ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঈদুল আযহা ও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে

আগামীকাল বুধবার ঈদুল আযহা। এই ঈদ কুরবানির ঈদ। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) দুনিয়াতে তার সবচেয়ে প্রিয়তম বস্তুকে কুরবানি দেয়ার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে স্বপ্নযোগে নির্দেশ পান। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি প্রিয়তম সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ.)কে কুরবানির সিদ্ধান্ত নেন এবং তা পুত্র ইসমাঈলকে (আ.) অবহিত করেন। আল্লাহর নির্দেশের কথা শুনে তিনি তা বিনাবাক্যে মেনে নেন এবং পিতাকে এই কুরবানিতে উৎসাহ দেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালন ও তার সন্তুষ্টির জন্য চোখ বেঁধে পুত্রের গলায় ছুরি চালিয়ে দেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার এই কুরবানি কবুল করেন এবং সন্তুষ্ট হয়ে তার পুত্রকে রক্ষা করেন। তার কুদরতে পুত্র ইসমাঈলের জায়গায় তার ছুরির নিচে একটি দুম্বা প্রতিস্থাপিত হয়ে তা জবাই হয়। চোখ খুলে তিনি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে পড়েন। এটা ছিল আল্লাহর নির্দেশ পালনের লক্ষ্যে আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এক মহত্তম দৃষ্টান্ত। আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করার উদ্দেশ্যে ঈমানী পরীক্ষা, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এই অত্যুজ্জ্বল আদর্শকে ঈদ-উল-আযহা ও কুরবানির মাধ্যমে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। এই ঈদ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ্বের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই পবিত্র হজ্ব ও ঈদ উপলক্ষে আমি সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
ঈদের পর কি ঘটবে তা নিয়ে এখন দেশব্যাপী নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। এই জল্পনা-কল্পনা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। বিগত নির্বাচন হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের দু’বছর পর। নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সাংবিধানিক কেয়ারটেকার সরকারকে গান পয়েন্টে হটিয়ে দিয়ে সেনাসমর্থিত একটি অনিয়মতান্ত্রিক সরকার এ সময়টি অর্থাৎ অতিরিক্ত দু’বছর দেশ শাসন করে। অনেকে একে সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার বলে থাকেন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার ভাষায় এই সরকার ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল, তার সাফল্য-ব্যর্থতা তাদেরই। আসলেও তাই। একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দমত একটি সরকার নির্বাচনের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্বাধীনতার পর থেকে সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে এই দেশের মানুষ এই অধিকার আদায়ে সমর্থ হয়। ১৯৯৬ সালে সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ এবং ২০০১ সালে জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হয়ে তারা এই ব্যবস্থাকে ভ-ুল করে দেয়ার জন্য দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ২০০৭ সালের জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রতিহত করার জন্য তারা উঠে পড়ে লেগে যায়। এরই অংশ হিসেবে কেয়ারটেকার প্রধান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলন করে গোটা দেশকে অচল করে দেন। প্রেসিডেন্ট ভবন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আজিজের বাড়িতে দৈনন্দিন ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রকাশ্য রাজপথে বায়তুল মোবাররম উত্তর গেটে ও পল্টন মোড়ে সাপের মত পিটিয়ে তারা মানুষ হত্যা করে, যা ছিল ইতিহাসের জঘন্যতম একটি ঘটনা। এভাবে দেশব্যাপী নৈরাজ্য সৃষ্টির পর ওয়ান ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা এই সরকারকে অভিনন্দন জানান। দলটি এভাবে পূর্ব নির্ধারিত জানুয়ারির নির্বাচনকে বানচাল করে দেয়। তারা হিসাব-নিকাশ করে দেখেছিল যে, ঐ দিন নির্বাচন হলে কিছুতেই তারা ক্ষমতায় আসবে না। কেন না জনমত তাদের পক্ষে ছিল না এবং নির্বাচনে কারচুপির সুযোগও ছিল না। এক/এগারোর সরকার সংস্কারের নামে দেশে সংবিধান বহির্ভূত অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। তারা ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন করে এবং এই সময়ে অত্যাচার-অবিচার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত পাইকারী হারে মানুষকে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানোর প্রথা চালু হয়। সারাদেশ একটা টর্চার সেলে রূপান্তরিত হয়। বেগম জিয়ার দুই ছেলের উপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালানো হয়। এই সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের সহায়তা, ইকোনমিস্টের ভাষায় ‘বস্তাভর্তি ভারতীয় টাকা ও ভারতীয় পরিকল্পনায় ভোট রিগিংয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জোট ক্ষমতায় আসে। বলাবাহুল্য, এর আগে শেখ হাসিনা এক-এগারোর সরকারের সকল কাজের বৈধতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ক্ষমতায় এসে তিনি ও তার জোট শুধু অবৈধ কাজগুলোকে বৈধতাই দেননি বরং তাদের গণতন্ত্র বিনাসী নিপীড়নমূলক কাজগুলোও অধিকতর মাত্রায় অব্যাহত রাখেন। দেশ দুনিয়ার পঞ্চম স্বৈরতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়। বহু তথ্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা তারা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে পার্লামেন্ট বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। এভাবে ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা করেন। বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে এবং নির্দলীয় কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ভোটারদের বয়কটের মুখে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়। ১৫৪টি আসনে বিনাভোটে আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। অন্য ১৪৬টি আসনে গড়ে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪.৫%। ম্যান্ডেটবিহীন ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই সরকার তার দ্বিতীয় মেয়াদের এখন শেষ বছরে পদার্পণ করেছে। নিয়ম অনুযায়ী আগামী চার মাসের মধ্যেই নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে সরকারের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও তত বাড়ছে বলে মনে হয়। স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পুলিশ-র‌্যাব ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে তারা সবাইকে দাবিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারেন না। বিরোধী দলগুলো পাবলিক মিটিং তো দূরের কথা, তাদের অভ্যন্তরীণ পরামর্শ সভাও করতে পারেন না। সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অজুহাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়। দেশে এখন কথা বলার যদি কারুর অধিকার থাকে তাহলে শুধু সরকারি দলের আছে, দেশপ্রেম যদি কারুর থেকে থাকে তাহলে শুধু ক্ষমতাসীন দল ও তার জোটের আছে। কথা বলতে হলে সরকারের পক্ষে বলতে হবে, না বললে পাকিস্তানী দালাল-রাজাকার। এই অবস্থার মধ্যেও বিরোধী দলের অজ্ঞাতে দেশে ইস্যুভিত্তিক বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে উঠছে এবং সরকারও নানা কৌশলে এগুলোকে দমন করছে। তথাপিও তাদের শান্তি নেই।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কয়েকদিন ধরেই বলছেন যে, তিনি দেশে এক-এগারোর ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন। অর্থাৎ মঈন-ফখরুদ্দিনের সেনাসমর্থিত সরকারের ন্যায় আরেকটি সরকার তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। পর্যবেক্ষকদের কেউই তার এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছেন না। তারা বলছেন যে, দেশের বর্তমান অবস্থায় সেনাবাহিনী ক্ষমতার ভাগী হবার জন্য আরেকটি এক-এগারো ঘটাবে এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। এক-এগারোর তাৎপর্য অনেক, এতে নির্বাচন পেছানোর কথাও আসে। মানুষ নির্বাচন চায় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনে তারা বিশ্বাসী। মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। মানুষের এই প্রত্যাশা কি পূরণ হবে? ক্ষমতাসীন দল কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি তুলে দিয়ে তাদের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে পদ্ধতি চালু করেছেন তাতে নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হতে যে পারে না তা একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। আবার প্রধান নির্বাচন কমিমনার কেএম নূরুল হুদা সম্প্রতি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, নির্বাচন কমিশন অনিয়ম ও ত্রুটিমুক্ত কোনো নির্বাচনের গ্যারান্টি দিতে পারে না। যদিও নির্বাচন কমিশন প্রধান এবং তার সদস্যরা অবাধ, নিরপেক্ষ এবং অনিয়ম ও ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন। তার স্বীকারোক্তি দেশের বর্তমান বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। তাহলে দেশে কি আবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ন্যায় আগামী ডিসেম্বর মাসে আরেকটি নির্বাচত হতে যাচ্ছে? দেশের কোটি কোটি গণতন্ত্রকামী মানুষ তা হতে দেবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় কি হবে? দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন হতে পারে, সরকারি নির্যাতনও বাড়তে পারে। বিরোধীদলীয় নেত্রী কারাগারে। তাকে এবং তার পুত্র তারেক রহমানকে বাইরে রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা হচ্ছে। বিরোধী দলের আন্দোলন আদৌ হবে কিনা এবং হলেও সরকার তা কতটুকুন সহ্য করতে পারবেন তা বলা মুস্কিল। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে একে ভিন্নভাবে দেখারও চেষ্টা করছেন। কারুর কারুর ধারণা দেশ যদি উত্তপ্ত হয় তাহলে বর্তমান সংসদ দু’টি কাজ করতে পারে। এক. শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এক-এগারোর ন্যায় একটি সরকারকে অনুমোদনও দিয়ে দিতে পারে। ঐ সরকার নির্বাচন পিছিঁয়ে দিতে পারে। ক্ষমতাসীন দল বিষয়টি ধাতস্থ করার জন্য বার বার এক-এগারোর সরকারের কথা উচ্চারণ করছেন। দ্বিতীয়. যে কাজটি হতে পারে সেটা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যে আছে। সেটা হচ্ছে ১৯৭৫ এর ন্যায় সংসদে একটি আইন পাস করে বর্তমান সংসদের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়িয়ে দেয়া। এটা করা হলে তাদের আর কোনো ঝুঁকিই থাকে না। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তিও পালন করা যাবে, কামাই-রুজির অসমাপ্ত কাজও সম্পন্ন হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ