাকা মাত্র। ফলে এবারের কুরবানিতে খুলনার মাদরাসাগুলো চামড়া বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় আছি।
খুলনার দারুল কোরআন সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. ইদ্রিস আলী জানান, গত বছর ফুলতলার একটি ট্যানারীতে কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করা হয়। এবার তারা একটি পত্রের মাধ্যমে চামড়া কিনবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। আর স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চামড়ার মূল্য কমিয়ে দিয়েছে। গত বছর চামড়া ১২শ’ টাকায় গড়ে বিক্রি করেছি। এবার তা ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা বলছে। চামড়ার বাজার কমিয়ে দেয়ার জন্য এটি ট্যানারী মালিক ও ব্যবসায়ীদের কারসাজি। কামিল মাদরাসাগুলো যাকাতের অর্থ এবং কুরবানি পশুর চামড়া বিক্রয়ের অর্থ দিয়ে অনেকটা চলে। ফলে এবার চামড়া বিক্রি করতে না পারলে মাদরাসা ক্ষতির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, কুরবানি পশুর চামড়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এই সম্পদ আমরা সংগ্রহ করে সরকারের পক্ষে কাজ করে থাকি। এতে আমরাও উপকৃত হই। এবার চামড়া বিক্রি করতে না পারলে বিপাকে পড়তে হবে।
জামিয়া ইসলামিয়া উসওয়ায়ে হাসনা মাদরাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস মুফতি জিহাদুল ইসলাম জানান, ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে চাচ্ছে না। একটি মহল চামড়া ব্যবসা নষ্ট করতে চায়। চামড়া নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে।  
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম ঢালী বলেন, ট্যানারি ও আড়ৎ মালিকরা ব্যবসায়ীদের ঠিকমতো টাকা দেয় না। ধার-দেনা করে ব্যবসা চালাতে গিয়ে অনেকেই এখন নিঃস্ব হয়ে গেছেন। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এবার দামও কমেছে।  মাদরাসাগুলোর অভিযোগ ভিত্তিহীন। শুনেছি, গত বছর ফুলতলার একটি ট্যানারীতে খুলনার মাদরাসাগুলোর সব চামড়া ক্রয় করে নেয়। এবার তারা কিনবে না। ফলে মাদরাসার কর্তৃপক্ষ এমন কথা বলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে। তবে তুলনামূলক কম।
শেখপাড়া চামড়া পট্টির ব্যবসায়ী বাবর আলী জানান, এবার চামড়া ব্যবসায়ী কম। ৮/১০ জন ব্যবসায়ী চামড়া সংগ্রহ করবে। অর্থ সংকটের কারণে অনেকে চামড়া কিনতে চাইছে না। তারপরও চামড়া সংগ্রহ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ