ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরিত্যক্ত কারাগারের নির্জন কক্ষে টানা দ্বিতীয় ঈদ করবেন খালেদা জিয়া

স্টাফ রিপোর্টার : কথিত দুর্নীতি মামলায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে একাকীত্ব অবস্থায় ঈদুল আযহা পালন করবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মূল মামলায় জামিন পেলেও হাস্যকর আর ৩০টির অধিক মামলায় তিনি দীর্ঘ প্রায় সাত মাস ধরে পুরান ঢাকার জীর্ণ কারাগারে অবস্থান করছেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এ নেত্রী। কারাগারে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে তিনি দেশের জনগণ ও নেতাকর্মীদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সেই সাথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চলমান আন্দোলনকে আরো বেগবান করার নির্দেশ দিয়েছেন। 
সূত্র মতে, গত প্রায় এক দশকেরও বেশী সময় ধরে পুত্র,  ছেলের বউ ও নাতনিদের ছাড়াই ঈদ করতেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আপনজনরা কাছে না থাকলেও পরিবারের অন্যদের পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ঈদের দিনটা কাটতো বেগম জিয়ার। পরে ছেলে, নাতনি, ছেলের বউদের সাথে টেলিফোনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন তিনি। এবার সেই সুযোগও থাকছে না। পরিত্যক্ত কারাগারের নির্জন কক্ষে এবারের ঈদুল আযহাাও কাটবে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, সাবেক বিরোধী দলীয় নেতা, সাবেক প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার।
কারাগারে বেগম জিয়ার ঈদ নতুন কিছু নয়। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময়ে সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ কারাগারে বেগম জিয়া ঈদ উদযাপন করেছিলেন। বেগম জিয়া এমন সময়ে কারাগারে ঈদ করছেন যখন দেশের মানুষের কোনো নিরাপত্তা নেই। ঈদ করতে যাওয়া মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ হতাহত হচ্ছে। তিনি নিজেও গুরুতর অসুস্থ। কারাগারে তিনি বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সরকার তার চিকিৎসাও করছেনা। এমনকি তার অসুস্থতার খবর পর্যন্ত দেয়া হয়না। বিএনপির পক্ষ থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করানোর দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু সরকার সেটিতে রাজি হচ্ছেনা। একইসাথে ঈদের আগেই বেগম জিয়ার মুক্তির দাবি জানানো হয়েছিল বিএনপির পক্ষ থেকে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই। প্রয়োজনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সমুদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। আমরা দাবি করছি যে, আর কাল বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের পরামর্শ অনুযায়ী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতে খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ার পরও মুক্তির পথে সৃষ্ট ‘সরকারের সকল অপকৌশল’ বন্ধের দাবিও জানান খন্দকার মোশাররফ। তিনি বলেন, সরকার বেগম জিয়াকে হাস্যকর ও মিথ্যা মামলায় আটকে রেখেছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টিকে সরকার রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে। বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও অন্যায়ভাবে এবং তার দেয়া জবানবন্দী বিকৃত করে একটি আদালত তাকে পাঁচ বছরের জেল দিয়ে সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছে। বর্তমানে তাকে একটি পরিত্যক্ত ঘোষিত নির্জন কারাগারের একমাত্র বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছে। ৭৩ বছর বয়স্কা এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে তা যেকোন সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলার মতো। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তার দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে। ফলে তাকে সবসময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৩ বারের নির্বাচিত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা তাতে তাকে সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে এবং জরুরী পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা একান্তই জরুরী। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থাইটিস এর ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন এবং পাশাপাশি তার অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তার উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে।
২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের অবৈধ সরকারের পর থেকে দীর্ঘ ১১টি বছরে ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের ছাড়াই ঈদ উদযাপন করছেন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ এই নেতা। এর মধ্যে এবারো তিনি কাউকেই কাছে পাচ্ছেন না। এমনকি কারো সাথেও কথাও বলতে পারবেন না। এই ১১ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নানা শারীরিক ও মানসিক দু:সহ যন্ত্রণা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। এবার দেশে ঈদ করছেন আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী ও দুই মেয়ে। ঈদের দিন কোকোর পরিবারের সদস্যসহ অন্যরা বেগম জিয়ার সাথে দেখা করার কথা রয়েছে।
আগের বছরগুলোতে পরিবারের সদস্যদের ছাড়া ঈদ করলেও সান্ত¡না শুধু এইটুকু যে, ঈদের দিন অসংখ্য নেতাকর্মী ও শুভাকাংখীদের নিয়ে তিনি ঈদ করেছেন। সবার সাথে ঈদেও শূভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। আর যখনই মনে পড়েছে টেলিফোনে ছেলেদের সাথে কথা বলে মনকে সান্ত¡না দিয়েছেন। ঈদের দিন সবার আগে ফজরের নামাজ শেষে চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকা ছেলের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। কথা বলতেন ছেলের বউ আর নাতনিদের সাথে। এবার আর তাদের ফোন করার সুযোগ নেই। আদরের নাতনি, ছেলে আর ছেলের বউদের কারো কন্ঠই তিনি শুনতে পাবেন না। তবে কারা কর্তপক্ষ যদি অনুমতি দেন তাহলে ঈদেও দিন কোকোর স্ত্রী ও মেয়েদের সাথে দেখা হতে পারে।
এদিকে মা বেগম খালেদা জিয়ার কারাগারে ঈদ করায় আনন্দ নেই বড় ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। নিরানন্দ ঈদ কাটবে নেতাকর্মীদের। কাছে না থাকলেও দূর থেকে মায়ের কন্ঠটা শুনতে পাবেন না তিনি। ঈদের দিন নাতনি জাইমা রহমান, পুত্রবধু ডা. জোবাইদা রহমানের সাথে কথা বলতেন তিনি। মাঝে কয়েকটা ঈদে নাতনিদের কাছে পেয়েছিলেন বেগম জিয়া। এবারো কেউই নেই তার পাশে। বাবাকে হারানোর যে কষ্ট তা কোকোর মেয়েরা দাদিকে কাছে পেয়ে ভুলতে চেয়েছিল। কিন্তু এবারো সেই সুযোগও নেই।
 দেশে-বিদেশে দলের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভাকাংখীর অভাব নেই। দেশজুড়ে মানুষের অফুরন্ত ভালবাসাও তার জন্য। কিন্তু এতকিছুর পরও ঈদের দিন কারাগারের নির্জন কক্ষে একাকী ঈদ পালন করবেন বেগম জিয়া। ঈদের দিন ছেলেদের সাথে কথা বলার যে অভ্যাস তার ছিল এবারো হয়ত সেটি মনে করে তিনি কাঁদতেই থাকবেন। তিনি আর শুনতে পাবেন না কারো কথা। এটি তিনি বিশ্বাসও করবেন না।
ওয়ান ইলেভেনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। ওই সময় তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও গ্রেফতার হন। ৩৭২ দিন সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষ কারাগারে আটক থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এর মধ্যে ২০০৭ সালের দুটি ঈদ কারাগারে কেটেছে তার। পরে তারেক রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। তিনি এখনও সেখানেই আছেন। সঙ্গে আছেন স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। আরাফাত রহমান কোকোও প্যারোলে মুক্তি নিয়ে থাইল্যান্ড যান। তার স্ত্রী শর্মিলা রহমান, দুই মেয়ে জাফিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানও ছিলেন তার সঙ্গে। ২০১৫ সালের ২৪ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাই ২০০৭ সালের পর থেকে দুইছেলেকে একসঙ্গে পাশে পাননি বেগম জিয়া। বরং পুত্র, পুত্রবধূ ও নাতনিদের রেখে ২০টি ঈদ একাই কাটিয়েছেন তিনি। এবারো ২১তম ঈদ তিনি নির্জন কারাগারে একাকীভাবে কাটাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ