ঢাকা, মঙ্গলবার 21 August 2018, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ৯ জিলহজ্ব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নারীর মর্যাদা ও ইসলাম

অধ্যাপক সারওয়ার মো. সাইফুল্লাহ্ খালেদ : বঙ্গীয় শব্দকোষ নামক অভিধানে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নারী শব্দের অর্থ করেছেন - নৃজাতির বা নরজাতির স্ত্রী, নরের ধর্ম্ম্যা, স্ত্রীলোক, সীমন্তনী, পতœী, স্ত্রীজাতিমাত্র, ইত্যাদি। সে যা হোক। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যারা ঢাকা শহরে বাসে চড়েছেন তাদের কাছে - “ওস্তাদ লেডিস, চার চাক্কা বন্কে”- এ কথাগুলো নতুন নাও ঠেকতে পারে। সেকালে ঢাকা শহর যেমন ছোট ছিল তেমনি বাস এবং যাত্রী উভয়েরই সংখ্যা কম ছিল। তখন সিংহভাগ বাস ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর ছিল খাস ঢাকার লোক। বাসে মহিলাদের জন্য আলাদা আসন থাকতো। মহিলা না থাকলে আসনগুলো খালি যেত। সেকালে মহিলারা আজকের তুলনায় বেশ পর্দানশীন ছিলেন। বাসে যে সব মহিলা চলতেন তাদের অধিকাংশই বোরখা পরতেন আর কমবয়সীরা ছালওয়ার কামিজ উরণা পরতেন। তারা যাতে বাসে ঝুঁকিমুক্তভাবে উঠানামা করতে পারেন সেদিকে বাসের ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর উভয়েই সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। বাস কন্ডাক্টর বাসের হাতল ধরে পা’দানিতে দাড়িয়ে সে কাজটি করতে ড্রাইভারকে সহায়তা করতেন। যে কোন বয়সের মহিলা যখন বাসে উঠানামা করতেন তখন কন্ডাক্টর বাস থেকে রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়ে জোর গলায় ড্রাইভারকে সতর্ক করে বলতেন - “ওস্তাদ লেডিস, চার চাক্কা বন্কে”। এর অর্থ মহিলা উঠানামা করছে, বাস নিশ্চল রাখুন, যেন তারা নিরাপদে উঠানামা করতে পারেন।
ঢাকইয়া ভাষার এ সতর্ক বাণীটি আপাত ন্দৃষ্টিতে অসৌজন্যমূলক মনে হতে পারে। আমরা যদি একটু তলিয়ে দেখি তবে সহজেই বোধগম্য যে, এই উক্তিটির মাঝে বাসযাত্রী মহিলাদের প্রতি সেকালের বাস ড্রাইভার ও কন্ডাক্টরদের মনে কী গভীর শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ ছিল। তারা সেটা মহিলাদের অধিকার মনে করতেন। আর আজ? মহিলারা নিজেদের অধিকারের জন্য আন্দোলন করেন। সেকালে তাঁরা না চাইতেই সেটা পেয়ে যেতেন। সেকালে লোক মুখে একটি সাধারণ বোল চালু ছিল - “আমাদের সকলেরই মা-বোন আছে। তাই সর্বস্তরের মেয়ে-মহিলাদের সকল পুরুষই মর্যাদার চোখে দেখতেন। আজকের মতো নারী অধিকার আদায়ের জন্য পুরুষের মতো মহিলাদের ব্যানার হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বক্তৃতা ও শ্লোগান দিতে হতো না। আজকে মহিলাদের মর্যাদার যে আকাল চলছে আমি মনে করি তার জন্য মহিলারাও কম দায়ী নন। মহিলারা আর যাই হোন পুরুষ হতে পারেন না। আজ সেই প্রতিযোগিতাই চলছে। মহিলারা যদি মহিলাদের জায়গায়ই অবস্থান করতেন তবে হয়তো তাদের কোন সমস্যা হতো না। মর্যাদা আন্দোলন করে লাভ করা যায়না। তার জন্য নিজেকে সেভাবে প্রস্তুত করে তুলতে হয়। আজকের অধিকাংশ মহিলার যেরকম বেলাগাম চলাফেরা, পোশাক পরিচ্ছদ, তা দেখলে হয়তো আধুনিক যুগের নারী শিক্ষার অগ্রদূত স্বয়ং বেগম রোকেয়াও আক্ষেপ করতেন।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন এটা বেগম রোকেয়ার কাল নয় বরং বিশ্বায়নের যুগ। মানি। পাশ্চাত্য সভ্যতা আজ আমেদের গ্রাস করতে বসেছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার আগ্রাসী দিকটি ব্যাখ্যা করতে যেয়ে মার্কস ও এঙ্গেলস বলেছেন। “The west compels all nations, on pain of extinction, to adopt the bourgeois mode of production; it compels them to introduce what it calls civilization into their midst, i.e., to become bourgeois themselves; in one word, it creates a world after its own image” (Marks-Engels, Selected Works, 1962, Vol. 1, P. 38). এই বুর্জোয়া সভ্যতার চাপে পাশ্চত্যে আর যা-ই থাক নারীর কোন মূল্য নেই। নারী সেখানে পণ্য। অথচ নারীর অধিকারটা আমাদের দেশের নারীরা পেতে চান পাশ্চাত্য কায়দায়। এ উপমহাদেশীয় সনাতন ধর্ম শাস্ত্র এবং ইসলাম কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। যদিও আমাদের দেশে সম্প্রতি একটি পাশ্চাত্য ও ভিন্নধর্মী ট্রেন্ড চালু হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ডাস্টবিনে পরিত্যাক্ত নবজাতকের সংখ্যা দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। বিবাহিত জীবনেও নারীর সুচিতা লজ্জিত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনের দৈনিক কাগজের পৃষ্ঠায় তা দেখা যায়। বিষয়টি পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে বলার জন্য আমি বেশ পেছন থেকে আলোচনাটি শুরু করব।
সনাতন ধর্ম শাস্ত্রে আছে যে “পঞ্চপান্ডবের মহাজননী কুন্তীর জীবন উভয় ব্যাপারেই বিস্ময়কর উদাহরণ স্থল। কুমারী অবস্থায় তিনি কানীনপুত্র কর্ণের জন্মদান করিয়াছেন। বিবাহিত জীবনেও তাঁহার পুত্রদের একজনও স্বামীর ঔরসজাত নহেন। কিন্তু তৎসত্বেও কুন্তীর নিত্যস্মরণ মহাপাতকনাশী। ‘অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা/ পঞ্জকন্যা, স্মরোনিত্যম মহাপাতক নাশনং’ (আবুল হাসনাত, যৌনবিজ্ঞান, ১৯৬৩, পৃষ্ঠা ৪৬৬-৪৬৭)।.. ‘আদি পর্বে পা-ু বলিয়াছেন, উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু একদিন পিতৃ— মক্ষেই স্বীয় জননীকে অন্য পুরুষ কর্তৃক আকর্ষিত হইতে দেখিয়া এই অশ্রদ্ধেয় প্রথার অবসান ঘটান। ... মহাভারতে ‘লা হইয়াছে -‘দুঃশীলঃ কামবৃত্তো বা ধনৈৰ্বা পরিবর্জিতঃ॥/ স্ত্রীণাং আর্যস্বভাবানাং পরমং দৈবতং পতিঃ’ -স্বামী দুঃশীল বা যথেচ্ছাচারীই হোন, স্ত্রীর নিকট তিনিই পরম দেবতা। সেদিন সাড়ম্বরে পতিপ্রণামের মহামন্ত্র বিঘোষিত হইল .. “ওঁ নমঃ কান্তায় শান্তায় সর্বাদেবাশয়ায় স্বাহা’ । কিন্তু এক পক্ষের রাশ আলগা হইলে অন্য পক্ষের বজ্র-আঁটুনি ফস্কা-গেরোতেই পর্যবসিত হইবে তাহা মানবের ইতিহাসে বার বার প্রমাণিত হইয়াছে। (আবুল হাসনাত, যৌনবিজ্ঞান, ১৯৬৩, পৃষ্ঠা ৪৬৭-৪৬৮)। ইসলাম ধর্মে পরকীয় প্রেম শুরু থেকেই অবৈধ।
মার্কসীয় দর্শন মতে এককালে নারী বহুভোগ্যাই ছিলো। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে মায়ের অধিকার ছিল সমস্ত পুরুষের ওপর আর সে অধিকার সর্বাগ্রগণ্য। চব্বিশ বছরের যে যুবকটি নেকড়ের আক্রমনে মারা গেল সে ছিল মায়ের পুত্র এবং পতিও বটে। তার মৃত্যুতে মায়ের মনে কোনো কষ্ট হয়নি তা নয়, তবে সে যুগে মানুষ অতীতের চেয়ে বর্তমানের কথা বেশী ভাবতে বাধ্য হত। মায়ের এখন দু’জন স্বামী বর্তমান- তার অপর সন্তানের বয়স চৌদ্দ মাত্র, তবে সে অল্পকালেই স্বামী হবার উপযুক্ত হবে। মায়ের রাজকালের মধ্যেই এখন যারা শিশু, তাদের ক’জন স্বামী হবে তা কেউ বলতে পারে না। মা চব্বিশ বছরের যুবকটিকে ভালোবাসত বেশী। তাই তিনজন তরুণীর ভাগে পঞ্চাশ বছরের পুরুষটি ছিল’ (রাহূল সাংকৃত্যায়ন, ভোগা থেকে গঙ্গা, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ২৫)। এ নারীর রূপমাধুর্য এ রূপে বর্ণনা করা হয়েছে: ‘ময়লাহীন আরক্তিম গালের উজ্জ্বল আভা, জটাবিহীন সােনালী কেশদাম, তন্বী দেহ, পরিপুষ্ট বুকের ওপর গোল গোল শ্যামল-মুখ স্তন, কৃশ কটি, আকর্ষণীয় নিতম্ব, পরিপুষ্ট পেশল জানু, পরিশ্রমে গড়ে উঠা পায়ের ডিম”(রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ১৯৯৬, ভোলগা থেকে গঙ্গা, পৃষ্ঠা ১৯)। এ-মতানুসারে সেকালে অবাধ যৌনাচার সিদ্ধ ছিলো।
আধুনিক অনেক নৃবিজ্ঞানী মানব সমাজে কোনকালে অবাধ যৌনাচারের প্রথা চালু ছিলো তা মানতে রাজি নন। তারা বলেন জীব জগতে সবই জোড়ায় জোড়ায় চলে। আল কোরআনের একাধিক সূরার একাধিক আয়াতেও বলা হয়েছে যে, “তিনি (আল্লাহ) সব কিছুই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন” (সূরা আয যোখরুফ ৪৩: আয়াত ১২)। অবাধ যৌন মিলনের ধারণা কাল্পনিক পৌরানিক কাহিনী থেকে এসেছে বলে তারা মনে করেন। পরিণত বয়সে নর নারীর পারস্পরিক আকর্ষণ যে প্রাথমিকভাবে প্রাকৃতিক ও যৌন প্রবৃত্তির তাড়নার বশিভূত ও শাশ্বত এবং কোন নিয়মের বশিভূত নয় তা না মেনে উপায় নেই। শেক্সপিয়রের ‘টেম্পেস্ট’ নাটকে এর উদাহরণ আছে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধে একে নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে আধুনিক মানুষ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ঘটিয়েছে। মানুষের তৈরি নিয়ম যখন প্রকৃতি ও জৈব-ধর্ম বিকাশের অন্তরায় বলে কারো কাছে মনে হবে তখন সেই নিয়মকে জীব মানুষ অতিক্রম করে যাবে তাতে আশ্চর্যের কি আছে? কারো কারো মতে ‘আতুরে নিয়মা নাস্তি’। মানুষের তৈরি বিধান লংঘনে কোন পাপ নেই। তবে এ প্রবণতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ত্রণে সব ধর্মই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় বিধান লংঘনে পাপ আছে। ধর্মীয় বিধান তাই পরকাল ভীত আস্তিক মানুষের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ ক্ষেত্রে মন, চোখ ও দেহের পর্দা নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। সনাতন ধর্মের মহাভারতে দেখা যায় যথানিয়মে অগ্নিতে আহুতি দেবার পর যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীর পাণি গ্রহণ করলেন। পরবর্তী চার দিনে একে একে অন্য ভ্রাতাদেরও বিবাহ সম্পন্ন হয়। প্রত্যেক বার পুনর্বিবাহের পূর্বে ব্রহ্মর্ষি ব্যাস দ্রৌপদীকে এই অলৌকিক বাক্য বলতেন - ‘তুমি আবার কুমারী হও’। পতিশ্বশুরতা জ্যেষ্ঠে পতিদেবরতানুজে।/ মধ্যমেষু চ। পাঞ্চাল্যাস্ত্রিতয়ং ত্রিতয়ং ত্রিষু’ - জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির পাঞ্চালীর পতি ও ভাশুর হলেন, কনিষ্ঠ সহদেব পতি ও দেবর হলেন, এবং মধ্যবর্তী ভ্রাতা প্রত্যেকে পতি ভাশুর ও দেবর হলেন” (রাজশেখর বসু, মহাভারত, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ, - সারানুবাদ, পৃষ্ঠা ৮৭)। এখানে যা দেখা যায় তা হলো বিবাহযোগ্যা নারীর কৌমার্য অত্যাবশ্যক। সুতরাং সনাতন ধর্মেও বিবাহ বহির্ভূত । দৈহিক মিলন কাম্য নয়।
দ্রৌপদীর স্বামীরা “অনল ও সূর্যতুল্য প্রভাবান দিব্যরূপধারী, তাঁদের বক্ষ বিশাল, দেহ দীর্ঘ, মস্তকে স্বর্ণকিরীট ও দিব্য মাল্য, দেবতার সর্বক্ষণ তাঁদের দেহে বর্তমান”(রাজশেখর বসু, মহাভারত, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ - সারানুবাদ, পৃষ্ঠা ৮৭)। কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামা দ্রৌপদীর কাছে জানতে চান “তোমার স্বামীরা লোকপালতুল্য মহাবীর জনপ্রিয় যুবক”- এঁদের সঙ্গে তুমি কিরূপ আচরণ কর? দ্রৌপদী বলেন ‘সর্বদা অহংকার ও কামক্রোধ ত্যাগ করে আমি সপত্নীদের সঙ্গে পান্ডবগণের পরিচর্যা করি.... আমি সকল সুখভোগ ত্যাগ করে দিবারাত্র আমার কর্তব্যের ভার বহন করতাম, কোনও দুষ্ট লোকে তাতে বাধা দিতে পারত না। আমি চিরকাল সকলের আগে জাগি, সকলের শেষে শুই। সত্যভামা, পতিকে বশ করার এইসব উপায় আমি জানি, অসৎ স্ত্রীদের পথে আমি চলি না’ (রাজশেখর বসু, মহাভারত, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ - সারানুবাদ, পৃষ্ঠা ২৩২-২৩৩)। এখানে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য বোধ যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি দেখা যায় স্বীয় কর্তব্য নিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য দ্রৌপদী অসৎ স্ত্রীদের এড়িয়ে চলতেন - তাই সততা তার ভূষণ।
হিন্দু পুরাণে দ্রৌপদীর রূপ বর্ণনা করতে যেয়ে বলা হয় “দ্রৌপদী আজন্ম যুবতী শ্যামবর্ণা, পদ্মপলাশলোচনা, নীল ও কুঞ্চিত কেশকলাপ ভূষিতা” (সুধীরচন্দ্র সরকার, পৌরণিক অভিধান, ১৪০৬ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ২৪১)। দ্রৌপদী বীরভােগ্যা। যুধিষ্ঠির মনে করেন ধনঞ্জয়ের উপর এঁর বিশেষ পক্ষপাত ছিল” (রাজশেখর বসু, মহাভরত, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ - সরানুবাদ, পৃষ্ঠা ৭৯)। দ্রৌপদী বহুভোগ্যা ছিলেন বলেই দুর্যোধন বিশ্বাস করতেন “দ্রৌপদীর অনেক পতি, তাকে অন্য পুরুষে আসক্ত করাও সুসাধ্য” (রাজশেখর বসু, মহাভারত, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ - সারানুবাদ, পৃষ্ঠা ৮৮)। কিন্তু ইসলাম যে নারীর একাধিক স্বামী সমর্থন করে না তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হলো পুরুষ নারী অপেক্ষা অধিক যৌনক্ষমতা সম্পন্ন। এর পারিবারিক ও সামাজিকভিত্তির একটি হলো একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকলে তার পক্ষে এডজাস্ট করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় এবং অপরটি হলো সন্তানের পিতৃপরিচয় নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ এক পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে পিতা মাতার পরিচয় নির্ণয়ে কোন প্রকার জটিলতা থাকে না। উপরন্তু ইসলামে পিতা সনাক্তকরণের উপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সন্তান যদি তার পিতা মাতার পরিচয় না পায় তাহলে সে চরম মানসিক অশান্তিতে ভোগে।
জনৈক ভূয়োদর্শি লোক আমাকে একবার বলেছিলেন মেয়েরা এ ব্যাপারে উদার’। কথাটা সম্ভবত ঠিক। মানসিক দিক থেকে এক জনের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেও মেয়েরা বিশেষ অবস্থায় স্বেচছায় ও সানন্দে বহু জনকে দেহ দানে অভ্যস্ত হতে পারে এবং দিয়েও থাকে। বহু নারী দেহের সুচিতা থেকে মনের সুচিতাকে অগ্রাধিকার দেয়। যেমন সীতা বলেন “মদধীনং তু যৎ তন্মে হৃদয়ং ত্বয়ি বতৃতে।/পরাধীনেষু গাত্রে কিং করিষ্যামনীশ্বরী” - আমার অধীন যে হৃদয় তা তোমারই ছিল; কিন্তু যখন আমি নিজে। কত্রী নই তখন পরায়ত্ত দেহ সম্বন্ধে কি করতে পারি? (রাজশেখর বস, রামায়ণঃ ১৬৬/৯ -সারানুবাদ, পৃষ্ঠা ৩৮২)। স্বাধীন নারীর সতিত্ব রক্ষা তার নিজ আয়ত্বাধীন। পরাধীন অবস্থায় সে নিরুপায়। সিতা তাই বলতে চেয়েছেন।
“টাহিটির কথা দৃষ্টান্তের মত উল্লেখ করিতেছি। কাপ্তেন কুক তাহার ভ্রন-কাহিনীতে লিখিয়া গিয়াছেন যে, ইহাদের দাম্পত্য বন্ধন অতি কদর্য very low, very degraded এমন কি, যে স্ত্রী সুন্দরী, তাহার কিছুতে একটা স্বামীতে মন উঠে না; বাপের অবস্থা শ্বশুর বাড়ির অবস্থা হইতে ভাল হইলে, স্ত্রী ‘as a right demand and obtain more husbands’ এবং পরবর্তী পর্যটকেরাও এ-সব কথা সত্য করিয়াই স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু এ সমস্ত থাকা সত্ত্বেও ঐ-দেশের পুরুষেরা নারীকে শ্রদ্ধা-সম্মানের চোখে দেখে” (শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুলভ শরৎ সমগ্র ২, ১৯৯৫, নারীর মূল্য, পৃষ্ঠা ১৯৪৪-১৯৪৫)। আমার মনে হয় এটা শুধু টাহিটির মেয়েদের ক্ষেত্রেই সত্য তা নয়। সাম্প্রতিক কালে এ প্রায়। যে কোন দেশের যে কোন বেপর্দা মেয়ের বেলায়-ই সত্য। ১৯৬০-এর দশকে ‘Bitter Harvest’ নামে একটি ইংরেজি ছায়া-ছবি দেখেছিলাম। এতে পাশ্চাত্য সমাজের এক সধবার বহুগামীতার এবং এর করুণ পরিনতির কাহিনী বিধৃত হয়েছে। এ ছাড়াও George Bernord Shaw -এর ভাষায় ‘Marriage is a ghastly public confession of strictly private intention’. নৃবিজ্ঞানী সৈয়দ আলী নকী দেখিয়েছেন -“এস্কিমো ও উত্তর আমেরিকার শোশোনিয়ানরা অতিথি এলে স্ত্রীদের দিয়ে তাকে যৌনতৃপ্তি প্রদান করে থাকে। পুরুষেরা শিকারে থাকাকালেও স্ত্রীরা অন্য পুরুষের সঙ্গ লাভ করতে পারে” (সৈয়দ আলী নকী, নৃবিজ্ঞান, ২০০০, পৃষ্ঠা ১০৭)। সে সকল দেশে নারীদের এভাবে ভোগ্য-সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সীতা যা বলেছেন তা রাবনের গৃহে বন্দী শুধু সীতার কথাই নয়, এ দেহ বন্দী সকল নারীর কথা। পর গৃহে বন্দী হলেই কেবল নয় এমনিতেও রিপুর তাড়নায় নারী নিজ দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং যে কাউকে তার ইচ্ছা দেহ দান করতে পারে। অগ্নিপরীক্ষা শেষে রাম যখন নিশ্চিৎ হলেন দেহের দিক দিয়ে যাই, হোক রাবন সীতাকে হৃদয়ের দিক দিয়ে ধর্ষণ করতে পারেনি তখন সানন্দে’ তাকে গ্রহণ করলেন। এ ভালবাসার ব্যাপাটি আধুনিক মতে A man loves with his heart and a woman with the point of her breast. (আবুল হাসনাত, ১৯৬৮, যৌনবিজ্ঞান-২য় খন্ড, পুষ্ঠা ১০৪)। দেহে পারলেও রাবন যে সীতাকে হৃদয়ের দিক থেকে ধর্ষণ করতে পারেনি তা সম্ভবত এই কারণে যে দীর্ঘ দিন ধরে পুনঃপুনঃ দেহিক সংসর্গের কারণে সীতা রামে অভ্যস্ত হয়ে পরেছিল।
এ অভ্যস্ত হয়ে পড়ার বিষয়টা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। জঁ-পল সাত্রের লেখায় এর সমর্থন পাওয়া যায়। লক্ষণীয়-“আমি কত্রীকে বিদায় জানাতে যাচ্ছি।/আমি বিদায় জানাতে এসেছি’।/তুমি চলে যাচ্ছ সঁসিয়ে রোকেত’ /আমি পারী যাচ্ছি। একটা পরিবর্তন দরকার’ ।/ভাগ্যবান। আমি কি করে এই বিশাল মুখে আমার ঠোট চেপে রাখতে পারাম? ওর দেহ আমার নেই। গতকাল কালো পশমের নীচে আমি কল্পনা করতে পেরেছিলাম। আজ পোশাকটা দুর্ভেদ্য। এই শাদা দেহ, ওপরে শিরাগুলো, এটা কি স্বপ্ন? আমরা তোমাকে হারাব’, কত্রী বলে, ‘কিছু পান করবে না? একটা দোকান দেবে। আমরা বসি, গেলাস স্পর্শ করি। ও গলার স্বর একটু নামায়। ‘আমি তোমাতে অভ্যস্ত ছিলাম। ও নম্র দুঃখে বলে, ‘আমাদের ভাল কাটছিল। (জাঁ-পল সার্তে, বিবমিষা - খধ ঘধঁংবব -মৃণালকান্তি ভদ্র অনুদীত, জাঁ-পল সার্ত সংখ্যাঃ বিজ্ঞাপন পর্ব/২১৪, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ২১২-২১৩)। সীতা যখন রামকে বলেন- “সহ সংবৃদ্ধভাবেন সংসর্গেণ চ মানদ।/ যদি তেহহং ন বিহাতা হতা তেনাস্মি শাশ্বতম্ - আমাদের দীর্ঘকাল সংসর্গ হয়েছে, পরস্পরের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি পেয়েছে, এতেও যদি তুমি আমাকে না বুঝে থাক তবে আমার পক্ষে তা চিরমৃত্যু” (রাজশেখর বসু, রামায়ণঃ ১৬৬/১০ - সারানুবাদ, পৃষ্ঠা ৩৮২)।
সীতা এখানে সেই অভ্যস্ততার কথাই বলেন। এ না হলে এ জগতে ক’জোরা স্বামী স্ত্রী আজীবন একত্রে ঘর সংসার করতে পারতো? তবে রাম স্ত্রীর বহুগামীতাকে অনুমোদন দেননি। তাই সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হলো। রাম দ্রৌপদী চাননি সীতা চেয়েছেন। সংসারে সকল স্বামীই সীতা চায়। ইসলাম ধর্মও সংসার জীবনে সীতাকেই অনুমোদন দেয়। তবে দেহে এবং হৃদয়ে। দেহটি দেখা গেলেও হৃদয়টি দেখা যায় না। হৃদয় দেখা না গেলেও স্ত্রী স্বামীর কেনা দাসী নয়। স্বামী অপছন্দনীয় বা আনন্দদায়ক না হলে স্ত্রী বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারেন। পছন্দের পুরুষকে বেছে নিতে পারেন। সে বিধান ইসলামে আছে। নারীর বহুগামীতা বা বহুবিবাহ ইসলাম অনুমোদন করে না। স্ত্রী ভুল করলে এবং তা বুঝতে পারলে বিবাহ বন্ধন অক্ষুণ্ণ রেখেই তার সংশােধনের সুযোগ দানের বিধান ইসলামে আছে। স্ত্রী সংশোধন না হলে বা তা না চাইলে অগত্যা বিবাহ বিচ্ছেদ - তালাক। পুরুষের ব্যাবিচারকেও ইসলাম অনুমোদন দেয়নি। পুরুষের বহুবিবাহের অনুমোদন দিলেও ইসলাম বিবাহ বহির্ভূত নারী সংসর্গের অনুমোদন দেয়নি। পুরুষের পৌরুষ ভেদে সামর্থ থাকলে একের অধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে যদি তার পক্ষে সকলের প্রতি সমান কর্তব্য পালনে সক্ষম হয়। তা না পারলে এক জনই যথেষ্ট।
ইসলামে নীতিগতভাবে একসঙ্গে চারটি স্ত্রী রাখা সমর্থন করে বলে অনেকেই বহু-স্ত্রী বিবাহের উদাহরণ খুঁজতে গিয়ে মুসলিম সমাজের কথা উলেখ করেন। এখানে বহু-বিবাহের শর্ত হলো আর্থিক, সামাজিক ও যৌনজীবনের প্রেক্ষিতে সব স্ত্রীকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে। এ অবস্থার সৃষ্টি করা খুব কষ্টসাধ্য। তদুপরি প্রথম স্ত্রীর বিনানুমতিতে দ্বিতীয় স্ত্রী বিবাহ করা যায় না বলেও শরীয়তে নির্দেশ রযেছে। এ সব বিচার করলে ইসলামে বহু-বিবাহের সমর্থন খুব একটা আছে বলা যায় না” (সৈয়দ আলী নকী, নৃবিজ্ঞান, ২০০০, পৃষ্ঠা ১০৮)। শরিয়ত মোতাবেক প্রথম স্ত্রীকে উপেক্ষা করা যায় না।
আমরা দেখতে পেলাম সনাতন শাস্ত্র মতে ও ইসলামে ব্যভিচার নিষিদ্ধ। নারীদের সম্বন্ধে মনু বলেন তারা রূপ বিচার করে না, বয়সও বিচার করে না; সুরূপ বা কুরূপ যাই হোক, পুরুষ পেলেই তারা সম্ভোগের জন্যে অধীর হয়ে উঠে (মনুসংহিতা, ৯:১৪)। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে/ তুমি বিচিত্র-রূপিণী’। আধুনিকরা সংক্ষেপের পক্ষপাতী, তাই তাঁদের উপলব্দিও একটু সংক্ষিপ্তঃ জগতের মাঝে দ্বিচিত্র তুমি হে/ তুমি দ্বিচিত্ররূপিণী। চিত্রদুটির একটি চিত্র দুঃখের অন্যটি পাপের। দুঃখ ও পাপের যুগ্ম সত্তাকে ইংরেজিতে evil বলে অভিহীত করা হয়, তারই বাংলা করেছি অমঙ্গল” (আবু সয়ীদ আইয়ুব, আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ২১)। এরূপ ধারণার বশবর্তী হয়েই হয়তো পূর্ববর্তী সকল সভ্যতাই নারীকে শয়তানের যন্ত্র হিসেবে মনে করত। অথচ কোরআনে নারীকে “মুহসানা” আখ্যা দিয়েছে। যার অর্থ “শয়তান থেকে সুরক্ষিত”।
আল কোরআনে উল্লেখ আছে, আল্লাহ প্রকৃতির অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন” (সূরা আর রূম ৩০, আয়াত ৩০)। হাদিসে উক্ত হয়েছে প্রত্যেক মানব শিশু এই সহজাত প্রকৃতি (ইসলাম) লইয়া জন্মগ্রহণ করে”। আল্লাহ্ রাসুল (স)-কে বলতে নির্দেশ দেন, মুসলমানদের মধ্যে আমিই হচ্ছি সর্বপ্রথম” (সূরা আল আনয়াম ৬, আয়াত ১৬৩)। ইতিহাসে দেখা যায় ইসলাম প্রচারপূর্ব যুগে আরবে নারীদের অবস্থা ছিল করুণ। সে যুগে আরবে বেশিরভাগ কন্যা শিশুকেই জীবন্ত মটিতে পুঁতে ফেলা হতো। ইসলাম প্রচারের সাথে সাথেই এই কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। ইসলাম যেকোন প্রকার সন্তান, সে কন্যা বা পুত্র যা-ই হোক না কেন, হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম নবজাতককে কেবল হত্যা করতেই নিষেধ করেনি বরং এ ধরণের হত্যাকান্ডকে কঠোরভাবে তিরষ্কার তো করে বটেই উপরন্তু পুত্র সন্তান লাভের আনন্দকেও গৃণা করে - একই সাথে কন্যা সন্তান হত্যার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পবিত্র কোরআনে এর সমর্থন পাওয়া যায়, যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং অসহনীয় মনকষ্টে ক্লিষ্ট হয়। তাকে শোনানো সুসংবাদেও দুঃখে সে অন্যদের কাছে মুখ লুকিয়ে রাখে। সেভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে না, তাকে মাটির নীচে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! তাদের ফয়সালা কতইনা নিকৃষ্ট” (সূরা আন নাহল ১৬, আয়াত ৫৮-৫৯)।
রাসুল (স) বলেন, “যে ব্যক্তি দু’টি কন্যকে যথাযথভাবে লালন-পালন করবে, সে শেষ বিচারের দিন আমার সঙ্গে থাকবে” (হাদিস: আহমদ শরীফ)। আরেকটি হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি দুইটি কন্যাকে সঠিকভাবে লালন-পালন করবে, ভালভাবে যত্ন করবে, স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইসলামে ছেলেমেয়ে লালন-পালনের ক্ষেত্রে কোন প্রকার বৈষম্যের অনুমোদন দেয়নি। পক্ষান্তরে এই আত্যাধুনিক যুগেও কতক দেশে স্ত্রী-গর্ভে সন্তান থাকা অবস্থায় আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা হয়, গর্ভের সন্তানটি আসলে কী - কন্যা নাকি পুত্র। কন্যা হলে পিতাকে ভবিষ্যতে কন্যাদায়গ্রস্থ হতে হবে ভয়ে সেই ভ্রুণটি হত্যা করা হয়। পক্ষান্তরে আল কোরআনে উল্লেখ আছে, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের কখনো দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না, আমিই তাদের রিযিক দান করি ও তোমাদেরও কেবল আমিই রিযিক দান করি। রিযিকের ভয়ে তাদের হত্যা করা বড় ধরণের অপরাধ” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭, আয়াত ৩১)। এভাবে ইসলামে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে।
ইসলামে নারীর অর্থনেতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার কথাও বলা আছে। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় ১৩০০ বছর আগেই ইসলামে নারীদের অর্থনৈতিক অধিকার দেয়া হয়েছে। একজন পূর্ণবয়স্ক মুসলিম নারী, তিনি বিবাহিতা বা অবিবাহিতা যা-ই হোন না কেন, কারো পরামর্শ ব্যতিরেকেই সম্পদের মালিক হতে পারেন। তিনি সম্পদ বন্টন করতে পারেন এবং মালিকানা আদান-প্রদান করতে পারেন। একজন নারী যদি কাজ করতে চান, ইসলামিক বিধি মোতাবেক তিনি তা করতে পারেন। কোরআন-হাদিসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞামূলক কোন দলীল নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কাজ হারাম হবে। এ প্রয়োজনে তিনি ঘরের বাইরেও যেতে পারবেন, তবে তাকে শরীয়া মোতাবেক পোশাক পরতে হবে। তিনি এমন স্থানে কাজ করতে পারেন যেখানে নারীদের জন্য আলাদা ভাগ করা আছে। ইসলামে একজন নারী অর্থনৈতিক দিক থেকে একজন পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ কারণ পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব তার উপর বর্তায় না। এটা বর্তায় পরিবারের পুরুষদের উপর। বিয়ের সময় নারী উপহার হিসেবে নির্দিষ্ট একটা অংশ পাচ্ছেন যাকে বলা হয় ‘মোহর’। আল কোরআন বলছে, “নারীদের তাদের মােহরানা আবশ্যিকভাবে দিয়ে দাও” (সূরা আন নিসা ৪, আয়াত ৪)। ইসলামে যৌতুক হারাম করা হয়েছে।
ইসলাম নর-নারীকে সমান অধিকার দেয় শুধুমাত্র পরিবারের নেতৃত্ব ছাড়া। এটা আল কোরআনে এভাবে বলা হয়েছে, “নারীদের পুরুষের উপর ন্যায়ানুগ অধিকার রয়েছে যেমনি রয়েছে পুরুষের নারীদের উপর, তবে তাদের উপর পুরুষের মর্যাদা এক স্তর বেশি” (সূরা আল বাকারা ২, আয়াত ২২৮)। তাফসীরকারক ইবনে কাছীরের তাফসীরে তিনি এর অর্থ করেছেন, দায়িত্বের দিক থেকে এক স্তর উপরে কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে নয়। যদি কোন পুরুষ কোন নারীকে হত্যা করে তাহলে তাকেও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দন্ড ভােগ করতে হবে। আল কোরআনে উল্লেখ আছে, “তাকেও হত্যা করা হবে। যদি কোন নারী হত্যা করে সেও হত্যাকৃত হবে” (সূরা আল বাকারা ২, আয়াত ১৭৮-১৭৯)। ইসলাম নারীদের সতীত্বকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। যেহেতু অল কোরআন বলে, “পুরুষেরা নারীদের সংরক্ষক” (সূরা আন নিসা ৪, আয়াত ৩৪), এ কারণে স্বাভাবিক অবস্থায় নারীদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাওয়া বারণ, এটা পুরুষের দায়িত্ব। শুধু জরুরি অবস্থায়ই ইসলামে নারীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়। তবে তাদের ইসলামি হিযাব, ইসলামি বিধান ও সতীত্ব রক্ষা করতে হবে।
আধুনিক কালে মানুষের পারিবারিক, মামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেকেই ধর্মকে এড়িয়ে যেতে চান। এটা করা ভুল। আধুনিক জীবনের আসল- রোগটি বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর Marriage and Morals তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, In the modern world, however, love has another enemy more dangerous than religion, and that is the gospel of work and economic success. It is generally held, especially in America, that a man should not allow love to interfere with his career, and that if he does, he is silly. But in this as in all human matters a balance is necessary, (Bertrand Russell, Marriage and Morals, Frorn Internet). পবিত্র কোরআনে নর-নারীর ভালবাসা সম্পর্কে স্পষ্টত উল্লেখ আছে, “তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও একটি যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সঙ্গী সঙ্গিনীদের নির্বাচন করেছেন, যাতে করে তোমরা তাদের সান্নিধ্যে সুখ শান্তি পেতে পার, তদুপরি তিনি তোমাদের মঝে ভালবাসা ও সৌহার্দ সৃষ্টি করে দিয়েছেন” (সূরা আর রূম ৩০, আয়াত ২১)। এখানে অবশ্য দায়িত্বশীল নারী-পুরুষের কথাই বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বার্ট্রান্ড রাসেলের আরেকটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য, ‘...love must feel the. ego of the beloved person as important as one’s own ego, and must realize the other’s feelings and wishes as though they were one’s own” (Bertrand Russell, Marriage and Morals, From Internet). এ প্রসঙ্গে আল কোরআনের আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে অপছন্দও করেন, তার সাথে সদাচরণ করতে হবে” (সূরা আন্ নেসা, ৪, আয়াত ১৯) উল্লেখ করা যায়। তবেই পারস্পরিক বিপত্তি ও বিপর্যয় এড়ানো যায় কারণ তারা তোমাদের পোশাক, তোমরাও তাদের পোশাক” (সূরা আল বাকারা ২, আয়াত ১৮৭)। শেষোক্ত আয়াতের মর্মার্থ তারা একে অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবে। আমি উপরে মেয়েদের পর্দার কথা বলেছি। পবিত্র আল কোরআনে নারী-পুরুষের পর্দার কথা বলা হয়েছে। সেখানে নারীদের পর্দার আগে সূরা আন্ নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে পুরুষের পর্দার কথাও বলা আছে - “একজন ঈমানদারের উচিত দৃষ্টি অবনত রাখা এবং তার পবিত্রতা সংরক্ষণ করা”। এর পরবর্তী আয়াতে আছে - “ঈমানদার মহিলাদের বলুন, সে যেন দৃষ্টি অবনত রাখে। পবিত্রতা অবলম্বন করে এবং যতটুকু প্রয়ােজন তার অতিরিক্ত সৌন্দর্য প্রদর্শণ না করে - এবং উরণা দ্বারা মাথা ও বুক ঢেকে রাখে” (সূরা আন্ নূর ২৪, আয়াত ৩১)। নারীর বাবা, ছেলে ও স্বামী ছাড়া পর্দার বৈশিষ্ট সমুহ কোরআন হাদিসে দেয়া আছে। এর প্রধান ছয়টি বৈশিষ্ট নিম্নরূপ: (১). পর্দা পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে আলাদা। পুরুষকে নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। মহিলাদের ক্ষেত্রে মুখমন্ডল এবং হাতের কব্জি ছাড়া সমগ্র শরীর ঢেকে রাখতে হবে। (২), নারীদের পোশাক এমন আঁটসাঁট হওয়া যাবে না যার ফলে দেহকাঠামো স্পষ্ট বুঝা যায়। (৩), নারীদের পরিধেয় পোশাক স্বচ্ছ হওয়া যাবে না। (৪). নারীগণ এরকম আকর্ষণীয় পোশাক পরবে না যা বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করে। (৫). নারী এমন পোশাক পরবে না যা বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য সৃষ্টি করে। এবং (৬). ঈমানদার নারী এমন পোশাক পরবে না যা অবিশ্বাসীদের পোশাকের সাথে মিলে যায়।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান স্বাধীন দেশ। এতদসত্ত্বেও এর সাথে বাংলাদেশের অধিকাংশ স্বাধীন নারীদের বিদ্যমান রুচি মিলিয়ে দেখলে আমরা কোন মিল খুঁজে পাই না। সম্ভবত এ কারণেই নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। এর প্রতিকারের জন্য নারীরা মিটিং, মিছল ও মানব বন্ধন করে বটে তবে তাতে কোন ফলোদয় হয় না। দিন দিনই অবস্থার অবনতি ঘটছে। এর কারণ এগুলো সমস্যা নিবারণের পথ নয়। বলা হয়েছে “প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত কর্মের জন্য দায়ী” (সূরা আত্ তূর ৫২, আয়াত ২১)। আসল পথ তাদের পর্দা মেনে চলা। তাহলে পুরুষ তাদের অবশ্যই সমীহ করবে। যেমনটা এ দেশেই পুরুষ নারীদের এক সময় করেছে। পর্দার উপকারিতা বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে যেখানে পর্দা আছে ও যেখানে পর্দা নেই এমন দু’টি সমাজকে বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে।
যে দেশে সবচেয়ে বেশি অপরাধু-সংগঠিত হয় সে দেশটির নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯০ সালের এফবিআই-এর এক রিপোর্টে দেখা যায় সে বছর সেখানে == ১,২৫০ মহিলা ধর্ষিতা হয়েছে এবং ধর্ষণের মাত্র ১৬ শতাংশ এই রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা হল ৬,৪০,০০০ মহিলা ধর্ষিতা হয়েছে। সংখ্যাটি ৩৬৫ দ্বারা ভাগ করলে দেখা যায় ১৯৯০ সালে প্রতিদিন গড়ে ১,৭৫৬ জন মহিলা আমেরিকাতে ধর্ষিতা হয়। ১৯৯১ সালে (১৯৯৩ সালে প্রকাশিত রিপোর্ট মতে) ১.৩ জন প্রতি মিনিটে ধর্ষিতা হয়।.... আমেরিকা মহিলাদের অবাধ মেলামেশার অধিকার দিয়েছে এবং তারা অধিক হারে ধর্ষিতা হচ্ছে। .... এমনকি ভারতে, জাতীয় অপরাধ ব্যুরোর রিপোর্ট মতে (১৯৯২ সালে প্রকাশিত) প্রতি ৫৪ মিনিটে ১টি ধর্ষণের নথিবদ্ধ করা হয়। আপনি যদি ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা হিসেব করেন, তাহলে প্রতি কয়েক মিনিটেই ১টি হয়ে দাঁড়াবে। ... যদি যুক্তরাষ্ট্রেও সকল মহিলা হিজাব পরে তথা পর্দা করে তাহলে কী ধর্ষণের এই সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকবে। নাকি বাড়বে বা কমবে? যদি ভারতের সকল মহিলা হিজাব পরে, তাহলে কী ধর্ষণের সংখ্যা বাড়বে। কমবে নাকি অপরিবর্তিত থাকবে? ... আমি অনেক ভদ্রলোককে প্রশ্ন করেছি। ধরুন আপনাকে বিচারক বানানো হল, ইসলামী, ভারতীয় আইন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের আইন বাদ দিন, আপনি যদি বিচারক হতেন তখন আপনার বোনের ধর্ষককে আপনি কী শাস্তি দিতেন? সকলেই একবাক্যে বলেছেন, ‘মৃত্যুদন্ড’। কেউ কেউ বলেছেন, ‘আমি মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি দিতে থাকব” (ডা. জাকির নায়েক, লেকচার সমগ্র, ২০১০, পৃষ্ঠা ২৬৬-২৬৭)।
বস্তুত যারা নারীদের লোক দেখানো মৌখিক অধিকার দিয়েছে, তারা তাদেরকে পরিচারিকা ও উপপত্নী হিসেবে ব্যবহার করে। আসুন আমরা প্রকৃতার্থেই একটি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখি। একই সৌন্দর্যের অধীকারিণী দু’বোনের একজন হিজাব পরিহিতা এবং অন্যজন শর্ট পরিহিতা। তারা দু’জন রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। বিবেচনা করুন রাস্তার পাশে বসা বখাটে ছেলেরা কাকে টিজ করবে? নিঃসন্দেহে বলা চলে শর্ট পরিহিতা মেয়েটিকে। আসলেও হিজাব বা পর্দা মহিলাদের সম্মান বৃদ্ধি, নিরাপত্তা বিধান ও পবিত্রতা সংরক্ষণ করে। তাই পরম পাক আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে তার রাসুলকে (স) নির্দেশ দিয়েছেন - “হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রী কন্যা এবং সাধারণ মোমেন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের ওপর টেনে দেয়, এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদের কোন রকম উত্ত্যক্ত করা হবে না” (সূরা আল আযহাব ৩৩, আয়াত ৫৯)। আল্লাহ আরো বলেন - “হে নবী পরিগণ, তোমরা অন্য নারীদের মতো নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে পর-পুরুষের সাথে কোমল কন্ঠে এমনভাবে কথা বলবে না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়, তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে। প্রচীন অজ্ঞতার যুগের মত নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না” (সূরা আল আহযাব ৩৩, আয়াত ৩২-৩৩)। কিন্তু এটা অধিকাংশ মেয়েই মানে না।
সকল ধর্মেই পাপ বা অমঙ্গল যা-ই বলি না কেন তা পরিত্যাজ্য। তাই সতীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধান সকল বিবেকবান পুরুষই করে থাকেন। তাই পঞ্চাশ/ষাট দশকের ঢাকার বাস কন্ডাকটরের সতর্কবাণী - “ওস্তাদ লেডিস, চারচাক্কা বনকে” পর্দানশীন সতী নারীর প্রতি পুরুষের এক চিরন্তন দায়িত্ব বোধেরই পরিচায়ক যা রাজপথে ব্যানার হাতে শ্লোগান দিয়ে কোন দিনও আদায় করা যাবে না। বিবাহ পূর্ব এবং বিবাহ উত্তর নারী-পুরুষের জীবনে সততা প্রাচ্যের সকল ধর্মেই কাম্য। তাই সতীত্ব রক্ষায় বিবাহ পূর্ব এবং বিবাহ উত্তর জীবনে তাদের বেশভূষা ও আচরণ এর অনুকুলই হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় নারীকে আজ যেমনটা হতে হচ্ছে তেমনি পদে পদে লাঞ্ছিতা, অপমানীতা এমনকি বাসে পর্যন্ত ধর্ষিতা হতে হবে এবং হচ্ছেও। রাজপথে নেমে প্রতিকার চেয়েও কোন ফল হবে না এবং হচ্ছেও না। নারীকে আত্মসংযমী ও পর্দানশীন হতে হবে। সে সহজ ও কার্যকর পন্থা নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই ইসলাম ধর্মে সবিস্তারে বাতলানো আছে।
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ