ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুরবানির ত্যাগের শিক্ষা

মাওলানা নুর-উল হক : প্রতি বছর ঘুরে আমাদের কাছে আসে কুরবানি। প্রকৃত পক্ষে কুরবানি থেকে আমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি সেই বিষয়টি নিয়ে এই লেখা। আমরা যদি প্রশ্ন করি কুরবানি কি? কুরবানির শব্দটির সমার্থক শব্দ “উযহিয়্যাহ্” আভিধানিক অর্থ হচ্ছে নৈকট্য ত্যাগ, উৎসর্গ ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থ আল্লাহর তায়ালা সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে ১০ জিলহজ্জ হতে ১২ জিলহজ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হালাল পশু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করাকে কুরবানি বলে।
এটি একটি উত্তম ইবাদত এবং ওয়াজিব। এবং হাদিস শরিফে রাসুল (স.) বলেন, কুরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কাজ আল্লাহর নিকট আর কিছু নেই। ঐ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন কুরবানির পশুর শিং ক্ষুর ও লোমসমূহ নিয়ে হাজির হবে। কুরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদার স্থানে পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা কুরবানির ধারা নিজেদেরকে পবিত্র কর (তিরমিজি); রাসুল (স.) আর ও বলেন সামর্থ্য থাকা সত্বেও যে কুরবানির করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়” (ইবনে মাজাহ)” অথচ আজ আমরা অহংকারের সাথে বলে থাকি- কে কত টাকা খরচ করে পশু ক্রয় করেছে, কার কত  মোটা তাজা কার কত সুন্দর পশু। কিন্তু কুরআন কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, কখনো আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত বরং পৌছায় তোমাদের তাকওয়া (সুরা আল হাজ্জ আয়াত-৩৭)। এই কুরবানির ধারা আল্লাহর নবি হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) এর অতুলনীয় নিষ্ঠা ও অপুর্ব ত্যাগের পুণ্যময় স্মৃতি বহন করে। প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। ইরাক দেশের বাবেল শহরে এক পুরোহিত পরিবারে হযরত ইব্রাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ। করেন। তখন কার লোকের মুর্তি পুজক ছিল। মানুষকে প্রতারিত করত ঃ পুরোহিতগণ রাজা বাদশাদের সহযোগিতায় সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করত তারা ভাগ্যের ভালোমন্দ জানার জন্য গণকদের শরণাপন্ন হত। গণকদের প্রতি ছিল তাদের অগাধ বিশ্বাস। তারা চন্দ্র, সুর্য, গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি সব কিছুর পুজা করত। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ.) ছোট বেলা থেকেই মুর্তি পুজার ঘোর বিরোধী ছিলেন। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর পিতার নাম ছিল আজর। আজর ছিলেন মুর্তি উপাসক। হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বীয় পিতা ও অন্য সবাইকে বোঝালেন মুর্তি পুজা করা ঠিক নয়। মুর্তিতে নিজেদের হাতের গড়া তৈরী। মানুষ কেন এদের পুজা করবে? এদের কাছে মাথা নত করবে? আমাদের জীবন মৃত্যু, সুখ দুঃখ এদের কারো হাতে নেই। আমরা এদেরকে রব বলে স্বীকার করব কেন? প্রকৃত পক্ষে আমাদের রব, এক মাত্র আল্লাহ, যিনি সব কিছুর সৃষ্টি করেছেন। তাঁর হাতেই আমাদের জীবন মৃত্যু। আমরা একমাত্র সেই আল্লাহরই ইবাদত করি। কিন্তু তারা মানল না। তারা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর বিরুদ্ধে তৎকালীন বাদশা নমরুদের। কাছে নালিশ করল। বাদশা নমরুদের দরবার থেকে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে আগুনে পুড়িয়ে মারা হবে। বাদশাহর এই ভয়াবহ সিদ্ধান্তে তিনি একটু ও বিচলিত হলেন না। আল্লাহর ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল।
বাদশা নমরুদ হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে মেরে ফেলার জন্য বিশাল অগ্নিকান্ড তৈরী করল। আর সেই জ্বলন্ত আগুনে ইব্রাহীমকে ফেলে দেয়া হল। কিন্তু আল্লাহর আদেশে আগুন ঠান্ডা হয়ে গেল। আগুন হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর একটি পশম জ্বালাতে পারল না। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বাঁচালেন, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’ আল্লাহ তায়ালা বললেন “হে আগুন” ইব্রাহীমের জন্য তুমি ঠান্ডা হয়ে যাও। আরামদায়ক হয়ে যাও। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত-৬৯) এভাবে হযরত ইব্রাহীম (আ.) যৌবনকাল অতিবাহিত করে জীবনের শেষ প্রান্তে প্রায় ৮৬ বছর বয়সে আল্লাহর রহমতে পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) জন্ম গ্রহণ করেন। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সন্তান ইসমাঈল (আ.) অপেক্ষা দুনিয়াতে অধিকতর প্রিয় আর কী হতে পারে? একদা ইব্রাহীম (স.) এর আর ও পরীক্ষা আল্লাহ তায়ালা আদেশ করলেন হে ইব্রাহীম শিশু পুত্র ইসমাঈল ও তার মা হাজেরাকে নির্বাসনে দিয়ে আস। হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে জনমানবহীন পাহাড় ঘেরা মরু উপত্যকা নির্জন ভুমিতে রেখে আসেন। আজকাল আমরা কোন সন্তান বা পরিবারকে রেখে আসলে মানুষ বা সমাজ আমাদেরকে কি বলবে, স্ত্রী ও এটা কখনো মেনে নিবে না। ইব্রাহীম (আ.) তেমন কোন খাদ্য সামগ্রী দেন নাই। মাত্র কিছু খেজুর ও এক মশক পানি দিয়ে আসেন এবং তাদের জন্য এ বলে দোয়া করেন হে আমার প্রতি পালক; আমি আমার বংশধরদের কতককে নিয়ে বসবাস করলাম অনুর্বর উত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের নিকট। হে আমার প্রতিপালক! এ জন্য যে তারা যেন নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। অতএব তুমি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দ্বারা তাঁদের রিজিকের ব্যবস্থা কর যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। (সুরা ইব্রাহীম আয়াত-৩৭)। ইব্রাহীম (আ.) যে খাবার ও পানি দিয়ে গেলেন অল্প কিছু দিনের মধ্যে সব খাবার ফুরিয়ে যায়। শিশু ইসমাঈল পানির পিপাসায় কাতর হয়ে ওঠেন। পৃথিবীতে একমাত্র মা বুঝেন সন্তানের ব্যথা। পুত্র ইসমাঈলের চিৎকারে মা হাজেরা (আ.) অস্থির হয়ে পড়েন। তিনি পানি সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড় দ্বয়ে সাতবার ছুটোছুটি করেন। কিন্তু কোথাও পানি পেলেন না। অবশেষে ফিরে এসে দেখতে পান শিশু ইসমাঈলের পদাঘাতে আল্লাহর হুকুমে সে স্থানে পানির স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে। সৃষ্টি হলো আজকের এই জমজম কুপ। খবর পেয়ে মানুষ সেখানে আসতে শুরু করল এবং বসবাস করতে লাগল। গড়ে উঠল জনবসতি। স্থাপিত হলো মক্কা নগরী।
শুরু হলো ইব্রাহীম (আ.) এর উপর নতুন পরীক্ষা। হযরত ইব্রাহীম সুদুর সিরিয়া থেকে বিবি হাজিরা ও পুত্র ইসমাইল (আ.) কে দেখতে মক্কায় গমণ করলেন। তখন ইসমাঈল (আ.) এর বয়স ছিল ১৩ বছর। হযরত ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখেন প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানি করতে আদিষ্ট হন।
জাগ্রত হয়ে হযরত ইব্রাহীম (আ.) পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে বলেন! হে পুত্র; স্বপ্নে দেখলাম আমি তোমাকে কুরবানি করছি। তুমি কী বল? তখন পুত্র ইসমাঈল কোনোরূপ বিচলিত না হয়ে আনন্দ চিত্তে উত্তরে বলেন। হে পিতা; আপনি যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। ইনশাল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত হিসেবে পাবেন। (সূরা. আস সাফফাত আয়াত-১০২) সন্তানের স্বভাব সুলভ আচরণ কেমন ছিল এটাও আমাদের সন্তানদের জন্য ইসমাঈল (আ.) রেখে গেছেন।
হযরত ইব্রাহিম (আ.) পুত্র ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানি করার উদ্দেশ্যে মিনার পথে রওয়ানা হলেন। পথের মধ্যে শয়তান ইসমাঈলকে বারবার ধোকা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে তিনি বিন্দুমাত্র প্রভাবিত না হয়ে নির্বিঘেœ মিনায় পৌঁছেন। বরং শয়তান কে কংকর পাথর, নিক্ষেপ, করলেন। আজ ও মিনায় শয়তানকে ৭টি পাথর ছোড়ার নিয়ম স্মৃতি রয়েছেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রাণ প্রিয় পুত্রকে কুরবানি করার জন্য উদ্যত হলেন। তিনি পুত্রের গলায় চুরি চালালেন। ঠিক এর সময় আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে জান্নাত থেকে একটি দুম্বা পাঠাইলেন। এর স্থলে একটি দুম্বা কুরবানি হয়ে গেল আর ইসমাঈল দুম্বার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আল্লাহ তায়ালা এই কুরবানি প্রথা কিয়ামত পর্যন্ত চালু রাখলেন। এ ধারাবাহিকতায় আজকে আমাদের এ পশু কুরবানি। আমাদের জীবনে এ শিক্ষা গ্রহণ করলে আমরা হয়ে উঠবাে একে অপরের প্রতি সহানুভুতিশীল, পরোপকারী ও আত্মত্যাগী, আত্মত্যাগী মানুষই সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যান ভয়ে আনতে পারে। নিজের সুখ শান্তির বাইরে যারা সমাজের মানুষের সুখকে বড় করে দেখে তারাই প্রকৃত মানুষ, কুরবানি ত্যাগের শিক্ষা আমাদেরকে পরোপকারে উৎসাহিত করবে ও মানবতাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটাবে। এর মাধ্যমে মুসলমানগণ দৃঢ়তার সাথে ঘােষনা করেন যে, আমাদের কাছে নিজের জান মাল অপেক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মুল্য অনেক বেশি। পশুর গলায় চুরি চালিয়ে এর রক্ত প্রবাহিত করে আল্লাহর কাছে শপথ করে বলে হে আল্লাহ তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যে ভাবে পশুর রক্ত প্রবাহিত করছি প্রয়োজনে আমাদের শরীরের রক্ত প্রবাহিত করতেও কুন্ঠিত হব। এই হচ্ছে আল্লাহর প্রেমের প্রকৃত নিদর্শন আল্লাহ তায়ালা বলেন নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সব কিছু সমগ্র জগতের মালিক আল্লাহর তায়ালার জন্য। (সূরা আন-আম আয়াত-১৬২)। সর্বপরি আমরা এটা বলতে পারি যে, মানুষের মধ্যে যেমন মনুষত্ব আছে, তেমনি পশুত্বও আছে। কুরবানির মাধ্যমে পশুত্বকে হত্যা করে মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলা হয়। মানুষের। লোভ-লালসা, হিংসা বিদ্বেষ অহংকার ইত্যাদি পাশবিক চরিত্র বিসর্জন দিয়ে মানবীয় গুণাবলী উজ্জীবীত করতে পারলেই কুরবানি স্বার্থক হবে।
লেখক : প্রভাষক, এভার গ্রীণ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ